কিছু কিছু সুর থাকে যা কথাকে আশ্রয় করে না। শব্দের মোড়ক ছাড়াই প্রকাশ পায় নগ্নভাবে। আর সেই নগ্নতাই সত্য, সুন্দর। আবার কোনও কোনও সময় শব্দের আতিশয্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেখিয়ে দেয় অন্দরমহল। সুরের বসতবাড়ি। স্টকয়স্কি বলেছিলেন স্তব্ধতার ক্যানভাসে ঈশ্বর সুর আঁকেন। মাঝে মাঝে এ কথাটিকে আমার সাংঘাতিক সত্য বলে মনে হয়। এও মনে হয় যে মাকড়সার জালের মতো অজস্র সুরের জাল ছড়ানো থাকে চারিদিকে, জড়িয়ে ধরলেই সুরারোপিত জীবন…বছর তিনেক আগে কার্শিয়াংয়ের রাস্তায় এক অদ্ভুত বিকেল কেটেছিল; overspread silence…একটা চায়ের দোকান, কেটলি ও কিছু বাসনপত্রের খুচরো আওয়াজ, সামনে দেবদারু জঙ্গলে কিছু পাখির কলতান, আর কিছু শব্দ নেই। হাঁটলে জুতোর মচমচ শব্দ ওঠে। একটা দুটো যাত্রীবোঝাই গাড়ি দার্জিলিঙয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে আরও ওপরে। এমন নিরবিচ্ছিন্ন স্তব্ধতায় হাঁটতে দিব্যি লাগে। আদিম শব্দহীন নৈসর্গিক দৃশ্যকল্প যেন! চায়ের দোকানটিতে সঙ্গ পেয়েছিলাম এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর। অন্তর্মুখী ত্রিকালজ্ঞ সাধকের মতো দৃষ্টি। খানিক পরে এক ব্যাপার ঘটল। সামনের উঁচু সবজে পাহাড়টা থেকে ভেসে এল একটি সুর। প্রার্থনার সুর, কাছেই কোথাও মনাস্ট্রি থেকে আসছে। সমগ্র চরাচরে বিস্তার করছে এক অনির্বচনীয় নমনীয়তা, হিমালয় ভেসে যাচ্ছে সুরস্রোতে। এ সুরের উৎস কোথায়! ঠিক কতগুলো গিরিপথ লঙ্ঘন করে ভারতবর্ষের একফালি পাহাড়ি শ্যামল উপত্যকাকে প্লাবিত করছে জানা নেই! বৌদ্ধ সাধক উঠে গেছিলেন,সূর্যও ডুবেছিল, আমি অনেকক্ষণ বসেছিলাম স্তব চাদর গায়ে জড়িয়ে।
গাড়িটা যেখানে এসে থামল সেটা শিলং আর গৌহাটির ঠিক মাঝখানের জায়গা। নাম তার নংপো। গাড়িতে বাজছিল কিশোর কুমার। গাড়ি থামতেই ভদ্রলোককেও চুপ করিয়ে দেওয়া হল। চারদিকটা নিস্তব্ধ, পাইনের ঘন জঙ্গল,রাস্তা সামনে চড়াই উঠে গেছে। কফির দোকানে কফি পেটে ঢেলে গাড়িতে ফেরার সময় চোখে পড়ল বাচ্চাটাকে। বয়স সাত কিংবা আট হবে, চোখ দুটো ক্ষুদে, পরনে ময়লা হলদেটে একটা ঢোলা জামা আর খয়েরি হাফপ্যান্ট, রাস্তার ওপর একমনে একটা বাঁশের পাইপে ফুঁ দিচ্ছে। ফুঁ গুলো বৃথা যাচ্ছে না। তৈরী হচ্ছে আওয়াজ। একটা সুর। অদ্ভুত এক মৌলিক সুর। এ সুরে কোনও কৌলিন্য নেই,এ সুর কোনও দাবি রাখে না, এ সুর কোনও দেখনদারি করে না। তৈরী হয়েই হারিয়ে