জীবনদর্শন সম্পর্কে আমি আজীবন খুবই উদাসীন। জীবনের দর্শন ঠিক কি হওয়া উচিত সে ব্যাপারে আমি কোনো কালেই মাথা ঘামাইনি। জীবন আমাকে যা দিয়েছে সেটাই ঈশ্বরের বিধান বলে মেনে নিয়েছি। জীবন যা নিয়ে নিয়েছে বা আমি যা হারিয়েছি তা আমার কোন কালেই ছিল না বলে মান্যতা দিয়েছি। এই চিন্তাধারায় এক অদ্ভুত শান্তি আছে। কারণ জীবনের সব দুঃখের শুরুটা হয় প্রত্যাশা থেকে। তাই আমি সবার আগে নিজের জীবনে প্রত্যাশা জিনিসটাকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। হয়ত এটাই আমার জীবন দর্শন।
আমার প্রত্যাশা নেই। লোভ তার বীজ আমার মনে ফোটাতেই পারেনি। তাই আমি মুক্ত। এই মুক্ত মনে আমি মানুষের সাথে মিশি। সহজেই মানুষের মনের কথা বুঝতে পারি। এটা আমার একরকম সুপার পাওয়ার বলা যেতে পারে। আমার মতে, প্রত্যেক মানুষ কিছু না কিছু ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কখনও সে সেটা বুঝতে পারে; কখনও পারে না।
বলা হয়, বিয়ের পরে নাকি পায়ে বেড়ি পড়ে যায়। কিন্তু আমি বিয়ের পর আরও বেশি মুক্ত। মহামায়া আমার খুবই ভালবাসে এবং সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় সে আমার বোঝে। পৃথিবীর কাছে আমার কাজকর্ম যেখানে পাগলামি, মহামায়ার কাছে তা শিশুসুলভ আচরণ। তার মতে আমি এখনও শিশু। আমার মানসিক বিকাশ ঘটেনি।
নিজের পোশাক বলতে আমি সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরেই এই ৪০ বছর কাটিয়ে দিলাম। আর কোনো পোশাক দেহে তুলতে পারলাম না। কেন জানি না। হয়ত এটিও আমার জীবন দর্শন।
আজ সকাল থেকেই এসব কথাগুলো ভাবছি। মাঝে মাঝে আমি এরকম ভাবি। ভাবতে ভাল লাগে। একটু আগেই মহামায়া চা দিয়ে গেল। আজ রবিবার। আমায় একটু বাদেই বেরুতে হবে। প্রানেশের বাবা ডেকে পাঠিয়েছে। ব্যাটা প্রানেশ আবার কিছু নতুন পাগলামি শুরু করেছে হয়ত। আমি যদি গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীর হতাম হয়ত প্রানেশই আমার প্রধান শিষ্য হত।
চট্ করে ঠিক করলাম আজ মহামায়াকে একটি উপহার দেবো। কি দেবো সেটা পরে ঠিক করা যাবে। আগে প্রানেশের বাড়ি যাওয়া যাক।
– অধীরবাবু বাড়িতে আছেন?
– হ্যাঁ, আপনি বসুন, উনি আসছেন।বলেই চাকরটা চলে গেল। আমি একটা ছোট বসার ঘরে বসলাম। সারা ঘরে একটা টেবিল আর চারটে চেয়ার। তবে এর থেকে বেশি কিছু রাখার জায়গাও নেই। বড়লোকদের বাড়িতে সবচেয়ে গুরুত্বহীন মানুষ দেখা করতে এলে তাদের এরকম ঘরে বসানো হয়। আমেরিকার একটি প্রতিবেদনে বড়লোক ও গরীবদের ঘরের বিশ্লেষণ করা আছে এবং পার্থক্য স্বরূপ বলা আছে যে গরীবদের সব ঘর প্রায় একই মাপের হয় কারণ তারা সবাইকে একই নজরে দেখে। তবে ধনীদের চোখ অন্যরকম। অর্থ দিয়ে তারা মানুষের গুরুত্ব বিচার করে। তাই প্রায় সব ধনী মানুষের বাড়িতে একটিকরে এরকম ঘর থাকে। যেখানে গুরুত্বহীন মানুষকে বসতে দেওয়া হয়। যেমন আমি।
হনহন করে অধীরবাবু (প্রানেশের বাবা) ঢুকলেন। ঘড়িতে এখন সকাল ১১টা।
– তুমি কি চাও আমি তোমায় লোক দিয়ে মার খাওয়াই?
– সেকি! আমি আবার কি করলাম ?
– প্রানেশ কি শুরু করেছে জানো?
