‘শকুন’

বিলুপ্ত প্রজাতির তকমাটা নিজের শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে ক্রমশ নেমে আসছে সে।  নামতে নামতে আড়চোখে দেখে নিল। না,আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সে একাই। মনে মনে আশ্বস্ত হলো,আজ পুরো খাবারটায় সে দখল নেবে। রেললাইনের ডানদিকের কোণ ঘেঁষে ঝোঁপে পড়ে থাকা নিথর শরীরটাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। তীক্ষ্ম আর ধারালো দৃষ্টির আকর্ষণে গন্তব্য আরো কাছাকাছি।

বিশাল ডানা দুটো শরীরের দুপাশে গুটিয়ে নিয়ে ঝোপটার একপাশে সেঁদিয়ে গেল শকুনটা। এখনও সামান্য প্রাণ আছে খাবারে। ঠোঁট দিয়ে কয়েকবার ঠোকরালেই  বেজান হয়ে যাবে শরীরটা। দু এক পা এগিয়েও সে থমকে গেল। আধমরা শরীরটার দিকে তারই মত জুলজুল করে চেয়ে আর একজন। লোভ যেন তাকেও গ্রাস করে বসে আছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষার পর সে দেখল,তার কাঁধ থেকে ঝুলছে ক্যামেরা আর ডান হাতে কাগজ কলম। 

অবাক হয়ে শকুন ভাবতে থাকে, মাইলখানেক দূর থেকেও অকুস্থলে চোখ যায় তাদের। কিন্তু মানুষের এত প্রখর দৃষ্টি? হিসেব মেলাতে পারে না। তাহলে কি কাঁধে ক্যামেরা ঝোলানো জ্যান্ত মানুষটা,আধমরা মানুষটাকে তুলে নিয়ে যাবে? খালি মুখেই তাকে ফিরতে হবে?

বিহার থেকে হেঁটে আসা এক অসহায় পরিযায়ী শ্রমিকের ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু–কাল রাতে টিভির ব্রেকিং নিউজে চোখ পড়তেই, জনৈক শকুনের অনেক আগেই কলকাতা থেকে কোডারমা স্টেশনে পৌঁছে গেছেন সাংবাদিক চয়ন রায়। এই মুহূর্তে তিনি অর্ধমৃত শ্রমিক আর তার আট দশ গজ দূরে বসে থাকা শকুনের ছবি নিতে ব্যাস্ত। জমজমাট খসড়াটা আগেই লেখা হয়েছে। শকুনের মতই কারো মৃত্যু নিয়ে যত না বেশি উদ্বিগ্ন,তার থেকে অনেক বেশি উৎসাহ খবর সংগ্রহে। শকুনের মত ঠুকরে ঠুকরে  দুর্ঘটনায় পড়ে থাকা শরীরের সংবাদ গ্রহণ করে।এইসব নিউজ সরবরাহ করে চ্যানেলের টিআরপি বাড়িয়ে, সম্মানের সঙ্গে আত্মা বেচে,কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতিই তার একমাত্র লক্ষ্য। মৃতের শরীরে কখনো প্রাণ সঞ্চার করা যায় না, কিন্তু তার সামনে জীবন পড়ে আছে।তাঁকে বাঁচতে হবে,পেশায় ভর করে। মানবিকতার কাছে হারতেই হয়।ফোনে রেলওয়ে পুলিশের আসার খবর পাওয়া মাত্রই,চয়ন রায় চ্যানেলের গাড়িতে উঠে বসলেন। 

সেই মুহূর্তে শকুনের মনে হলো,তার গ্রাস কেড়ে নিতে শ্বাপদের মত এগিয়ে আসছে দুজন মানুষ। শিকারের প্রতি  তাদেরও শ্যেন দৃষ্টি।এরাও কি তার মত সবার অলক্ষ্যে,দূর আকাশ থেকে শিকার খুঁজে বেড়ায়। ক্ষুধাকাতর শ্রান্ত শকুন ভাবতে থাকে। খাবার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে অথচ তারও যে সমান ভাগ আছে। নিজের মাটিতে যারা ভিটেহীন, তাদের দলে সেও পড়ে। এই পরিণতি তারও হতে পারে। 

একসময় মানুষের লোভের কাছে হেরে যাওয়ার গ্লানি নিয়ে, নিঃশব্দে উড়ে গেল সে। তার নিজস্ব ঠিকানায়।

ছবি সংগৃহিত

সমাজ বসু, গড়িয়া

Published by B O I K A A L

লেখার স্বত্ব সম্পূর্ণভাবে লেখকের; কারোর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে না অনুকরণ করে সে দায় বা দায়িত্বটি বইকাল ব্লগ নিতে অপারগ কেননা বিশ্বাস বস্তুটির ওপর ভর করে আমাদের পথ চলা শুরু; এটুকু আমাদের মার্জনা করা হবে আশা করি। যতিচিহ্ন সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পাদক কাজ করলেও লাইন স্পেশিং বা বানানের দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকমন্ডলীর। ধন্যবাদ...❤

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started