চলার পথে…

এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনের দূরত্বে চলে তাদের পরিপাটির সাম্রাজ‍্য…

দলে আছে কমবয়সী থেকে বয়স্ক সকলেই! এক-একজনের জীবনের এক-এক ধরনের বিচিত্র কাহিনি কান পাতলেই শোনা যায়! সাজগোজ? পরনে রঙচটা, ছেঁড়া শাড়ি- ব্লাউজ, আঁচল কোমড়ে গোঁজা, হাতখোঁপাতে কোনো পরিপাট‍্য নেই, কারো বা কপালে সিঁদুরের আভা; অধিকাংশই প্রচন্ড শীর্ণ, দেখলেই বোঝা যায়, অসম্ভব মনের জোরই এগিয়ে নিয়ে যায় তাঁদের! এইসব মহিলাদের সাথে প্রচুর পুরুষ সঙ্গীও দেখা যায়– হয়তো নেই কোনো বিশেষ সম্পর্ক, শুধু কাজের সূত্রেই সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুর মতো। এদেরও দেখা যায় লুঙ্গি ভাঁজ করে কোমরে বেঁধে আর একটা ছেঁড়াফাটা গেঞ্জি পড়ে মাথায় মুট বইতে! রোজকার ঝগড়ার মধ‍্যেও তাদের অদম‍্য ভালবাসা আর ভালোলাগা বেঁচে থাকে! সস্তার অভিমান বোধহয় শুধু মধ‍্যবিত্তদেরই সাজে…একদল তাকে কিনে নেয় টাকায়, আর এই একদল, যাদের মধ‍্যে অভিমান বিস্তারের অবকাশই পায়না– প্রতিদিনের জীবনে এরা এতটাই সহজলভ‍্য যে আলাদা চোখে দেখতেই শিখিনি আমরা! কেউ কেউ এদের দেখলেই নাক সিঁটকোয়, নির্দ্বিধায় দামী জুতোয় পা দলে দেয় ভীড়ের সুযোগে; আবার কেউ কেউ একটু হাসিমুখে কথা বলে জেনে নিতে চায় অভাবের কথা! 

 আজ বহুদিন বাদে ভোরের ট্রেনে– ৫:৪০ এর কৃষ্ণনগর লোকাল। চারপাশে এত গিজগিজে ভীড় দেখে মনে হবে যেন বিকেল ৫টার কোনো ট্রেনে উঠেছি বাড়ি ফেরার জন‍্য! ভ‍্যান্ডারের ভাড়া বাঁচাতে গেটের দু’দিকে সার দেওয়া জিনিসের ঢল– কেউ ঘুমে ঢুলছে, আবার কেউ কেউ ব‍্যস্ত ফুলের মালা গাঁথতে, কেউ ঘরে ভাজা মুড়ি আর ছোলা এনেছে বিক্রি করতে, কোথাও ঝুলছে বড়ো পাপড়ের ঝাঁঝড়ি, পাশের কামরা থেকে ভেসে আসছে ছানার জলের বিদঘুটে গন্ধ; এরমধ‍্যেই শোনা যাবে কোনো এক মালতী পিসি গান ধরেছে দরাজ গলায়..  আর, ঐ যে লোকগুলো, তাদের মধ‍্যেও কেউ কেউ এইসব মহিলাদের সরঞ্জাম গুছিয়ে দিয়েই ছুটে চলে অন‍্য কামরায় জায়গা করে নিতে! অদ্ভুত পরিবেশ, কিন্তু প্রচলিত! তবু আজ যেন সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার ইচ্ছে জেগেছিল প্রবলভাবে! 

    ট্রেন তখন মদনপুর…

প্রতি স্টেশনের মতো এবারও গেটে চলছে প্রচন্ড ব‍্যস্ততা, ভ‍্যান্ডারির জিনিসপত্র ওঠানামা করছে.. হঠাৎই এক মহিলা এক বৃদ্ধার মাথা ঠুকে দিল দরজায় নিজের ‘মাল’ তোলার জন‍্য, তারপরই প্রায় হাতাহাতি; ব‍্যস…

ট্রেন চলতে শুরু করেছে , রড ধরে দৌড়চ্ছে ঐ মহিলা; ঝুলে পড়েছে– টানটান উত্তেজনা আমাদের চোখেমুখে – পড়ে গেল? না! রোজকার মতোই অভ‍্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে পড়েছে ট্রেনে; আর, তারপরই আবার ঝগড়া, গালাগালি! তবে, সাথের সঙ্গীটি আর উঠতে পেরেছে কিনা অন‍্য কামরায় তা জানতে পারিনি!

    না, আজ আর এদের ঝগড়ায় অস্বস্তি লাগলো না, বরং মনে হল এটাই তাদের বেঁচে থাকার রসদ…আর, ঐ যে মেলবন্ধন একেও অনেকে নোংরা চোখে দেখবে, কটু মন্তব‍্য করবে! আবার কিছুক্ষন পর থেকেই একসাথে বসে শুরু করবে প্রতিদিনের যাত্রা, আবার গল্প করবে সব ভুলে, বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে খোঁজ নেবে একে অপরের… দিনশেষে এরা কী পায়, আমরা জানি না, খোঁজও রাখি না…তবে বিশ্বাস, কিছু ভরসার হাত আছে এদের, একটা দল আছে…এরা দরকারে মারবেও, আবার হাত টেনে ধরে বাঁচিয়েও নেবে প্রত‍্যেকে প্রত‍্যেককে। শুধু ব‍্যস্ততার ভান করার মাঝে আমরাই এই ভালোলাগাকে খুঁজতে শিখিনি!

    হঠাৎ ভাবনার দমকে বাঁধা পড়ল, নৈহাটি ঢুকছে ! ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসলাম গেটের সামনে, ঠান্ডা হাওয়ার স্নিগ্ধতা জড়িয়ে নিল – নেমে পড়লাম আমি, এগিয়ে গেল তারা দিগন্তবিহীন গন্তব‍্যে! আবার দেখা হবে ফেরার পথে…

: মধুরিমা রায়

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started