উপন্যাস

পরকীয়া

এক
পরিচিত কারোর সাথে দেখা হলে ‘হাই’ বা ‘হ্যালো’ বলতে হয়। কথাটা শুনেই চমকে উঠল মেয়েটি। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল আমার দিকে। চিরজীবন ঠোঁটকাটা সঙ্গীতা। যা বলে মুখের উপর বলে দেয়। ভাল লাগুক, খারাপ লাগুক এ সব নিয়ে ওর মাথা ব্যথা নেই। কলেজে পড়ার সময় ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল। সম্পর্ক এগিয়েছিল প্রেমে। তবে তা বেশিদিন টেকেনি। আজ প্রায় ২০ বছর পর একটা শপিং মলে দেখা হল ওর সাথে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কথা বলব না। কিন্তু দুবার চোখা‍‌চোখি হতে ও যখন কথা বলল না তখন আমারও জেদ চেপে বসল ওর সাথে আজ কথা বলার জন্য। যাইহোক, আমার কথাটা শুনে সঙ্গীতা বলল,আপনি আমার পরিচিত সেটা কে বলল?

আমি অবাক হয়ে বললাম, সে কি! ৮মাস চুটিয়ে প্রেম করলাম, শাহরুখ খানের ‘ দিল সে’ সিনেমার ফাস্ট ডে ফাস্ট শো’য়ের টিকিট কাটতে গিয়ে পিঠে বাঁশের বাড়ি খেয়েছিলাম, যার ব্যথা আজও টের পাই, আর তুমি বলছ আমায় চেনো না?

– না চিনি না। চিরজীবন তুমি নিজের ইচ্ছাকে অন্যের উপর চাপিয়ে এসেছ। শাহরুখ,র বই দেখতে যাওয়ার হুজুক তুমি তুলেছিলে সেটা কি মনে আছে!

– আরে বাবা ঠিক আছে ঠিক আছে। হ্যাঁ, আমিই বলেছিলাম, আমার দোষে আমিই বাঁশের বাড়ি খেয়েছি। এবার খুশি তো? বলতো এবার কেমন আছো? কতদিন পর দেখা।

– দেখো নিখিলেশ তোমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারবো না, এই মলে আমার স্বামী কাজ করে। ফ্লোর ম্যানেজার। ও দেখতে পেলে ব্যাপারটা বাজে হবে।

– কিছুই বাজে হবে না, বল‍‌বে এক পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল।

– বাঃ, সবাই তো বোকা তাই না। ওকে বলবো আর ও বিশ্বাস করে যাবে। আর ও তোমায় চেনে। বিয়ের আগে আমি তোমার ফটো দেখিয়ে বলেছিলাম যে এই ছেলেটার সাথে আমার কিছুদিন সম্পর্ক ছিল।

– শুনে কি বললো?

– তা জেনে লাভ নেই তোমার। আমি আসলাম।

বলেই গড গড করে হেঁটে ভিড়ে মিশে গেল সঙ্গীতা। আমি নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলাম বোকারমতো। তবে অনেক পুরোনো স্মৃতি চোখের সামনে ফুটে উঠল। সেই সঙ্গীতা যাকে আমি প্রথম ভালবেসেছিলাম তবে হয়ত সেটা ছিল হঠাৎ ভাললাগা। যদিও সেটি ঠিক কি ছিল তা আজও জানি না। যা ছিল, যতটুকু ছিল বেশ ভালো ছিল। সেই ৮ মাস আমি আমার সামর্থমতো ওকে আনন্দ দিতে চেয়েছিলাম। ঠোঁটকাটা, প্রাণোচ্ছ্বল সেই সঙ্গীতা আজ বয়সের ভারে গৃহিনীর রূপ নিয়েছে। মুখের চামড়ায় সামান্য ভাঁজ এসেছে। কোমড় ফুলেছে। আজ ও শাড়ী পরতে পারে। তবে এসবের মধ্যেও যেটা হারায়নি তা হলো সঙ্গীতার চোখের চাউনি। মেয়েদের পৃথিবীতে পাঠানোর আগে ঈশ্বর হয়ত তাদের একটা চাউনির ক্লাস দিয়ে পাঠায়। এদের দেখতে যেমনই হোক এরা একটা চোখের ইশারায় পুরো মহাভারত বলে দিতে পারে।

