– ” বাপ, আজ ঈদের তারাবি নামাজ পড়বিনি ? জুম্বাবারের নামাজও পড়লিনি দুপুরে? ”
– ” কেন নামাজ পড়লুম তো ইফতারের পর। তুই শুনিস নি –
‘ নূতন প্রাণ দাও প্রাণসখা ,
আজি সুপ্রভাতে ।।
বিষাদ সব …….
প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে।। ‘
আজ পঁচিশে বোশেখ। আজ রবি ঠাকুরের কবিতা পাঠ করলুম। ওটাই আমার সারাদিনের নামাজ।”
– ” শোন শ্যামলীর মা, এই নিয়ে তিনদিন কামাই করলে, কাল ফের কামাই করলে মাইনে কেটে নেব।”
– ” কাল আমি আসছি না। কাল আমার ছোট্ট পাপান, কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করবে। অনেক কষ্টে ও সিলেক্ট হয়েছে। শুনতে পাচ্ছেন খোলা ছাদে ও কি সুন্দর আবৃত্তি করছে ঐ দেখুন-
‘ চিত্ত যেথা ভয় শূন্য/ উচ্চ যেথা শির….
…….. ……..প্রাচীর…… ‘
– ” গুরুপ্রীত, তোমার পাঞ্জাবী হোটেলের তন্দুরিটা কিন্তু অসাধারণ বানাও । সন্ধ্যেতে গেস্ট আসছে। তন্দুরি আর কাবাবটা বানিয়ে রেখ। আমি এসেই … ”
– ” সাব, আজ তন্দুরি নেহি বানায়েঙ্গে। আজ রবীন্দ্রনাথকা জনম্ দিন হে। ইসলিয়ে হাম বাঙ্গালী খানা বানায়েঙ্গে। ”
– ” রোজলিন, তোর ঐ ফরাসী বয়ফ্রেণ্ডকে ধুতি পরে কেমন ” পুরুত ঠাকুর ” এর মতন লাগছে। সবাই হাসছে। ”
– ” আমিই বলেছি পরতে। আজ জানিস তো কি দিন ? আজ ও রবি ঠাকুরের গান করবে পাড়ার অনুষ্ঠানে। ”
-” তোমাদের আদিবাসীদের দম আছে। এগারো মাইল রোদে হেঁটে থ্যালাসেমিয়া দিবসে রক্ত দিতে এসেছ শহরে। ”
-” বাবু তু মুকে যা বুলিস বুল ক্যানে , মু আইছি রবি ঠাকুরের গান শুনবার লিগা। আজ তো উহার “হ্যাপী বার্থ ডে” টো আছেক। আহা! পরাণ জুড়াইন যায় উ গানে-
” যদি তোর ডাক শুনে কেউ ….
চল রে……”
আটত্রিশ বছর কেটে গেছে। হুগলীর বলাগড় একটু একটু করে সাবালকত্বের তুলসীতলা পেরিয়েছে। সেদিনের বাসির চাচা, শ্যামলীর মা, গুরুপ্রীত, রোজলিন, চুমরি কেউই নেই। তবু এলাকার মানুষদের বৈশাখের একটি বিশেষ দিনকে নিয়ে আবেগ , মাতলামির যেন শেষ নেই। শব্দগুলো ঘটনাগুলো ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজও ছোট ছোট “ভিসুভিয়াস” তৈরী করে।
অগোছালো গ্রামের গন্ধ মেশা গঙ্গাপাড়ের ঐ অঞ্চলটার পঁচিশে বৈশাখ আসলেই ছটফটানি শুরু হয়ে যায়।
**********
ঝরণা তখন সেনবাড়িতে সবে পা রেখেছে। জমিদার শ্বশুড়ের চাবুকের শব্দ কলকতা অবধি শোনা যায়। শ্বাশুড়ির হুঙ্কারে বাঘে গরুতে…।
গায়ের রং শ্যামলা, খুব সুশ্রীও নয়। গরীব বাবার মেয়ে তাই জমিদারবাড়িতে আদর কম। একটু কোণঠাসাও বটে। শুরুতেই সবার অপচ্ছন্দের তালিকাতে।
পঁচিশে বৈশাখের দিন অঘটনটা ঘটল।
