একমাত্র ভাইয়ের এমন দুর্দিনে দিদি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। ভেবেছিলেন সমস্যাটা হয়ত মিটে যাবে। কিন্তু ভাইয়ের ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া দুশ্চিন্তায়, তিনি নিজেও চিন্তিত হয়ে, জলন্ধর থেকে কাল বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতায় উড়ে এসেছেন চিত্রা দেবী।
পঞ্চাশোর্ধ চিত্রা দেবীর শরীর ও মনে এতটুকু পাক ধরেনি। আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি নারীর তুলনায় বেশ শক্তপোক্ত। আজ প্রায় বছর তিরিশেক হল উনি কলকাতা ছেড়েছেন। স্বামী জলন্ধর পুলিশের পদস্থ আধিকারিক। জলন্ধরের আবহাওয়ায় নিজেকে বেশ ভালভাবেই মানিয়ে নিয়েছেন চিত্রা দেবী।
মালিপাড়া থানার এসআই বারিদ বাবুর বাড়ির সামনে কাল বিকেলে উবের থেকে চিত্রা দেবীকে নামতে দেখে, এলাকার অনেকেই বিশেষত মহিলারা তাকে জরিপ করছিলেন। এত লম্বা চওড়া মেয়েমানুষ এর আগে তাদের কারো চোখে পড়েনি।
“- এসআই এর দিদি তো, তাই অমন বড়সড়ো চেহারা। ভাইবোনে তো মিল থাকবেই।”
একজন রোগাপটকা মানুষ তার তিন গুণ ওজনেরও বেশি স্ত্রীকে বললেন;
“-কি ব্যাপার গো,বারিদ বাবুর বাড়িতে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে? কিগো,শুনতে পাচ্ছো না আমি কি বলছি?”
“-আমি কি আর জানি?মিউ মিউ করে জবাব দিলেন স্বামী।”
“- চোখ কান খোলা রাখতে পারো না।”
“- চোখ কান খোলা রেখেই তো জানতে পেরেছি,বারিদ বাবুর নাকি রাতের ঘুম চলে গেছে।”
“- সে কি! কী আবার ঘটলো যে উনি রাতে ঘুমাতে পারছেন না। খোঁজ নিয়ে দ্যাখো তো ব্যাপারটা কি?”
“- হ্যাঁ,জানতে আমাকে হবেই। বাথরুমের মগ চুরির
জিডি করতে গিয়ে সেদিন ওনার ওই তাচ্ছিল্য আর রঙ্গতামাশায় আমি তিন রাত ঘুমোতে পারিনি। এখন বোঝ্ ঠ্যালা। ঈশ্বর আছে গিন্নি, ঈশ্বর আছে।”
দিদির আগমনে বারিদ পাট্টাদার যেন কিছুটা অক্সিজেন পেলেন। সেই অক্সিজেনটুকু নিয়েই সকাল সকাল বাজার ছুটলেন তিনি।
দু ঝোলা ভর্তি সবজির পাহাড় স্ত্রীর সামনে ফেলতেই,তার চোখ কপালে-
“-এত সবজি কি হবে? সবজির পাহাড়ের তলায় হাত ঢুকিয়ে চারটে মাত্র পোনা মাছ অতি কষ্টে বার করতে করতে বললেন, বারিদ বাবুর স্ত্রী, বিদিশা।”
“- ওমা এত সবজি, খুব ভাল করেছিস। বিদিশা, আমাকে একটা মুলো ধুয়ে দাও তো এখনই খাবো। ভাইয়ের বউকে নিজের ইচ্ছের কথা জানালেন, ননদ চিত্রা দেবী।”
“- দিদিকে মুলোটা ধুয়ে কেটে দাও।”
“- না, কাটতে হবে না। আমি গোটাই খাই। হ্যাঁরে,আজ তো তো্র ছুটি? চল্ দেখি আজ আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে কোনো মীমাংসা সূত্র বের করতে পারি কিনা।”- ভাইকে আশ্বস্ত করলেন চিত্রা দেবী।
“-হ্যাঁ তাই চল্।”
মুলোয় কামড় দিতে দিতেই ভাইয়ের পিছু নিলেন তিনি।
– ‘বড়ী বহেন’ (জলন্ধরে চিত্রা দেবীকে সবাই ওই নামেই ডাকে, তাই বিদিশাকেও ওই নামে ডাকতে বলেছেন তিনি) তোমার ভাইকে একটু ভালো করে বোঝাও, যেন অযথা টেনশন না করে। ছেলেকে নিয়ে কিসের যে এত চিন্তা ভেবে পাই না। ঘুম তো আগেই গেছে, এখন খাওয়া দাওয়াও প্রায় যেতে বসেছে।