আজ রবিবার, কাজকর্ম বিশেষ নেই। ভেবেছিলাম বাড়ির পাশের এই শপিংমলে এসে কিছুক্ষণ মানুষ দেখবো। যার দেখা পেলাম—যথেষ্ট। এবার বাড়ি ফিরে স্নান করে খেয়েদেয়ে একটা ঘুম দিতে হবে। বিকেলে একটা নেমতন্ন আছে। জন্মদিনের। অফিসের বড়বাবুর ছেলের জন্মদিন। এদিকে মহামায়া বাড়িতে নেই। হলদিয়াতে গেছে বাবার বাড়িতে। সঙ্গীতার সাথে আরও কিছুসময় কথা হলে ভালো হতো। যাইহোক, কোথায় যেন পড়ে ছিলাম জানা বা অজানা মানুষের সাথে জীবনে মোট ৪ বার দেখা হয়ে যায়। এটাই নাকি প্রকৃতির নিয়ম।

আমার অফিসের বড়বাবু অলোকবাবু মানুষটা একদম মাটির মানুষ। জীবনে তিনি শুধু কাজ করার জন্যই হয়ত এসেছেন। তবে সব কাজ একসাথে করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ভড়কে যান। তখন আমার কাছে ছুটে আসেন। মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়া পিতার মতন গলা কাঁপিয়ে বলেন, ভাই নিখিলেশ, বড় মুশকিল হয়ে গেছে। এমাসের স্যালারি এক্সেলটা কম্পিউটারে সেভ করে রেখেছিলাম। কি করতে গিয়ে ডিলিট মেরে ফেলেছি। তুমি দেখো না ভাই কিভাবে সেটা রিকভারি করা যায়।

আমি তখন নিজের কাজ রেখে রিকভারি নিয়ে মেতে উঠি। সেই অলোকবাবুর আজ একমাত্র পুত্রের জন্মদিন। পুত্রের বয়স ১০। আমার যেতে বলা হয়েছিল সন্ধে ৬টায়। আমি ৭টায় পৌঁছলাম। অলোকবাবু বাড়ি হাবরায়। আর বনগা লাইনের ট্রেন—যাক সে কথা। আমি পৌঁছাতেই দেখি অলোকবাবুর বাড়ি টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে। ভিতর থেকে বেশ হইহই শব্দ আসছে। মনে হয় বেশ কিছু মানুষকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। অলোকবাবু তার দুতলা বাড়ির একতলার একটা ঘরে বসে ছিলেন। পুরো বাড়িতে বেলুন আর বেলুন। অলোকবাবু আমায় ঢুকতে দেখেই বিরক্তির সুরে বলে উঠলেন, এত দেরি নিখিলেশ! আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

আমি অবাক হয়ে বললাম, আমরা জন্য মানে?

– আরে আগে বসো। একটু কফি খাও তারপর বলছি।

আমি বসলাম, সঙ্গে সঙ্গেই কাজের মেয়ে কফি দিয়ে গেল। তার নাম মিনতি। আমি তাকে চিনি। এর আগে যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম মিনতি আমার খাসির মাংস করে খাইয়েছিল। সেদিন অলোকবাবুর বাড়িতে কেউ ছিল না। যত তৃপ্তিকরে আমি খেয়েছিলাম তার থেকেও অনেক তৃপ্তি নিয়ে মিনতি রান্না করেছিল—যা আমি লক্ষ্য করেছিলাম। আমি অলোকবাবুকে প্রশ্ন করেছিলাম, দাদা, এরকম ফাঁকা বাড়িতে এত সুন্দর কাজের মেয়ের কাছে বৌদি আপনাকে একা রেখে চলে গেছে?

