রাত বেশ গভীর। আকাশে একটাও তারা নেই। চাঁদ মুখ ঢেকেছে অমাবস্যার কোলে। বাড়ির সামনে স্ট্রিট লাইটদুটো অন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। পাশের গুহ বাবুর বাড়ির দোতলার বাতিও এইমাত্র নিভে গেল। দূরে কোথায় একটা কুকুর কেঁউকেঁউ করে ডেকে উঠলো। নাকি কেঁদে উঠলো বোঝা গেল না। আবার সব চুপচাপ। গাঢ় অন্ধকার আর গভীর নিঃস্তব্ধতায় যেন ডুবে গিয়েছে চারিপাশ! শুধু বিকাশের মাথার সামনে দেওয়ালের বড় ঘড়িটার পেন্ডুলামের টিক টিক শব্দটা ছাড়া…
পাশ ফিরে শুলো বিকাশ। টেবিলে জলের জগ থেকে এক গ্লাস জল খেল। কত রাত হয়ে গেল… অথচ ঘুম যে কেন আসছে না! চোখের পাতা বন্ধ করলেই বারবার ভেসে উঠছে হোটেলের ছবিটা।
আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল বুবলু, ব্যাকগ্রাউন্ড জুড়ে আঁকা সমুদ্র সৈকতের ডিজিটাল পেইন্টিং সহ দৈত্যাকার নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে… ‘ হুররে…পেয়ে গেছি দাদানের হোটেল!’
তিরিশটা বছর… কম তো নয়! টিনের ক্যানেস্তারার ওপর সেদিনের লেখা ‘ হোটেল সৈকতাবাস’…নামটা সেই একই রয়ে গেছে, পালটে গিয়েছে ফরমেশান। কে বলবে, কত শখ আর স্বপ্ন নিয়ে বিকাশের নিজের হাতে গড়া একতলা হোটেলটা আজ সময়ের হাত ধরে এভাবে বদলে ফেলবে নিজেকে! হাত বাড়ালেই সমুদ্র, হাত বাড়ালেই মেইন রাস্তা, বাজার… তার পাশে নতুন, নতুন বাড়ি, মনুষ্য বসতি,ভীড় আর যানজটে ভরা আজকের শহরের বহিরঙ্গের চেহারা বদলালেও জায়গাটা কি আর ভোলা যায়? বিকাশও ভোলে নি। শুধু মাথা উঁচু করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে.. এই সেই ‘সৈকতাবাস!’ এই কি সেই একতলার ঘর! এতগুলো বছর পরেও যার ছাঁচটা হবহু এক,কিন্তু আশ্চর্যভাবে পালটে গিয়েছে দেহ সৌষ্ঠব। কোথায় সেই পুরনো আদ্দিকালের টিনের নেমপ্লেট! তিরিশ বছর সময়টা এ হোটেলের চেহারাকে শুধু বদলায়নি, খোল নলচে পর্যন্ত বদলে দিয়েছে…। শুধু একতলার ঘরের এই ছাঁচটুকু এতদিন ধরে যেন অপেক্ষায় ছিল স্মৃতিটুকু উসকে দেবে বলে…।
‘বলো না দাদান,এটাই কি তোমার তৈরি করা সৈকতাবাস?’
কিছু বলে নি বিকাশ। শুধু মাথা নেড়েছিল। জীবনে অনেক ছবি ফ্যাকাশে হয়ে এলেও এ ছবি বোধহয় গাঁথা হয়েই থাকবে মনে… কতকাল, বিকাশ নিজেও জানে না।
‘কত্তো বড় হোটেলটা আর কি সুন্দর! এক দৌড়েই সমুদ্র.. কতো বড় বড় ঢেউ..ঐ তো কত লোক চান করছে জলে নেমে..! আমরা এটাতেই থাকবো।’
আবারো লাফিয়ে ওঠে ভাইপো বুবলু।
সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলো, এমন হোটেল থাকতে আর খোঁজাখুঁজির কোনো দরকার নেই। বিকাশের মুখে এর আগে এই হোটেলটা সম্পর্কে যে যতটুকু গল্প শুনেছে,তাতেই যেন সমান নস্টালজিক সকলে…।
রেস্টুরেন্ট, সুইমিং পুল, বাগান, ক্যাফেটরীয়া সমেত একবিংশ শতাব্দীর একটা ঝাঁ চকচকে চার তলা হোটেলের রাস্তার ধারের একতলার ঘরখানাই তিরিশ বছর পর আসা প্রায় অচেনা শহরে যেন সবথেকে বেশি আপন হয়ে উঠেছিল বিকাশের কাছে… কিন্তু সেই সঙ্গে কি এক একটা ঘোর লাগা ভাব..! আপনত্ত্বের মাঝে মিশে থাকা সেই ঘোর লাগা অণুভূতি বাড়ি ফিরে আসার পরেও কিছুতেই কেন কাটতে চাইছে না? কেন চোখের পাতা বুজলেই ফিরে ফিরে আসছে রাস্তার পাশের ঐ একতলার ঘর, সেই প্রশস্ত করিডরটা, সমুদ্রের ঝপাং ঝপাং শব্দ আর রাত হলেই কার নীরব পদচারণা. …! নাকি কাছে আসতে চাওয়া স্মৃতিগুলোর পদচারণা? উত্তর আসে না কোনো।
হঠাৎই বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা আচমকা বেজে ওঠে..। এই গভীর নিশুতি রাত্তিরে কে?
