নিখিলেশ এবং সাদা সূর্যমুখী
আমার স্বপ্ন দেখতে ভাললাগে। তবে আমার স্বপ্ন আর পাঁচটা মানুষের মতো নয়। কারণ আমি যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমি বুঝত পারি যে আমি স্বপ্ন দেখছি। তাই স্বপ্নের প্লট ভালো না লাগলেই সেটা আমি পরিবর্তন করে দিতে পারি। আমার এই বিশেষ ক্ষমতা আমি বুঝতে পারি যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। তখন একদিন স্বপ্ন দেখছিলাম যে আমি একটা গর্তে পড়ে যাচ্ছি। আমার ভয় করছিল। হঠাৎ অন্য একটা প্লট ভাবলাম আর সাথে সাথে স্বপ্ন চেঞ্জ হয়ে গেল।
আমি এখন স্বপ্ন দেখছি। দুধারে সূর্যমুখী ফুল। আর আমি সেই ফুলের বাগানের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি। ফুলগুলো সব সাদা-কালো। কারণ স্বপ্ন কখনও রঙীন হয় না। কেন হয় না সে বিষয়ে আমেরিকান রিসার্চ সেন্টারে একটা চিঠি পাঠাব। এই বৈজ্ঞানিকরা খুব চালাক। যখনই কোনো প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারে না তখনই সেটা অবান্তর প্রশ্ন বলে উড়িয়ে দেয়। হয়ত আমার প্রশ্নকেও উড়িয়ে দেবে।
একি আমি কাঁপছি কেন? মাটি কাঁপছে; আমার শরীর কাঁপছে। সূর্যমুখি ফুল কাঁপছে। সর্বনাশ। ভূমিকম্প। স্বপ্নে ভূমিকম্প হচ্ছে। দারুন লাগছে। কে যেন পিছন থেকে ডাকছে, অ্যাই নিখিলেশ, অ্যাই নিখিলেশ! আমি উত্তর দিচ্ছিনা। পিছনে তাকাচ্ছি না, আমি কাঁপছি। দারুন লাগছে!
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম পাশে মহামায়া বসে আছে। পালোয়ানের মতো কোমরে হাত দিয়ে বলল, কখন থেকে ডেকে যাচ্ছি কোনো সাড়া ই নেই তোমার। দু’বার ঝাঁকুনি দিলাম তারপর উঠলে।
– তুমি সাদাকালো সুর্যমুখী ফুল দেখেছ?
– কি যে বলো কিছুই বুঝি না। তুমিই তো বললে আজকে সকাল ৮টার মধ্যে ডেকে দিতে।
– ও হ্যাঁ, ঠিক। তুমি আমায় চা করে দাও। আমি চা খেয়েই বেরোব, আমার কিছু বিশেষ কাজ আছে!
মহামায়া চা বানাতে চলে গেল। আমি হাত-মুখ ধুয়ে পেন খাতা নিয়ে বসলাম আমার বিশেষ কাজগুলোর একটা লিস্ট বানাতে। আমি এদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি। একগাদা ছুটি জমা ছিল।
আমার বিশেষ কাজের লিস্ট—
প্রথম কাজ—আমার ছোট মাসির নাম ললিতা। বিয়ে হয়নি। তার মাথায় ঢুকেছে তাকে কেউ ফলো করছে। তার মতে তার পিছনে কেউ স্পাইগিরি করছে। আমাকে তিনি এই কাজের দায়িত্ব দিয়ে বলেছেন সেই স্পাইকে খুঁজে বের করত হবে ৫ দিনের মধ্যে। যদি পারি তাহলে নগদ ২০,০০০ টাকা। না পারলে, লবডঙ্কা।
দ্বিতীয় কাজ—আমাদের পাড়ায় এক ভিখারীকে বেশ কিছুদিন দেখতে পাচ্ছি না। এলাকার বেশিরভাগ জায়গায় এখনও যাওয়া হয়নি। সেই জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে হবে। ভিখারীদের নিয়ে আমার একটা রিসার্চ বুক লেখার ইচ্ছা আছে। তাই পাড়ার ভিখারীদের উপর আমার বিশেষ নজর থাকে।
তৃতীয় কাজ—বেশ কিছু দিন হলো প্রানেশের কোনো খবর নেই। না ফোন, না কিছু! একবার ওদের বাড়িতে যেতে হবে। গুরু হিসেবে আমার প্রথম কাজ শিষ্যের খবর রাখা।
আপাতত এই তিনটি কাজ মাথায় নিয়ে রাস্তায় বেরোলাম। প্রচন্ড গরম। বৈশাখ মাস। রাস্তার পিচ ফেটে গেছে। আমার ছাতা নেওয়ার অভ্যাস নেই। তাই রাস্তার ধারের ছায়াগুলোর নিচ দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ কে যেন ডাকল, নিখিলেশ না? অ্যাই নিখিলেশ!
