স্মৃতি পত্র…

বাবা,

অনেকদিন ধরে ভাবছি তোমাকে একটা চিঠি লিখবো। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠে না। চাকরি করতে রাজ্যের বাইরে চলে এসেছি। বেশিরভাগ সময়ই মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তোমার সঙ্গে তেমন কথা হয় না। মুঠোফোনের ব্যবহারটা তুমি সেভাবে পারো না। আবার ফোন ধরিয়ে দিলে ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলতেও তুমি অভ্যস্ত নও। শৈশব থেকে তোমার সঙ্গে কথা খুব কম হয়েছে। বরাবরই তুমি গুরুগম্ভীর মানুষ। ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে। কলেজ স্ট্রিটে একটু বর্ষাতে জল দাঁড়িয়ে যায়। আর তুমি সেই বর্ষার মধ্যে, আমার স্কুল ইউনিফর্ম টা ঠিকঠাক রাখার জন্য আমাকে নিজের কাঁধে চাপিয়ে স্কুলের গেটে নামাতে। নিজের চামড়ার জুতো আর প্যান্ট হাঁটু অব্দি ভিজে যেত। সেগুলোর তোয়াক্কা করতে না। আমি সেইদিন তোমার স্নেহ বুঝতে পারতাম না। স্কুলের স্যার এদের কাছে আমার পড়াশোনার খবর নিতে। আমার বুক ধড়ফড় করত। আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতে। আমাকে বড় করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছ। দুই দিদি, আমি, মা আর তোমাকে নিয়ে ভাঙাচোরা টালির বাড়িতে থেকে আমাদের দিনযাপন হতো। সরকারি চাকরির মাইনেতে সংসারের সব চাহিদা পূরণ হতো না। তার জন্য তুমি চাকরির পাশে শাড়ির ব্যবসাও করতে। যদিও সেই ব্যবসা ডুবে গেছে। স্কুল ছুটির পর আমি সূর্য সেন স্ট্রিটে ইংরেজি পড়তে যেতাম। অফিস ছুটির পর আমাকে আনতে যেতে। ইংরেজি স্যার, আমি আর তুমি শিয়ালদা অব্দি হেটে আসতাম। রাত ৮.৩৫’এ ট্রেন ধরবো বলে বেশ জোরেই হাটা হত। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমার হাঁটু ব্যথা হয়ে যেত। ট্রেনে ওঠার পর তুমি কোন কোন দিন হাঁটু থেকে গোড়ালি অব্দি টিপে দিতে। অনেক স্বপ্ন দেখতে আমাকে নিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য। জানিনা আমি মানুষ হতে পেরেছি কিনা। তবে এটুকু বুঝতে পারি তোমার সুপুত্র হয়তো হতে পারিনি। তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। অনেক দায়িত্ব আমি পালন করতে পারিনি। তবে আজও চেষ্টায় আছি ভালো ছেলে বা দায়িত্ববান ছেলে যাতে হয়ে উঠতে পারি। আমার জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আজ তুমি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছো। তবুও আমি বাড়ির দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারিনি। বাবা মনে পড়ে তুমি, আমি আর মা পুরী ঘুরতে গিয়েছিলাম তোমার অবসর নেওয়ার কিছুদিন আগে। জগন্নাথ মন্দিরে ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলে। তোমার চোখে জল ছল ছল করছিল। তুমি হয়তো আমাকে নিয়ে সেদিনও চিন্তায় ছিলে আর আজও চিন্তায় আছো। শারীরিক সমস্যা আমার একটা আছে। সেটা নিয়ে তোমার আর মায়ের অনেক চিন্তা। ডাক্তার বলেছে আমাকে সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। সেটা নিয়েও চিন্তা করো তোমরা। তবে বেশি চিন্তা করো না বাবা। আমি আমার অসুস্থতা সম্বন্ধে সচেতন। তাই প্রতিদিন নিয়মিত ওষুধ খাই। তবে তোমরা যেদিন থাকবে না , সেদিন হয়তো মনে করিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না যে “বাবু ওষুধ খেয়েছিস তো “? হ্যাঁ, বাবা। সেদিনও নিয়মিত ওষুধ খাবো নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য। কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি চেষ্টায় আছি যদি একটু ভালো ছেলে হতে পারি। আর দুই থেকে তিন বছর আমাকে সময় দাও। তারপর সব দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নেব। তোমাদের কোন অভিযোগ থাকবে না। কথা দিচ্ছি। তোমাদের বাবু স্বাবলম্বী হতে শিখেছে। আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক উন্নতির পথ দেখতে পাচ্ছি। তুমি শুধু ভালো থেকো। সুস্থ থেকো। নিজের কাজের জায়গায় একটা সম্মান তৈরি করেই বাড়ি ফিরব। তোমরাও মন প্রাণ খুলে হাসতে পারবে। তোমরা লোকজনের কাছে আমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবে। তোমাদের বাবু দাঁড়িয়েছে এই ভেবে।

ইতি
তোমাদের বাবু।

____________________

:সর্বার্থ শেখর জানা

ঠিকানা – 166 সি. সি. আর. ঝিলপাড়, বালি দুর্গাপুর হাওড়া – 711 205।

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started