বিনা মেঘে বজ্রপাত? বিনা মেঘে বৃষ্টিপাত? কিন্তু মেঘ তো আকাশে রয়েছে। একদম সকালে অবশ্য ছিল না। ভোরের সূর্যটা দিব্বি ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য করেছে। হয়ত চা-বিস্কুটও খেয়ে থাকবে।
কিন্তু চা-বিস্কুট খাওয়ার সময় পায় নি অনুব্রত। পায় নি তার বৌ পৃথা। এমন কী দুধ দিয়ে কর্ণ ফ্লেক্স খাওয়াও হল না ওদের ছোট্ট ছেলে বুম্বারও। বাবার জন্যে চায়ের বাটিতে গরম জলে দার্জিলিং চায়ের বড় বড় পাতা ভিজিয়ে ঢাকা দিয়ে পৃথা সবে এ ঘরে এসে বুম্বার গরম দুধের বাটিতে কর্ণ ফ্লেক্স প্যাকেট থেকে ঢেলে ভিজোতে যাচ্ছে এমন সময় ঐ আওয়াজ। ঝম ঝম ঝম শব্দে একটু হাত কেঁপে গেল পৃথার। দু চারটে ফ্লেক্স মেঝেতে পড়ল।
কান খাড়া করল বুম্বাও। তারপর দৌড়ে জানালার সামনে গিয়ে পর্দা তুলে দিয়ে আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, ওমা বিষ্টি গো বিষ্টি। দেখবে এস কত জল।
হ্যাঁ তাই তো। কৌতূহল নিবারণ করা আর সম্ভব হল না পৃথার পক্ষেও। ওঃ বাবা যা গরমটা পড়েছে। ঘাম আর ঘামাচি যেন লেপটে বসে আছে সারা শরীরে। শরীর যেন সদা আইঢাই করছে। সকাল সাতটা আর দুপুর বারটার মধ্যে কোনও ফারাক নেই। তার আবার রান্নাঘরে কাজ। ওভেনের গরম আর রান্নার পরিশ্রম মিলে ঘামের সঙ্গে যেন লড়াই করতে হয়। ওঃ বাবা একটু স্বস্তি পাওয়া গেল তবে।
যেন বয়েস হঠাৎ বেশ কমে গেছে পৃথার। কোথায় জানলার পর্দা খুলে বিছানায় জল ঢোকানোর জন্যে ছেলেকে ধমকাবে তা নয় নিজেই যেন তার সমবয়সী হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টিটা উপভোগ করছে। মুখটা ভরে গেছে তৃপ্তির হাসিতে। আঃ কী সুন্দর ঠান্ডা। মনে হচ্ছে যেন এক ঝটকায় দরজা খুলে বাইরে গিয়ে ভেজে এই বৃষ্টির মধ্যে। ভেজে আর নাচে।
-খুব হয়েছে এবার চল। ফ্লেক্স খেয়ে নেবে। স্কুল যেতে হবে তো? ছেলেকে বিধি-সম্মত মৃদু ধমক দিলেও পৃথার মনের ইচ্ছে ছিল ছেলের পাশে আর একটু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির শোভা দেখে।
ছেলেকে দুধের বাটিতে কর্ণ ফ্লেক্সগুলো একটু নেড়ে বলল, বাবু রেডি হয়ে নে। সাড়ে সাতটায় কিন্তু স্কুলের গাড়ী আসবে।
মুহুর্তে বুম্বার সারা মুখে নেমে এল যেন আকাশে জমে থাকা বেশ কিছু মেঘ। স্কুল? এই সুন্দর বৃষ্টির দিনে স্কুল? আজ বাবা নিশ্চয় বাজার থেকে ইলিশ মাছ আনবে। মা নিশ্চয় বেলায় খিচুড়ি রাঁধবে। আর বাবা এই বৃষ্টিতে অফিস যাবে বলে মনে হয় না। সেদিন যেন কাকে ফোনে বলছিল, আমার অনেক ছুটি পাওনা আছে। না হয় যাবে তার থেকে কিছু। তাতে আর কী। একটা বিষ্টি ফিষ্টি না হলে আর ভাল লাগছে না।
দুপুরে এই ঝম ঝম বৃষ্টির মধ্যে মায়ের করা গরম খিচুড়ির সঙ্গে গরম ইলিশ মাছ খেতে খেতে বাবা আর মা নিশ্চয় হেসে হেসে খুব গল্প করবে। এমন দিনে বাবা নাকি মাকে খুব আদর করে। হ্যাঁ, বুম্বা দেখেছে কত দিন। অবশ্য চোখের সামনে সে এসে পড়লেই মা কেমন চোখ পিটপিট করতে করতে বুম্বাকে বলে, চোখে যে কী পড়ল। ধুলো নাকি কে জানে। তোর বাবা তো অনেক ফুঁ দিল এবার তুই একটু দেখ তো বাবু। দেখতে কিছু পাস কিনা।
স্কুলের কথায় খুব মন খারাপ হয়ে গেল বুম্বার। ভাবতে লাগল ইস কী হবে। সেই বৃষ্টির মধ্যে রেনকোটের ভেতরে জবজবে ঘাম আর বাইরে বৃষ্টির ঠান্ডা ছাঁট। এই বৃষ্টিতে কারোর ঘরের বাইরে যেতে ভাল লাগে?
ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে। মনে মনে গডকে ডেকে বলতে থাকে, ইস গড, যেন স্কুলের রিক্সো আমাদের বাড়ির গলিতে ঢুকতে না পারে গড।
তা গডের ইচ্ছে হোক বা না হোক, এমন একটা সম্ভাবনা অবশ্য থেকে যায়। যদিও মায়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়া খুব মুশকিল। নিজের রান্না ফেলে গায়ে রেনকোট চড়িয়ে মাথায় ছাতা দিয়ে বুম্বাকে নিয়ে দৌড়বে সেই মোড়ের মাথায় যেখানে এসে জলের জন্যে আটকে আছে তার স্কুলের রিক্সো। আর আজ তো বাবা যদি অফিস না যায় তো সেই এ কাজ করবে।
ছেলেকে কোনওমতে খাইয়ে রান্নাঘরে ছুটল পৃথা। বুম্বার বাবা অফিস বেরোবে ঠিক নটায়। তার গাড়ী নটা চোদ্দয়। এখনও বিস্তর রান্না বাকি কিছুটা করে ফেলতে হবে তারপর বাজার থেকে মাছ নিয়ে অনুব্রত ফিরলে সে মাছ ভেজে ঝাল করে দেবে।
খানিকটা রান্না করে দেবার কথায় বাসনের কথাটা মনে পড়ে গেল। এই রে কালকের বাসন যে ডাঁই করা রয়েছে রান্নাঘরে। সুন্দরী আসবে তবে মেজে তাকে উদ্ধার করবে। সুন্দরী তার কাজের মেয়ে। আসল নাম কেউ জানে না। বা খোঁজ নেয় নি। রঙ তেমন ফর্সা না হলেও দেখতে সে বেশ সুন্দর। তাই সবাই তাকে এই নামে ডাকে বা চেনে।
কানে এই সময় আবার নতুন করে বৃষ্টির শব্দটা এল। আর মনের আলগা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল সন্দেহটাও। সাত সকালে আচমকা বৃষ্টির এই উৎপাতে মেয়েটা যদি কাজে না আসে? ইস কী বিপদ। কিন্তু আর সময়ও তো নেই। এখন হাতে হাতে দুটো বাসন ধুয়ে নিতেই হবে। মাথা কুটে মরতে ইচ্ছে হচ্ছে পৃথার। ধুর ধুর একেবারে হাড় মাস কালি হয়ে গেল গা!
সাতটার আগে সাধারণত বিছানা ছাড়ে না অনুব্রত। আর উঠবেই বা কী করে। রাত সাড়ে বারটা একটা পর্যন্ত কম পরিশ্রম করতে হয় তাকে? পরিশ্রম অবশ্য আগেও করত। লড়াইয়ের পরিশ্রম। কখনও তো রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যেত।
তখনও বুম্বা হয় নি। তখন পৃথার সঙ্গে তাকে লড়াই চালাতে হত প্রায় সারা রাত্তির ধরে। এখন তার দিক থেকে সাড়া তেমন পাওয়া যায় না। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায় অন্য দিক থেকে। সারারাত না হলেও কাল রাত দুটো পর্যন্ত তো বটেই। ঘুমন্ত পৃথার পাশে দিব্বি চ্যাট করে গেছে। সুমতির নামটা সুমতি কী কুমতি কিংবা তার ছবিটা তার নিজের কিনা সেটা নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। অলীক জগতে কেউ নিজেকে লিক করে না বেশী। বেশীর ভাগ সুখ তো মনে।
সাতটা দশে ঝম ঝম ঝম শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুমচোখে বাইরে তাকাল জানলা দিয়ে। চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে ছাওয়া। তার মানে এখনও ভোর হয় নি। পাশবালিশ টেনে তাকে প্রাণপণে আঁকড়ে আবার শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঝম ঝম আওয়াজে আবার ঘুম ভাঙ্গল। মনে হল আচ্ছা আজ সকাল তো হয়েছিল। দিব্বি আকাশ ফুঁড়ে রোদ বেরিয়েছিল। তবে কি এখন আবার সন্ধ্যে হয়ে গেল? সারাদিন ঘুমিয়েছিল? আর তার অফিস?