– না।
– কাল রাত থেকে বউবাজারে একটা কোঠায় পড়ে আছে। আমি ফোন করেছিলাম। বলে, জীবনের ভাল দিক জানতে হলে সবার আগে জীবনের খারাপ দিক গুলোকে দর্শন করতে হয়। তা না হলে ভালোর গুরুত্ব বোঝা যায় না। এটাই নাকি জীবন দর্শন।
– বুঝলাম।
– বুঝলাম বললে হবে না। শোনো ছোঁড়া। প্রানেশকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। ও ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। শুধু তোমার পাল্লায় পড়ে ও উচ্ছন্নে যাচ্ছে। ওকে এখুনি ফিরিয়ে নিয়ে এসো। আর দয়া করে ওর সাথে আর মিশবে না। তাহলে ফল খুব খারাপ হবে।
– প্রথমত গণতান্ত্রিক দেশে আপনি কাউকে কারোর সাথে মিশতে বারন করতে পারেন না। আর ফল আমার কি আর খারাপ হবে? আমার তো কোনো ফল ফোটেইনি গাছে।
রাগে বিজ বিজ করতে করতে অধীরবাবু বললেন,তোমার দু’ঘন্টা সময় দিলাম। তারমধ্যে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসো ঐ নোংরা জায়গা থেকে।
এই অধীরবাবু টাইপের লোকের সাথে আমার কোনোকালেই বেশি কথা বলতে ইচ্ছা করে না। আসলে এদের আমি ঠিক রিড করতে পারি না। মানুষের প্রয়োজনের থেকে বেশি টাকা হয়ে গেলে এরকম হয়। ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে পারে না।
– আমি স্বর্গে গুরু। মেনকাকে নিয়ে আছি। মাঝে মাঝে আঙুর আর রাম, একেবারে নিট্ মারছি।
– কাল থেকে বাড়ি ফিরছিস না কেন?
– আর ফিরব না। এখানেই থাকব। কি সুন্দর জায়গা।
– পাগলামো রাখ। বাড়ি ফের। আমাকে কোথায় আসতে হবে বল। তোর সাথে নিয়ে আসবো।
– ওকে, তুমি গিরিশপার্ক মেট্রোর সামনে এসে ফোন করো। আমি তারপর বেরুবো এখান থেকে।
গিরিশপার্ক থেকে প্রানেশকে নিয়ে আসা সত্যিই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকেই মাল খেয়েছে। ঠিকমত হাঁটতেই পারছে না। একটা ট্যাক্সি নিলাম। সোজা পৌঁছালাম ওদের দমদমের বাড়িতে। প্রানেশ এখন বেহুস। চ্যাংদোলা করে ওর শোবার ঘরে রেখে আসলাম। এদিকে অধীরবাবুর চোখ লাল। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে। কি জানি কি বলে বসে।
প্রানেশকে ওর ঘরে শুইয়ে রেখে বেরোতেই অধীরবাবু বললেন,তোমার লজ্জা করে না। নিজের বন্ধুর এই খারাপ অবস্থা দেখে মনে মনে খুব খুশি হচ্ছো নিশ্চয়ই?
– জীবনের সবকিছু এভাবে হিসেব করে দেখতে যাবেন না।
হঠাৎ করে কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। অধীরবাবু বললেন,মানে? কি বলতে চাইছ?
– ছোটবেলা থেকেই প্রানেশকে নিয়ে আপনার অনেক প্ল্যান। তবে কখনই আপনি জানতে চাননি ওর কি স্বপ্ন? ও কি চায়।
– ও কি চায় না চায় সেটা আমার কাছে অবান্তর। এ বাড়িতে থাকতে হলে আমার ইচ্ছা অনুযায়ী থাকতে হবে।
– তাহলে তার ফল কি হতে পারে তা আপনার চোখের সামনেই আছে। আরও একটা কথা বলা দরকার, প্রানেশ আমার ছোটবেলার বন্ধু, ওর যাতে ভাল হয় আমি সেটাই চিন্তাকরি। হয়ত তাই ও আমার কথা এত শোনে। কারণ আমি ওর স্বপ্নকে গুরুত্ব দিই।
অধীরবাবু এরপর কি বললেন ঠিক গুরুত্ব দিলাম না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আজ প্রানেশের সাথে প্রথম দিনের কথাগুলো মনে পড়ছে। মাধ্যমিকের পর ওর সাথে পরিচয়। একটা প্রাণবন্ত ছেলে। এত বড়লোকঘরের একমাত্র সন্তান হলেও মনে কোনো অহংকার নেই। সবার সাথে সমান ভাবে মিশত। নিজেও হাসত, অন্যকেও হাসাতো। তবে তার সেই সুন্দর হাসিটার মধ্যে একটা চাপা মনের দুঃখ ছিল। যা আমি ধরে ফেলেছিলাম। আর তাই একদিন কচি লিভারে ছয় পেগ হুইস্কি মেরে প্রানেশ মাতাল হয়ে আমায় বলেছিল, তুমি বুঝলে কি ভাবে? আজ থেকে তুমি আমার গুরু। যে জিনিস আজও আমার বাবা বোঝেনি তা তুমি বুঝলে কিভাবে?