যায় পাইনের জঙ্গলে। গাড়ি আবার চলল শিলংয়ের দিকে। সেই সুরটা কানে বেজে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ। ভারী অদ্ভুত লাগে ব্যাপারটা এভাবে ভাবলে, যেমন একটি জেলে পুকুরের জলে ছিপ ফেলে বসে থাকে,ঠিক তেমনি হয়ত বাচ্চা ছেলেটা ওই পাইপটা হাতে নিয়ে ফুঁ দিচ্ছিল, মাছ যেমন ধরা পড়ে যায়,তেমনভাবেই অচিনপুরের কোনও সুর হয়ত ভাসতে ভাসতে এসে সেই পাইপে আত্মসমর্পণ করেছে!! তারমানে এই দাঁড়াচ্ছে যে সুর তৈরী হচ্ছে না নতুন করে,বরং অনেক আগেই সব টিউন যেন তৈরী করাই আছে, শুধু মানুষের সৃষ্টিশীল সতর্ক চেতনার খপ্পড়ে পড়বার অপেক্ষা!পরে জেনেছিলাম বাঁশের পাইপটার নাম স্থানীয় ভাষায় “কুচপা।”
আমার একটা দোষ আছে। মাঝেমধ্যে কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন নিজেকে করে ফেলি। তারপর নিজের ভেতর অনেকগুলো “আমি” জন্মায়,তাদের একেকরকম মতামত,একেকরকম চিন্তাধারা। সেইসব মতামত বা উত্তর কে সমষ্টিবদ্ধ করে একটা কিছু হয়ত পাওয়া যায়,কিন্তু তাতেও ফাঁক থেকে যায় অনেক। যেমন ধরুন, একটা প্রশ্ন যে শব্দ বা আওয়াজের সাথে সুরের তফাত ঠিক কোনক্ষেত্রে?আপাত অর্থে খুব সাধারণ ভাবেই মনে হবে যে শব্দ তো শব্দই,সেটা সুরের মতো ব্যপ্ত নয়। কিন্তু, মুশকিলটা হল যে প্রতিটা শব্দের মধ্যেই সুরের আত্মা লুকিয়ে থাকে বলে আমার বিশ্বাস। সহজ করে বললে একটা যেকোনো শব্দ বিস্তার লাভ করলেই সেটা নির্দিষ্ট সুরে রুপান্তরিত হয়। একমুখী বিস্তারে ছন্দলাভও একমুখী হয়, তবে এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া ভালো যে প্রতিটি শব্দই প্রতিটি সুরের সংক্ষিপ্ত রূপ। বিস্তারেই ধ্বনি জন্মায়। কিছু কিছু আওয়াজ আছে যা আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। যেমন বৃষ্টি আসার শব্দ, নিশুত রাতে নিঝুম রাস্তায় ভারী বুটের ভারী মচমচ শব্দ, মরা নিয়ে যাওয়ার সময় উচ্চকিত হরিধ্বনি। আরেক ধরনের আওয়াজ পরিচিত ছিল ছেলেবেলায়। আপিস থেকে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করার সময় রোজ বাবার পকেট থেকে বেশ কিছু খুচরো পয়সা ছড়িয়ে পড়ত মেঝেতে। আমরা ঝাঁপ দিতাম সেই ধাতব সচ্ছলতার ওপর। সেই রিনরিনে আওয়াজটায় একটা আমোদ মিশে থাকত। খুব রাতে বৃষ্টি পড়লে টিনের চালে ঝিনঝিনে বাজনা, নিঝুম অন্ধকারে সেটা যে নিছক শব্দ হয়ে থাকত না বলাই বাহুল্য। বৃষ্টির বাড়াকমা বোঝা যেত অনায়াসে। একতারার আওয়াজ মুগ্ধ করে। একতারার ওই একটি তারে কি আছে বলুন তো? যার জন্য বিবাগী হয়ে যাওয়া যায়, যার জন্য গেয়ে ওঠা যায় “তুই আমায় পাগল করলি রে!” আপার বার্থে আমি তখন ঘুমে কাদা। ট্রেন যাত্রী বোঝাই, হঠাৎ ওই সব্বোনেশে শব্দটা কানে এল। গেরুয়া পরা ভিখারীটা গাইছে “হরি হে, দুখ দাও যে জনারে”। তাকিয়ে থাকলাম লোকটার দিকে। রুগ্ন শরীর, গলার শিরা ফুলে উঠেছে। হরি সুখ না দিক অন্তত একটা একতারা দিয়েছে ওকে। ট্রেন বোলপুর ছাড়ল।
মায়ের চুড়ির আওয়াজ আমি চিনি। ওটা থামলে বুঝি মাও থেমে গেছে। একটা চুড়িতে কোনোদিন সুর তৈরী হয় না। সুরে মিশে থাকে একটা টাটকা গন্ধ,মায়ের গন্ধ। ওই সুরে ধাতব গন্ধ থাকে না। আমার চেতনায় মায়ের যাতায়াত চিরন্তন। সুর কখন গান হয়?? সুরের অনাবৃত শরীরে কথার জামা পড়িয়ে ছন্দের প্রসাধণে গান সৃষ্টি হয়।
পৃথিবীর সবথেকে ইন্টারেস্টিং আওয়াজ হল নাক ডাকার আওয়াজ। ট্রেনের কামরায় সন্মিলিতভাবে ওই আওয়াজ তন্দ্রাকে যখন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয় তখন বিরক্ত লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্ত কেন জানি আমার মনে হয় প্রত্যেকের নাক ডাকার মধ্যে একটা তফাত আছে। কারোরটা নরম সুরে, যেন এক অব্যক্ত আকুতি মিশে আছে,যেনও অনেকদিনের না বলা কথা ঘুমের মধ্যে সব অভিমান ঝেড়ে জেগে উঠতে চাইছে। কারোরটা গর্জন, যেন বহুদিনের রাগে প্রতিশোধের নেশা চেপেছে, কারোরটা আবার নির্বিকার, সরল স্বীকারোক্তি যেন, এইতো আছি, ভালোই আছি টাইপ। এটাও তো সুর!
পৃথিবীটা একটা সুরের পাহাড়ের ওপর অধিষ্ঠিত। কোনায় কোনায় সুরের আবাহন। সেখানে ডুংরি আছে,কুচপা আছে,একতারা আছে, হাসি কান্না হিরা পান্না সব আছে।কার্শিয়াংয়ের সেই অপূর্ব বিকেল বা ঝাড়খন্ডের ঝাঁঝালো মাদলের মধ্যরাত্তির যখন ফিরে ফিরে আসে,সমগ্র শব্দের ক্যাকাফোনি ছাপিয়ে অপূর্ব এক বাঁশি শুনতে পাই। কোথায় বাজে,কে বাজায় জানি না। মন বলে সুতীক্ষ্ণ সেই স্বরে পৃথিবীর সমস্ত সুর লুকিয়ে আছে। শুরুর সেদিন ব্রহ্মান্ডের জন্মের শুভলগ্নেও সে বাঁশি নির্ঘাত বেজেছিল,সেই অকৃত্রিম অদ্বিতীয় সংগীতের পিঠেই ব্রহ্মান্ডের ব্যাপ্তি, সভ্যতার পদচারণা। আবহমান তা বেজে চলেছে একক অখন্ড ব্রহ্মরাজ্যে….”বাজে অসীম নভোমাঝে অনাদি রব,জাগে অগন্য রবি চন্দ্র তারা….” সুরের সেই চির পরিচিত দেশটা সবার। সেখানে পিট সিগার আছে,লালন আছে,আছে সেই নংপোর বাচ্চা ছেলেটাও।
ভালো থাকবেন…

: সুপ্রতীক চক্রবর্তী