ধড়মড় করে উঠতেই চোখ পড়ে গেল ঘড়ির দিকে। আরিব্বাস পৌনে আটটা। কিন্তু সকাল না রাত? এ ধন্ধ কাটাতে তড়াক করে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিশেষ ফল নেই। তুমুল বৃষ্টি আর কালো আকাশ। ইস কাল কি তবে সুমতির সঙ্গে চ্যাটটা খুব জোর হয়ে গেছে?
ডাইনিং-এ টিউব লাইট জ্বলছে। রাত কী দিন বোঝার উপায় নেই। এমন সময় সুন্দরী ঢুকল। ছাতা রেখে সে চলে গেল সোজা রান্নাঘরে। তার মানে এখন রাত নয় সকালই। কারণ রাত পৌনে আটটায় সুন্দরী কখনও আসে না।
-এসেছিস সুন্দরী? নে নে ঝটপট হাত চালিয়ে বাসন ক’টা দে তো বোন।
-আসব না তো আর কী গো। কাল পর্যন্ত ভ্যাপসা গরমে রাতে চোখের পাতাটি বোজাতে পারি নি। আজ ভাবলাম একটু জলে ভিজি আরাম করে তা মনে পড়ল তোমাদের কথা। বর্ষার প্রথম বিষ্টি কী ভাল লাগে তাই না গো দিদি?
মনের কথা বটে। কিন্তু এখন মনের কথা মনে গুঁজে দিয়ে কত্তার রান্না করার কথা ভাবার সময়। পৃথা সামান্য বিরক্ত হল, রাখ তো এখন বিষ্টির কথা। আমি মরছি আমার নিজের জ্বালায়।
বাসন মেজে থালাবাটিগুলো সিঙ্কে ফেলে ধুতে ধুতে বলল, দাদাকে তো দেখছি না? দাদা কি শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে বিষ্টি দেখছে নাকি গো দিদি? সত্যি কি ভাল লাগছে না কী বলব। ঠিক যেন বরফ দেওয়া লস্যি খাচ্ছি গো দিদি।
কথাটা বলে খিলখিল করে হেসে উঠল সে। দাদার কথা ওঠায় আর তার খিলখিল হাসিতে পৃথার গা-পিত্তি জ্বলে গেল একেবারে। আবার ঠিক এই সময়ই লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে মুখে টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে অনুব্রত ঢুকল গিয়ে বাথরুমে।
–আর অত আদিখ্যেতা করতে হবে না বিষ্টিকে নিয়ে। বিষ্টি আমার রান্না করে দেবে না বা তোর বাসনও ধুয়ে দেবে না। কখন থেকে বলছি হাত চালা না শুধু মুখ চালিয়েই যাচ্ছিস।
–এই তো হয়ে গেল দিদি। মুখ করছ কেন? সুন্দরী এবার মুখ ভার করে, কাল সকালে এমন বিষ্টি এলে কিন্তু আমি আর আসব না বলে দিচ্ছি। বিষ্টিতে ভিজলে আমার বড় জ্বর হয়।
মুখ বেশ একটু কুঁচকে গেল পৃথার। কী জানি কাল আবার সত্যি সত্যি যদি মেয়েটা ডুব দেয় তো কী করবে কে জানে। এদের তো শুধু কথায় কথায় কামাই আর কামাই। আবার এদিকে ধিঙ্গিপনাও আছে বেশ। আর বলিহারি বটে অনুব্রতর। কী দরকার ছিল তোমার স্যান্ডো গেঞ্জি পরে মেয়েটার সামনে আসার? এরপর যদি বাসনে সাবান লেগে থাকে তো সেই শোনাবে কথা। বলবে, সুন্দরীকে একটু বলতে পার না ভাল করে বাসন ধুতে?
তার বেশ দেরি হয়ে গেছে। ঝটপট মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে। পৃথার কথা কানে আসছিল কিছু কিছু তবে কিছু মনে করে নি। কাল যা গরম গেছে। সুন্দরীর একটা কথা তার বেশ ভাল লেগেছে। বেরিয়ে এসে বলল, তুই ভাল বলেছিস তো সুন্দরী।
বাসন ধুয়ে আনাজ কুটতে বসেছে সুন্দরী। মুখ তুলে অনুব্রতর দিকে চেয়ে বলল, কোন কথাটা গো দাদাবাবু?
