‘উপন্যাস’

নিখিলেশ এবং

আজ আমার শ্বশুরকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। গতকাল মাঝরাতে কখন এসেছেন জানা নেই, আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি তিনি আমার মুখোমুখি বসে আছেন। আমি চোখ মুখ ধুয়ে বসে পড়লাম ওনার সামনে। গম্ভীর মুখে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কেন কে জানে! আমি বললাম,শুনলাম কাল রাতে এসেছেন?

– হুঁ, তা কলকাতার খবর কি? শুনলাম নাকি এখানে খুব ঝামেলা চলছে?

– তা তো জানি না। আপনার কাছে কোনো খবর আছে নাকি ?

– তা নেই, তবে তোমার সাথে আমার কিছু বিশেষ কথা আছে।

আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখলাম মহামায়ার মুখ ভার। বুঝতে পারলাম বিশেষ কিছু হতে চলেছে আমার সাথে। শ্বশুরমশাই বললেন,এসব কি শুরু করেছ তুমি? হঠাৎ হঠাৎ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছ। সবসময় একটা ভাবের ঘোরে থাকো। তোমার প্রবলেমটা কি?

– আজ্ঞে, আমার তো কোন প্রবলেম নেই। আর বিয়ের পর আমি একবারই বাড়ি থেকে পালিয়েছি।

– মানে? একজন বিবাহিত মানুষ, বাড়ি থেকে পালাচ্ছে , এটা কি একটা হাস্যকর বিষয় নয়? মহামায়া খুব আপসেট।

– মানুষ পালাতে পারলেই নিজেকে খুঁজে পায়। এই যেমন আপনি, আপনিও পালাতে চান তবে পারেন না। কারণ আপনার মেয়ে।

– আমি পালাতে চাইনা। আর সকাল সকাল ফিলজফি দেবে না।

– আজ্ঞে দেব না।

– আমার কিছু কথা রাখতে হবে।

– যথা?

– বাড়ি থেকে পালানো চলবে না। তোমাদের বিয়ের আগে অনেকেই আমায় বলত ছেলের মাথা খারাপ, বিয়ে দেবেন না। মহামায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বিয়েতে রাজি হলাম। এখন দেখছি….

– ছেলের মাথা খারাপ!

– অবশ্যই। মাথাটাই নেই। বাড়িতে বউ আছে অথচ বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এ কেমন ছেলে।

– অদ্ভুদ।

– আবার ফাজলামো মারছ। সকাল সকালে ফাজলামো মারবে না নিখিলেশ।

– আজ্ঞে।

– তোমার কি ইচ্ছাহয় আমায় বল। দেখি তোমায় সাহায্য করতে পারি কি না।

– আমার বই পড়তে ইচ্ছা হয়। উপন্যাস।

– বাহ্‌। তা কোন লেখকের? আমায় ব‍‌লো আমি কিনে দেব।

– আমার কোন প্রিয় লেখক নেই।

– আবার ফাজলামি শুরু করলে। প্রিয় লেখক নেই বললেই হল।

– আজ্ঞে সত্যি নেই। আমার মত প্রকৃত পাঠকের কোন প্রিয় লেখক থাকতে পারে না। কারণ প্রতিটি লেখক নিজের প্রতিভা অনুযায়ী রচনা লেখেন। তারমধ্যে বিশেষ করে কোন একজনকে প্রিয় বলা যায় না। পাঠকের উচিত রচনাকে ভালবাসা, রচনাকর্তাকে নয়।

আজ মাসের ১ তারিখ। এই দিনটায় আমার অফি‍‌‍‌সে যেতে ভাল লাগে না। কারণ এইদিনে আমাদের মাইনে হয়। আর মাইনে এলেই আমার মনে হয় আমি এজীবনে এসেছি অন্য একজনের ফাইফরমাস খাটতে। যার জন্য মাসের শেষে টাকা পাই। একটা জীবন পুরোপুরি নষ্ট। নিজের জন্য কিছু করলে মানুষ যদি টাকা পেত তাহলে ভাল হত। অলি গলিতে কত লেখক, কত বিদুষী মানুষ পাওয়া যেত।