উত্তরে অলোকেশবাবু যুদ্ধে জিতে যাওয়া একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলেছিলেন, সব কিছুই ম্যানেজ করতে হয় ভাই।

আমি আজও সেই মুচকি হাসির প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাইনি। তবে মিনতিকে পেলাম। আগে যেমন দেখেছিলাম তার থেকেও সুন্দর লাগছে আজ তাকে। সাদার উপর লাল সুতোর কাজ করা একটা শাড়ি পরেছে। গা‍‌য়ে কি যেন একটা সেন্ট দিয়েছে। চোখে কাজল। না বোধহয় আয়লানার। তবে আগের মতই ছটফটে মিনতি। সবসময় কাজ করছে। অলোকবাবুর মতো। কাজের মেয়ে যদি সুন্দরী হয় তাহলে শুনেছি মালিকরা মাঝে মাঝেই তাদের মাইনে বা‍‌ড়িয়ে দেয়। অলোকবাবুর ক্ষেত্রে এরকম কিছু হয় কিনা জেনে ‍‌নিতে হবে কোনো এক সময়।

আমি যেখানে বসলাম সেখানে একটা সোফা জুড়ে একজন বসে আছে। আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কফি খেতে খেতে অলোকবাবুকে বললাম,ব্যাপারটা কি দাদা?

অলোকবাবু আবার মুচকি হেসে বলল, তুমি আসার আগে আমি অবিনাশকে তোমার কবিতাগুলো পড়ে শোনাচ্ছিলাম। তোমার কবিতা শুনে মুগ্ধ। তাই তোমার সঙ্গে দেখাকরার জন্য অপেক্ষা করছিল।

কথা শেষ হতে না হতেই সেই অবিনাশ বলে উঠল, নিখিলেশবাবু আপনি যে এতটা ভাল লেখেন জানা ছিল না।

আমি লজ্জার স্বরে বললাম, ধন্যবাদ, আপিনও লেখেন নাকি?

– আজ্ঞে না, তবে আমি পড়ি। আমার কবিতা পড়তে ভাল লাগে। আমার বাড়িতে প্রতি মাসের শেষ রবিবার একটা কবিতার আসর বসে। আমি যেখানে আপনাকে আমন্ত্রণ করতে চাই।

আমি বললাম,আপনার বাড়ি কোথায়?

– দমদম, আপনার বাড়ি কোথায় সেটা আমি জেনেছি অলোকবাবুর কাছ থেকে। আমার বাড়ি আপনার বাড়ি থেকে বেশি দুর না। আমি ঠিকানা লিখে দিচ্ছি।

আমি ঠিকানা নিলাম। রাত করে খাওয়াদাওয়া হলো। বাড়ি ফেরার সময় ট্রেনে বসে বর্তমান কালের কবিতা নিয়ে অবিনাশ অনেক তথ্যমূলক কথাবার্তা বলল, যা শুনে মনে হলো মানুষটা ভালাই পড়াশুনা করে কবিতা নিয়ে। অবিনাশের বয়স ৪০ মতো হবে। সুঠাম চেহারা। দেখলে ভক্তি এসে যায়। মনে হয় সবসময় শার্ট প্যান্ট পরতে অভ্যস্ত। যে মানুষ যে পোশাক পরতে অভ্যস্ত তাকে সেই পোশাকে দেখলেই বোঝা যায়। অবিনাশের পাঠ চুকিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মানুষটা বেশ বকতে পারে। সেই হাবরা থেকে দমদম একনাগাড়ে কথা বলে গেল। তবে এসবের মধ্যে যেটা অন্যরকম ঘটনা সেটা হল অবিনাশকে দেখার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে ওকে কোথাও দেখেছি। কিন্তু কোথায় সেটাই মনে করতে পারছি না।

দুই

আজ মাসের শেষ রবিবার। আমি অবিনাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সন্ধ্যে ৫টায় টাইম। আমি যথাসময়ে পৌঁছলাম। একতলা বাড়ি। সামনে সামান্য জায়গায় একটি বাগান। আমি বেল টিপলাম। দরজা খুলল অবিনাশ। আমায় দেখে বলল, বাঃ, একদম টাইমে এসে গেছেন। বেশ ভালো। আসুন, বসুন।

আমি একটি চেয়ারে বসে বললাম, এখনও কেউ আসেনি?

– না আসেনি। আসলে আজ কেউ আসবে না। যারা আসার ছিল সবার কিছু না কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। চা খাবেন?

– হ্যাঁ, দিন।

– আমার বউ বাইরে গেছে। আপনি বসুন আমি চা বানিয়ে আনছি। তারপর জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে। আপনার আজ কোথাও কাজ নেই তো?

– না তা নেই। এখানে সিগারেট খাওয়া যাবে তো?

