রংপেন্সিল

।। এক ।।

সন্ধ্যে ছ’টার মধ্যে অফিস থেকে বেরোতেই হবে আজ। সকাল থেকে তাই যথাসম্ভব কম সময় নষ্ট করে নিজের কাজটুকু শেষ করার চেষ্টা করে চলেছি, সময় পাইনি টিফিনটুকু খাওয়ারও। ঋক বলেছিল, অফিস ফেরৎ বাইরে কোথাও দেখা করার কথা। বলে দিয়েছি, হবে না আজ, ওকে বরং আমার সঙ্গে নিয়ে যাবো আমাদের বাড়ি।

আজ ছেলেটার জন্মদিন। ন’বছরে পা দিল। আসার সময় বারবার করে বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা। বড়ো কোনো অনুষ্ঠান হয় না তেমন, শুধু ওর কয়েকজন কাছের বন্ধু আর আমার বাবা – মা মানে নীলের দাদু – দিদা আসে এই দিনটায়।

অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই দেখলাম ঋক আসছে। ঋক এর অফিস আর আমার অফিসের দূরত্ব খুব বেশি হলে এক কিলোমিটার। একই বাসে যাতায়াতের সূত্রেই কখন যেন সহযাত্রী থেকে বন্ধু হয়ে উঠেছিল ঋক। পরিচয় বেশিদিনের নয়, ছয় -সাত মাস হবে হয়তো। কিন্তু সময়ের মানদন্ডে কি আর সম্পর্কের গভীরতা মাপা যায়? স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই আমার খারাপ লাগা, ভালোলাগা, একাকিত্ব, হতাশা, আনন্দ, বিষাদের কত স্মৃতি আর মুহূর্তের ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিল ও। আমাদের নিখাদ বন্ধুত্বের প্রাচীরে প্ৰতিফলিত হয়ে গিয়েছে কত শত অশ্লীল শব্দের তীর, কারণ একটি ছেলে আর একটি মেয়ে যে শুধুমাত্রই খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে, তা এখনো সহজদৃষ্টিতে মেনে নিতে পারে না আজকের “কেতাদুরস্ত “, “আধুনিকমনস্ক “, “যুক্তিবাদী” সমাজ। আচ্ছা, বন্ধুত্বের কোনো জেন্ডার হয় নাকি?

ঋক আসতেই একটা রিক্সা ধরে আমরা রওনা দিলাম সামনের বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্য। মাঝখানে একটা কেকের দোকান চোখে পড়ায় রিক্সাচালক ভাইটিকে একটু দাঁড় করিয়ে একটা কেক কিনে এনে রিক্সায় উঠতে গিয়ে দেখি, ঋক নেই। রিক্সাচালক ভাইটিকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, “দাদা বললেন, একটু অপেক্ষা করতে, উনি সামনের দোকান থেকে কিছুক্ষনের মধ্যেই আসছেন।” এদিকে দেরি হয়ে গেলেও অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। প্রায় ১৫ মিনিট পর ফিরে এলো ঋক, হাতে রঙিন গিফ্টপ্যাক এ মোড়া উপহার। মনেই হচ্ছিলো আমার, ও এমন কিছু একটা কিনতেই গেছে। বাকি পথ যেতে যেতে বললাম ঋককে, “জন্মদিনে উপহার না নিয়ে যাওয়া যাবে না এমন নিয়ম কিন্তু কোথাও বলা নেই, তুমি নিজে যাচ্ছ, আমার ছেলেটার আনন্দের একজন অংশীদার হয়ে উঠছো, এর থেকে বড়ো উপহার আর কি হতে পারে? “ঋকের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে আমি পেরে উঠিনি কোনোদিনই, জানতাম আজও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটবে না, তাই প্রত্যাশামতোই উত্তর, “জীবনের প্রতিক্ষেত্রেই কি কোনো না কোনো বাঁধাধরা নিয়মের খুব প্রয়োজন? আমাদের ভালোলাগা,খারাপলাগা -এগুলোর কি দাম নেই কোনো? সবকিছুকেই কি জড়িয়ে ফেলতে হবে নিয়মের বেড়াজালে? নীল বাচ্চা ছেলে, আমরা যখন ছোটো ছিলাম আমাদের জন্মদিনে আমরাও অপেক্ষা করে থাকতাম নতুন উপহারের জন্য, আজকের দিনে নীলও হয়তো সেই একই প্রত্যাশাই করে। তোমার কথা মতো আমি নিজে গিয়ে না হয় ওর আনন্দের ভাগীদার হলাম, কিন্তু সেই আনন্দে যদি একটুও নতুন মাত্রা যোগ করতে না পারি তাহলে একটা অতৃপ্তির রেশ যে রয়েই যায় মনের মধ্যে !”

