জীবন-দর্শন
জীবনদর্শন সম্পর্কে আমি আজীবন খুবই উদাসীন। জীবনের দর্শন ঠিক কি হওয়া উচিত সে ব্যাপারে আমি কোনো কালেই মাথা ঘামাইনি। জীবন আমাকে যা দিয়েছে সেটাই ঈশ্বরের বিধান বলে মেনে নিয়েছি। জীবন যা নিয়ে নিয়েছে বা আমি যা হারিয়েছি তা আমার কোন কালেই ছিল না বলে মান্যতা দিয়েছি। এই চিন্তাধারায় এক অদ্ভুত শান্তি আছে। কারণ জীবনের সব দুঃখের শুরুটা হয় প্রত্যাশা থেকে। তাই আমি সবার আগে নিজের জীবনে প্রত্যাশা জিনিসটাকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। হয়ত এটাই আমার জীবন দর্শন।
আমার প্রত্যাশা নেই। লোভ তার বীজ আমার মনে ফোটাতেই পারেনি। তাই আমি মুক্ত। এই মুক্ত মনে আমি মানুষের সাথে মিশি। সহজেই মানুষের মনের কথা বুঝতে পারি। এটা আমার একরকম সুপার পাওয়ার বলা যেতে পারে। আমার মতে, প্রত্যেক মানুষ কিছু না কিছু ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কখনও সে সেটা বুঝতে পারে; কখনও পারে না।
বলা হয়, বিয়ের পরে নাকি পায়ে বেড়ি পড়ে যায়। কিন্তু আমি বিয়ের পর আরও বেশি মুক্ত। মহামায়া আমার খুবই ভালবাসে এবং সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় সে আমার বোঝে। পৃথিবীর কাছে আমার কাজকর্ম যেখানে পাগলামি, মহামায়ার কাছে তা শিশুসুলভ আচরণ। তার মতে আমি এখনও শিশু। আমার মানসিক বিকাশ ঘটেনি।
নিজের পোশাক বলতে আমি সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরেই এই ৪০ বছর কাটিয়ে দিলাম। আর কোনো পোশাক দেহে তুলতে পারলাম না। কেন জানি না। হয়ত এটিও আমার জীবন দর্শন।
আজ সকাল থেকেই এসব কথাগুলো ভাবছি। মাঝে মাঝে আমি এরকম ভাবি। ভাবতে ভাল লাগে। একটু আগেই মহামায়া চা দিয়ে গেল। আজ রবিবার। আমায় একটু বাদেই বেরুতে হবে। প্রানেশের বাবা ডেকে পাঠিয়েছে। ব্যাটা প্রানেশ আবার কিছু নতুন পাগলামি শুরু করেছে হয়ত। আমি যদি গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীর হতাম হয়ত প্রানেশই আমার প্রধান শিষ্য হত।
চট্ করে ঠিক করলাম আজ মহামায়াকে একটি উপহার দেবো। কি দেবো সেটা পরে ঠিক করা যাবে। আগে প্রানেশের বাড়ি যাওয়া যাক।
– অধীরবাবু বাড়িতে আছেন?
– হ্যাঁ, আপনি বসুন, উনি আসছেন।বলেই চাকরটা চলে গেল। আমি একটা ছোট বসার ঘরে বসলাম। সারা ঘরে একটা টেবিল আর চারটে চেয়ার। তবে এর থেকে বেশি কিছু রাখার জায়গাও নেই। বড়লোকদের বাড়িতে সবচেয়ে গুরুত্বহীন মানুষ দেখা করতে এলে তাদের এরকম ঘরে বসানো হয়। আমেরিকার একটি প্রতিবেদনে বড়লোক ও গরীবদের ঘরের বিশ্লেষণ করা আছে এবং পার্থক্য স্বরূপ বলা আছে যে গরীবদের সব ঘর প্রায় একই মাপের হয় কারণ তারা সবাইকে একই নজরে দেখে। তবে ধনীদের চোখ অন্যরকম। অর্থ দিয়ে তারা মানুষের গুরুত্ব বিচার করে। তাই প্রায় সব ধনী মানুষের বাড়িতে একটিকরে এরকম ঘর থাকে। যেখানে গুরুত্বহীন মানুষকে বসতে দেওয়া হয়। যেমন আমি।
হনহন করে অধীরবাবু (প্রানেশের বাবা) ঢুকলেন। ঘড়িতে এখন সকাল ১১টা।
– তুমি কি চাও আমি তোমায় লোক দিয়ে মার খাওয়াই?
– সেকি! আমি আবার কি করলাম ?
– প্রানেশ কি শুরু করেছে জানো?