অজানা নাম্বার।
‘ হ্যালো।’
‘ আমি অভয়।’
বুকের ভেতরটা কেন জানি না ধক করে উঠলো বিকাশের।
‘ বোবা হয়ে গেলি নাকি?’
কেমন একটা অদ্ভুত শব্দে হেঁসে উঠলো অভয়।
নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বিকাশ।
‘ নম্বর বদলে ফেলেছিস বুঝি?’
‘ বদলাতেই পারি…।’
‘ তাই ভাবলাম এত রাতে কে আবার…।’
‘ বললাম তো “অভয়”। আরো ভেঙে বলতে হবে বুঝি?’
বাঁ হাতে জগটা ধরে আরো কয়েক ঢোক জল খেয়ে নেয় বিকাশ। গলাটা শুকিয়ে এসেছিল।
‘ আরে না, হয়েছে কি, খারাপ খবর না থাকলে লেট নাইটে তো কেউ সাধারণত ফোন করে না…তোর গলাটা শুনে তাই হঠাৎ করেই…।’
‘ হঠাৎ করেই কী?’
থমকে যায় বিকাশ। ঢোক গিলে বলে,’ ও কিছু না। তা তুইও দেখছি আমারই মতো…।’
‘ নিশাচর..।’
হেসে ওঠে অভয়। আবার সেই অদ্ভুত হাসি। কানে এসে লাগছে বড় হাসিটা। ওকে তো এর আগে এইভাবে কখনো হাসতে…! কী করেই বা পড়ে ফেললো বিকাশের মনের ভাষা? অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, টেলিপ্যাথিটা কী করে রপ্ত করলি?
‘ কেমন ঘুরলি বল..।’
প্রশ্ন ভেসে আসে ওপাড় থেকে।
‘ আর বলিস না, কলকাতায় বাস করেও তিরিশ বছর বাদে দীঘায় পা রাখলাম…লোকে শুনলে হয়তো অবাক হয়ে যাবে..রবি ঠাকুরের কবিতাটা মনে পড়ছিল… “দেখা হয় নাই শুধু দুই পা ফেলিয়া..”এবারেও যাওয়া হতো কিনা সন্দেহ.. নেহাৎ বড় ভাইপোটা বায়না ধরলো বলে ওদের পাল্লায় পড়ে… ভালোই লাগলো বেশ… সেই আগের দীঘা আর নেই… অনেক কিছুই পালটে গিয়েছে… পরিবর্তন হয়েছে… স্বাভাবিক। সমুদ্র তো বরাবরই আমাকে টানে… এসে দেখলাম, তিরিশ বছর আগে যা দেখেছি.. সেই ঘন নীল জলরাশি,সুবিস্তৃত ঝাউবন, বোল্ডার বিহীন বিস্তীর্ণ বালিয়ারি…কল্পনায় ভাবছিলাম আর বীচে বসে কমপেয়ার করছিলাম দুটো সময়কে…এখনো শুয়ে শুয়ে এসব কথাই রেমিনিসেন্স করছিলাম আর কি…এছাড়া কি আর করবো বল..বাবা নেই, মা নেই…পূর্বাশাও (বিকাশের স্ত্রী) চলে গেছে কত দিন হয়ে গেল… ছেলে বোর্ডিংয়ে… একা একা কাটানো জীবনে রেমিনিসেন্স করা ছাড়া আর কিই বা থাকতে পারে…। ঘুম আসছিল না.. কাল আবার অফিস…আসছিস তো কাল?’
