টিভিতে পালা করে আজ তপন শাস্ত্রী তো কাল রতন শাস্ত্রী। আজ আর কালের ব্যবধানে তো চব্বিশ ঘন্টা লাগে। আজকাল একই সঙ্গে একই দিনে দু- তিনটে চ্যানেলে একই সঙ্গে বারো চোদ্দ জন জ্যোতিষীদের ভিড় লেগে থাকে। এ বলে আমাকে দেখ তো ও বলে আমাকে। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব রে বাবা!
ভেরি কনফিউসড্।
প্রতিকার একটা চাইই…
মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে, সঠিক পাত্র জুটছে না! ছেলের চাকরীর যোগ কবে থেকে শুরু? গিন্নীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না একদম, উপায় বলুন বাবা!-এমন হাজারো প্রশ্ন দর্শকদের লেগেই থাকে।
দাদা বাবারাও তাদের সামনে রাখা ল্যাপটপে জন্ম তারিখ, সময় পুট করছে আর পুট পুট করে উপায় বাতলে দিচ্ছে। ফল হাতে হাতে পাবেন সামনের অগ্রহায়ণ মাস থেকে কিম্বা সামনের জুলাই মাসের পনেরো তারিখের পর থেকে। পারলে আমার চেম্বারে একবার চলে আসতে পারেন। বারাসাত, চাকদা, মালদা, শেওরাফুলি, চুঁচুড়া, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, এগরা, মগরা সব জায়গায় আমার চেম্বার আছে। একনাগাড়ে বলতে গেলে গলা শুকিয়ে যাবে। টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখুন কবে কোথায় বসেন আমাদের শাস্ত্রীজি সবটা দেখতে পাবেন। প্রতিকার না পেলে মূল্য ফেরতের গ্যারান্টি দিতেও বাবারা কার্পণ্য করেন না। বাবার পাশে বসা মেয়েটা একটার পর একটা ফোন রিসিভ করছে। বাবার কথার ওজন কুইন্টালের থেকেও ভারি এভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে পাশে বসা তন্বী।
বাপরে বাপ্!
বাবা দাদাদের হাতে আংটির ছড়া ছড়ি, গলায় মাদুলি কিম্বা বাবাদুলি। মাথায় কারোর জটা, কারোর আবার মুখ ভর্তি দাড়ি। মর্ডান জ্যোতিষ দাদারাও আছেন টাই স্যুট পরা।
কাউকে বলছেন, ‘শনির দশা চলবে আগামী আড়াই বছর’, কাউকে আবার বলছে, ভৌম যোগের কারণে আপনার বিবাহিত জীবন সুখের হচ্ছে না।’ আবার কাউকে ভয় দেখিয়ে বলছেন, ‘আপনার মেয়ের যে এখন মাঙ্গলিক যোগ রয়েছে, বিয়ের প্রধান অন্তরায় এটি।’ যোগ গুলোকে বিয়োগ করতে গেলে আমার কাছেই আসতে হবে একথা একদম বলছি না, যেকোনো ভালো জ্যোতিষীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন’- এভাবে নিজের পদমর্যাদা বাড়িয়ে তোলেন ভগবানের অবতারেরা।
কাজ না থাকলে, শুনতে মন্দ লাগে না। গোটা দেশজুড়ে করোনার জন্য লকডাউন চলছে। এখন একদম হাতে কাজ নেই।‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কনসেপ্ট পশ্চিমবঙ্গেও চালু হয়েছে। কিন্তু আমাদের কাজ সেরকম নয়। তাই ছুটি পুরোপুরি।
ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম আজকে কোনো একটা নামজাদা বাবাকে জিজ্ঞাসা করবই, ‘করোনার এই করালগ্রাস থেকে বিশ্ব কবে মুক্তি পাবে? কবে স্বাভাবিক হবে আমাদের জীবন?’
ফোন করলাম।
বাবার শো গুলোতে অ্যাঙ্কারিং করা মেয়েটা সুমধুর কন্ঠে জানিয়ে দিল, ‘এখন যে শোগুলো টিভিতে দেখছেন। ও গুলো লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে না। বাবা এখন হোম কোয়ারিন্টেনে রয়েছেন। বাবা কিছু বলতে পারবেন না!’
প্রশ্নটার উত্তর বাবার কাছ থেকে আশাও করিনি।
তবে জ্যোতিষীর ক্ষমতা আছে। আমার মনের প্রশ্নটা আগে থেকে বুঝতে পারল কি করে!

ড. প্রদীপ ঘোষ
নাড়ুয়া, সত্যপীরতলা
পোষ্টঃ চন্দননগর, জেলা- হুগলী
(বি.দ্র. সব চরিত্র কাল্পনিক। কারোর কোনো বিশ্বাসে আঘাত করার জন্য লেখা নয়। এটা শুধুই গল্প)