উত্তরে আমি বলেছিলাম, আমি মানুষের মুখ দেখে মনের কথা বুঝতে পারি। ব্যাস, সেই থেকেই ওর মাথায় ভূত চাপলো যে ওকেও আমার মত এই ক্ষমতার অধিকারি হতে হবে। তার জন্য যা যা করনীয় তাই তাই ও করবে।
তবে এসবের মধ্যে প্রানেশ সেদিন মাতাল অবস্থায় আরও একটি কথা বলেছিল যা খুবই সাংঘাতিক। মায়ের মৃত্যুর কথা উঠতে ও বলেছিল, তখন অনেক ছোট ছিলাম রে, বাবার ব্যবসা সবে বড় হচ্ছিল। হাতে কাঁচা টাকা পেয়ে রোজ বাড়িতে মদের আসর বসাতো। উল্টোপাল্টা লোক আসত বাড়িতে। যারা বাবার পার্টনার ছিল। মা এসব পছন্দ করত না। তাই প্রায় রাতেই অশান্তি হত। আমি একদিন রাতে এরকম ঝগড়া শুনছিলাম নিজের ঘরে শুয়ে। হঠাৎ মায়ের একটা চিৎকার শুনলাম। এর আগেও অনেকদিন মা এরকম চেঁচিয়ে উঠেছিল । আমি খুব ছোট ছিলাম তাই ভয়ে শুয়ে থাকতাম নিজের ঘরে। আর অনেক রাতে দেখতাম মা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে আমার পাশে শুয়ে পড়ত। তবে সেদিন মা আর এলো না। সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে শুনলাম মা মরে গেছে। কারণ হার্ট অ্যাটাক। তবে আমি সিওর বাবাই মাকে মেরে ফেলেছে।
আজ বাড়ি বাড়ি ফিরে এসেও মনটা ভাল লাগছে না। ভেবেছিলাম মহামায়ার জন্য কিছু কিনে আনব, সেটাও ভুলে গেলাম। প্রানেশকে একটা এস এম এস পাঠিয়ে রেখেছি। বলেছি, ঘুম থেকে উঠেই আমাকে ফোন করতে। আমি নিশ্চিত ও এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি; না হলে ফোন পেয়ে যেতাম। সন্ধ্যের দিকে একবার বেরোতে হবে। দেখি কি কেনা যায় মহামায়ার জন্য। মহমায়াকে আজ পর্যন্ত কিছুই দিতে পারলাম না। হয়ত আমার মতন মধ্যবিত্ত কিছু দেওয়ার অধিকার নিয়ে জন্মায় না। আমাদের অধিকার শুধু স্বপ্ন দেখা। অপার স্বপ্ন। যা কোনোদিনই সার্থক রূপ নেয় না। আমিও মহামায়াকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে এসেছি এতকাল। কেন জানিনা ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে আমার ভাল লাগে। মনে মনে ভাবি, যে জিনিস ওকে বাস্তবে দিতে পারিনি তা না হয় স্বপ্নেই দিলাম ওকে।
বাবার এতটা কঠোর শাসন আমার প্রাপ্য ছিল কিনা আমার জানা নেই। আমার দুই বোন। আমি বড় ছেলে, ছোট থেকেই তাই যা পেয়েছি তা বিলিয়ে দিয়ে আমার বড় ছেলে হওয়ার পজিসন রক্ষা করতে হয়েছে। বোন দুটো এমনভাবে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে যে মনে হত ওদের প্রত্যাশা পুরোনের জন্যেই ২০৬টা হাড় দিয়ে ভগবান আমায় পাঠিয়েছে মর্তে। তবে আমার বাড়িতে ছিল বাবার কঠোর শাসন। ঠিক সময় খাওয়া, ঠিক সময় ঘুম।ঠিকভাবে পড়াশুনা, সব কিছই ঠিক ঠিক ভাবে হতে হবে। নাহলেই কপালে ছিল শাস্তি। সেই শাস্তি ছিল রাতের খাবার না পাওয়া থেকে শুরু করে এক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে না যাওয়া বা খেলতে না যাওয়া। এসব শুনতে ঠুনকো মনে হলেও এক কিশোরের কাছে এসব শাস্তি কালাপানির মতন।