– বিলক্ষণ, মনের সুখে খান। আমি চা নিয়ে আসছি।

অবিনাশ চলে গেল চা বানাতে। আ‍‌মি ঘরটা দেখছি আর অবাক হচ্ছি। ঘরের প্রতিটা আসবাবপত্র নিপুন ভাবে সাজানো। কোথাও এতটুকু ময়লা নেই। মার্বেলের মেঝে চকচক করছে। আমি যে ঘরে বসে আছি সেটা বসার ঘর। আর কটা ঘর আছে কে জানে!

ভাবতে ভাবতেই কলিং বেল বেজে উঠল। অবিনাশ রান্নাঘর থেকে বলল, নিখিলেশ দরজাটা খুলে দাও। মনে হয় তোমার বৌদি এসেছে।

হঠাৎ ‘আপনি’ থেকে কেউ ‘তুমি’তে চলে এলে আমার হিসাব অনুযায়ী সেই মানুষটা খুব সরল ও ভাল স্বভাবের হয়। আমি দরজা খুললাম। আর দরজা খুলে যাকে দেখলাম তাতে আমার পিলে চমকে গেল। মেরুন রঙের শাড়ি পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গীতা। সেও আমার দেখে চমকে ওঠে। সামান্য ভুরু কুঁচকায়। ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, দরজাটা বন্ধ করে দাও।

আমি দরজা বন্ধ করলাম। বুঝত পারছি না অবিনাশের কাছে কি করবো। সঙ্গীতাকে চিনি সেই পরিচয় দেব নাকি অচেনা হয়েই থাকব। হয়ত সঙ্গীতাও তাই ভাবছে। সঙ্গীতা সোজা অন্য ঘরে চলে গেল। আর অবিনাশ চা নিয়ে ঢুকল। হাসতে হাসতে বলল, কি নিখিলেশ, পরিচয় হল আমার বউয়ের সাথে? আমি গোবেচারার মতো বললাম, হ্যাঁ, তবে উনি মনে হয় ক্লান্ত তাই অন্য ঘরে চলে গেলেন।

– আরে না না, এক্ষুনি চলে আসবে। আমাদের আড্ডায় সেও থাকবে। তুমি চা খাও।

চা শেষ হওয়ার পর সঙ্গীতা এসে বসল আমাদের সামনে। সে একেবারেই স্বাভাবিক। মনে হয় সে অচেনা হয়ে থাকার অভিনয় করতে চাইছে। আমিও অভিনয় চালিয়ে যাই। অবিনাশ বলল, নিখিলেশ তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। আমার স্ত্রী সঙ্গীতা। আর ইনি হলেন নিখিলেশ।

আমি বললাম, নমস্কার।

সঙ্গীতা দুহাত জোড় করে বলল, নমস্কার।আপনি কি লেখেন? কবিতা না গল্প।

অবিনাশ বলে ওঠে, সঙ্গীতা নিখিলেশ কবিতা লেখে।দারুন লেখা, আমি তো অলোকবাবুর বাড়িতে পড়লাম। ফেসবুক থেকে বের করে আমার সামনে প্রায় ১০টা কবিতা পড়ল সেদিন অলোকবাবু। উফ্‌ কি লেখা।

সঙ্গীতা বললো, তাহলে আপনার একটি বই দিয়ে যাবেন। পড়ে দেখব।

আমি বললাম, আমার তো কোনো কবিতার বই নেই।

সঙ্গীতা অবাক হয়ে বললো, সে কি এত সুন্দর লেখেন তাও বই নেই। অদ্ভুদ, তাহলে আমিও অন্যদের মতো ফেসবুক থেকেই পড়ব।

আমি বললাম, আপনাকে ফেসবুক থেকে পড়তে হবে না। আমার কাছে বেশ কিছু কবিতার কপি আছে প্রিন্টআউট করা , সেগুলো দিয়ে যাবো।

অবিনাশ বললো, হ্যাঁ সেই ভালো। আমার আবার হাতে কাগজ না থাকলে পড়ে মজা আসেনা।

এই ঘটনার পর তিনদিন কেটে গেছে। আমি অফি‍‌সে বসে আছি, বিকেল ৪টে বাজে। হাতের কাজ প্রায় শেষ, এই তিনদিন ধরে মাথায় একটা চিন্তা ঘুরছে সেটা হল এরকম—