ঠিক করলাম আজ ২টার সময় হাফ ছুটি নিয়ে চলে যাবো কলেজস্ট্রিট। কিছু বই কিনব। মানুষের কাজ যদি শুধু বই পড়া হত তাহলে হয়ত আমি ১নং’এ থাকতাম। মাঝে মাঝে ভাবি এক একটা জীবন যদি শুধু জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য হত তাহলে বেশ হত।

ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ২টো বাজে। বেরুতে যাব তখনই অফিসের বড়বাবু অলোকবাবু আমার কেবিনে ঢুকলেন। অলোকবাবু মানুষটা প্রাণখোলা মানুষ। সারাদিন শুধু কাজ নিয়ে থাকতে ভালবাসেন। জীবনটা যদি শুধু কাজ নিয়ে থাকার জন্য হত তাহলে অলোকবাবু ১নং’এ থাকতেন। আমার কেবিনে ঢুকে ধপ করে বসে বড়লেন তিনি। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমি বললাম,কি স্যার, কোনো গুরুতর ব্যাপার না‍‌ কি?

অলোকবাবু যেন আমার কথা শুনতেই পেলেন না। কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন,ভাই নিখিলেশ, বড় সমস্যায় পড়েছি। সাহায্য করতে হবে।

– বলুন।

– শুনেছি তুমি নাকি মুখ দেখে মনের ব্যথা বলতে পারো। তা বলোতো আমার মনে কি চলছে এখন।

– পরীক্ষা করছেন?

– অনেকটা সেরকমই। বলইনা দেখি একটু।

– আপনি খুবই ব্যক্তিগত সমস্যায় পড়েছেন। সমস্যাটা এমনই যে খুব বিশ্বাসি মানুষ ছাড়া আপনি বলতেও পারছেন না।

– ঠিক তাই। আর তারজন্যই তোমার কাছে ছুটে আসা।

– আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন জেনে ভাল লাগল। এই নিয়ে দু’জন মানুষ পাওয়া গেল যারা আমায় বিশ্বাস করে।

– আর একজন কে?

– মহামায়া, আমার স্ত্রী। এবার বলুন ব্যাপারটা কি?

– ব্যাপারটা খুবই পার্সোনাল, ঘটনাটা তোমায় খুলে বলি।মাসখানেক আগে আমি একটি মেয়ের সাথে আলাপ করি ফেসবুকে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। আমরা প্রায়ই কথা বলতাম ফেসবুকে। এরপর ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়। শুরু হয় ফোনে কথা বলা। হপ্তাখানেক আগে তার সাথে আমি দেখা করি, অনেক গল্প হয়। এইপর্যন্ত ঠিক ছিল। এখন মেয়েটি আমায় বলছে যে সে নাকি অপর একটি লোককে দিয়ে আমাদের পাশে বসে থাকার ছবি তুলেছে। সেই নিয়ে আমায় এখন ব্ল্যাক মেল করছে। বলছে টাকা দাও না হলে সব ফটো বাড়িতে চলে যাবে। আ‍‌মি বউ বাচ্ছা নিয়ে সংসারী লোক এসব কি ঝামেলা শুরু হল বলো দেখি।

– বুঝলাম। তা আমায় কি করতে হবে?

– তুমি মেয়েটির সাথে দেখা করে ওকে বলো যে এসব যেন বন্ধ করে।

– আমি! আমার কথা মেয়েটি শুনবে?

– আলবাত শুনবে। তুমি হলে নিখিলেশ। তোমার কথা শুনবেই। তুমি বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারো। এইটুকু হেল্প করে দাও ব্রাদার। মেয়েটির নাম মিনু। ওর ফোন নম্বর আমি তোমার দিয়ে দিচ্ছি!

বিকেল ৫টা বাজে। আমি নন্দনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ইতিমধ্যেই মিনুর সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ—

– হ্যালো, মিনু বলছেন?

– হ্যাঁ, আপনি অলোকবাবুর পরিচিত কেউ?

– সেকি! বুঝলেন কিভবে?

– আমি এরকম অনেককিছুই বুঝতে পারি। বলে যান।

– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। আজ দেখা করতে পারি?

– পারেন, তবে বেশিক্ষন না। কোথায় আসবো বলুন?

– ৫টার সময় নন্দন। কিন্দু আমি আপনাকে চিনব কিভাবে?