“- ঠিক আছে, তুমি কিচ্ছু ভেবো না, আমি দেখছি। শুভ তো আমার ভতীজা, ওর ভালো মন্দটা আমাকেও দেখতে হবে।” এই বলে মুলো চিবানোর শব্দ ছড়িয়ে বারিদ বাবুর ঘরে প্রবেশ করলেন।
পেল্লাই সাইজের সাদা মুলো,বীট,গাজর, পালং শাক, টমেটো,শিম,বরবটি, বেগুন,এত সবজি রান্না করা দূরের কথা, অনেক দিন চোখেই দেখেননি বিদিশা। তিন জনের সংসারে ডাল,ভাজা আর মাছের ঝোল হলেই যথেষ্ট। কর্তার যা ডিউটির বহর, কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজে বেরোতে হয় তাঁকে। ছেলে তো সবজি দেখলেই নাক সিটকোয়। কিন্তু এখন তো উপায় নেই। জলন্ধরের ননদটি আবার ভেজিটেরিয়ান। বাকি বাটি সবজি তার চাই। এইসময় কিচেনে থাকলেও বিদিশার মনটা দিদি আর ভাইয়ের শলা পরামর্শেই ঝুঁকে আছে।
“- এই ঘটনা আমাদের বংশে এই প্রথম। একজন এসআইয়ের আঠেরো বছরের ছেলে সারাদিন নেচে বেড়াচ্ছে।” বারিদ বাবু তার দিদির কাছে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন।
“- শোন্ বীরু,এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই বয়সে শুভ একটু হিল্লি দিল্লি করবেই। কেন তুই ভুলে গেছিস, তোকে নিয়ে বাবা কি অশান্তিতেই না ছিল! এক মুহুর্তও তোকে ঘরে পাওয়া যেত না।” চিত্রা দেবী ভাইকে বোঝান।
“- আরে বাবা,হিল্লি দিল্লি করলে নয় কথা ছিল।শুভ সত্যি সত্যিই নেচে বেড়াচ্ছে। মণিপুরী, কত্থক আর ভারত নাট্যম। আমার তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। আড়ালে আবডালে সবাই হাসাহাসি করছে। কলিগরা তো মজা করছে। এই তো সেদিন এক সিনিয়র উপদেশের সুরে বললেন, মিঃ ভৌমিক ছেলেকে গোবিন্দার মত নাচতে বলুন,নাম আর পয়সা দুটোই আছে। এরপরে কি মাথার ঠিক থাকে, তুই ই বল্?”
“- আমি বলি কী,শুভকে আমার সঙ্গে জলন্ধরে নিয়ে যাই। সেখানে ওর বয়সী ছেলেরা সব হকি, বাস্কেটবল খেলে কিংবা আখড়ায় কুস্তি লড়ে। তারপর কুড়ি বাইশ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়ে। সেখানকার ছেলেরা একমাত্র ভাঙরা ছাড়া আর কোনো নাচ জানে বলে আমার জানা নেই। তারপর তোর জামাইবাবু আছেন, তিনি শুভকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ম্যানেজ করে নেবেন। তুই কিছু ভাবিস নারে বীরু। চিত্রা দেবী ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।”
“- তা কি করে সম্ভব। এখানে ওর কলেজ আছে যে!” লেখাপড়ায় মোটামুটি মন আছে। কিভাবে যে ওকে নাচের নেশায় ধরলো আমি তো ভেবেই পাই না। আমি যে কি টেনশনে আছি,তোকে বোঝাতেই পারব না। বারিদ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“- আহা অত ভেঙে পড়িস না।”
কে আবার ভেঙে পড়ল বড়ী বহেন। ট্রে’তে তিন কাপ কফি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন বিদিশা।