‘ কোথায়?’
‘ কেন অফিসে?’
উত্তর আসে না কোনো।
‘ হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো..।’
লাইনটা কেটে গেল বোধহয়। ফোনটা রেখে দেবে কিনা ভাবছিল বিকাশ। আর ঠিক তক্ষুনি আবার সেই অচেনা হাসি..’ কী ভাবলি লাইনে নেই? এত তাড়া কেন?’
‘ না ঠিক তা নয়…।’
মনের মধ্যে খটকাটা ক্রমশই যেন বাড়ছিল বিকাশের। আদৌ কি এটা অভয়? তার অনেক দিনের চেনা সবচাইতে কাছের অফিস কলিগ..। এতক্ষণ হাসিটা অচেনা লাগছিল, এবার যেন গলাটাও কিরকম..! তাই বা কি করে হয়? এই মূহুর্তে অভয় নামে বন্ধু বলতে তার ঐ একজনই। আর তো কেউ নেই…। অভয় ছাড়া এত রাতে কে তার ফোন নম্বর জোগাড় করে জ্বালাতন করবে? তবু….।
‘ জীবনে কতকিছুই তো আমাদের অবাক করে দেয়…তাই না রে? এই যেমন ধর একটা হোটেল…আদ্যন্ত আধুনিকতায় মোড়া… পালটায় নি শুধু একতলার ঘরের কাঠামোটাই…সেই পুরনো করিডর… তিরিশ বছর আগে যা ছিল..’
‘ মা..মা..মানে..?’ বিকাশের গলার শিরা উপশিরা বিদীর্ণ করে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো শব্দগুলো যেন!
আবার সেই শিহরণ জাগানো হাসি। সেই অদ্ভুত,অচেনা গলার আওয়াজ…।
‘আমাকেও সমুদ্রটা বড় টানে বুঝলি…বিশেষ করে যে জায়গাটায় তুই আমাকে খুন করেছিলি….সৈকতাবাস ছাড়িয়ে সেই নির্জন জায়গাটা…ঘন ঝাউবনে ঢাকা… আমার চেয়ে একটু বেশি ড্রিংক করে ফেলেছিলি… জোর করে ধরে আমাকে টেনে নিয়ে চললি গভীর জলের দিকে… পায়ের মাটি পাচ্ছিলাম না…তোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম… একটুকরো খড়কুটো…তখনো বুঝিনি তোর অভিষ্যন্ধি… আমার নাক,মুখ জলের ভেতরে ঠেসে ধরেছিলি তুই… যতবার ঢেউগুলো আসছে… আমি প্রাণপণ মাথা তোলার চেষ্টা করছি, ততই তুই আমায় অগাধ জলে..কি যে কষ্ট হচ্ছিল! উঃ! সে কষ্ট এখনো আমার গলায় বিঁধে…কেন করলি এসব? হোটেল ব্যাবসায় নিজেই পুরো ভাগ বসাবি বলে?’
সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে যাচ্ছে বিকাশের। গায়ের লোমকূপ খাড়া হয়ে উঠেছে।
‘ কে…কে তুমি..!’
‘ আমি অভয়। অভয় সাঁধুখা। কাঁথি থেকে রামনগরে এসে উঠি কারখানায় কাজের সূত্রে তোর দেশের বাড়িতে পেইং গেস্ট হয়ে… তুই তখন বেকার অবস্থায় হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছিস…কারখানা একদিন লক্ আউট হয়ে গেল আমার…বাপ, ঠাকুর্দার যা জমিজমা, সম্পত্তি ছিল, বেচেবুচে দুজনে মিলে দীঘায় এসে হোটেল ব্যাবসা শুরু করলাম… আমাদের স্বপ্নের হোটেল..” সৈকতাবাস..” তারপর লোভের বশে আমায় খুন করে নিজেই পালিয়ে গেলি… হোটেল বিক্রি করে, দীঘা ছেড়ে, দেশের বাড়ি ছেড়ে, আমার গচ্ছিত টাকা পয়সাগুলো সব হাতিয়ে…এমনকি ব্যাগ থেকে আমার ব্যাঙ্কের পাস বইটা পর্যন্ত নিয়ে গেলি ওর ভেতরে রাখা আমার নিজের সই করা চেকের পাতাগুলো সমেত…এক এক করে টাকাগুলো সব আত্নস্যাৎ করার পর একদিন অবাক কারণে নিজেই ভুলে গেলি পাস বইয়ের ব্যাপারটা…লোভ আর পাপ কাউকে ছাড়ে না জানিস তো? নিজেও টিকতে পারলি না ব্যাবসায়,আমাকেও থাকতে দিলি না দুনিয়ায়…বুড়ো বাপ,মা আমার শোকে শোকে মরে গেল…একজন নয়, তুই তিন- তিনজনকে খুন করেছিস..!’