– আমাকে চিনতে লাগবে না। আমিই আপনাকে চিনে নেব। আপনি নন্দনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়াবেন। আর লেট করবেন না। আমি খুবই পাঁঞ্চুয়াল মানুষ।

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

এখন ৫টা ১০মিনিট। মেয়েটির পাঁঞ্চুয়ালিটির সংজ্ঞায় কিছু ভুল আছে। এই নিয়ে তিনটে সিগারেট আর ২ কাপ চা শেষ হয়ে গেল। উদাস মনে আমি নন্দনের পোস্টার দেখছি। আর্ন্তজাতিক একটি সিনেমা চলছে। নামটা কি বিটকেল। উচ্চারনই করতে পারছিনা। হঠাৎ দেখলাম একটি লাল শাড়ী পরা সুন্দীর মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বয়স প্রায় তিরিশ। অবিবাহিত। আপাতত তাই মনে হচ্ছে কারণ হাতে শাঁখা, সিন্দুর নেই। যদিও এসব দিয়ে আজকাল বোঝা যায় না। মেয়েটি আমার সামনে এসে বলল,

– নিখিলেশবাবু!

– আজ্ঞে। আপনিই মিনু।

মেয়েটি বিরক্তির সাথে আমার দিকে তাকাল। হয়ত সবার মাঝে এভাবে নাম নেওয়াটা পছন্দ করেনি। মেয়েরা নিজের নামটাও সবার সাথে শেয়ার করতে চায় না। ঈশ্বরের অদ্ভুদ সৃষ্টি। মেয়েটি কঠিন ভাবে বলল, আগে আগে কোথাও বসি, তারপর বলছি আমি কে।

আমরা বসলাম নন্দন-এর পাশে একটি বেঞ্চে। লোকজন বেশ ভালই রয়েছে এখানে।

মিনু বসতে বসতে বলল, আপনি সিগরেট খান?

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

– সাথে সিগরেট থাকলে আমায় একটা দিন। তাড়াহুড়োতে কেনা হয়নি।

মিনু সিগারেট ধরালো। আমিও ধরালাম। ঠোঁটের বাঁ দিকে সিগারেট রেখে টেনে চলেছে মিনু। মনে হচ্ছে বেশ পারদর্শি একাজে সে। এসবের মধ্যে হঠাৎ‍‌ সে বলে উঠল, বলুন লিখিলেশবাবু কী কথা আছে?

– তেমন বিশেষ কিছু না। অলোকবাবুর ব্যাপারে। উনি খুব চিন্তিত, এভাবে ব্ল্যাকমেল করাটা কি উচিত হচ্ছে?

– মানে! উফফ মানুষটা দেখছি এবার আমার হাতের বাইরে চল যাচ্ছে। ও এসব বলেছে আপনাকে! আশ্চর্য! আপনি জানেন আসল ঘটনা কি?

– এরপরে‍ও কোনো ঘটনা আছে নাকি? থাকলে শুনব অবশ্যই।

– তাহলে শুনুন, আপনার অলোকবাবু একজন মানষিক রোগী। আর আমার নাম মিনু নয়। প্রতিমা। প্রতিমা চ্যাটার্জি। আমি একজন সাইক্রিয়ার্টিক ডাক্তার। মাসখানেক আগে উনি আমার চেম্বারে আসেন। ওনার মতে উনি নাকি একটি মেয়েকে দেখতে পান, তার নাম মিনু, তারসাথে গল্পও করেন। এখন আপনাকে বলেছেন যে সেই মেয়েটি নাকি তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছে। এত পাগলের পাগল।

– মানে মিনু নামে কেউ নেই?

– কেউ আছে কি না জানি না। তবে ইদানিং উনি আমার নাম দিয়েছেন মিনু। ব্যাপারটা কমপ্লিট হ্যালুসিনেশন।

– বুঝলাম। তাহলে এখন আমার কি করণীয়।

– ওনাকে গিয়ে বলুন যে মিনুকে বুঝিয়ে দিয়েছি। ও আর ব্ল্যাকমেল করবে না।

– বুঝলাম তাই করব। আপনাকে একটা কথা বলব?

– বলুন।

– আপনি কি বিবাহিত?

– হঠাৎ এই প্রশ্ন?

