আলিঙ্গন

তুমি চুল টা সরিয়ে রাখলে কানের পাশে।

আমার চোখ না চাইতেও থেমে গেলো, বাসের ভীড়ে আর ঝাঁকুনির অবহেলা কিন্তু আমার নজরের লক্ষ্যবস্তু বদলাতে পারলো না।
দেড় বছর হলো একলা জীবন যাপন, শেষ বারের সম্পর্কটা আত্মসম্মানের তাগিদে মুছে দিয়েছি, ভালোবাসাটা এতটাই গভীর ভাবে গহীনে দাগ কেটেছিল যন্ত্রণার, এতোটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তার রেশ কাটে নি।

সব কিছু যেনো গুলিয়ে কোথায় মিশে গেছিলো জানো?
ঠিক যখন শ্যামবাজারগামী বাসটা বালি হল্ট থেকে দক্ষিণেশ্বরে এসে দাঁড়ালো, কন্ডাক্টারের হাঁক আর বাসের হর্ন এর শব্দ কোলাহলের মাঝে সন্তর্পনে ব্যাগ টা কষে হাতে ধরে উঠলে বাসে, সচরাচর, আমি কানে হেডফোন গুজে গান অনুভব করতে ভালোবাসি, শব্দ গুলো যেনো গানের গল্প বলে যায় সুরে সুরে, জীবনের, সময়ের, তোমার-আমার, সমাজের, কান থেকে সরিয়ে রাখলাম সেই হেডফোন, আজ যেনো একাকীত্বের ফাঁকে কোথাও একটা কারণ খুঁজে পেয়েছি উৎফুল্ল হওয়ার, যদিও তোমার তখনও গোচরে আমি আসিনি, দূর থেকেই দাঁড়ানো লোকেদের দুলতে থাকা শরীর গুলোর ফাঁকে ফাঁকে দেখছিলাম তোমাকে, যেনো লুকোচুরি খেলা চলছে তোমাতে আমাতে।
কন্ডাক্টার হাঁক ছাড়ল ডানলপ…

বেশ অনেক ভিড় আলগা হলে প্রথম বার চোখ পড়লো তোমার আমার,
তোমার চোখে সরু করে টেনে রাখা লাইনার, পড়েছিলে সবুজের টিন্ট টপ, সরু ঠোঁট আর তোমার চাহনি কিছু না বলেও যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মত আকর্ষণ করছিল তোমার দিকে, প্রথম প্রেমে যেমন হয় , ঠিক সেই একই অনুভূতি,
সত্যি পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমি সম্পর্ক থেকে?

ধাক্কা খেয়ে আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প শুনতে শুনতে কেমন যেনো একটা ভয়ংকর পরিণতি মন ভেবে নেয় নিজে থেকেই। তাই মনকে সান্তনা দিয়ে সামলে রাখি প্রায়শই কিন্তু সেদিন পারছিলাম না, পারছিলাম না কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা বিচার করতে! বাস যত ক্রমশঃ এগোতে থাকলো, তোমার চোখ দেখলাম আমার চোখে বেশ কয়েক বার এসে ফিরে গেলো। নিজেকে কেমন যেনো চাতক পাখির মত মনে হতে লাগলো।ঠোঁটের কোণে নিজের অজান্তে ক্ষীণ হাসি কখন ফুটে উঠেছিল বুঝতে পারিনি ততক্ষণ, যতক্ষন হটাৎ তোমার চোখে চোখ পড়তেই তোমার হাসি ফুটে উঠলো,
সিঁথির মোড় আসতেই আমার নেমে পড়ার পালা, বুঝেছিলাম তোমার ঝোলা ব্যাগ আর চাহনিতে তুমি রবীন্দ্রভারতীতেই পড়তে কনফার্ম হলাম যখন কন্ডাক্টার টিকিট কালেক্ট করতে গেলো…
আমি নেমে পড়লাম। সোজা চললাম আমাদের অফিসে,
চেষ্টা করছি মুহুর্তগুলো ফেলে রেখে এগোনোর; কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারছিনা, চেষ্টার পর চেষ্টা, ঠিক যেমন ছোটো বেলায় ভূতের সিনেমা দেখলে রাতের বেলা হতো, ঠিক তেমন। কিন্তু প্রেম তো আমি আগেও করেছি, সম্পর্ক ছিল বেশ কয়েক বছর, এমন অনুভূতি তো হয় নি , নানা রকম খেয়াল মাথাচাড়া দিতে শুরু করলো, তার রেশ কাটবার ছিলো না কে জানতো?