– না।
– কাল রাত থেকে বউবাজারে একটা কোঠায় পড়ে আছে। আমি ফোন করেছিলাম। বলে, জীবনের ভাল দিক জানতে হলে সবার আগে জীবনের খারাপ দিক গুলোকে দর্শন করতে হয়। তা না হলে ভালোর গুরুত্ব বোঝা যায় না। এটাই নাকি জীবন দর্শন।
– বুঝলাম।
– বুঝলাম বললে হবে না। শোনো ছোঁড়া। প্রানেশকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। ও ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। শুধু তোমার পাল্লায় পড়ে ও উচ্ছন্নে যাচ্ছে। ওকে এখুনি ফিরিয়ে নিয়ে এসো। আর দয়া করে ওর সাথে আর মিশবে না। তাহলে ফল খুব খারাপ হবে।
– প্রথমত গণতান্ত্রিক দেশে আপনি কাউকে কারোর সাথে মিশতে বারন করতে পারেন না। আর ফল আমার কি আর খারাপ হবে? আমার তো কোনো ফল ফোটেইনি গাছে।
রাগে বিজ বিজ করতে করতে অধীরবাবু বললেন,তোমার দু’ঘন্টা সময় দিলাম। তারমধ্যে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসো ঐ নোংরা জায়গা থেকে।
এই অধীরবাবু টাইপের লোকের সাথে আমার কোনোকালেই বেশি কথা বলতে ইচ্ছা করে না। আসলে এদের আমি ঠিক রিড করতে পারি না। মানুষের প্রয়োজনের থেকে বেশি টাকা হয়ে গেলে এরকম হয়। ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে পারে না।
অধীরবাবুর বাড়ি থকে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবছি একবার প্রানেশকে ফোন করব। দেখি মালটা কোথায় আছে।
– হ্যালো, প্রানেশ।
– গুরু, জানতাম ফোন করবে।
– তুই আছিস কোথায়?
– আমি স্বর্গে গুরু। মেনকাকে নিয়ে আছি। মাঝে মাঝে আঙুর আর রাম, একেবারে নিট্ মারছি।
– কাল থেকে বাড়ি ফিরছিস না কেন?
– আর ফিরব না। এখানেই থাকব। কি সুন্দর জায়গা।
– পাগলামো রাখ। বাড়ি ফের। আমাকে কোথায় আসতে হবে বল। তোর সাথে নিয়ে আসবো।
– ওকে, তুমি গিরিশপার্ক মেট্রোর সামনে এসে ফোন করো। আমি তারপর বেরুবো এখান থেকে।
গিরিশপার্ক থেকে প্রানেশকে নিয়ে আসা সত্যিই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকেই মাল খেয়েছে। ঠিকমত হাঁটতেই পারছে না। একটা ট্যাক্সি নিলাম। সোজা পৌঁছালাম ওদের দমদমের বাড়িতে। প্রানেশ এখন বেহুস। চ্যাংদোলা করে ওর শোবার ঘরে রেখে আসলাম। এদিকে অধীরবাবুর চোখ লাল। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে। কি জানি কি বলে বসে।
প্রানেশকে ওর ঘরে শুইয়ে রেখে বেরোতেই অধীরবাবু বললেন,তোমার লজ্জা করে না। নিজের বন্ধুর এই খারাপ অবস্থা দেখে মনে মনে খুব খুশি হচ্ছো নিশ্চয়ই?
– জীবনের সবকিছু এভাবে হিসেব করে দেখতে যাবেন না।
হঠাৎ করে কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। অধীরবাবু বললেন,মানে? কি বলতে চাইছ?
– ছোটবেলা থেকেই প্রানেশকে নিয়ে আপনার অনেক প্ল্যান। তবে কখনই আপনি জানতে চাননি ওর কি স্বপ্ন? ও কি চায়।
– ও কি চায় না চায় সেটা আমার কাছে অবান্তর। এ বাড়িতে থাকতে হলে আমার ইচ্ছা অনুযায়ী থাকতে হবে।
– তাহলে তার ফল কি হতে পারে তা আপনার চোখের সামনেই আছে। আরও একটা কথা বলা দরকার, প্রানেশ আমার ছোটবেলার বন্ধু, ওর যাতে ভাল হয় আমি সেটাই চিন্তাকরি। হয়ত তাই ও আমার কথা এত শোনে। কারণ আমি ওর স্বপ্নকে গুরুত্ব দিই।
অধীরবাবু এরপর কি বললেন ঠিক গুরুত্ব দিলাম না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আজ প্রানেশের সাথে প্রথম দিনের কথাগুলো মনে পড়ছে। মাধ্যমিকের পর ওর সাথে পরিচয়। একটা প্রাণবন্ত ছেলে। এত বড়লোকঘরের একমাত্র সন্তান হলেও মনে কোনো অহংকার নেই। সবার সাথে সমান ভাবে মিশত। নিজেও হাসত, অন্যকেও হাসাতো। তবে তার সেই সুন্দর হাসিটার মধ্যে একটা চাপা মনের দুঃখ ছিল। যা আমি ধরে ফেলেছিলাম। আর তাই একদিন কচি লিভারে ছয় পেগ হুইস্কি মেরে প্রানেশ মাতাল হয়ে আমায় বলেছিল, তুমি বুঝলে কি ভাবে? আজ থেকে তুমি আমার গুরু। যে জিনিস আজও আমার বাবা বোঝেনি তা তুমি বুঝলে কিভাবে?
উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমি মানুষের মুখ দেখে মনের কথা বুঝতে পারি। ব্যাস, সেই থেকেই ওর মাথায় ভূত চাপলো যে ওকেও আমার মত এই ক্ষমতার অধিকারি হতে হবে। তার জন্য যা যা করনীয় তাই তাই ও করবে।
তবে এসবের মধ্যে প্রানেশ সেদিন মাতাল অবস্থায় আরও একটি কথা বলেছিল যা খুবই সাংঘাতিক। মায়ের মৃত্যুর কথা উঠতে ও বলেছিল, তখন অনেক ছোট ছিলাম রে, বাবার ব্যবসা সবে বড় হচ্ছিল। হাতে কাঁচা টাকা পেয়ে রোজ বাড়িতে মদের আসর বসাতো। উল্টোপাল্টা লোক আসত বাড়িতে। যারা বাবার পার্টনার ছিল। মা এসব পছন্দ করত না। তাই প্রায় রাতেই অশান্তি হত। আমি একদিন রাতে এরকম ঝগড়া শুনছিলাম নিজের ঘরে শুয়ে। হঠাৎ মায়ের একটা চিৎকার শুনলাম। এর আগেও অনেকদিন মা এরকম চেঁচিয়ে উঠেছিল । আমি খুব ছোট ছিলাম তাই ভয়ে শুয়ে থাকতাম নিজের ঘরে। আর অনেক রাতে দেখতাম মা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে আমার পাশে শুয়ে পড়ত। তবে সেদিন মা আর এলো না। সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে শুনলাম মা মরে গেছে। কারণ হার্ট অ্যাটাক। তবে আমি সিওর বাবাই মাকে মেরে ফেলেছে।
আজ বাড়ি বাড়ি ফিরে এসেও মনটা ভাল লাগছে না। ভেবেছিলাম মহামায়ার জন্য কিছু কিনে আনব, সেটাও ভুলে গেলাম। প্রানেশকে একটা এস এম এস পাঠিয়ে রেখেছি। বলেছি, ঘুম থেকে উঠেই আমাকে ফোন করতে। আমি নিশ্চিত ও এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি; না হলে ফোন পেয়ে যেতাম। সন্ধ্যের দিকে একবার বেরোতে হবে। দেখি কি কেনা যায় মহামায়ার জন্য। মহমায়াকে আজ পর্যন্ত কিছুই দিতে পারলাম না। হয়ত আমার মতন মধ্যবিত্ত কিছু দেওয়ার অধিকার নিয়ে জন্মায় না। আমাদের অধিকার শুধু স্বপ্ন দেখা। অপার স্বপ্ন। যা কোনোদিনই সার্থক রূপ নেয় না। আমিও মহামায়াকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে এসেছি এতকাল। কেন জানিনা ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে আমার ভাল লাগে। মনে মনে ভাবি, যে জিনিস ওকে বাস্তবে দিতে পারিনি তা না হয় স্বপ্নেই দিলাম ওকে।
বাবার এতটা কঠোর শাসন আমার প্রাপ্য ছিল কিনা আমার জানা নেই। আমার দুই বোন। আমি বড় ছেলে, ছোট থেকেই তাই যা পেয়েছি তা বিলিয়ে দিয়ে আমার বড় ছেলে হওয়ার পজিসন রক্ষা করতে হয়েছে। বোন দুটো এমনভাবে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে যে মনে হত ওদের প্রত্যাশা পুরোনের জন্যেই ২০৬টা হাড় দিয়ে ভগবান আমায় পাঠিয়েছে মর্তে। তবে আমার বাড়িতে ছিল বাবার কঠোর শাসন। ঠিক সময় খাওয়া, ঠিক সময় ঘুম।ঠিকভাবে পড়াশুনা, সব কিছই ঠিক ঠিক ভাবে হতে হবে। নাহলেই কপালে ছিল শাস্তি। সেই শাস্তি ছিল রাতের খাবার না পাওয়া থেকে শুরু করে এক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে না যাওয়া বা খেলতে না যাওয়া। এসব শুনতে ঠুনকো মনে হলেও এক কিশোরের কাছে এসব শাস্তি কালাপানির মতন।