জলদগম্ভীর আওয়াজ! বিকাশের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘাম ঝরতে শুরু করেছে ততক্ষণে! শরীরময় এক অদ্ভুত কাঁপুনি…!
‘ কী… কী….কী প্রমাণ আছে আমি খুন করেছি? কবে আমি এসব করলাম..! মিথ্যা..সব মিথ্যা!’
আবার সেই হাসি।
‘এত ভুলে যাওয়া মন তোর! জীবনের চরম সত্যিটাকেও অস্বীকার করছিস! অবশ্য করবি নাই বা কেন…প্রমাণ যে তুই কিছুই রাখিস নি সেদিন.. আমার গলাও টিপে ধরিস নি.. শুধু চুলের মুঠি ধরে ঠেসে ধরেছিলি, যাতে লোকে ভাবে অ্যালকোহল গিলে জলে নেমে পায়ের মাটি না পেয়ে ঘটি বাটির মতো কেউ একজন ডুবে গেছে…!’
‘ না.. না…না আমি এ কাজ করতে পারি না.! পারি না! আমায় মিথ্যে ফাঁসানো হচ্ছে ফোনে…কে? কে তুমি? উত্তর দাও!’
‘ আমি? হা..হা..হা..! পরিচয় তো দিয়েই দিয়েছি।আচ্ছা বলতো,তাহলে কে তোকে দিয়ে সেদিন করিয়েছিল এসব কাজ? তোর লোভ? নাকি তোর মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহলের নেশা?’
‘ না..না..!’
প্রাণপনে বলতে থাকে বিকাশ।
‘শোন, আমার মুক্তি নেই রে…আমি হোটেলের ঐ একতলার ঘরেই রয়ে গেছি আজও… ঘুরে ঘুরে বেড়াই…ঘরের আনাচে-কানাচে.. করিডর… এর বাইরে চাইলেও আমার মুক্তি নেই… কখনো যদি এ হোটেলে আসিস, দেখতে পাবি ঘোরাফেরা করতে..না আমাকে নয়..আমার ছায়াকে…। তোর নিজের পরিবারে তোর বাবা,মা ছাড়া আর কেই বা জানতো সে আসল কাহিনী…। পাছে সবকিছু বেফাঁস হয়ে যায়, এই ভয়ে দেশের বাড়িতে চিরকালের জন্য তালা মেরে… তোর ছোট ভাই এ নিয়ে প্রশ্ন করলে গোটা ঘটনাটা হাজির করেছিলি আর একভাবে…আজ তোর নিশ্চিন্ত জীবনে আমি কোনো ব্যাঘাত ঘটাবো না রে… একটা অনুরোধ, পাস বইটা পুড়িয়ে ফেল…যেভাবে আমাকে নিশ্চিহ্ন করেছিস, ঠিক তেমন করে…। ভেবে দ্যাখ শেষবারের মতো কোথায় রেখেছিলিস বইটা…।’
‘ কি.. কিসের পাস বই..আমার কাছে কোনো বই..!’
ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো বিকাশ।
‘ আজকাল অনেক কিছুই দেখছি ভুলতে বসেছিস তুই, শারীরিক সমস্যার কারণে..মনে করে দেখ ।’
‘ মিথ্যা! সর্বৈব মিথ্যা! আমার এ ধরণের কোনো সমস্যা নেই। আগেও ছিল না…।’
‘আবার ভুলতে বসেছিস!এরপর কোনদিন হয়তো নিজেকেই ভুলে যাবি দেখছি..! আমি কিন্তু কিচ্ছু ভুলি নি…ওটা যত তাড়াতাড়ি নিশ্চিহ্ন করবি,ততই মঙ্গল…হাজার জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ সেদিন তোর দিক থেকে কোনো প্রমাণ পায় নি…আর কোনোদিন হয়তো পাবেও না…যদি পাসবইটা…দরকার কি একটা প্রমাণ রেখে দেওয়ার… নইলে আমায় দিয়ে দে..সে আসছে নিমেষের মধ্যে….তোর কাছেই আসছে…দিয়ে দে…দিয়ে দে.. তাড়াতাড়ি খোঁজা শুরু কর…মনটাকে একজায়গায় নিয়ে আয়..!’