–ওই যে বললি না বরফ দেওয়া লস্যি খাওয়ার কথাটা? আমারও যেন—
আগুন চোখে তার দিকে তাকাল পৃথা, বলছি হচ্ছেটা কি? সময় নষ্ট করছ কেন? মাছ আবার টাটকা না হলে তো মুখে রুচবে না। এদিকে বাজার ফুরিয়েছে। যা বিষ্টি দেখছি ক’দিন বাজার বসবে না তা ঠিক নেই। কিছু বাজার বরং বেশী করে এনে দাও। বড়ি আছে মাছের বদলে চালিয়ে দেব যা হোক।
নিজের ঘরে গিয়ে কাগজ নিয়ে বসতে না বসতে গিন্নি ঢুকল। এক হাতে চায়ের কাপ অন্য হাতে বাজারের থলে।
কড় কড় করে বাজ পড়ল বাইরে। চমকে নিজের মাথাতেই হাত দিয়ে ফেলল অনুব্রত। ইস বাজটা বোধহয় তার মাথাতেই পড়েছে। ভেবেছিল চায়ের সঙ্গে জম্পেশ করে কাগজ পড়বে। মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে মুখ তুলে বৃষ্টির শোভা দেখবে। আর আকাশ না ধরলে অফিস যাওয়ার বালাই নেই।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কারবারে কেরোসিন। এই সাংঘাতিক জল মাথায় করে বাজার করতে বেরোতে হবে? বাজার বসবে তো? কে জানে গিন্নির হুকুম।
-কি হল গো বসেই থাকবে নাকি যাবে? আবার গিন্নির তাড়া। বেরোতেই হল। বৃষ্টি এখন একটু ধরেছে মনে হল। বাজার করতেই হবে নইলে গিন্নি হয়ত আজকে তাকে বড়ির ঝাল আর ভাত খায়েই রাখবে।
বাজার আর বসবে কি? এই বর্ষায় সে বসবে কি ছুটি নেবে যেন ভাবতেই পারছে না। বাজারের ভরা হাট আজ রীতিমত ভাঙা হাট। জনা কয় এসেছে গুটি গুটি। তাও কাটা মাছের জায়গায় এসেছে ল্যাটা মাছ। বাগদা চিংড়ির জায়গায় এসেছে কুঁচো চিংড়ি। কুমড়োর জায়গায় এসেছে ডুমুর কী কাঁচকলা।
একটু অপেক্ষা করলে কি হয় না? হয় বৈকি। তার ছুটির ঘন্টা বেজে যায় অফিস পৌঁছনোর আগেই। হাতঘড়ির কাঁচের জল মুছে দেখল সাড়ে নটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি আছে।
বাড়ী থেকে হেঁটে আসা যায় না। আবার সাইকেল চালাতেও জানে না। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও অটো বা টোটো কিছুই পাওয়া গেল না। বৃষ্টির জোর আবার বেড়েছে। একটা বন্ধ দোকানঘরের চালার নীচে দাঁড়িয়ে রিক্সার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আহারে! একটা লোক মজুর মত হয়ত, তার পাশেই গুঁড়ি শুঁড়ি মেরে বসে আছে। ফুটপাথেই থাকে হয়ত। এই দামাল বৃষ্টি তাকে হয়ত আশ্রয়চ্যুত করে থাকবে। মধ্যবিত্ত আর ফুটপাথবাসীকে একসঙ্গে এনে ফেলেছে।
বুকপকেটটা কেঁপে উঠল। ভুল করে সাইলেন্ট করা ছিল।
পৃথার ফোন। বলেছে আজ নাকি খিচুড়ি করে দেবে। শ আড়াই মাঝারি সাইজের খয়রা পেয়েছে অনুব্রত। ইয়াহু! তাই আজ ইলিশের বদলে দিব্বি চলে যাবে।
একটা রিক্সাকে অনেক করে দাঁড় করান গেল।
-পঁচিশ টাকা লাগবে কিন্তু। দেখছেন তো কি বিষ্টি—
লোকটা ডাহা গলা কাটছে। সাত টাকা ভাড়া বৃষ্টির চোটে গিয়ে দাঁড়াল একেবারে পঁচিশ টাকায়? পরেই ভাবল আহা এমন বর্ষায় তার যদি মজা করতে ইচ্ছে হয় তো এ লোকটা করবে না?