দিনরাত শুধু সঙ্গীতার কথা মনে পড়ছে। অথচ আমি বুঝতে পারছি যে আমি ওকে প্রেম করি না। অবৈধ সম্পর্ক অনেক দূরের ব্যাপার। আমার সেই মানসিকতা নেই। আর সঙ্গীতাও সেরকম মেয়ে না। তবে কেন? মনে হয় পুরোনো স্মৃ‍‌তি। এই মানুষের মাথায় যে স্মৃতির চেম্বার আছে সেটা কখনও সাট ডাউন হয় না। কথায় আছে, মৃত্যুর পরেও নাকি মানুষের ম‍‌স্তিষ্ক স্মৃতিচারণ করতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তবে নিজেকে নিয়ে বিশ্লেষণ করতে ভাল লাগছে। এরকম বিশ্লেষণ চালিয়ে যেতে পারলে ভাল হত কিন্তু ফোন বেজে উঠল। দেখলাম আননোন নাম্বার।

-হ্যালো।

-হ্যালো নিখিলেশ?

-হ্যাঁ, আপনি?

-আমি সঙ্গীতা।

-সেকি, তুমি আমার নম্বর কিভাবে পেলে?

-সেসব পরে বলব। তবে আমি তোমার সাথে আজকেই দেখা করতে চাই। একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।

-সর্বনাশ, ‍কি হলো আবার?

-দেখা হলে বলবো, তুমি আজ সন্ধ্যে ৬টার সময় সিটি সেন্টারে চলে এসো

তিন

আমি সিটি সেন্টারে দাঁড়িয়ে আছি। ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ৬টা। সঙ্গীতা কই? আমি লক্ষ্য করেছি প্রত্যেক ‍‌সিটি সেন্টারের সামনে একটা বিশাল বড় জায়গা থাকে। যেখানে যুগল’রা এসে বসে। কর্তৃপক্ষ মনেহয় জেনেশুনেই এরকম একটা ফাঁকা জায়গা বানিয়ে রাখে। আমার সামনেও এরকম একটা ফাঁকা জায়গা। যেখানে অসংখ্য যুগল বসে আছে। এদের মধ্যে কেউ প্রেমিক-প্রেমিকা, কেউ বন্ধু-বান্ধবী যেখানে বন্ধুটি মনেপ্রানে চেষ্টা চালাচ্ছে তার বান্ধবীর হৃদয়ে নিজের পদ্ম ফোটাবার জন্য। আর আছে কিছু অবৈধ সম্পর্ক। তবে আমার মতে, অবৈধ সম্পর্কের যুগলরা এরকম ফাঁকা জায়গায় বসে না। ব্যাপারটা রিস্কি। তাদের বেশিরভাগ কাজই লুকিয়ে করতে হয়। তাদের জন্য পারফেক্ট জায়গা সাইন্সসিটি। সঙ্গীতা কই?

সঙ্গীতা এল ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ। এই মেয়েটি সিল্কের শাড়ি খুব পছন্দ করে। আজ হালকা হলুদ শাড়ি পরে এসেছে। তার উপর আবার জরির কাজ। তবে তার মুখ ভার। মনে হচ্ছে মুখের মধ্যে আস্ত একটা ঝড় নিয়ে এসেছে। আমার সামনে এসে কঠিন মুখ নিয়ে বললো—এখা‍‌নে দাঁড়ানো ঠিক হ‍‌বে না। চলো ভিতরে গিয়ে বসি কো‍নো রেস্টুরেন্টে।

– আচ্ছা চলো।

– তবে আমরা আলাদা আলাদা হাঁটব। এমন ভাব করবে তুমি আমার চেনই না।

– এই সেরেছে। আলাদা হাঁটলে বুঝব কিভাবে যে কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকতে হবে?