‘ কে..! কে আসছে..!’
উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকে বিকাশ…।
‘ আমার তো মুক্তি নেই… বৃদ্ধ বাবাকে পাঠাচ্ছি… তিনি আসছেন, তোর মঙ্গলের জন্য… ঐ শোন..।’
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে কে যেন!
আলো নিভে গিয়ে হঠাৎই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢেকে গেল ঘরের চতুর্দিক।
ধুপ…ধূপ…ধূপ…ধূপ..।
সিঁড়িতে কার যেন পায়ের আওয়াজ। ক্রমশ এগিয়ে আসছে শব্দটা…স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে…একটা করে পা ফেলার আওয়াজ, তার কিছুক্ষনের বিরতিতে পরেরটা..দোতলায় বিকাশের ঘরের সামনে এসে হঠাৎই থেমে যায় শব্দটা…। নাকি গোটাটাই মানসিক বিভ্রান্তি..!
‘ খট..খট..খট..খট…। ‘
কড়া নাড়ছে কে যেন!
‘কে….কে ওখানে…! বুবলু.! সুরেশ…!’
হাতের মোবাইলটা খটাস করে মাটিতে আছড়ে পড়লো বিকাশের।
ভাই, ভাইপো.. ওরা কি শুনতে পাচ্ছে না কিছু? শুনতে পাচ্ছে না দোতলার এক কোণের ঘরে বিধ্বস্তপ্রায় বিকাশের আর্তনাদ?
সজোরে দরজাটা বন্ধ করতে গেল বিকাশ…আর ঠিক তখুনি ঘন অন্ধকারে কিসের একটা পায়ায় বাঁ পাটা আটকে গিয়ে ‘ আঃ’ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে।
সারা বাড়ি আজ শোকে মুহ্যমাণ। কাজের লোক গণেশই প্রথম ভোরবেলায় চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকে দেহটা দরজার কাছে পড়ে থাকতে দ্যাখে। বারবার ডাকার পরেও সাড়া না পেয়ে চিৎকার করে বাড়ির লোকজনকে জড়ো করে। একটু আগেই ডাক্তারবাবু এসে পাল্স পরীক্ষা করে জবাব দিয়ে চলে গেছেন…’ কোনো একটা সাডেন শক্ আর আর তা থেকেই এই ম্যাসিভ অ্যাটাক…।’
খাটে শোয়ানো বরফের মতো ঠান্ডা, নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকে বুবলু।দীঘায় যাবার আগে দাদান বলেছিল, ‘ ওখানে একটা হোটেল আছে। আমি নিজে তৈরি করেছিলাম হোটেলটা। দেখাবো তোদের…। ‘
‘তোমার হোটেল দাদান? কি মজা, কি মজা..ওখানেই আমরা থাকবো..?’
বাবা বলেছিল, ‘হ্যাঁ রে, আমি তখন কতো ছোট। ইস্কুলে পড়ি। তখন দাদান আর দাদানের বন্ধু মিলে হোটেলটা তৈরি করেছিল। ‘
‘ তারপরে কী হলো দাদান?’