মাধ্যমিকের পর থেকে আমি টিউশনি করতে শুরু করি। আর তখনই বুঝতে পারি নিজের পায়ে দাঁড়াবার আসল মজা কোথায়। বাবার সাথে আমার দুরত্ব বাড়তে থাকে। এর কারণ জগৎকে আমি নিজের মতন করে বুঝতে শুরু করি। বাবার জগৎ সম্পর্কে যুক্তি ও বিবরণ আমার কাছে খেলো হতে শুরু করে। তবে এর পরেও নিজে মধ্যবিত্ত হওয়ার দরুন আমি নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে গেছি। কখনো দেশের কোথাও যেতে চাইলে প্রানেশের কাছে গিয়ে গল্প করতাম। কিছুদিনের মধ্যেই প্রানেশ সেই জায়গায় ঘুরে এসে আমায় গল্প শোনাতো আর আমি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতাম। এভাবেই ৪০ বছর-এ পা দিলাম। কখন বিয়ে হল, কখন ৫ বছর মহামায়ার সাথে কাটিয়ে দিলাম বুঝতেই পারলামনা।
তবে আমি জানি প্রানেশ কি চায়। ওর মুখটা আমি পড়তে পারি। ও উড়তে চায়। অধীরবাবুর এই চারতলা বাড়ি ওকে যেন খেতে আসে। তাই ও পালিয়ে বেড়ায়। তবে কতদিন এভাবে পালাবে ছেলেটা! এই পালানোর নাম জীবন নয়। সেটা ওকে বুঝতে হবে। আজ ও ফোন করলে ওকে সেটাই বোঝাব। আমি নিশ্চিত ও আমার কথা ফেলতে পারবে না।
হাঁটতে হাঁটতে কখন প্রানেশের বাড়ির সামনে চলে এলাম বুঝতেই পারিনি। কিন্তু ওদের বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। এখনও আমার কাছে ফোন আসেনি মানে ও ঘুমাচ্ছে। তাই এখন ভিতরে গিয়েও কোনো লাভ নেই। এরউপর বিষফোঁড়া অধীরবাবু রয়েছে বাড়িতে।
পালের চায়ের দোকানে বসে চা নিলাম একটা। সিগারেট সাথেই ছিল। মাথায় চিন্তা ঘুরছে প্রানেশ এখনও ফোন করছে না কেন? এই অধীরবাবু টাইপের মানুষগুলোকে কোনো বিশ্বাস নেই। এদের আপন বলে কেউ হয় না। এরা শুধু অর্থ বোঝে। সম্পর্কের মায়াজাল এদেরকে কোনো দিনই কাবু করতে পারে না।
বাড়ি ফিরে যাব ভাবছি এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠল।
– কি রে ফোন করতে বলেছিলি কেন?
– তোর ঘুম ভাঙল? শোন, একবার দেখা কর, কথা আছে।
– কোথায়?
– আমি দমদম মেট্রোর সামনে আসছি। ওখানে আয় তারপর দেখছি।
– ওকে।
ফোন কাটতেই আমি রওনা হলাম দমদম মেট্রোর দিকে। প্রানেশের বাড়ির সামেন ওর সাথে দেখা করা ঠিক হবে না। অধীরবাবু দেখতে পেলে অহেতুক চেঁচামেচি শুরু করতে পারে।
মেট্রো স্টেশনের পাশে প্রানেশকে দেখতে পেলাম। আজ ওকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। চোখের তলায় কালি। চুল এলোমেলো। সচারচর ছেলেটা এভাবে থাকে না। আমি সামনে গিয়ে বললাম,কি রে, নেশা কেটেছে?
– হালকা ধুমকি আছে এখনও। বল কি ব্যাপার। ডাকলি কেন?
– সব বলব, হাতে সময় আছে তোর?