রিক্সোটা বঙ্কিম কাননের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের ঠিক ওপরেই ঋষি বংকিমচন্দ্রের আবক্ষ প্রতিমূর্তি। রিক্সার গতি বেশী ছিল না। প্রবল বৃষ্টির ঝাপটায় কোনওমতে টেনে টেনে চলছিল। তাই মূর্তিটা আজ অনেকক্ষণ ধরে দেখার সুযোগ পেল সে। অবাক কান্ড অন্যদিন তো এটাকে চিনতেই পারত না। নীচে মাঝে মাঝে জমে থাকে জঞ্জালের স্তূপ। মাথায় কাক-চিল বসে বসে মুখ আর মাথা সাদা করে দিয়েছিল।
কিন্তু আজ এই প্রবল বৃষ্টিতে সব সাদা ধুয়ে মুছে সাফ। এই সেই সেদিনের সাহিত্য সম্রাট। আনন্দমঠের রচয়িতা। নিজের অজান্তেই নিজের হাত উঠে গেল কপালে। বর্ষা তুমি খেল দেখালে বটে। মহাপুরুষকেও আজ নতুন করে চিনিয়ে দিলে।
তারপরেই এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। এদিক ওদিক বইছে পাগলা হাওয়া। এতদিন আসছে এই বাড়িগুলো কি কোনদিন চোখে পড়ে নি তার? বয়েস তা প্রায় আশি-নব্বই কি একশোও হতে পারে। বাড়ি তো নয় যেন বাড়ীর কঙ্কাল। ভূতের মত দাঁত বার করে হাসছে। বাড়িগুলো কি দুলছে? এত জোর দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির দাপটে ভেঙ্গে না পড়ে।
ভয়ে ভয়ে তাড়া দিল রিকশাওয়ালাকে, ভাই একটু তাড়াতাড়ি চল না।
-যাচ্ছি তো দাদা। দেখতেই তো পাচ্ছেন কেমন হাওয়াটা দিচ্ছে।
খিল খিল হাসিতে রীতিমত চমকে যেতে হল অনুব্রতকে। এই বর্ষায় এমন প্রাণখোলা ঊচ্ছ্বল হাসি এল কোথা থেকে? আশ্চর্য এই বর্ষাতেও ছাতা না নিয়ে স্রেফ রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে চলেছে এরা দুজনে। দুজনে প্রায় জড়াজড়ি করে। এই বর্ষায় আর কে দেখছে তাদের।
ওরা চলছে ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে। রিক্সোটা প্রায় পাশ দিয়ে যাচ্ছে। অনুব্রতর খুব কৌতূহল হল। এমন রোমান্টিক দৃশ্যের নায়ক-নায়িকাদের দেখতেই হবে। হৃদয় যে তারও দুলছে।
ক্লাস ইলেভেনের শম্পা। একটা জিনস আর টাইট গেঞ্জি পরেছে। জলে ভিজে তা আরও টাইট হয়ে গেছে। দেহরেখা স্পষ্ট। শম্পা থাকে তাদের বাড়ির একটু দূরেই। কয়েক বছর আগে প্রাইভেটে তাকে ইকনমিক্স পড়াত। তাকে জড়িয়ে ধরে হাটছে প্রিয়ংকন। বি-এস-সি ফাইনাল ইয়ার। দুজনে এত প্রেম আগে জানত না অনুব্রত। এখন জেনেও খারাপ লাগল না।
-এই কোথায় চললি তোরা?
–আমি স্কুলে যাব দাদাই। শম্পা হাসতে হাসতে বলল, আর প্রিয় যাবে কলেজে।
-এই বৃষ্টিতে কলেজ হবে? ছাতা নিস নি কেন তোরা?
রিক্সো তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। শম্পা খিলখিল হেসে বলল, বিষ্টিতে ভিজতে ভাল লাগছে দাদাই। কতদিন পরে বিষ্টি এল বল?
মনটা ভরে গেল অনুব্রতর। তারও তো ইচ্ছে হচ্ছিল উঠোনে দাঁড়িয়ে পৃথার সঙ্গে ভেজে। এমন ভাবে দুই শরীর লেপ্টে। আজও ইচ্ছেগুলো পালায় নি। কিন্তু হাতছাড়া হয়েছে উপায়টা।

Dr. Arun Chattopadhyay; 181/44 G.T.Road (Gantir Bagan) P.O Baidyabati Dist. Hooghly (PIN 712222)