কথা বলতে বলতে কখন যে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেছি, তা খেয়ালই করিনি। ওখানে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি বেশিক্ষন। বাড়িতে যখন পা রাখলাম আমরা ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। আমার বাবা – মা আজ সকাল থেকেই এখানে, আমন্ত্রিতরাও আসতে শুরু করেছে দু একজন করে। নীল স্কুল যায়নি আজ, সারাটা সকাল ওর কেটেছে দাদু-দিদার সঙ্গে দুষ্টুমি করে আর এখন বন্ধু -বান্ধবের সঙ্গে হুল্লোড়ে মত্ত। আমাকে দেখামাত্রই সবকিছু ফেলে দূর থেকে দৌড়ে এসে জাপটে ধরলো ভীষণজোরে। হাত থেকে কেকের প্যাকেটটা পাশের টেবিল এ নামিয়ে রেখে কোলে তুলে নিয়ে খুব আদর করলাম ওকে আর কপালে গালে এঁকে দিলাম শতসহস্র স্নেহচুম্বন। নীলের সারাগায়ে ছড়িয়ে থাকে কি সুন্দর নরম একটা আদুরে গন্ধ, মনে হয় সেই গন্ধের ঘ্রাণ যেন নিতে পারি আজীবন, আমার দেহমনের সমস্ত ক্লান্তি, মনখারাপ ধুয়ে যায় সেই গন্ধের সমুদ্রে।

এরপর সন্ধ্যের বাকি সময়টা কেটে গেছে হাসি -ঠাট্টা -আনন্দ -খুশির মিলিত কোরাসে। নীল -হলুদ -গোলাপি আলোর টুনিতে কি মায়াবী লাগছিল আমাদের ঘরটা। একে একে জন্মদিনের হাওয়ায় এসে মিশেছে কেক কাটার মুহূর্তে সকলের মিলিত শুভেচ্ছাধ্বনি, ঋকের মিষ্টি গলার গান, বাচ্চাদের আনন্দোল্লাসের শব্দ।

।। দুই ।।

এখন রাত এগারোটা। অতিথিরা ফিরে গেছে সবাই। নীলও ঘুমিয়ে পড়েছে ওর দাদু -দিদার সঙ্গে। কাল আবার স্কুল আছে ওর। বাড়ির সব কাজ সেরে উঠে স্নান সেরে আমি এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি আমাদের ভাড়া বাড়ির ছোট্ট ছাদটায়। সারাদিনে নিজেকে দেওয়ার মতো সময় বলতে এটুকুই। দূরে বৃষ্টি হয়েছে কোথাও। ঠান্ডা হওয়ার ঝাপ্টা এসে লাগছে চোখে মুখে। চাঁদটা মেঘের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে বারবার। হাতেগোনা চার -পাঁচটা তারা ফুটে রয়েছে আকাশের একেবারে ঈশাণ কোনটায়। অদূরে কোনো বাড়ির টিভি থেকে ভেসে আসছে খবরপাঠের আওয়াজ। সামনের পুকুরটার শান্তজল বারবার কেঁপে উঠছে দু -একটা বটফল পড়ার মৃদু শব্দে। আর অতীতের কবর খুঁড়ে আমার মাথার ভিতরে একে একে জেগে উঠতে শুরু করেছে দশবছর আগের ব্যথিত স্মৃতির শব। টাইমমেশিনে চেপে আমি ফিরে চলেছি আমার কলেজজীবনের রোমাঞ্চপূর্ণ দিনগুলিতে।