– ইচ্ছা হল তাই করলাম। আপনার অসুবিধা হলে প্রশ্ন ফিরিয়ে নিলাম।

– না অসুবিধা কিছু নেই। তাহলে শুনুন আমি বিবাহিত আর আমার স্বামী আমেরিকায় থাকে। সফ্‌টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।

বা‍‌ড়ি ফিরছি। মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে, কে ঠিক আর কে বেঠিক। তবে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। অলোকবাবুকে যতদুর বুঝেছি তিনি তিব্বতের লামাদের মতন। আজীবন একটাই মন্ত্র পড়ে যাবে। ডানে বামে কি হচ্ছে তাতে কিছুই এসে যায় না তার। এরকম একটা মানুষের মানষিক রোগ! হতেও পারে। এই শতাব্দীতে রোগের রুপ ও কারণ বড়ই অস্বাভাবিক। ইংল্যন্ডের এক বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিক ডাক্তার বলেছিলেন, পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষই মানষিক রোগী। কেউ সেটা প্রকাশ করে কেউ করে না। কে জানে আমার আবার কোন মানষিক রোগ আছে। তবে আমার মন এখন বিভ্রান্ত। ফোনে নয়, সরাসরি কথা বলতে হবে অলোকবাবুর সাথে। সবচেয়ে অদ্ভুদ মানুষটা আমায় এখনও ফোন করল না। জানতে চাইল না মিনু মানে প্রতিমার সাথে আমার কি কথা হল। মনে হচ্ছে মিনুর কথাই ঠিক, মানে প্রতিমার কথা। উফ্‌ দেখেছ আমিও কেমন হয়ে যাচ্ছি।

দমদম স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি ট্রেন ধরব বলে। এখান থেকে মাত্র একটা স্টেশন পরেই আমাদের বাড়ি। তবে এই একটা স্টেশনে যাওয়ার যে চাপ তা সহ্য করার পর যখন ট্রেন থেকে নামি তখন মনে হয় পুনঃজন্ম পেলাম।

– নিখিলেশবাবু?

লোক‍‌টি কে বুঝতে পারলাম না। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। লোকটি আবার বলল,আপনি নিখিলেশ তো?

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। আমি কে জানতে চাইবেন না?

– আজ্ঞে না। আপনি যেই হন আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।

– তবে আপনাকে নিয়ে আমার মাথাব্যথার যথেষ্ট কারণ আছে। শুনলাম আপনি নাকি মুখ দেখে ভ‍‌বিষ্যৎ বলতে পারেন।

– ভবিষ্যৎ নয় তবে মানুষটা কেমন তা বলতে পারি।

– তাহলে বলুন আমি কেমন মানুষ?

– ইচ্ছা নেই বলার। ট্রেন আসছে আমায় উঠতে হবে।

– প্লিজ, আমার খুব দরকার আপনাকে। আমার নাম সুকান্ত সেন। আমি প্রতিমার হাজবেন্ড।

– বাজে কথা, ওর হাজবেন্ড আমেরিকায় থাকে।

– হ্যাঁ থাকে, আর আমিই সেই মানুষ।

ট্রেনটা ছেড়ে দিতে হল। মানুষটার দিকে ভাল করে তাকালাম। এই এপ্রিলের গরমে একদম ফিটফাট হয়ে আছে। ফুলহাতা জামা, কালো প্যান্ট, চেহারায় কেমন একটা বস বস টাইপ। আমি বুঝতে পারলাম এ আমাকে ছাড়বে না। অনেকক্ষণ ধরেই পিছু করছে বোধহয়। নিতান্তই ভদ্রলোক তাই মুখফুটে কথা বলতে পারেনি। এর সাথে কথা বলা দরকার। আমরা স্টেশন থেকে বের হলাম। একটা চায়ের দোকানে বসলাম। চায়ের সাথে লোকটি আমার সিগারেট দিল। আমি টানতে থাকলাম। লোকটি বলল,আমার নাম সুকান্ত সেন।

– এই নিয়ে দু’বার বললেন।

– ও আচ্ছা। আমি আসলে খুব চিন্তিত। কি বলছি, কি করছি বুঝতে পারছি না। আমি প্রতিমার হাজবেন্ড। কিছু কথা আপনার সাথে শেয়ার করতে চাই।