আর বোলো না বিদিশা,ছেলের চিন্তায় চিন্তায় বীরুর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শুভ যে মেয়েদের মত নেচে বেড়াচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেই ভাল না। ওর ভবিষ্যত কি আমিও তো ভেবে পাচ্ছি না। ননদের গলায় উদ্বেগের সুর।
“- ছেলেরা নাচলেই মেয়েলি হয়ে যায়,কোন্ বইয়ে লেখা আছে। উদয় শঙ্কর, বিরজু মহারাজ, থাঙ্কুমণি কুট্টি,গোপী কিষেণ এনারা তো সব এক একজন দিকপাল। ভারতীয় নৃত্যকলার এক একটি স্তম্ভ। সারা পৃথিবীতে এনাদের কীর্তি ছড়িয়ে আছে। এমনকি বলিউডের ছবিতেও সরোজ খান,ফারহা খানের পাশাপাশি,পি এল রাজ,রেমো ফার্নান্দেজ আর গনেশ আচারিয়ার মত নামকরা পুরুষ ডান্স ডিরেক্টরও আছেন যাঁরা খ্যাতি প্রতিপত্তিতে মেয়েদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।আর দক্ষিণ ভারতের প্রভুদেবার নাম তো সবাই জানে। তোমরা কি জানো, গনেশ আচারিয়ার ডান্স এ্যাকাডেমিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ছেলে মেয়েরা নাচ শিখে কেরিয়ার তৈরি করছে। বর্তমানে কোরিওগ্রাফিতে গনেশ আচারিয়া দেশের সেরা নাম। কোটির কাছাকাছি তাঁর মান্থলি ইনকাম।
বিপাশার বিস্তারিত তথ্য পরিবেশনে,দিদি আর ভাই একেবারে স্তব্ধ। দুজনের অপলক দৃষ্টি বিপাশার চোখেই কেন্দ্রীভূত। কারো মুখে কোন কথা নেই।
— তাছাড়া যার যেদিকে ঝোঁক,তাকে সেদিকেই এগিয়ে দিতে হয়। তার ইচ্ছে কিংবা স্বপ্নের লালন-পালন করা ভীষন জরুরী। কোন পেশাই উপেক্ষা বা অবহেলার নয়। আজ আমরা বিভিন্ন পেশায় যে খ্যাতিমান মানুষদের দেখি,নেপথ্যে কিন্তু তাদের প্রিয়জনদের একটা ভূমিকা থাকে।”- বিপাশা যুক্তি দিয়ে বোঝালেন।
বিপাশার বুদ্ধিদীপ্ত কথার মাঝখানে হঠাৎই শুভর আবির্ভাব।
“- আয়, আমার কাছে একটু বোস দেখি।” শুভর ঘাড় বেয়ে নেমে আসা বাবরি চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন বারিদ বাবু।
“- এই শুভ, আমি পরশুর যাওয়াটা ক্যানসেল করলাম। ওই দিন তোর ডান্স প্রোগ্রামটা দেখে তারপরে যাবো।” পিসির কথায় শুভ একেবারে উচ্ছসিত।
তাহলে তো কোন কথাই নেই। কালই তোমার আর মা’র দুটো কার্ড নিয়ে আসবো।
“- না,তিনটে কার্ড আনবি। আমিও যাবো।”
বারিদ বাবুর অপ্রত্যাশিত ঘোষনায় ঘর জুড়ে খুশির ঢেউ খেলে গেল।
আজ চিত্রা দেবীর জলন্ধরে ফেরার দিন। গোছগাছ সব সাড়া। মোবাইলের স্ক্রিনে রুট ম্যাপ অনুযায়ী আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উবের চলে আসবে বাড়ির দরজায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই চিত্রা দেবী বোমটা ফাটালেন-
” -বিপাশা তুমি হয়ত জানো না,বাবা ছোটবেলায় বীরুর নাম রেখেছিলেন নটরাজ। তারপর একটু বড় হয়ে ও নিজেই কোর্টে গিয়ে নামটা এফিডেভিট করে ফেলে। কিন্তু বাবার নাম কি অত সহজেই বিফলে যায়? বলি নটরাজের ছেলে নাচবে নাতো কি চোর, গুন্ডা, বদমাইশ ধরে ধরে লকআপে পুরবে?”
উবেরের হলুদ প্লেটের কালো নম্বরটা ততক্ষণে একেবারে দরজার সামনে চলে এসেছে-WB 5621

:সমাজ বসু
৫৬এ, মিলন পার্ক। ডাক-গড়িয়া।
কলকাতা: ৭০০০৮৪