‘ তারপর একদিন বন্ধুর সঙ্গে আড়ি হয়ে গেল। আমি আর কি করবো.. মনের দুঃখে হোটেল বন্ধ করে আবার চলে আবার চলে এলাম নিজের বাড়ি। কতো লোক, কতো মানুষজন আসতো সেই হোটেলে…কতো মজার মজার গল্প আছে… সব বলবো তোকে একদিন..। ‘
বাবা বলেছিলেন, ‘ আমিও শুনবো দাদা। ‘
বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মাও শুনছিল সেসব গল্প।
কান্নাভেজা গলায় বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বুবলু।
‘ দাদান আর কোনোদিন গল্প করবে না, তাই না বাবা? আর কথা বলবে না? ‘
বুবলুর মা রমা দেবী স্বামী সুরেশের দিকে তাকিয়ে ভীষণ রকম কৌতুহলী চিত্তে জিজ্ঞেস করে, ‘ সাডেন শক্ টা ঠিক কী হতে পারে বলোতো? দীঘায় ঐ হোটেলটাতে ঢোকার পর থেকেই দাদাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল…এমন কি ফিরে আসার পরেও…কালকে তুমি যখন কথাটা বলছিলে আমায়,ভাবছিলাম দাদা বোধহয় একটু বেশিই নস্টালজিক হয়ে পড়েছে, তাই…। তুমি তো এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলে দাদাকে? ‘
ভেঙে পড়া কন্ঠে মৃদু স্বরে উত্তর দেয় সুরেশ,’ হ্যাঁ করেছিলাম। “নস্টালজিয়া…বয়স হলে বাড়ে।” আমাকেও তাই বলেছিলেন। ‘
‘ কাল অবধি আমিও তাই ভেবেছি জানো..। এখন যেন মনে হচ্ছে গতরাতের ঘটনার সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর কোথাও কোনো যোগ…সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে..! দ্যাখো, দাদার চোখ দুটো কিরকম বিস্ফারিত! ‘
সকলকে চমকে দিয়ে মোবাইলের আওয়াজ ভেসে আসে। কথা থেমে যায় রমার। দাদার ফোনটা মেঝের এককোনে পড়ে আছে কারো নজরেই পড়ে নি! এগিয়ে গিয়ে মোবাইলটা তুলে নেয় সুরেশ। লাইন টা কেটে গেল। ফোন স্ক্রিনে কি একটা দেখে ভুরু কুঁচকে তাকায় সুরেশ। নিজেই নম্বর টা ডায়াল করতে শুরু করে।
‘ হ্যালো।’
‘আমি অভয়। একটু আগেই কল করলাম। কেটে গেল। ‘
‘ ও অভয় কাকু.. তুমি কি গতরাত্রে দাদাকে ফোন করেছিলে?’
‘ কেন বল তো?’
‘ এই নম্বরটাই শো করছে স্ক্রিনে। দুটো আটের কল…। দাদা তখন জেগে ছিল? ‘
‘ আরে তোর দাদা যে এতটা ভীতু তা তো জানতাম না! কী হয়েছে শুনবি? একদিন অফিস ক্যান্টিনে বসে কি একটা কথার সূত্রে আমার সঙ্গে বাজি ধরলো..রাত বিরেতে ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে। ও বলে ভূত টুত ওসব কিছু নেই। আমি বললাম, আছে তোকে দেখাবো। বাজি অ্যাকসেপ্ট করে নিলাম। গতকাল বাড়ি রং করানোর সময় চিলেকোঠায় রাখা একটা ভাঙা টিনের বাক্স থেকে কি খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম তিরিশ বছর আগেকার একটা খবরের কাগজের ফ্যাকাশে বিবর্ণ পাতা। এক ঝলক নজর পড়ে যাওয়ায় দেখি অনেক খবরের মাঝে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং রিপোর্ট.. “দীঘা সৈকতের কাছে ব্লু মুন নামক একটি হোটেল তৈরি করে নতুন ব্যাবসা করতে আসা দুই বন্ধুর মধ্যে অভয় সাঁধুখা নামে এক যুবকের সমুদ্রে রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য। হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ঘন ঝাউবনে ঢাকা সমুদ্রতীরের এক নির্জন স্থানে মৃতদেহটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। রামনগর থানার আই সি র নেতৃত্বে পুলিশ গোটা ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুসারে মৃতের পাকস্থলীতে পাওয়া অ্যালকোহলের অস্তিত্ব এবং মৃত্যুকালে অস্বাভাবিকরকম বিস্ফারিত দু চোখের মণি রহস্যকে ঘনীভূত করেছে। সদ্য ব্যাবসা শুরু করা মৃত যুবকের ব্যাঙ্ক পাসবই, নিজের সই করা চেকের বেশ কিছু পাতা, এবং সঙ্গে রাখা নগদ টাকা পয়সা… সেগুলি সবই খোয়া গেছে বলে মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগের যাবতীয় তীর মৃতের বন্ধুর বিরুদ্ধেই…। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে নিজের বাসভূমি কাঁথি থেকে এসে কারখানায় চাকরি সূত্রে রামনগরে ঐ বন্ধুর বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থাকতে শুরু করে মৃত যুবক অভয় সাঁধুখা। কারখানা লক আউট হয়ে যাওয়ায় পৈতৃক সম্পত্তি, জমি জমা বিক্রি করে হোটেল ব্যাবসা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় দুই যুবক। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে রয়েছে কিনা পুলিশ সব দিক খতিয়ে দেখছে। আপাতত জেরার মুখে মৃত যুবকের বন্ধু…।”
পৃষ্ঠার বাকী অংশ একেবারেই ছেঁড়া। যাই হোক, খবরটা পড়ার পর মাথায় একটা ভূতুড়ে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। বছর কয়েক আগে ফ্যামিলি নিয়ে দীঘায় বেড়াতে এসে এক আদ্যন্ত ঝাঁ চকচকে হোটেলে গিয়ে উঠি। যে হোটেলের একতলার ঘর আর সামনের প্রশস্ত করিডরের মূল কাঠামোটা কোনো এক অজানা কারণে অদ্ভুত ভাবে সেকেলে মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গিয়েছে। তফাত শুধু এই..ওটা ছিল ব্লু মুন আর যে হোটেলে ছিলাম সেটা তার থেকে মাত্র কিছুটা দূরে, সৈকতাবাস। সর্বোপরি আরো একটা ঘটনা… মনে আছে তোরা বেড়াতে যাবার ঠিক আগের দিন বিকেলে তোদের বাড়ি গেলাম? গল্প করতে করতে তোর মুখেই প্রথম উঠে এলো, বিকাশও নাকি এক বন্ধু পার্টনারকে নিয়ে অনেক বছর আগে দীঘায় হোটেল ব্যাবসা করতে শুরু করেছিল। তারপর পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে লোকসানে চলা ব্যাবসা শেষমেশ গুটিয়ে ওকে ফিরে আসতে হয়… তুই শুরু করলি তারপর বিকাশ গল্পটা ধরলো…আগে কোনোদিন ওর মুখে শুনিনি। বেশ ইন্টারেস্টিং। যাই হোক, তাড়া থাকায় আর সবটা শুনতে পেলাম না। পরে বাড়ি যেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো, এ তো মেঘ না চাইতেই জল! তিনটে ছবিকে একটা ফ্রেমে নিয়ে এসে, নিজেকে অভয় সাঁধুখার জায়গায় বসিয়ে, গলা পালটে, ফোন নম্বর চেঞ্জ করে রায় বাড়ির দোতলার কোণের দক্ষিণমুখী ঘরটাতে একটা ভুতুড়ে নাটকের উপস্থাপন করলে কেমন হয়? একসময় ইস্কুল,কলেজ প্রোগ্রামে অভিনয় করতুম, কল্পনা করে গল্পও লিখেছি কতো..। তারই কিছুটা খরচ করে ওর স্মৃতিশক্তিটা লোপ পাইয়ে দিয়ে বাজিটা যদি জিতে নিয়ে আসতে পারি…হা..হা…হা…হা..শেষমেশ ভয়ে ময়ে তোর দাদা কি করলো জানিস? হঠাৎ আসা ঝোড়ো হাওয়ায় দরজার কড়াগুলো বোধহয় নড়ে উঠেছিল.. আর ও ভাবলো ভূত বুঝি ওর ঘরের দোরগোড়ায়.. ..! বাছাধনের মুখেই যত বারফাট্টাই..ভেতরে আসলে ফানুস…নইলে এই আজগুবি গপ্পে কেউ সাড়া দেয়? বাজি লড়তে গিয়ে শেষকালে নিজেই কিনা সত্যিকার ভূত হয়ে গেলাম…হো..হো..হো…! আজ আসছে তো অফিসে? আসুক একবার দেখি…হ্যালো হ্যালো হ্যালো…!’