আমি পিছনে ফিরে দেখি আমার ছোটমাসি ললিতা। একটা Honda City গাড়ির জানালা থেকে মুখ বাড়িয়ে ডাকছে। আমি না চেনার ভান করে হাঁটতে লাগলাম। আমি এরকম করি মাঝে মাঝে।
– অ্যাই নিখিলেশ, রোদের মধ্যে হেঁটে হেঁটে কোথায় যাচ্ছিস? গাড়িতে আয়।
আমি বললাম, আপনি কে? আপনাকে চিনি না গাড়িতে তিনউঠতে যাবো কেন?
– হায় হায়। শোনো ছেলের কথা। ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে মানুষ করলাম এখন বলে চেনে না। এক থাপ্পড় মারব। আয় উঠে বলছি।
এখন আমি ললিতা মাসির গাড়িতে। গাড়ি কোথায় যাচ্ছে জানি না। প্রশ্ন করার মতো অবস্থায় নেই। মাসি কট্ মট্ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। যখন-তখন কিল চড় মারতে পারে। আমি মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। মাসি গম্ভীর গলায় বললো, তোর যত বয়স বাড়ছে তত ফাজলামি বেড়ে যাচ্ছে। রাস্তায় অতগুলো লোকের সামনে আমায় না চেনার ভান করলি কেন?
আমি বললাম, আমি ওরকম করি মাসি, আমার ভাল লাগে।
– লোকগুলো কি মনে করল কে জানে, ইস্ রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কি হাল হয়েছে তোর। মনি (মহামায়া) তোর একদম খেয়াল রাখে না দেখছি।
– ওসব ছাড়ো। আমরা যাচ্ছি কোথায়?
– ধর্মতলা, তুই কোথায় যাচ্ছিলি?
– তোমার বাড়িতে। তোমার কাজটা শুরু করছি আজ থেকে।
– বাঃ, বেশ ভালো, কোনো সন্দেহের তালিকা বনিয়েছিস?
– এখনো বানাইনি, তবে বানাবো।
– আমি সিওর কেউ আমাকে ফলো করে। মাঝে মাঝেই একই লোককে আমার পিছনে ঘুরতে দেখি।
– লোকটা দেখতে কেমন?
– ঠিক মনে নেই। তবে কালো চশমা পরে।
– ও।
– নিখিলেশ?
– আজ্ঞে!
– পাঁচদিন সময়টা একটু কম হয়ে গেছে। তোকে আরও কিছু সময় দিলাম। কাজটা করে দে। আগাম হাজার দুই টাকা দিচ্ছি, রেখে দে।
– থ্যাংকস মাসি।
– থ্যাংকস বলে লাভ নেই তোর ১০,০০০ টাকা থেকে কেটে নেবো। এবার বল তোর প্ল্যান কি?
– আমার প্রথম প্ল্যান হলো তুমি আমায় সামনের মোড়টায় নামিয়ে দাও।
– সে কি রে! কেন?
– আমি তোমার গাড়ি থেকে নেমে অন্য একটা গাড়িতে উঠে তোমার পিছু করে দেখব যে কেউ তোমার পিছু করছে কি না।
– সেই ভাল, ড্রাইভার গাড়ি থামাও।
আমি গাড়ি থেকে নামতে নামতে মাসিকে বললাম, মাসি চিন্তা নেই আমি তোমার পিছনেই আছি।
দুই
সুলভ ভান্ডার নামক আমাদের পাড়ায় মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে সেই ভিখারির নাম লোছন মিঞা। তার এক মেয়ে আছে। মাঝে মাঝে লোছন মিঞা তার মেয়ের সাথে দেখা করতে যায় অশোকনগরে। কথাগুলো আমার তেমন বিশ্বাস হলো না। অনেক কষ্টে সেই মেয়ের বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করলাম পাড়ার আর এক ভিখারি রকুবউদ্দিনের কাছ থেকে। ভিখারিদের নিয়ে রিসার্চ করে আমি জানতে পেরেছি যে তাদের মধ্যে ইউনিটি মারাত্মক। সবার কাছেই একপ্রকার বায়োডাটা থাকে। তবে সেটা মুখে মুখে। লিখিতভাবে না। তাই সবার বাড়ি ঘর কোথায় বা আত্মীয় পরিজন কেউ আছে কি না তার একটা বিবরণ মোটামুটি খুঁজলেই পাওয়া যায়।
এখন বিকেল হয়ে গেছে। অশোকনগর যেতে ঘন্টা দুই লাগবে। ফিরতে রাত হবে। মহামায়াকে জানিয়ে আসলে ভাল হতো। না থাক, আজ আর যাবো না। কাল ভোরবেলায় রওনা হবো। তার চেয়ে বরং একবার প্রানেশের বাড়ি ঘুরে আসলে হয়। তারপর সন্ধ্যেবেলায় মাসির কেস’টা নিয়ে ভাবতে হবে। দু’হাজার টাকার একটাকাও খরচ করা যাবে না। মাসি যা জিনিস যখনতখন টাকা ফেরত চাইতে পারে।
প্রানেশের বাড়ি আজ খুব থমথমে লাগছে। যেন মৃত্যুপুরী। আমি লোহার গেটে টোকা মারলাম। দারোয়ান বেরিয়ে এল। বললাম, প্রানেশ আছে?