– উফ্‌ আমি সামনে হাঁটবো তুমি আমায় ফলো করো।

সঙ্গীতা সামনে হেঁটে চলেছে। আমি ফলো করছি। বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছে। পরিচিত একজনকে অপরিচিতের ভান করে তাকে ফলো করছি। হয়ত এই মলে এমন অনেক যুগল ঘুরছে। যুবতী যুবককে ফোনে জানিয়েছে, শোনো মনে হয় আমার স্বামী আমার পিছনে স্পাই লাগিয়েছে। তাই আজ দেখা হবার পর তুমি আমায় না চেনার ভান করে আমার পিছু পিছু হাঁটবে। তারপর আমি টুক করে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ব। তুমিও চলে এসো।

সঙ্গীতা একটা চাইনিজ রেস্টেুরেন্টে ঢুকলো। আমিও পিছু পিছু ঢুকলাম। চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আমার বেশ ভাল লাগে। এখানে আলো খুব কম থাকে। প্রতিটি টেবিলে ডিম লাইট। যেখানে শুধু দুটি মানুষ দুজনকে দেখতে পারে। চাইনিজ রেস্টুরেন্ট লুকিয়ে দেখা করার আদর্শ জায়গা।

সঙ্গীতা একদম কোনোর দিকে একটা টেবিলে গিয়ে বসল। আমি সেই টেবিলের সামনে গিয়ে ইতঃস্তত দাঁড়িয়ে রইলাম। কি করবো বুঝতে পারছি না। সঙ্গীতা বলল, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ব‍‌সো।

আমি বসতে বসতে বললাম, কেসটা কি? এত জরুরী তলব!

– তোমার এই কাব্যিক কথা রাখো। গা জ্বলে যায় শুনলে, আমার এদিকে সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।

– আরে বাবা সেটাই তো শুনতে চাইছি। আমার ফোন নম্বর পেলে কোথা থেকে?

– সব বলছি আগে দুটো সুপের অর্ডার দাও।

আমি সুপের অর্ডার দিলাম। সঙ্গীতা বললো, তুমি সেদিন চলে যাওয়ার পর অবিনাস আমায় বললো, সঙ্গীতা আমি বেশ কিছুদিন ধরেই একটা গল্প লিখব ভাবছি, Story-টা তোমায় বলছি। তুমি শুনে বলো কেমন হয়েছে। গল্পটা হলো,

একটি ছেলে আর একটি মেয়ে, কলেজে তাদের প্রেম হয়। একবছর চুটিয়ে প্রেম করার পর কিছু একটা কারনে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর প্রায় বছর ২০পর তাদের আবার দেখা হয়। দুজনেই তখন বিবাহিত। কিন্তু তাদের পুরোনো প্রেম জেগে ওঠে।

এতটা শোনার পর আমি বললাম , সেরেছে এতো আমাদের ঘটনা।

– তাহলে আর বলছি কি? আমার মনে হয় ওর মনে আমাদের নিয়ে সন্দেহ হয়েছে। আমি তিন দিন ধরে তোমার ফোন নম্বর নেওয়ার জন্য ওর ফোন ঘাঁটার অপেক্ষায় ছিলাম। আজ সকালে ও যখন বাথরুমে ছিল আমি তোমার নম্বরটা ওর ফোন থেকে নিয়ে তোমায় পরে ফোন করলাম। তবে এখানেই শেষ নয় নিখিলেশ। আরও আছে। গল্পটা ও আমায় পুরো বলেনি। আমি যখন বললাম, এটা তো অর্ধেক গল্প। তখন ও বললো, আমি ভাবছি নিখিলকে ডাকবো একবার এই গল্পের শেষটা কি হওয়া উচিত সেটা ও বলুক। কবি মানুষ, একটা ভাল এন্ডিং বলে দিতে পারবে। অবিনাশ তোমায় এই রবিবার আমাদের বাড়িতে আসার জন্য ফোন করবে। সেখানে গল্পটা বলবে। আর Ending জানতে চাইবে।

সুপ এসে গেছে। আমি সুপ খাচ্ছি। সঙ্গীতা যা দেখে তেলে বেগুনে রেগে বললো, আমার মাথায় বাজ পড়েছে আর তুমি মনের সুখে সুপ খাচ্ছ।

আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, চিন্তা কোরো না। আমায় ডাকলে আমি যাবো। আমি প্রবলেম সলভ করে দেবো। তুমি তো বলেছিলে যে বিয়ের আগে তুমি আমার ফটো দেখিয়েছিলে অবিনাশকে। তাহলে ও আমায় চিনতে পারছে না কেন?