– আছে।
– তাহলে দুটো এসপ্ল্যানেড টিকিট কাট।
কেন, কি বৃত্তান্ত এসব না জেনেই প্রানেশ চলে গেল টিকিট কাটতে। ও এরকমই। আমার কথার উপর কথা বলে না। ধর্মতলায় পৌঁছালাম সন্ধ্যে ৬টা নাগাদ। এখানে সব সময় অনেক লোক থাকে। তবে আমি প্রানেশকে নিয়ে ঢুকলাম লাইট হাউস বারে। তিন পেগ পর্যন্ত সামান্য কথাবার্তা হলো। চার পেগের মাথায় আমি প্রানেশকে বললাম,অহেতুক জীবনটাকে নিয়ে এভাবে খেলিনস না। এবার একটা বিয়ে করে সেটেল হয়ে যা।
প্রানেশ মুচকি হেসে বলল, আমি আর বিয়ে! কোনো মেয়েকেই পছন্দ হয় না। সবার মধ্যেই কেমন যেন হিসাব নিকাশের রুপ দেখতে পাই।
– আমি কোনো মেয়ে দেখে দিলে বিয়ে করবি?
– কথা দিতে পারছিনা গুরু। তবে হঠাৎ তুমি আমার বিয়ের পিছনে পড়লে কেন?
আমি চতুর্থ পেগটা শেষ করে জবাব দিলাম, কারন তুই হারিয়ে যাচ্ছিস। তোর এবার নোঙর ফেলার সময় হয়েছে। সবাইকেই কোনো কোনো সময় থামতে হয়। আমিও থেমেছিলাম। এবার তোর পালা।
– কিন্তু গুরু, তোমার মতো আমি আজও মুখ দেখে মানুষ বুঝি না। আমি তোমার মতো হতে চাই।
– যথেষ্ট বুঝিস তা না হলে একটু আগেই মেয়ে নিয়ে তোর দর্শন চিন্তা আসত না। আমি তোর ভাল চাই, তাই বলছি। থাম এবার।
প্রানেশের কথা জড়িয়ে আসছে। আমি জানি না আমি ঠিক করছি কি না। ছেলেটা কাল এত মদ খেয়েছে। আজ আবার ওকে এখানে নিয়ে এলাম! কিন্তু এখানে না নিয়ে এসে ওকে বোঝাতে পারতাম না যে ও বিপথে চলে যাচ্ছে। যাকে ও আমার সুপার পাওয়ার বলে মানে তা নিছকই এক কাকতালীয় ব্যাপার। আন্দাজে কথা লেগে যাওয়ার মতো। ওর আজ সেই সত্যিটা জানা দরকার। ওকে আমার বলা দরকার ওর এতদিন ধরে আমাকে ফলো করটাই ভুল হয়েছে।
রাত দশটা নাগাদ প্রানেশকে ছাড়লাম ওর বাড়ির সামনে। জানি না ওকে ঠিক মতো বোঝাতে পারলাম কি না। তবে আমার কথাগুলো শুনে ও কেমন থমকে গেছে। যাওয়ার সময় ও কেমন যেন নিরুদ্দেশে যাওয়ার মতো উদাশ হয়ে গেল। আমিও চাই এবার ও আমাকে অপছন্দ করুক, ঘেন্না করুক। তা না হলে ও এভাবেই খারাপের দিকে যেতে থাকবে। জানিনা এরপর ও কি করবে। আমার সাথে কথা বন্ধ করলে ও পুরোপুরি একা হয়ে যাবে। যতদুর জানি আমি ছাড়া ওর তেমন কোনো বন্ধুও নেই।
ধর্মতলা থেকে মহামায়ার জন্য একটা পুঁতির মালা নিয়ে এসেছিলাম। সেটি পেয়ে মহামায়া অবাক হয়ে গেল। বলল, হঠাৎ, এসব আনলে! ব্যাপার কি?
আমি উত্তরে কি বললাম মনে নেই। তবে রাতে যখন আমার বুকে ও হাত রাখল তখন বুঝলাম আমার এ পৃথিবীতে আসা সার্থক। এক মানুষের সর্বপরী এক নারীর ভালবাসা পেয়েছি— প্রানেশ তাও পায়নি আজ পর্যন্ত। হয়ত আমিই স্বার্থপর ছিলাম, হিংসুটে ছিলাম ছোটবেলা থেকে। তাই আমার অজান্তে আমি প্রানেশকে কাল্পনিক সব গল্প বলে গেছি। আমার মনের যা বিষ ছিল সেইসব নিঙড়ে দিয়েছি ওকে। আর ও সেসব নিয়ে আজ ভুগছে। না, ও ভুগছে না, ভোগাচ্ছে। অধীরবাবুকে। হয়ত এটাই আমি চেয়েছিলাম। হয়ত আমি প্রানেশের ভাল দেখতে পারি না। তা না হলে আজ আবার ওকে নিয়ে মদ খেতে যেতাম না।

: কৌশিক দে