দারোয়ান বলল, না । বাবু তো সকালে বেরিয়েছে। বড়বাবু আছেন।
আজ আর অধীরবাবুর মুখোমুখি হতে ভাল লাগছিল না। কিন্তু দোতলা বাড়ির জানালা থেকে অধীরবাবু আমায় দেখতে পেয়ে ডাক দিল, নিখিলেশ ভিতরে এসো। কথা আছে।
এই মানুষটার সবসময় আমার সাথে কথা থাকে কেন কে জানে! আমি ভিতরে ঢুকে সোজা দোতলায় চলে গেলাম। এই বাড়ির প্রতিটি কোণ আমার পরিচিত। দোতলায় উঠে দেখি অধীরবাবু আমায় চোখে ঈশারা করে একটা ঘরে ঢুকে গেলেন। যা বুঝলাম উনি আমায় ওই ঘরে আসতে বললেন। আমিও সেই ঘরে ঢুকলাম। দেখি অধীরবাবু সোফায় বসে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। তামাকের গন্ধ বিশেষ করে চুরুটের তামাক আমার খুব প্রিয়। আমি ওনার মুখোমুখি বসলাম। অধীরবাবু গম্ভীর ভাবে বললেন, তা এতদিন পর এলে? শরীর ঠিক আছে তো?
আমি বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
– প্রানেশের খবর কিছু জানোনা বুঝি?
– না, ওর সাথে বেশ কিছুদিন দেখা হয় না, কথাও হয় না।
– ভালো। খুব ভালো। তুমি ওর থেকে যত দূরে থাকবে ততই ভালো ওর পক্ষে। তুমি তো নিজেরটা সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছ এবার ওরটাও গুছিয়ে নিতে দাও। যাইহোক, তোমায় জানিয়ে রাখা দরকার আমি প্রানেশের বিয়ে ঠিক করেছি। মেয়ে কোথাকার সেটা এখনই বলছি না। তবে বনেদি ঘরের মেয়ে। প্রানেশ সুখে থাকবে।
– মেয়ে বনেদি হল প্রানেশ কিভাবে সুখে থাকবে?
– সেটা তোমায় বুঝতে হবে না। সেটা আমায় ভাবতে দাও।
– আজ্ঞে। আমি কি এখন যাবো?
– যেতে পারো। তোমার কি আর কিছু বলার আছে? তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলবে।
– বলার ছিল, তবে ভাবছি আপনার মুড ঠিক আছে কি না। সেই বুঝে বলতাম।
– আমার মুড ভালো আছে। বলে ফেলো তাড়াতাড়ি।
– আপনার বাড়িতে একটা কাজের মেয়ে ছিল তাকে দেখছি না তো।
স্টুপিড ,ও কাজের মেয়ে নয়। আমার সেক্রেটারি ছিল।
– ও বুঝলাম, তাকে দেখছি না তো।
– তার সাথে তোমার কি দরকার?
– না এমনি, জাস্ট কিউরিসিটি।
– ওকে আমি বিদেয় করে দিয়েছি। দুমাস কাজ করেই বলে মাইনে বাড়ান। আমি বললাম, তুমি বিদেয় হও। যদিও যাওয়ার আগে ৫০,০০০ টাকার একটা বান্ডিল নিয়ে চম্পট হয়েছে। খেটে খাওয়া মেয়ে তাই আর পুলিশে খবর দিইনি।
– ভাল করেছেন। আমি আজ উঠি। প্রানেশ এলে আমার…
না থাক, কিছু না, আমি আসলাম।
তিন
আমি যে বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি সেটি একটা টিনের চালের। চারিপাশ বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাড়ির পাশেই একটা নারেকল গাছ। হতদরিদ্র বাড়ি। কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার কড়া নাড়ালাম। মুহুর্তে একটি মেয়ে দরজা খুলে আমার দিকে ভয় ভয় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। মেয়েটিকে ভিখারির মেয়ে বলা যাবে না। মেয়েটি শ্যামলা, রোগা , তবে মিষ্টি দেখতে। দেহের পোশাক খুব পরিষ্কার। মেয়েটি আমতা আমতা করে আমায় বললো,
– কে?
আমি বললাম, তোমার নাম বুঝি বুলবুল?