– তোমার কি মাথা খারাপ নাকি? আমি তোমায় মিথ্যা কথা বলেছিলাম। অবিনাশ মারাত্মক রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষ। বিয়ের আগে এসব বললে হয়ত বিয়ে হয়ে যেত কিন্তু ঝামেলা হত বিয়ের পর। প্রচন্ড সন্দেহ করে আমায়।

– অবিনাশ কি করে? মানে কাজকর্ম বা পেশা।

– বিয়ের আগে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। বিয়ের পর ব্যবসা খারাপ খারাপ হতে শুরু হয়। রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে বেচে দেয় অবিনাশ। তারপর থেকে তেমন কিছুই করে না। বাবার তিনটে ফ্ল্যাট আছে। সেখান থেকে ভাড়া আসে আর বাবু সেই টাকায় সংসার চালায়। কবিতা পড়ে। এই হল তার কাজ।

– বুঝলাম, তোমার সুপ খাওগা হয়ে গেলে চলো উঠে পড়ি। আমাদের এভাবে দেখাকরা ঠিক হয়নি। যে মানুষ আমাদের নিয়ে সন্দেহ করছে সে যদি এখন এভাবে আমাদের দেখে নেয় তাহলে ব্যাপারটা খুব বাজের দিকে এগোবে।

চার

আমি এখন অবিনাশের সামনে বসে আছি। আজ রবিবার। অবিনাশ আমায় বিশেষ তলব করে ডেকে পাঠিয়েছে। আমি ওর সেই আগের বসার ঘরে বসে আছি। এর থেকে বেশি এগোনোর লাইসেন্স আমি এখনও পাইনি। অবিনাশ বসে আছে আমার মুখোমুখি। একটা সোফায়। আমার বাঁ দিকে সঙ্গীতা, অবিনাশ ইতিমধ্যে আমার গল্পটা অর্ধেক বলে ফেলেছে। তারপর আরাম করে নিজেকে সোফায় ঠে‍‌লে দিয়েছে। ওর বাঁ হাতে একটা সিগারেট, ডান হাতে চায়ের কাপ। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। পুলিশ যখন ইনটারোগেট করে ঠিক তেমন। আমি হলাম দাউদ ইব্রাহীম। আমার সব অপরাধ জেনেও এই পুলিশ আমায় মারতে পারবে না, বকতে পারবে না। সারাঘর নিস্তব্ধ। অবিনাশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে,নিখিলেশ, বলো তাহলে গল্পটার শেষ কি হওয়া উচিত?

আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, এইরকম গল্পের শেষটা আর পাঁচটা গল্পের মতো না করলেই ভাল হয়।

অবিনাশ খানিকটা বিব্রত হয়ে বলে, মানেটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।

আমি খুব শান্ত গলায় বললাম, মানেটা হলো অডিনারি ফিনিসিং না করাই উচিত। সচরাচর এসব গল্প মিলনের দিকে এগোয় না। দুবাড়ির মধ্যে ঝামেলা হয়। থানা পুলিশ থেকে কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আমার মতে, গল্পের শেষটায় একদম মোড় ঘুরিয়ে দিন।

অবিনাশ এবার উঠে বসল, কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে ওর মধ্যে সেটা আমি বুঝতে পারছি। সে যে অঙ্ক দিয়েছিল তার নতুন ফরমূলা আমি দিচ্ছি। ও সেটা নিতে পারছে না। অবিনাশ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, গল্পের শেষটা আমায় বলো নিখিলেশ। শেষটা জানা আমার খুবই জরুরী।

আমি ঠাণ্ডা বরফের মতো শান্ত হয়ে বললাম, এক কাজ করুন, গল্পের শেষটায় মেয়েটির হাসবেন্ডকে মেরে ফেলুন। মানে খুন না, আত্মহত্যা। হতাশাগ্রস্ত হয়ে সেই স্বামী নিজেকে শেষ করে দিল। আর ছেলেটিও তার বউয়ের কাছ থেকে ডিভোর্স পেয়ে গেল। তারপর ছেলেটি আর মেয়েটি একটা নতুন জীবন শুরু করলো। Happy ending.

