ভুল

গৃহকর্তা সাহস রায় পিসিমার ভয়ে ঘাবড়ে থাকেন আর সবকিছু গুলিয়ে ফেলেন । বিনস’র সাথে বরবটির যে কী তফাৎ আজও বুঝতে পারলেন না। উচ্ছে করলাও তো একইরকম । বেগুণের মধ্যে যে পোকা আছে, সেটা যে কীকরে মানুষ বাইরে থেকে বোঝে, কে জানে! 

আজকে যেমন সস্তায় পেয়েছেন ভেবে পেঁয়াজের বদলে টোপাকুল কিনে এনেছেন । পিসিমা ফতোয়া দিয়েছে সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া যাবে না । গায়ে জ্বালা ধরিয়ে বউ শুনিয়েছে – অসময়ে কুল খেয়েই তোমার যতো ভুল।

পিসিমার সাথে সর্বদা বউ সানাইয়ের পোঁ ধরে । কেউ কোনও সাশ্রয় করে না, কিন্তু সেকথা বলবার উপায় নেই সাহসবাবুর । অফিসে নারীদিবসের বক্তৃতায় শুনেছেন – গৃহশ্রমে মজুরি হয় না বলে…। তবে উনি খেয়াল করে দেখেছেন, সব বাড়ির নারীই শায়েস্তা হয় কাজের লোক কামাই করলে । 

বাজার করা তার কাছে ছোটবেলা থেকেই বড় ঝক্কির কাজ। ফর্দ দেখে, সস্তা খুঁজে বাজার দোকান করো, গলদঘর্ম হয়ে বয়ে নিয়ে এসো তারপর হাজার গঞ্জনাও সহ্য করো। যথেষ্ট সস্তায় জিনিস কিনতে পারে না বলে বাবা তাকে বাজার না যেতে দিয়ে নিজে খুঁজে যতরাজ্যের হাবিজাবি কিনে এনে লোককে কৃতিত্বের গল্প শোনাতো। বাজারওলারা সম্পর্কে যেন সাহসবাবুর মামা ।  

বাহান্ন বছরের সাহসকে সুযোগ পেলেই এখনও বুড়ি পিসিমা অবহেলার হাসি হেসে বাচ্চা ছেলের মতো উপদেশ দিতে শুরু করেন। সম্পত্তিগুলো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে ঘ্যানঘ্যান। একটা কথা ওনার মনে থাকে না, ঠাকুরদার আমলের যাবতীয় কাগজপত্র কোন এক সিন্দুকে লুকিয়ে তিনি মারা গেছিলেন। 

বিয়ের পর থেকে গত বাইশ বছর ধরে সবেতেই ভয় পান সাহসবাবু । বসের ভয়, মাস শেষের ভয়, মুরগির ফ্লু হলে খাসি কেনার ভয়, নেমন্তন্ন এলে ভয়, ইএমআইয়ের ভয়, কোলেস্টেরলের ভয়, পাড়ার দাদাদের ভয়, চাহিদার ভয়, সম্বৎসর পুজোর সময় দেবীও দশহাতে মহাভয় দেন। তাই আজকাল শরীরটা সবসময়েই যেন দুর্বল ঠেকে।

আজ ভুল হতো না বড় একটা, চায়ের দোকানে বসে গল্পগাছা করতে গিয়েই হয়েছে মুশকিল। তারপরে মুদির দোকানে না গিয়ে তিনি সেলুনে গিয়ে আয়েস করে দাড়ি কেটে বাড়ি ফিরেছেন ।

এই কারণেই অফিসে লোকে কাজ না করে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে । সবার আগে সব কাজ করে দেয় – সেটা নাকি তার গুণ নয়, বসের ভয় । আর কী করেন সাহসবাবু… ক্ষমা করে দেন । লোকগুলো যে গণ্ডমুর্খ সে ভালই জানা আছে। কালীপুজোয় লোকের ঘরে রকেট ঢুকিয়ে, চন্দ্রযান কেন ঠিকমতো ল্যাণ্ড করলো না সেই নিয়ে আলোচনা করে । তাকেও যে এরা পুঁছবে না, তাতে আশ্চর্য কি ! অবশ্য সুযোগ পেলে তিনিও গালগল্পও যে ঝাড়েন না, তা  নয় । তবে অতি বড় নিন্দুকও তার গল্প বলার আর্টের তারিফ করে থাকেন । 

তার ছোটবেলায় শান্তিনিবাসে পিসিমার সাথে ইন্দিরা গান্ধী দেখা করতে এসেছিল কিংবা দাদুর নেতৃত্বে ভারতের সেনা গিয়ে বাংলাদেশটাকে উদ্ধার করেছিল অথবা বাবা কাউকে তেমন বুদ্ধি দিয়েছিলেন বলেই জিও এই অফার এনেছে… এসব শুনে সবাই আমোদ পায় খুব । সাহসবাবুও চা সিঙারা খাইয়ে থাকেন । সবাই বাহবা দিয়ে বলে, জমিদারের বংশ তো বটে ।

ফেব্রুয়ারির শেষে অফিসে জোর খবর । অডিট করতে লোক আসছে হেড অফিস থেকে । কয়েকদিন বসের হম্বিতম্বি বন্ধ । 

কয়েকদিন ধরে চলা গুজব সত্যি হতে দেখল অফিসের সবাই । বস ব্যাটা জব্বর ফাঁদে পড়েছে । কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ মিলছে না । ফাইল সব লোপাট । অনেকদিন আগেকার দলিল… কারোর মনেও নেই ।

সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছে তখন খেল দেখালেন সাহসবাবু । স্টক খুঁজে হাজির করলেন ভুলে যাওয়া সব ফাইলগুলো । 

তারপর থেকে ভুলো লোকটাকে সবাই সাহস হিসেবেই মনে রাখলো । 

ছবি: সংগৃহীত

: বৈদূর্য্য সরকার

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started