মেয়েটি ফিক করে হেসে উঠে বললো, ওমা আমার নাম বুলবুল হতে যাবে কেন? আপনি কে?
আমি বললাম, আমি নিখিলেশ। কলকাতা থেকে এসেছি। তোমার বাবার খোঁজ নিতে। লোছন মিঞা আমার বিশেষ পরিচিত।
মেয়েটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, বাবা আপনার পরিচিত? কেমন ভাবে?
আমি বললাম, সব কথা এখানেই শুনবে? বাড়িতে অতিথি আসলে চা দিতে হয়।
– আসুন ভিতরে আসুন। বাবা বাইরে গেছে। এক্ষুনি আসবে।
আমি বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখি হতদরিদ্র টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। সারা ঘরে গাদা করে রাখা ময়লা জিনিস, কোনটা কিসের উপর রয়েছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমি বসলাম ছোট্ট একটা টুলে। মেয়েটি আমায় বলল, চা খাবেন?
– চা, চিনি, দুধ সব আছে?
– হ্যাঁ আছে। বাবা শহর থেকে আসলে সব কিনে আনে।
– তাহলে এখন দিও না। লোছন মিঞা আসুক তারপর। তোমার সাথে একটু গল্প করি। তোমার নাম কি?
মেয়েটি দরজার পাশে বসল। বলল, খালিজা।
– বুলবুল হলে ভাল হতো।
মেয়েটি আবার হেসেউঠে বলল, আমার বাবার সাথে কি দরকার আপনার?
আমি বললাম, তুমি কি জানো তোমার বাবা ভিক্ষা করে?
– জানি। তবে আমার বাবা ভিখারি নয়। আপনি হয়ত পুরো ঘটনা জানেন না।
– পুরো ঘটনাটা কি?
– ঘটনাটা হলো, আমার বাবা আমার মাকে খুব ভালোবাসতো। বছর তিনেক আগে আমার মা হঠাৎ মারা যায়। তখন থেকেই বাবার মাথা খারাপ হয়ে যায়। পথে পথে ঘুরতে থাকে। আমি বি এ পাশ করে টিউশনি করি আর একটা জায়গায় পার্ট টাইম কাজ করে পেট চালাই। বাবার মাথা যখন ঠিক হয় তখন মনে পড়ে আমার কথা। তখনই আমার কাছে ছুটে আসে। কিছুদিন থাকার পরেই আবার মাথা খারাপ হয়ে যায়। তখন আমায় না জানিয়ে আবার রাস্তায় বেরিয়ে যায়।
এরমধ্যে লোছন মিঞা ঘরে ঢুকল। ময়লা কাপড়, গাল ভর্তি দাড়ি, কতদিন স্নান করেনি কে জানে। আমি বললাম, মিঞা কেমন আছো?
মিঞা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলে, কে আপনি?
আমি বললাম, সে কি! গত শীতে এতগুলো কম্বল দিলাম ক্লাব থেকে, তুমিও একটা পেলে আর এখন আমায় চিনতে পারছ না!
– ও নিতিনবাবু। মাফ করবেন মাথাটা ঠিক নেই।
– আমার নাম নিখিলেশ; নিতিন না।
– ওই এক হল; খালিজা চা বানা।
খালিজা পাশের ঘরে চা বানাতে চলে গেল। লোছন মিঞা বলে চলল, সবই ভাগ্য বুঝলেন বাবু। তিনদিনের জ্বরে বউটা মারা গেল। ফতেমাকে খুবই ভালোবাসতাম। তারপর থেকেই মাথাটা কেমন গোলমেলে হয়ে গেল। মাঝে মাঝেই ঝিলিক দেয়। একদিন দেখি আমি নৈহাটি স্টেশনে শুয়ে আছি। গায়ে ময়লা কাপড়। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলাম। এরকম ভাবেই চলে আমার। লোকে আমায় ভিখারি ভাবে নাকি পাগল ভাবে কে জানে! নিতিনবাবু আপনি বাগুইহাটি থাকেন, তাই না?
– আমার নাম নিখিলেশ। আমি দমদম থাকি।
– ওই হলো, নিতিন আর নিখিলেশ। আমার কাছে দমদম যা বাগুইহাটিও তাই। মাথায় যখন ঝিলিক ওঠে তখন কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। পৃথিবীর উপর আমি না আমার উপর পৃথিবী সেটাই বুঝতে পারি না। নিতিনবাবু আপনি কি করেন?
– আমার নাম নিখিলেশ।
– ওই হলো, আপনি কি করেন? মানে পেশা কি?
– আমি মানুষের মুখ দেখে মনের কথা বুঝে বেড়াই। আমিও একপ্রকার ভিক্ষুক লোছন মিঞা।
– কি বলেন বাবু!
– তোমার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। কোনো পাত্র দেখেছ?