তখন কলেজ শুরু হয়েছে চার -পাঁচদিন হবে। কত নতুন বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে শুরু করেছে সবে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের চৌহদ্দিতে পা রাখা আমাদের সবার চোখে তখন কত আশ্চর্য রঙিন স্বপ্নের অবাধ আনাগোনা। আমার ছিল ইংলিশ অনার্স। দিব্যেন্দু ভৌমিক আমাদের কলেজেরই ইংলিশের প্রফেসর। তাঁর কাছেই পড়া থাকতো সপ্তাহে দুদিন। শুধু আমাদের কলেজই নয়, অন্যান্য অনেক কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও পড়তে আসতো ওঁনার কাছে। সেখানেই প্রথম দেখা বিয়াসের সঙ্গে। বিয়াস সেনগুপ্ত, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইংলিশ অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার। যেদিন প্রথম দেখা সেদিন ওর পরনে ছিল নীল রঙের পাঞ্জাবী আর জিন্স। শান্ত, গভীর চোখদুটোয় বৃষ্টিস্নাত বিকেলের হিমেল বাতাস। সদাহাস্যময় মুখটিতে সদ্য ওঠা দাড়ির আভাস। ওর পড়া থাকতো আমাদের আগের ব্যাচটায়। আসা -যাওয়ার মাঝে দেখা হয়ে যেত মাঝে মধ্যেই, বুকভরা চাপা উত্তেজনা নিয়ে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতাম ওই মায়াময় চোখদুটির দিকে, ডুবে যেতে ইচ্ছে করতো ওই স্বপ্নালু চাহনির অতল গহীনে। নিজে থেকে কথা বলার সাহস বা সুযোগ করে উঠতে পারিনি কোনোদিনই। স্যারের বাড়িতে সরস্বতী পূজার দিন সন্ধ্যেবেলা একটা ছোটো সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন হতো। সেই অনুষ্ঠানে কেউ গান গাইত, কেউ আবৃত্তি করতো, কেউ বা নৃত্য পরিবেশনা করতো। সেখানে আমার গাওয়া একটা গানের সূত্র ধরেই খুলে গিয়েছিলো আমাদের পারস্পরিক ভাবপ্রকাশের প্রাথমিক দরজাটা। গান শোনার পর বিয়াস নিজেই এসে পরিচয় করেছিল আমার সাথে। আমার হৃদস্পন্দনকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথা বলছিলো আমার অপ্রকাশিত ভালোলাগা, ভালোবাসার প্রেমিক পুরুষটি, বলেছিলো, “ভারী সুন্দর গান তো আপনি, গান শেখেন নিশ্চই? ”

অপ্রত্যাশিত প্রশংসা আর আবেগে কাঁপতে থাকা গলা নিয়ে আমি কোনোক্রমে বলে উঠতে পেরেছিলাম, “অসংখ্য ধন্যবাদ, আমার বেসুরো গলার গানের প্রশংসা করার জন্য। আর হ্যাঁ, আমি গান শিখিনি কোনোদিন, আমার বাবা খুব ভালো গান করেন, ওঁনার থেকেই শুনে শুনে যেটুকু শেখা।”

প্রত্যুত্তরে ও বলেছিল, “আপনার গান শুনে কিন্তু এতটুকু বোঝার উপায় নেই যে, আপনি গান শেখেন না। এরপর একদিন আপনার বাবার সাথেও পরিচয় করার ইচ্ছে রইল। বাই দ্য ওয়ে, কথা বলতে বলতে নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি একেবারে, আমি বিয়াস সেনগুপ্ত, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইংলিশ অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার। আপনি?”

“আমি সাঁঝবাতি রায়, স্কটিশ চার্চে ইংলিশ অনার্সের ফার্স্ট ইয়ার এর ছাত্রী। ”

সেদিনের অনুষ্ঠানে ওর নিজের লেখা একটা কবিতা আবৃত্তি শুনে রীতিমতো ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম ওর। যেমন মন ছুঁয়ে যাওয়া তার ভাষা তেমনই তার স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। মনে হচ্ছিল, এ কবিতার জন্মই যেন শুধুমাত্র ওর ঠোঁট দিয়েই উচ্চারিত হওয়ার জন্য।

এরপর কত অনুষ্ঠানে ওর আবৃত্তি শুনতে গেছি লুকিয়ে লুকিয়ে –একবার তো ধরাও পড়ে গেছিলাম হাতেনাতে। ও নিজেও আমাদের বাড়িতে এসেছে বহুবার। বাবার সাথে তো খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গেছিলো ওর । ক্রমশ আরও বাড়তে থেকেছে যোগাযোগ। তারপর কখন যে গান আর কবিতার মাঝে ভালোবাসা সুর হয়ে দেখা দিলো -তা বুঝে ওঠার সময়ই পাইনি।

এখনো মনে পড়ে, গঙ্গার ঘাটে বসে তোমার কাঁধে মাথা রেখে কাটিয়ে দেওয়া সেই সন্ধ্যেগুলোর কথা, কলেজ পালিয়ে সারা শহরের এগলি – ওগলি ঘুরে হাতে হাত রেখে ট্রামলাইন ধরে একসাথে হেঁটে যাওয়া দুপুর, বাজের শব্দে তোমার বুকে মুখ লুকানো ঘন বর্ষার বিকেল, বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে সিঁড়ির তলার অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা প্রথম চুমুর উত্তাপ।