আবার কেটে গেল লাইনটা।
রায় বাড়ির দক্ষিন কোণের দোতলার ঘরে গতকাল গভীর রাতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা শেষমেশ চোখের জলে শেষ হবে, ভাবতে পারে নি বিকাশ চন্দ্র রায়ের দীর্ঘ দিনের কলিগ বন্ধু অভয় চট্টরাজ।ঐ ঘরেরই বাঙ্কে রাখা এটা সেটা জিনিসপত্রের পেছনে একটা মরচে ধরা ট্রাঙ্কের ভেতর হাবিজাবি, অদরকারী কাগজপত্রের ফাঁকে দিন কয়েক আগেও রাখা ছিল তিরিশ বছর আগে সদ্য হোটেল ব্যাবসা শুরু করা অভয় সাঁধুখা নামে কোনো এক ব্যক্তির বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া একটা ধূলিধূসরিত ব্যাঙ্ক পাসবই। অতীত বোধহয় কোনো না কোনো ছাপ ঠিক রেখে যায় কোথাও একটা, যার হদিশ জানে শুধু এ বাড়ির একজনই।
শোকস্তব্ধ বাড়িটা আজ যেন ভেঙে নুয়ে পড়া একটা বটগাছের মতো… যার ছায়া এতকাল বেঁধে রেখে এসেছিল একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষকে। শান্তির আশ্রয়ে। এক লহমায় স্মৃতি হয়ে গেল গাছটা।
ফুল,মালা,চন্দনে সাজানো দেহটার সামনে স্থানুর মতো দাঁড়িয়েছিল গণেশ। চলে যাচ্ছে সেও। ছায়ার আশ্রয় ছেড়ে। দেশের বাড়ি। ছেলের কাছে। ছেলে সেখানে বাঁধা মাসমাইনের চাকরি করে। বাবাকে আর কাজের লোকের পরিচয়ে থাকতে দিতে রাজী নয়।
যাবার আগে শুধু একটাই জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে গণেশ।
দাদাবাবুরা সব দীঘায় গিয়েছিল বেড়াতে। একা বাড়িতে ঘর দোরগুলো সাফসুতরো করছিল গণেশ। দাদাবাবুর ঘরের বাঙ্কে এটা ওটা জিনিসের পেছনে এক কোণায় পড়ে থাকা টিনের ট্রাঙ্কটা কি মনে করে ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে ভেতরকার পুরনো কাগজগুলো সরাতেই চমকে ওঠে সে! কাগজের গায়ে লেখা, মনে থেকে যাওয়া নামটা পড়ে ফেলতে অসুবিধা হয়নি নাইন পাশ করা গণেশের। আজ পর্যন্ত বাবুকে না বলে ওনার কোনো জিনিসপত্রে হাত দেয় নি গণেশ। সেদিনই প্রথম কি যে হলো হঠাৎ!
….মনে পরলে এখনো বুকের ভেতরটা কিরকম করে ওঠে গণেশের। দুপুরবেলা। মা ঠাকরুন আর বিকাশ দাদাবাবু ঘরের ভেতরে খাওয়া দাওয়া করছে।মেশোমশাই অফিসে। এমন সময় পুলিশ এসে হাজির। সোজা ঘরে। বিকাশ দাদাবাবুকে জেরার পর জেরা। সুরেশ দাদাবাবু তখন কতো ছোটো। হাফপ্যান্ট পরতো।ইস্কুলে গিয়েছিল। ঐ ঘটনার বিন্দুবিসর্গ কিছুই সে জানতো না। আড়ালে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটাই সেদিন আর অজানা রইলো না গণেশের কাছে। কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারে নি কিছুতেই , ঐ মানুষটা এরকম একটা অপরাধের সঙ্গে..! জয় হলো সেই দাদাবাবুরই।
আজ যখন সে সব কিছু ভুলে গিয়েছে মানুষ, তখন নিজের একটা ভুল বশত কেন সে এ কাজটা করে ফেললো! কেন বাঁচিয়ে রাখতে পারলো না তার মনে, এতদিনকার মানুষটাকে!
ঝোলা ব্যাগের ভেতর সন্তর্পণে রাখা সবুজ রংয়ের পাসবইটার দিকে একঝলক নজর চলে যায় গণেশের…।
তিরিশ বছর আগে ফেলে আসা খবরের কাগজের একটা রিপোর্ট…’ দীঘা সৈকতের কাছে ব্লু মুন নামে একটি হোটেল তৈরি করে ব্যাবসা করতে আসা দুই যুবকের মধ্যে এক যুবক.. হোটেলটা যে ব্লু মুন ছিল না। ছিল সৈকতাবাস… ভুলবশত ঘটে যাওয়া অর্ধসত্য শিরোনামটিকে চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেবার মতো কেউ হয়তো নেই আজ আর। রয়ে গেছে একজনই… নির্ণিমেশ চোখে দাদাবাবুর বিদায়ী যাত্রার দিকে তাকিয়ে। ঝোলা ব্যাগে সন্তর্পণে লুকোনো সে অতীতের কলংক…আর কেউ কোনোদিন হদিশ পাবে না শেষ সম্ভাবনাটুকুরও।
চল্লিশ বছরের চেনা বাড়িটা যে নিজের চেয়েও প্রিয় তার কাছে…

শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়