– ওকে নিয়েই যত চিন্তা। কি যে করি বুঝতে পারছি না। আপনার হাতে কোনো পাত্র আছে?
– আছে। একদম ১০০% পিউর। আমি গ্যারেন্টি দিতে পারি। তবে ছেলেটা হিন্দু।
– তা হোক, দেখেন বাবু যদি মেয়েটার বিয়ে দেওয়া যায়। আপনাকে আমার বড় ভাল লেগেছে। রাতে খেয়ে যান।
– না আমার ফিরতে হবে। বুলবুল কোথায়?
– বুলবুল কে?
– আপনার মেয়ে।
ওই দেখো। সেটাও ভুলে গেছি। মাথাটা পুরো গেছে। নিজের মেয়ের নাম মনে রাখতে পারি না। বুলবুল, অ্যাই বুলবুল।
– বুলবুল মানে খালিজা চা নিয়ে ঢুকল। চা খেতে খেতে লোছন মিঞা বললো, বুলবুল তোর বিয়ে ঠিক করলাম। এটা বিয়ে; নিকাহ নয়। ছেলে হিন্দু। তোর আপত্তি নেই তো? নিখিলবাবু সব ঠিক করে দেবে।
আমি বললাম, আমার নাম নিখিলেশ!
লোছন মিঞা জবাব দিল না। খালিজাও কিছু বললো না। আমি বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় খালিজা বললো—
ভাইজান, বাবার মাথাটা গেছে। তা বলে আমি যে সে ছেলেকে বিয়ে করতে পারবো না। আপনি ভালো মানুষ। আপনাকে তাই সব খুলে বললাম, পরে এই নিয়ে ঝামেলা হোক আমি চাই না।
আমি খালিজাকে কিছু জবাব দিলাম না। শুধু হাসলাম।
বাড়ি ফিরলাম রাত ১০টায়। ঘরে ঢুকতেই মাসির ফোন।
– অ্যাই নিখিলেশ হারামজাদা, গাড়ি থেকে নেমে একদম বেপাত্তা হয়ে গেলি তো।
– না মাসি, আমি তোমার পিছনেই ছিলাম।
– আমার মাথায় কি লেখা আছে আমি পাগল? আমি তোকে পিছনে দেখতে পাইনি।
– মাসি, তুমি দেখতে পাবে না। সেটাই তো পরিক্ষা, তুমি যদি আমায় দেখতে পেতে তাহলে সেই স্পাইও আমায় দেখতে পেত। তাই আমি ছদ্মবেশে ছিলাম।
– নিখিলেশ।
– আজ্ঞে!
– তুই তো গোয়েন্দা হয়ে গেলি রে। দারুণ কাজ করেছিস। এবার বল কিছু সমাধান পেলি?
– পেয়েছি। তবে তুমি লজ্জা পাবে শুনলে।
– কিচ্ছু লজ্জা পাবো না। তাড়াতাড়ি বল। তুই জানিস আমার হাই প্রেসার। আমি উত্তেজনা নিতে পারি না।
– ওকে, তাহলে শোনো, আমি নিশ্চিত তোমায় যে ফলো করে সে তোমায় ভালোবাসে। মানুষটা বয়স্ক। এটা কোনো ছোকরার কাজ নয়। এই কাজ পরিপক্ক ব্রেনের।
মাসি খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, হারামজাদা, বজ্জাত আমার এই বয়সে কে আমায় প্রেম করবে?
– করতেই পারে মাসি। প্রেমের কোনো বয়স হয় না। ইংলন্ডে এক ব্যক্তি ৯৩ বছর বয়সে প্রেমে পড়েছিল এক মেয়ের। মেয়েটির বয়স ছিল ২২ বছর। পরে তাদের বিয়ে পর্যন্ত হয়।
– অ্যাই, আমায় জ্ঞান দিবি না। গা জ্বলে যায় জ্ঞানের কথা শুনলে। আগে বল লোকটা কে?
– লোকটা কে আমি জানি না। তবে লোকটা অন্য একটা লোক লাগিয়েছে তোমার পিছনে।
– কিন্তু কেন? আমার তো মাথায় ঢুকছে না।
– আমার মনে হয় তোমার প্রেমিক ভিতু প্রকৃতির। তাই তোমায় নিজের মনের কথা বলার আগে স্পাই লাগিয়ে তোমার পছন্দ অপছন্দের একটা তালিকা তৈরী করছে। তুমি কোন রেস্টুরেন্টে যাও, কি খাও, কি রঙের শাড়ি পরো এইসব আরকি! এসব জেনে নিয়ে একদিন দেখবে দুম করে সে নিজে তোমার কাছে উপস্থিত হবে।
– আমি হাতুড়ি দিয়ে তার মাথা ভেঙে দেব। বুড়োভাম শালা। তুই ফোন রাখ। যখনই কোনো আপডেট আসবে আমায় জানাবি। এক কাজ কর, প্রতিদিন আমায় রাতে একটা ফোন করে দিনের একটা রিপোর্ট দিবি। রাখলাম।
কুট করে লাইনটা কেটে গেল। আমি দুহাজার টাকা মহামায়াকে দিয়ে বললাম, এটা যত্ন করে রাখো। একজন রাখতে দিয়েছে আমার কাছে। যখন তখন ফেরত চাইতে পারে।
চার
– কি রে তোর খবর কি? এত রোগা হয়ে গেছিস কেন?