আমি সিগারেট টানতে টানতে উদাস ভাবে বললাম, বলে যান শুনে যাচ্ছি।

– আমার সাথে প্রতিমার বিয়ে হয় বছর দু’য়েক আছে। সম্মন্ধ করে বিয়ে। বিয়ের মাস দুয়েক পর আমি আমেরিকায় চলে যাই। তবে প্রতিমার জন্য আমি গ্রীনকার্ড জোগাড় করতে পারিনি। এর পিছনেও একটি কারণ আছে। আমি আমেরিকা যাওয়ার পর থেকেই বাড়ি থেকে খবর আসে যে প্রতিমা মানষিক ভাবে অসুস্থ। মাঝে মাঝেই নিজেকে ডাক্তার, উকিল বা গোয়েন্দা বিভাগের লোক বলে মনে করে। মানে ব্যাপারটা পারসোনাল ডিসঅডার। আমি এখন এক বছরের বন্ডে গেছিলাম আমেরিকা। তাই এখন ভারতে আসতে পারতাম না। ঠিক এক বছর পর বন্ড শেষ হলে আমি ভারতে এসে ওর চিকিৎসা শুরু করাই। চিকিৎসা ভালই সাড়া দেয়। তবে ইদানিং আবার আগের মত শুরু করেছে, তাই আমাকে আবার আসতে হলো। এখন ভাবছি ওকে আমেরিকা নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। আপনি শুনছেন তো?

– শুনছি। আর তাই এখন বউয়ের পিছু করছেন?

– হ্যাঁ, তবে ঠিক পিছু না। ও কার সাথে কথা বলছে সেটা জানার চেষ্টা করছি। আর তারপর সেই মানুষটার সাথে দেখা করে পুরো ঘটনাটা খুলে বলে অনুরোধ করছি যাতে সে আর না মেশে প্রতিমার সাথে। আগের দিন আপনার বন্ধু অলোকবাবুকেও এভাবে সব বলেছিলাম। উনিই আপনার গল্প করেছিলেন। তবে উনি আমার কথায় বিশ্বাস করেননি। বলেছিলেন আপনাকে পাঠাবে প্রতিমার সাথে দেখা করার জন্য। আপনি জানেন আপনার বন্ধু আমার বউয়ের একটা নামও দিয়েছে— মিনু।

– প্রথমত, উনি আমার অফিসের বন্ধুনন, আমার বড়বাবু। দ্বিতীয়ত, আপনার মত একরকম, মিনু মানে প্রতিমার মত একরকম এবং অলোকবাবুর মতামত একরকম। আমাকে কি করতে হবে বলুন।

চায়ে শেষ চুমুক মেরে সুকান্তবাবু বললেন, আমি অন্যদের বলেছি আমার বউয়ের কাছ থেকে সরে যেতে তবে আপনাকে বলব আপনি একবার চেষ্টা করে দেখুন যদি কিছু করা যায়। মানে প্রতিমাকে যদি ঠিক করা যায়। কেন জানিনা আপনাকে দেখে ভরসা করতে ইচ্ছা করছে।

বাড়িতে ফিরলাম রাত ৮টা। ঢুকেই দেখি শ্বশুর লাল চোখ করে বসে আছেন। আর সাথে পেলাম হোমিওপ্যাথি ওষুধের গন্ধ। বুঝতে অসুবিধা হল না এক-দু পেগ চড়িয়ে বসে আছেন তিনি। মহামায়ার মুখ ভার। আজ সারাদিনে একবারও কথা বলেনি আমার সাথে। আমাকে দেখতে পেয়েই শ্বশুরমশাই গম্ভীর ভাবে বলে উঠলেন, নিখিলেশ হাম-মুখ ধুয়ে তোমার শোবার ঘরে এসো, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আমি গুটি গুটি পায়ে হাতমুখ ধুয়ে সোজা চলে গেলাম আমার শোবার ঘরে। শ্বশুর যখন মৃতসঞ্জীবনী খান তখন পেগের সংখ্যা অনুযায়ী ওনার মুড চেঞ্জ হয়। যেমন—

এক থেকে দুই—গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর

তিন থেকে পাঁচ-হাল্কা রসিক

পাঁচ থেকে উর্দ্ধে-অমায়িক, বন্ধুত্বপূর্ণ, দার্শনিক।

শোবার ঘরে ঢুকেই প্রথমে বোতলের দিকে চেয়ে বললাম, ক পেগ বাবা?

– মাত্র দুটি, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বসো।

আমি বসলাম একটি চেয়ারে। শ্বশুরমশাই তিন নম্বর পেগ শুরু করলেন।

– নিখিলেশ ?