তোমার কবিতা লেখার ডায়েরি তুমি দেখতে দিতে না কাউকে -কোনোদিন। একদিন অনেক রাগ, অভিমানের পর সেই পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, পাতাভর্তি অজস্র কাটাকুটির মধ্যে দিয়ে কেমন করে জন্ম হয়েছে এক একটা নতুন কবিতার !জিজ্ঞাসা করেছিলাম তোমাকে, “সমস্ত ডায়েরি ভর্তি এত কাটাকুটি কিসের?” তুমি বলেছিলে, “সদ্যসমাপ্ত কোনো লেখা আমার মাথার ভেতর খেলা করে সারাদিন। তার প্রতিটা লাইন, প্রতিটা শব্দ নিজেদের মতো করে খুঁজে চলে সেই নিখুঁত বিকল্পহীন উপযুক্ত ভাষা যা দিয়ে আমার অনুভূতির খুব কাছের কোনো বিন্দুতে পৌঁছনো যাবে অতি সহজেই। হয়তো বাথরুম এ স্নান করছি বা দুপুরে টিফিন খাচ্ছি বা ভিড় বাসে ঝুলতে ঝুলতে কলেজ যাচ্ছি, যে কোনো সময়ে এসে পড়তে পারে সেই প্রতীক্ষিত শব্দ,ভাষা—কবিতার শরীরে তাকে স্থান না দেওয়া পর্যন্ত তার হাত থেকে আমার নিস্তার নেই। তাই তো আমার লেখায় এত কাটাকুটি, সংশোধন -সেই সত্যকে ছোঁয়ার নিরলস প্রচেষ্টা।”

আমার জীবনটাকেও তুমি মনে করেছিলে তোমার কবিতার খাতা। নিজের লেখার মতো তাকেও “সংশোধন” করতে চেয়েছো বারবার। প্রথমবার যখন সন্তান এলো আমার গর্ভে তখন আমি এম.এ ফার্স্ট ইয়ার। গত বইমেলায় তোমার দু’খানা কবিতার বই বেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই তুমি ব্যস্ত থাকতে কবিতা সম্মেলন, সাহিত্যপাঠের আসর, নতুন বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান -এসব নিয়ে। প্রচারের চড়া আলোয় চোখ ঝকমকিয়ে উঠেছিল তোমার। খ্যাতি যতই কাছে এসেছে তোমার, ততই একটু একটু করে দূরে সরে গেছি আমি। আমার মন, আমার শরীরের কথা একবারও না ভেবে তাই কি অবলীলায় বলতে পেরেছিলে এবোর্ট করানোর কথা। অনেক শারীরিক যন্ত্রনা, মানসিক কষ্ট সহ্য করে করিয়েও নিয়েছিলাম এবোর্ট, শুধু তোমার অসুবিধার কথা ভেবে, তোমার মুখের কথায়। মনে হয়েছিল, যে অনাকাঙ্খিত দূরত্ব এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সম্পর্কের মাঝে, সে হয়তো নিজে সরে গিয়ে জায়গা করে দেবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে। না, ভুল ভেবেছিলাম আমি। তোমার তখন শুধুই শরীরের নেশা, নতুন নতুন নারী শরীর ভোগের বাসনা -শারীরিক কামনা চরিতার্থ না হলে তোমার কবিতারা নাকি থেকে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ, অতৃপ্ত। আমিও তোমার কাছে হয়ে উঠেছিলাম শুধুমাত্রই একটুকরো মাংসপিন্ড -যার কোনো অনুভূতি নেই, আবেগ নেই, দুঃখ -যন্ত্রনা কিচ্ছু নেই।

দ্বিতীয়বার প্রেগনেন্সির খবর পাওয়ার পর আমার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে তুমি। আমি ফোন করলে রিসিভ করতে না। বাবা ফোন করে দেখা করার কথা বলেছিলো একটিবার। ফোন করা তো দূরের কথা, কোনোরকম সম্পর্কই তুমি আর রাখতে চাওনি আমার সাথে। এদিকে দীর্ঘ সাত বছরের বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট, গ্লানি, হতাশা আমাকে একটু একটু করে ঠেলে দিচ্ছিলো মানসিক অবসাদের অন্ধকূপের দিকে।