– আর বোলো না গুরু। কিছুই ভাল লাগে না। সারাদিন বসে বসে ভিডিও গেম খেলি। কোনো কাজও নেই। সময় কাটে না। ক্ষিদে পায় না। আচ্ছা গুরু, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
– না এগুলো পাগলের লক্ষন না। তবে বলতে পারিস তোর লাইফে একটা চেঞ্জ আসছে।
– কি চেঞ্জ কে জানে! যাইহোক, তুমি নাকি আমার বাড়িতে গেছিলে? বাবা তো তোমায় দেখলেই ক্ষেপে যায়। শুনেছ নিশ্চই আমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা চলছে।
– আমি তো শুনলাম মেয়ে দেখা হয়ে গেছে। বনেদি ঘরের মেয়ে। তুই সুখে থাকবি।
– সুখ না ছাই। বাবা বলেছে ঐ মেয়েকে বিয়ে না করলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। মেয়েটাকে আমি দেখেছি। মোটা ধুমসি। যদিও মোটা বলে আমার আপত্তি নেই। তবে ও কথায় কথায় পয়সার গরম দেখায়। বিয়ের আগেই এই অবস্থা তো বিয়ের পর কি হবে ভেবে দেখো।
– হুঁ সেটাই ভাবছি। তাহলে তুই ওই মেয়েকে বিয়ে রতে চাস না। আর সেই চিন্তায় তোর এই হাল।
– একদম গুরু। তুমি মনের কথা বোঝো এর জন্যই এত ভালোলাগে তোমায়।
– শোন, আমার নজরে একটা মেয়ে আছে। তোর জন্য পারফেক্ট। তবে তোরা চাইলে বিয়ে করতে পারিস।
– তাই নাকি। দারুন তো। নাম কি মেয়ের?
– বুলবুল।
– বুলবুল! এ কেমন নাম! কেমন যেন পাখি পাখি ভাব।
– মেয়েটা পাখির মতই সুন্দর ও পবিত্র। তবে একটা প্রবলেম আছে। মেয়েটা মুসলিম।
– সেরেছে, বাবা আমায় কুচিকুচি করে কেটে ফেলবে। মেয়ের বাবা কি খুব বড়লোক?
– তার বাবা ভিখারি। তবে তার প্রফেশন ভিক্ষা নয়। মানবিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। কখন কি করে কোনো ঠিক নেই।
– গুরু, বাবা আমায় কিমা বানিয়ে আর্সেনালে বিক্রি করে দেবে। তোমায় ভাল বন্ধু ভাবতাম, এসব কি যা-তা বলছো গুরু।
– কিচ্ছু যা-তা নয়, যা বলছি মন দিয়ে শোন। আমি মেয়েটার ফোন নম্বর নিয়ে এসেছি। তুই কথা বলবি। তবে ভুল করেও আমার নাম নিবি না। বলবি তোর একটা পার্সোনাল সেক্রেটারি লাগবে।
– আমার পি এ! সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে গুরু।
– উফ্ যা বলছি চুপচাপ শুনে যা। মেয়েটিকে তোর বাড়িতে ডাকবি যখন তোর বাবা থাকে না তখন। ভালকরে একটা ইন্টারভিউ নিবি। দরকারি সব জেনে নিবি। তারপর বলবি যে তুমি এখন যাও। সিলেক্ট হলে ডেকে নেবো। এরপর মেয়েটার সাথে আলাপ বাড়াবি নাকি থেমে থাকবি সেটা তোর ব্যাপার। পছন্দ হলে এগোবি না হলে তোর বাবার দেখা বনেদি মেয়েটাকে বিয়ে করে নিস্।
– গুরু, আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে বহুত মার খেতে চলেছি। তাও যখন তুমি বলছ দেখি একবার মেয়েটির সাথে কথা বলে।