– আজ্ঞে।

– আমি সকালে তোমায় অনেককিছু বলে ফেলেছি। I am sorry।

– আরে নানা sorry বলছেন কেন?

– sorry বললাম কেন? এক‍‌শো বার বলব, হাজারবার বলব। তু‌মি কে আমাকে থামাবার।

– ওকে Sorry।

– নিখিলেশ ?

– আজ্ঞে।

– আসলে তোমায় আমি খুব ভালবাসি। You are a good boy, a good Person । মাঝে মাঝে একটু মাথার পোকা জেগে ওঠে। সে উঠুক। ক্ষতি নেই। তবে তোমার নিয়ে চিন্তায় থাকি। যাইহোক, তা শুনলাম কলকাতায় নাকি কিসব ঝামেলা চলছে।

– ঠিকই শুনেছেন। গড়ের মাঠে বোম পড়েছে।

– সে কি! কখন?

– বিকেলে।

– ও, সে পড়ুক। আসলে আমি এমন একটা কাজ করি কাউকে বলতেও পারি না। সারাদিন চোর পুলিশের খেলা। এমন ডিপার্টমেন্ট যে কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতে হয় পুলিশে কেরানির কাজ করি। ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট বলে যে একটু বুক ফোলাবো তার উপায় নেই।

শ্বশুরের পাঁচ নম্বর পেগ শেষ। এবার তিনি দার্শনিক হতে চলেছেন। আমিও প্রস্তুত। মাঝে দু’কাপ চা শেষ করলাম।

– বুঝলে নিখিলেশ, জীবনের শুরুটা শুন্য থেকে আর শেষটাও সেই শূন্যে গিয়ে। মাঝের এই সময়টায় মানুষ তার মনের মতন সংখ্যা বসিয়ে যায়। তাতে লাভ কি হয়। শেষটাতো সেই শূন্যেই।

– আমি অঙ্কে খুব কাঁচা। কি বলছেন বুঝতে পারছি না।

– কি বলছি বুঝতে পারছ না! তুমি দর্শন বোঝ না?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, তবে আপনি যা বলছেন তা অনেকেই বলে গেছে। নতুন কিছ শুনবেন?

– নতুন কিছু? নতুন কিছু কি আবার?

– আছে, আমি আপনাকে একটি গল্প বলব তবে আপনাকে গল্পের শেষে বলতে হবে কে অভিনয় করছে আর কে আসল দোষী।

– ওকে, Done, বলব, আমার পুলিশি কেরিয়ারের দিব্যি। বলো।

আমি শুরু করলাম অলোকবাবু, মিনু আর সুকান্তবাবুর ঘটনা পুরো বললাম। সব শুনে শ্বশুরমশাই হেসে উঠে বললেন,হে‍‌ হে, এত খুব সহজ নিখিলেশ। আসল কালপিটই হল ঐ সুকান্ত। ওই ব্যাটা বউটাকে পাগল বা‍‌নিয়ে রেখেছে।

– তাহলে আপনি বলছেন মিনুর মানসিক প্রবলেম আছে?

– হ্যাঁ, আছে, আর ভাল মতই আছে।

পরেরদিন একটু সকাল সকাল অফিসে পৌঁছলাম। অলোকবাবু অফিসে ঢুকে সোজা আমার চেম্বারে ঢুকেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আর বললেন,ভাই নিখিলেশ বাঁচিয়ে দিয়েছো, একটা ভিজিটেই প্রবলেম Solved।

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,বুঝতে পারছি না কি বলছেন।

– আরে মিনুর মাথা থে‍‌কে ব্ল্যাকমেলের ভুত নেমে গেছে ভাই। ও কালকেই আমায় ফোন করেছিল।

– যাক ভালই হল।

বলতে বলতেই আমার ফোন বেজে উঠল। আমি ফোন তুললাম, ওপাশে থেকে এক মহিলা বললেন, তোমার সাথে আমার পাশে বসার ছবি আমি তুলে নিয়েছি। আমার একটা লোক তোমার কাছে চলে যাবে। তার হাতে ১লক্ষ টাকা ক্যাশ দিয়ে দিও। না হলে সব ছবি তোমার বাড়িতে চলে যাবে। লোকটির নাম সুকান্ত।

(চলবে)

:কৌশিক দে

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started