থ্যালাসেমিয়া রোগটা তখন মানুষ অতটা জানত না। ছোট মসজিদ পাড়ার নিজামুদ্দিনের ছেলেটা রক্তের অভাবে মারা গেল। এক সপ্তাহ পড়ে পাঞ্জাবী পাড়া , আদিবাসী কলোনীর দুটো তাজা প্রাণ ঝরে গেল থ্যালাসেমিয়ার কবলে।
ঝরণা চুপ থাকেনি। পঁচিশে বৈশাখের দিন বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে আয়োজন করেছিল ব্লাড ডোনেশান ক্যাম্প। সেবার পঁচিশে বৈশাখ থ্যালাসেমিয়া দিবস একই দিনে পড়েছিল। সন্ধ্যেতে হাইস্কুলের মাঠে ঝরণার উদ্যোগে শুরু হল “রবি প্রণাম”। ঝরণা নাচও করল।
” মায়া বন বিহারিণী/
থাক থাক নিজ মনে……. ”
জমিদার রুদ্রপ্রতাপ সেনের সন্মান সেদিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। সেনবাড়ির মেজবৌ স্টেজে নাচছে বলে। দুবছর পরেই ঐ একই দিনে রুদ্রপ্রতাপের সৌখিন ঝাড়বাতি আবার ঝলমল করে ওঠে ঝরণার প্রতিভার ছটায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে উনি দেখলেন তাঁর আদরের বৌমা কি সুন্দর কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করছে সাহেবি ঢংয়ে-
” Where the mind is without fear
My head…….. ”
ঝরণার প্রচেষ্টায় বলাগড় হসপিটালেই তৈরী হল ছোট ব্লাড ব্যাঙ্ক।শ্বাশুড়ির দামী জামদানি সেদিন চোখের জল শুষে নিয়েছিল।
” বৌমা , তুমি ইংরাজীতে কবিতা বলতে পার ? ” শ্বাশুড়ির মুখের জ্যামিতিতে তৃপ্তির হাসি।
ঝরণা বেশীদিন বাঁচেনি। ব্লাড ক্যানসারে মারা যায়।
প্রায় চার দশক পরে বৈশাখের এই দাবদাহে মনে হল আবার যেন ঝেঁপে বসন্ত এসেছে বলাগড়ের অলি গলিতে। গান, কবিতার বসন্ত।
রমজান মাস। সেনবাড়ির মাঠেই চলছে ইফতার আর নাটকের মহড়া। কখনো ভেসে আসছে “শ্যামা” , “চিত্রাঙ্গদার” সংলাপ কখনো বা “চণ্ডালিকা” , “বীরপুরূষ”।
“কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…. ”
“রিমি ঐ মেয়েটি চুমরির মেয়ে ঝুমরি না ?”
কি সুন্দর নাচছে ! ঠিক তোর মেজকামণির মত। আজ আবার কবিগুরুর জন্মদিন। আজ বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসও।
বাসিরচাচার মেয়ে শহরবাণু “বাউল” কবিতাটি পাঠ করল।
“দূরে অশথতলায়….
বাউল দাঁড়িয়ে আছ তুমি
…… …… একতারাটি হাতে…..”
শ্বাশুড়ির মন হল মেজবৌমাও যেন এক বাউল। নিরাভরণ অহংকারহীন। বাউলের মতন পথে ঘাটে মাঠে সর্বত্র চলাফেরা।
শ্বাশুড়ি ধীর পদক্ষেপে ঘরে এসে ছল ছল চোখে ঝরণার প্রিয় গানটা বাজাল।
“…… না পেয়ে তোমার দেখা একা ……. ”
গানের ছোট ছোট ঢেউ বাউলের সুরের ছন্দে দুলে দুলে মাঠ ঘাট রেললাইন পেরিয়ে প্রবাহিত হল দূরে বহু দূরে।

ছবি: গুগল
কবিরুল; Dum Dum , Kolkata – 28