লকডাউনের জেরে…🌼

সেদিন সকালে ফোন এসেছিল একটা – কাঁদতে কাঁদতে মামা বলেছিল, “তোর বাবা আর নেই রে বাবু! পারলাম না আর কিছুদিন জাগিয়ে রাখতে!” –বিশ্বাস করতে পারেনি সে। এই তো, লকডাউন উঠলেই তো তার বাবার কাছে পৌঁছোনোর কথা ছিল!
আজও প্রতীক্ষায় জীমূত, হয়তো সারাজীবনই থাকবে; তার জীবনের এই লকডাউন আর কোনোদিনই স্বাভাবিক হবেনা। হাতে গ্লোব নিয়ে খেলা করার ছলে দূরত্ব মাপাও বোধহয় ছেড়ে দেবে সে, বাবার সাথে তার দূরত্বটা যে আর সেই মাপকাঠিতে মাপা যাবেনা!
না, তার বাবা করোনা আক্রান্ত নয়; নয় কোনো সৈনিক বা ডাক্তার – একজন সাধারণ ব‍্যবসায়ী মানুষ। চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু দেশব‍্যাপী হঠাৎ লকডাউনে আর ফিরতে পারেনি ঘরে, চাইলেও আর ফিরতে পারবেনা; চাইলেও ছুঁয়ে দেখতে পারবেনা তার বাবুকে, বুকে টেনে নিতে পারবেনা অভিমানী স্ত্রীকে। কিছু সম্পর্ক বোধহয় এভাবেও শেষ হয়! কিছু জীবনের সমাপ্তি বোধহয় এভাবেও ঘটে।
সারা বিশ্বের মানুষ যখন নোভেল করোনার খবর মাপতে ব‍্যস্ত, প্রশাসন ব‍্যস্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, তখনই নামকরা সরকারী হাসপাতালের বেডে শুয়েই শেষ নিশ্বাস ত‍্যাগ করেন অপেক্ষারত এক মানুষ – পরিবার- প্রিয়জনের অপেক্ষা।
এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখী পরিবার। ব‍্যবসার সুবাদে থাকতেন দেশেরই আর এক প্রান্তে। বাবা-মা-ভাই থাকেন কলকাতায় – পারিবারিক জটিলতায় সেইসব সম্পর্কতেও ভাঙন ধরেছিল ৬ বছর আগেই, কিন্তু , ধসে যাওয়ার খবর পাননি দূরে বসে; তাই, এখন যখন আবার কলকাতায় ফিরেছেন একাই, ঠাঁই মেলেনি সেই বাড়িতে – একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে শ্বশুরবাড়ি ও কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু-পরিজন। শারিরীক জটিলতা বাড়ছিল, তাই হঠাৎই আসেন কলকাতায় এবং এসে ধরা পড়ে দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসা চলতে থাকে, কিন্তু সুযোগ হয়নি kidney replacement এর – পরিবারের সই ছাড়া সেই অপারেশন যে সম্ভব ছিলনা– এগিয়ে আসেনি বাবা-মা। ইতিমধ‍্যেই লকডাউন শুরু হয়েছে, তাই স্ত্রী-ছেলেও আসতে পারেনি – চলতে থাকে অপেক্ষা। কিন্তু, ক্রমাগত বাড়তেই থাকে লকডাউনের পরিসর; আর একদিকে বাড়তে থাকে শারিরীক অবক্ষয়। একমাত্র আশা video call…বারবার চেয়েও পায়নি প্রশাসনিক কোনো সাহায‍্য। এভাবেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে মৃত‍্যুতে এসে। দেখা হয়নি কারো সাথেই – সুদূরে বসে শুধু থমকে গেছে একরাশ আশা, বয়ে গেছে চোখের জলের ধারা।
ছেলের মৃত‍্যুর খবরেও একফোঁটাও বিচলিত হয়নি বাবা-মা। পারিবারিক বিবাদের মূল কারণ যখন টাকাপয়সা-গয়না-সম্পত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোধহয় এমন পৈশাচিক মনোবৃত্তিই তৈরী হয়, আর লোপ পায় সম্পর্কের মূল‍্য; তাই ডুকরে ডুকরে শেষ হয়ে যেতেও দেখা পায়নি সেই আশৈশব-প্রিয় মুখগুলো। শুধু থমকে গেছে জীমূতের পথ চলা; হয়তো,মেরুদন্ডহীনভাবে চলবে কিছুদিন তারপর আবার ফিরবে মূল স্রোতে; আবার হয়তো নাও ফিরতে পারে, মিলিয়ে যাবে চোরাবালিতে। তবে, দূর্গাদের মৃত‍্যু যেভাবে অপুদের বড়ো করে দেয় এক ধাক্কায়, সেভাবে জীমূতরাও একধাপ বেড়ে উঠবে। শুধু ভুলতে পারবেনা এয়ারপোর্টে শেষ ছুঁতে পাওয়া বাবাকে, video call-এ শেষ দেখা বাবাকে আর পূর্বস্মৃতির আঁচর! লকডাউন এখনো চলছে….

: মধুরিমা রায়, রাণাঘাট, নদীয়া- ৭৪১২৪৭.

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

2 thoughts on “লকডাউনের জেরে…🌼

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started