মাসির বাড়িতে বসে আছি। প্রায় চার দিন হয়ে গেছে। মাসিকে কোনো আপডেট দিতে পারিনি। তাই মাসি আজ সকালে আমায় ডেকে পাঠিয়েছে। মনে হয় খুব গাল-মন্দ শুনতে হবে। মাসির বাড়িতে কেউ থাকে না মাসি ছাড়া। কোনো কাজের মেয়ে টেকে না। নিজে বিয়ে করেনি। তাই একতলা বাড়িতে একাই থাকে। কলকাতা ইউনির্ভারসিটিতে অধ্যাপিকা। সারাদিন পড়াশুনো নিয়েই থাকে। বিষয় ইতিহাস। যদিও এই মাসি আমার নিজের সম্পর্কের সরাসরি মাসি নয়। আমার মায়ের মেজ মামার মেয়ে। সম্পর্কে কি হয় জানি না। মা আমাকে ছোটবেলা থেকেই একে মাসি ডাকতে শিখিয়েছে। সেই থেকে আমি মাসি’ই ডাকি। ললিতা মাসি আমার প্রায় সম বৈয়সী। অর্থাৎ চল্লিশ।
মাসি দরজা খুলে আমায় বসতে বলে পাশের ঘরে চলে গেছে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। হাতে সিঙ্গাড়া আর চপ। ঠোঁটের কোনায় হাসি নিয়ে বললো—
অ্যাই হারামজাদা, খেয়েনে এগুলো তাড়াতাড়ি। অনেক কথা আছে। একনাগাড়ে বলে যাবো। মাঝখানে কথা বলবি না। মাঝখানে কথা বললে আমার কথা বলার খেই হারিয়ে যায়, কি বলছি ভুলে যাই।
আমি ‘ আচ্ছা ‘ বলে খেতে শুরু করলাম। মাসি দুলে দুলে বলতে লাগল, তুই ব্যাটা তো দারুন গোয়েন্দা। ঠিক ধরেছিলি। আসলে সত্যিই আমায় একজন প্রেম করে। আমাদের ইউনির্ভারসিটির লাইব্রেরিয়ান। বয়স আমার থেকে একটু বেশি। বেচারা দুবছর ধরে আমায় watch করছে। এত ভিতু যে বলতেই পারেনি। আমি সেদিন আমাদের টিচার রুমে বসে ছিলাম হঠাৎ করে সে দেখি আমার কাছে এসে বলল, ললিতা আমি তোমায় খুব ভালোবাসি। ভাগ্যিস টিচারস রুমে কেউ ছিল না। আমি তো লজ্জা পেয়ে গেলাম। কেন লজ্জা পেলাম কে জানে। মনে মনে ‘হ্যাঁ’ বললাম। ,ও’ হেসে চলে গেল। প্রেম করলে কি কেউ মনের কথা বুঝে যায়? কি রে? এই বজ্জাত কথা বলছিস না কেন?
– তুমিই তো বললে তোমার কথার মাঝে কথা বললে তোমার খেই হারিয়ে যায়।
– না, এবার বল। আমার কথা হয়ে গেছে।
– তাহলে তার মাথায় হাতুড়ির বাড়ি মারছ না?
– ওমা, শোনো ছেলের কথা। হাতুড়ির বাড়ি মারব কেন রে? অত ভাল মানুষ। তোর সব কিছু নিয়ে ইয়ারকি ভাল না নিখিলেশ।এরকম সেনসিটিভ জিনিস নিয়ে ইয়ারকি মারবি না।
– আচ্ছা মারবো না। তাহলে বিয়ে কবে করছো তোমরা?
– তোর কি মাথায় গোবর পোরা ! এইতো কাল জানলাম ওর মনের কথা। দাঁড়া কিছুদিন যাক আরও ভালভাবে বুঝি মানুষটাকে তারপর বিয়ের ব্যাপার। শোন তোকে আমি বাকি ৮০০০ টাকা আজ দেবো তাই ফোনকরে ডেকেছি।
– তোমায় ৮০০০ টাকা দিতে হবে না, আমি তোমায় ২০০০ টাকা ফেরত দিতে এসেছি।
– মানে?
– মানে কিছুই না। আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম টাকাটা নেবো না তোমার কাছ থেকে। তবে অন্য একটা সাহায্য চাইবো সেটা করে দিতে হবে।
– কি সাহায্য বল। আমি আজ খুব খুশি। বল কি সাহায্য করতে হবে?
– একটা খুব গরীব মেয়ে আছে। আমাকে ভাইজান বলে। নাম বুলবুল—মানে খালিজা। তার একটা কাজ জোগাড় করে দাও মাসি।
– কাজ! আমি কাজ কিভাবে জোগাড় করে দেবো?