অবিনাশ এবার গম্ভীর হয়ে গেল। আমি আড়চোখে দেখলাম সঙ্গীতা বারে বারে ঢোক গিলছে। তবে আমার বেশ ভাল লাগছে। একটি মানুষ কোন কাজ করেনা। সারাদিন বসে বসে কবিতা পড়ে। তার সুন্দরী বউ। কোনভাবে সে জানতে পারে যে তার বউয়ের এক পুরোনো প্রেমিক ছিল। সেই থেকে তার বউকে সে সন্দেহ করা শুরু করে।

সন্দেহ করা তার কাছে বেশ ভালো একপ্রকার কাজ হয়ে ওঠে। এসবের মধ্যে আমি এসে পড়ায় তার সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। কারণ কোনোভাবে সে আমায় দেখেছিল। না সঙ্গীতা ফটো দেখায়নি। সে আমার সঙ্গীতার সাথেই কলেজে ঘুরতে দেখেছিল। আর তাই তার মুখটা আমার খুব চেনা। সবার সামনে ঝামেলা অশান্তি না করে শুধু সন্দেহের বশে অবিনাশ আমায় ডেকে এনেছে। তবে আমার বেশ ভালই লাগছে। একটা ভুল অঙ্কের সঠিক উত্তর অবিনাশ খুঁজছে। ও বাক্স খুলতে চাইছে না। আমিও তাই বাক্সের বাইরেই ঘোরাঘুরি করব। যতক্ষন না অবিনাশ নিজে সেই বাক্স তুলে পালায়। এসবের মধ্যে অবিনাশ হঠাৎ হেসে উঠে বলল,বাঃ দারুন তো। গল্পের এইরকম একটা এন্ডিং আমি ভাবতেই পারিনি। সত্যি নিখিলেশ তোমার জবাব নেই।

আমি হালকা হেসে বললাম, তাহলে আর কি , এবার লিখে ফেলুন। প্রয়োজনে আমি কিছু প্রকাশকের নাম বলে দেব। তারা নতুন লেখকদের গল্প ছাপে। আর এক কাপ চা হবে?

অবিনাশ সঙ্গীতার দিকে তাকায়। সঙ্গীতা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আমি দিচ্ছি। সাথে কিছু পকোড়া ভেজে আনছি।

এখন ঘরে কেউ নেই। অবিনাশ সেই আগের দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, আসলে কি জানেন, গল্প মাথায় ‍এলেই হয় না। সেটা লেখার মতো হাত চাই। আর সেই হাত মনে হয় আপনার নেই। তারচেয়ে বরং এক কাজ করুন, গল্পটা আপনি আমায় দিন। আমি নিজের মতো করে লিখি। লেখাটা ছাপলে আমি গল্পকার হিসেবে আপনার নামও দেবো। ‍‌কি বলেন?

অবিনাশ আর একটা সিগারেট ধরালো। আমি বুঝতে পারছি যে ও বুঝে গেছে আমি ওর খেল ধরে ফেলেছি। বউ সামনে নেই; এখন মোক্ষম সময়। যা খুশি ও আমায় বলতে পারে। আমি নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছি। তবে মনে মনে আমিও প্রতিজ্ঞা নিয়েছি এই বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে আমি অবিনা‍‌শের সন্দেহ দুর করে যাবো। অবিনাশ সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললো, তুমি ঠিক বলেছ নিখিলেশ। গল্প লেখার হাত আমার নেই। আমি শুধু গল্প ভাবতেই পারি। আমার এই গল্প ভাবার রোগটা সারাতে হবে। জানি না কিভাবে সরাবো!

– আপনি কবিতার লোক। শুধু কবিতা নিয়েই ভাবুন। কিছু গল্প মাথায় এলে সেগুলো ভুল চিন্তাভেবে উড়িয়ে দেবেন। প্রয়োজনে আমায় ফোন করে বলবেন। আমি সেই গল্পের একটা মিমাংশা করে দেবো।

অবিনাশ কিছু বললো না। আমার দিকে তাকালো। আর একটা মুচকি হাসি দিল। আমি চমকে উঠলাম। এই হাসিটা আমি চিনি। একজন এরকম হাসি আমায় দিয়েছিল খাসির মাংস খেতে খেতে। আজও সেই হাসির রহস্য আমি বুঝিনি। এরকম হাসির মানে কি? এই হাসি যারা দেয় তারা কি সবাই ভালো মনের মানুষের অভিনয় করে যায়? তবে কি অলোকবাবুর মতো অবিনাশও ভদ্র মানুষের চামড়ার ভিতরে থাকা অন্য কোনো মানুষ?

কৌশিক দে

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started