ঘুমোতে পারতাম না কত রাত। মৃত্যুর ছায়ার নিচে দিন কাটাচ্ছিলাম আমি।একদৃষ্টে পাখার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হতো গলায় ফাঁস জড়ানো আমি ঝুলে আছি সিলিং থেকে, ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই, যন্ত্রণার কোনো লেশ নেই, চোখের নিচের কালিটাও অদৃশ্য–পুরো মুখ জুড়ে শুধু ছড়িয়ে রয়েছে কি অপার শান্তি! নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম চিরমুক্তির আশায়। পারিনি। ফিরে এসেছি বারবার। চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠতো তিন বছর ধরে প্যারালাইসড প্রতিবেশী রথীন দাদুর অসহায় মুখ, একসিডেন্টে ডান হাত হারিয়ে চাকরি খোয়ানো সুজন কাকুর শূন্য দৃষ্টি, মৃত স্বামী -সন্তানের স্মৃতি বুকে নিয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে বসে থাকা পাগলীটার কান্নাভেজা হাসি। এদের মতোই আরও অনেক মানুষ ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে, জীবন যাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বারবার। তবুও তো তারা হেরে না গিয়ে, প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে নিজের মনের সাথে, স্বপ্ন দেখছে দুঃখ যন্ত্রণাহীন আলোঝলমলে সুদিনের। কি করে হেরে যেতাম আমি ? একটা ব্যর্থ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে কি করে ভুলে যেতাম সেই সব মানুষগুলোর কথা যাদের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব আমার কাঁধে, যারা বেঁচে থাকতে চেয়েছে আমাকে সম্বল করে, আগলে রেখেছে, ভালোবেসেছে, সবসময় পাশে থেকেছে, প্রেরণা জুগিয়ে গেছে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে। আমার গর্ভে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিলো যে নির্দোষ ভ্রূণ, প্রতিমুহূর্তে অনুভব করছিলাম যে নতুন প্রাণের স্পন্দন–শুধু জন্ম দেবার অধিকারবোধ থেকেই কি খুন করে ফেলা যায় তাকে ?!

না, আমার কোনো সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্ট এর প্রয়োজন পড়েনি। নিজের মনের জোরেই আমি সরে আসতে পেরেছিলাম খাদের কিনারা থেকে। আমার শখ, আমার শিল্পসত্তা দিয়ে মুছে ফেলতে পেরেছিলাম এই অন্ধকার সময়কে। নতুন করে গান গাইতে শুরু করেছিলাম আবার, লেখালেখির কাজও নিয়েছিলাম নানান পত্র – পত্রিকায়। পাশাপাশি সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম পুরোদমে। সবমিলিয়ে বাঁচার আনন্দে আবার বাঁচতে শুরু করেছিলাম আমি -নিজেকে ভালোবেসে, নিজের কাজকে ভালোবেসে, কাছের মানুষদেরকে ভালোবেসে। আর বাঁচতে তো হতোই আমাকে, কারণ, আমি যে সাঁঝবাতি, সাঁঝবাতিরা কখনো এমন দপ করে নিভে যেতে পারে নাকি !

।। তিন ।।

আজ, জন্মদিনে অনেক উপহার পেয়েছে নীল। কেউ দিয়েছে স্কুলব্যাগ, কেউ গল্পের বই তো কেউ দিয়েছে রিস্ট ওয়াচ। খুব সুন্দর একটা ড্রয়িং সেট উপহার দিয়েছে ঋক। ওই ড্রয়িং সেটের মধ্যে যে প্যাস্টেল বক্সটা-ওটা দেখেই আমার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিলো ছোটবেলায় আঁকার স্কুলে প্রথমদিনের কথা। প্রতিটা রংপেন্সিলকে আলাদা আলাদা করে নিজের হাতের দু আঙুলে ধরে কি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের আঁকার স্যার -“এই দ্যাখো, এই যে এটা নীল–এটা কিসের রং বলোতো? এটা হল ব্যথার রং, মনখারাপের রং। তারপর এই যে লাল -এটা ভালোবাসার, ওই হলুদটা ঔজ্জ্বল্যের, সবুজটা ঐক্যের, নিশ্চয়তার।” স্যারের বলা কথাগুলো ঠিকমতো ধরতে না পেরে সেদিনের ছোট্টো আমি কেবলই মাথা নেড়ে চলেছিলাম অবুঝের মতো। এখন বুঝতে পারি, বৈপরীত্যময় এই রংগুলোই আসলে আমাদের মনের এক একটা অবস্থা, অনুভূতি –আর ওই চৌকো প্যাস্টেল বক্সটা, যার মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশাপাশি, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে –ওটাই আমাদের জীবন, ছোটো কিন্তু ভীষণ রঙিন।

: Dipanjan Poddar

Address:-12, Nawab Abdul Latif Street, Belghoria, Kolkata-700056

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started