– তুমি না পারো তোমার প্রেমিককে বলে দেখো। এতে বোঝাও যাবে সে তোমার কথাকে কতটা গুরুত্ব দেয়।
– হ্যাঁ, কথাটা ঠিক বলেছিস। তোকে যতটা বোকা ভাবি ততটা না তুই। ঠিক আছে দেখি। মেয়েটির বায়োডাটা দে।
– বায়োডাটা নেই। ফোন নম্বর দিচ্ছি। মেয়েটি বি এ পাশ। ভালো মেয়ে। আমি ১০০% দায়িত্ব নিয়ে বলছি।
– আর তোকে দায়িত্ব নিতে হবে না। দেখছি কি করা যায়। এবার তুই যা। ওর একটা ফোন আসবে এক্ষুনি। আর এই ব্যাপারটা কাউকে বলবি না। এটা আমার আর তোর মধ্যেই থাকবে।
দমদম স্টেশনে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে লোছন মিঞার সাথে দেখা হল। সেই পুরোনো ময়লা জামা, উস্কখুস্ক চুল নিয়ে সে বসে আছে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি সব বলছে। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, লোছন মিঞা আমায় চিনতে পারছ? আমি নিখিলেশ। তোমার বাড়িতে গেছিলাম।
লোছন মিঞা এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যেন মানুষ বলে প্রাণীকে সে জীবনে প্রথম দেখছে। তারপরেই আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে থাকলো। আমি বললাম, লোছন মিঞা তোমার মেয়ের জন্য যে ছেলেকে জোগাড় করেছিলাম তার তোমার মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে। তোমার মেয়েরও একটা কাজ হয়ে যাবে, আমি কথা বলে রেখেছি। পরের মাসে ওরা বিয়ে করছে। যদিও শ্বশুরবাড়িতে উঠতে পারবে না বিয়ের পর। তাতে ক্ষতি নেই, একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কি বলো? ও লোছন মিঞা !
লোছন মিঞা আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সাথে বলল, আঃ!
কেন আমার বিরক্ত করতিয়াসেন বাবু? দেখতাসেন না হামি চাঁন্দে যাইতেআসি?
আমি বুঝে গেলাম মিঞার মাথায় আবার ঝিলিক লেগেছে। ঠিক হতে সময় লাগবে। বেশ কিছুদিন। এইসব কান্ড দেখে পাশের এক ভদ্রলোক আমায় প্রশ্ন করলেন, কেসটা কি দাদা?
আমি বললাম, ঝিলিক।
পাঁচ
– নিখিলেশ কেমন আছিস?
– আমি ভালো আছি মাসি। তুমি কেমন আছো?
– আমি ভালই আছি।
– মেসো কেমন আছে?
– মেসো! মেসোটা আবার কে?
– তোমার প্রেমিক, তুমি মাসি হলে সে তো আমার মেসোই হবে।
– নুড়ো মেরে মাথা ফাটিয়ে দেবো তোর। ফাজিল, যত ভাবি তোকে কিছু বলবো না…যাইহোক শোন ওর নাম অমিত। তুই অমিতদা বলিস। লোকটা ভালো মানুষ। দেখি কতদুর এগোয় ব্যাপারটা।
– যাক্ ভালো। তোমরা ভালো থেকো। রাখি এবার।
– না না রাখবি না। আমি আসল কথা বলতেই ভুলে গেছি। আজকাল আসল কথা বলতে আমি ভুলে যাচ্ছি কেন কে জানে! এটা কি বয়স বাড়ার লক্ষণ?
– তাড়াতাড়ি আসল কথাটা বলো না হলে আবার ভুলে যাবে।
– ও হ্যাঁ, শোন তুই যে মেয়েটার কথা বলেছিলি টুলটুল না ফুলফুল অমিত ওর একটা কাজ জোগাড় করে দিয়েছে এর একটা বন্ধুর কাগজের মিলে। হাজার দশেক মাইনে।
– মাসি?
– বল।
– থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ! অমিতদা’কে আমার ভালোবাসা জানিও। রাখলাম।
আমার সামনে প্রানেশ আর বুলবুল দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দুটি প্রানীর সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। দুজনের মুখে বিয়ের উত্তেজনা। নতুন জীবন শুরু করার অপেক্ষা। প্রানেশ বললো, গুরু বাবাকে সামলে নিও। আমি জানি তুমি পারবে। মাসখানেক পর ফিরব। যদি বাবার হাত থেকে বেঁচে থাকি তাহলে দেখা হবে।
আমি বললাম, এতদুর যখন পেরেছি বাকিটাও সামলে নেবো আশাকরি।
ট্রেন ছেড়ে দিল, বুলবুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। তার দুচোখে জল। আমি বললাম, বুলবুল তুমি রাতের স্বপ্নে সাদা সূর্যমুখী দেখতে পাও তাই না?
বুলবুল আঁতকে উঠে জবাব দিল, ভাইজান আপনি কিভাবে জানলেন?
ট্রেনের গতি বেড়ে গেল। দুরের কুয়াশার ধোঁয়াশায় ধীরে ধীরে মিশে গেল ট্রেনের শেষ কামরা। আমি ভগবানকে বললাম, ওদের সুখে রেখো। এতবড় পৃথিবীতে একটা কোথাও থাকতে দিও ওদের। ওরা যেন না হেরে যায়। ওদের হারতে দিও না…

:কৌশিক দে