বেশ কিছু দিন কেটে গেল ঘড়ি ধরে বাড়ি থেকে বেরোনো আর ঠিক ওই বাস টাতেই ওঠা, নাহ তোমার দেখা নেই, তারপর ওই সময় টা বরাবর দক্ষিণেশ্বরের বাস স্টপে বেশ কিছু দিন অপেক্ষাও করা;

নাহ তোমার দেখা নেই।


দেখতে দেখতে প্রায় দুমাস কেটে গেল তোমায় আর দেখিনি, সত্যি বলতে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি, বাসে যথারীতি সামনের দিকে বসে কানে হেডফোন গুজে দিয়ে হারিয়ে যেতাম কাল্পনিক প্রেম উদ্ভাবনে,
আমি চা খেতে খুব ভালোবাসি, তবে বাস থেকে নেমেই চা খাওয়াটা কোনোদিনই হতো না, অফিসের ঠিক সামনেই বেশ কড়া করে আদা দিয়ে চা বানায়, ওখানে খেয়েই ঢুকতাম অফিসে। কিন্তু সেদিন জানিনা কেনো বাস থেকে নেমে পড়ার পর ফুটপাতের ঠিক পাশের চা’র দোকানে দাঁড়ালাম? পয়সা মিটিয়ে চা আর সিগারেটে একটু আনমনা হয়ে কী যেনো একটা ভাবছিলাম, হটাৎ চোখ পড়লো ফুটপাথ বরাবর, আমি সত্যি তোমায় দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, সত্যি বলতে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম ।
তোমার হাতে তখন অচেনা যুবকের হাত, অজ্ঞাত কারণ বসত চোখ কিন্তু চোখ এড়ালো না, চোখের কায়দায় বেশ বুঝিয়ে দিয়েছিলে তুমি অন্য কারো সাথে বাঁধবে ঘর;
মনের কোথাও যেনো একটা শান্ত ঝড় আর তৃপ্তি একসাথে বয়ে গেলো, বেশ কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলাম , সিগারেটটা কখন যেনো ফুরিয়ে গেছিলো ঠাওর করে উঠতেও পারিনি, শুধু নিস্পলক চোখে দেখেছিলাম তোমার চলে যাওয়া।

হাওয়ায় আলতো চুল গুলো ঢলে পড়ছিল তোমার কাঁধ বেয়ে, হাতের আঙ্গুলের ভাজে আঙ্গুল গুলো আলতো ভাবে আগলানো।

একবার বুকে মাথাটা রাখবে?

-হুম, রাখলাম।

সময় টা পেরিয়ে গেলো তার পর মাস থেকে মাস , বছর থেকে বছর, সেই আকর্ষণ থেকে আমি আর বেরিয়ে আসতে পারিনি কোনোদিন । ভুলিনি তোমায় বিশ্বাস করো, তবু তোমার হাতে রাখা হাত যেনো সুখের দিগন্তে পাড়ি দেয়, যেনো তুমি ভালো থাকো কোথাও না কোথাও আমার প্রার্থনা তে তাই ঘুরে ফিরে আসতো।

তার পর ব্যবসা যখন বেশ জমে উঠলো, আমি আর দাদা বেশ জমিয়ে ব্যবসা করছি হটাৎ বাবা একদিন তোমার ছবিটা সামনে রাখলো, বললো-

পছন্দ তোর?

আমাদের বয়স বাড়ছে এবার কিছু ভাবতে হবে তোকে ।
আমি সেই মুহূর্তে কতটা অবাক, আবেগ আপ্লুত সেটা বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল, এদিকে মনের ভিতর যে আন্দোলন আনন্দের চলছে তা চেপে রাখাটা সত্যি অক্ল্পনীয়!
তার পরের গল্প টা তুমি জানো…


তুমি শুনতে চেয়েছিলে আমার প্রেমের গল্প, আমাদের প্রেম এর গল্প এই ফুলশয্যায় তোমায় এইটুকু উপহার দিলাম, চুমু আঁকলাম তোমার কপালে।

: সৌগত গাঙ্গুলী
ঠিকানা : চকপাড়া, লিলুয়া, হাওড়া ,
ডাক যোগ সংখ্যা : ৭১১২০৪

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started