মাধ্যমিকের পর থেকে আমি টিউশনি করতে শুরু করি। আর তখনই বুঝতে পারি নিজের পায়ে দাঁড়াবার আসল মজা কোথায়। বাবার সাথে আমার দুরত্ব বাড়তে থাকে। এর কারণ জগৎকে আমি নিজের মতন করে বুঝতে শুরু করি। বাবার জগৎ সম্পর্কে যুক্তি ও বিবরণ আমার কাছে খেলো হতে শুরু করে। তবে এর পরেও নিজে মধ্যবিত্ত হওয়ার দরুন আমি নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে গেছি। কখনো দেশের কোথাও যেতে চাইলে প্রানেশের কাছে গিয়ে গল্প করতাম। কিছুদিনের মধ্যেই প্রানেশ সেই জায়গায় ঘুরে এসে আমায় গল্প শোনাতো আর আমি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতাম। এভাবেই ৪০ বছর-এ পা দিলাম। কখন বিয়ে হল, কখন ৫ বছর মহামায়ার সাথে কাটিয়ে দিলাম বুঝতেই পারলামনা।
তবে আমি জানি প্রানেশ কি চায়। ওর মুখটা আমি পড়তে পারি। ও উড়তে চায়। অধীরবাবুর এই চারতলা বাড়ি ওকে যেন খেতে আসে। তাই ও পালিয়ে বেড়ায়। তবে কতদিন এভাবে পালাবে ছেলেটা! এই পালানোর নাম জীবন নয়। সেটা ওকে বুঝতে হবে। আজ ও ফোন করলে ওকে সেটাই বোঝাব। আমি নিশ্চিত ও আমার কথা ফেলতে পারবে না।
হাঁটতে হাঁটতে কখন প্রানেশের বাড়ির সামনে চলে এলাম বুঝতেই পারিনি। কিন্তু ওদের বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। এখনও আমার কাছে ফোন আসেনি মানে ও ঘুমাচ্ছে। তাই এখন ভিতরে গিয়েও কোনো লাভ নেই। এরউপর বিষফোঁড়া অধীরবাবু রয়েছে বাড়িতে।
পালের চায়ের দোকানে বসে চা নিলাম একটা। সিগারেট সাথেই ছিল। মাথায় চিন্তা ঘুরছে প্রানেশ এখনও ফোন করছে না কেন? এই অধীরবাবু টাইপের মানুষগুলোকে কোনো বিশ্বাস নেই। এদের আপন বলে কেউ হয় না। এরা শুধু অর্থ বোঝে। সম্পর্কের মায়াজাল এদেরকে কোনো দিনই কাবু করতে পারে না।
বাড়ি ফিরে যাব ভাবছি এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠল।
– কি রে ফোন করতে বলেছিলি কেন?
– তোর ঘুম ভাঙল? শোন, একবার দেখা কর, কথা আছে।
– কোথায়?
– আমি দমদম মেট্রোর সামনে আসছি। ওখানে আয় তারপর দেখছি।
– ওকে।
ফোন কাটতেই আমি রওনা হলাম দমদম মেট্রোর দিকে। প্রানেশের বাড়ির সামেন ওর সাথে দেখা করা ঠিক হবে না। অধীরবাবু দেখতে পেলে অহেতুক চেঁচামেচি শুরু করতে পারে।
মেট্রো স্টেশনের পাশে প্রানেশকে দেখতে পেলাম। আজ ওকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। চোখের তলায় কালি। চুল এলোমেলো। সচারচর ছেলেটা এভাবে থাকে না। আমি সামনে গিয়ে বললাম,কি রে, নেশা কেটেছে?
– হালকা ধুমকি আছে এখনও। বল কি ব্যাপার। ডাকলি কেন?
– সব বলব, হাতে সময় আছে তোর?
– আছে।
– তাহলে দুটো এসপ্ল্যানেড টিকিট কাট।
কেন, কি বৃত্তান্ত এসব না জেনেই প্রানেশ চলে গেল টিকিট কাটতে। ও এরকমই। আমার কথার উপর কথা বলে না। ধর্মতলায় পৌঁছালাম সন্ধ্যে ৬টা নাগাদ। এখানে সব সময় অনেক লোক থাকে। তবে আমি প্রানেশকে নিয়ে ঢুকলাম লাইট হাউস বারে। তিন পেগ পর্যন্ত সামান্য কথাবার্তা হলো। চার পেগের মাথায় আমি প্রানেশকে বললাম,অহেতুক জীবনটাকে নিয়ে এভাবে খেলিনস না। এবার একটা বিয়ে করে সেটেল হয়ে যা।
প্রানেশ মুচকি হেসে বলল, আমি আর বিয়ে! কোনো মেয়েকেই পছন্দ হয় না। সবার মধ্যেই কেমন যেন হিসাব নিকাশের রুপ দেখতে পাই।
– আমি কোনো মেয়ে দেখে দিলে বিয়ে করবি?
– কথা দিতে পারছিনা গুরু। তবে হঠাৎ তুমি আমার বিয়ের পিছনে পড়লে কেন?
আমি চতুর্থ পেগটা শেষ করে জবাব দিলাম, কারন তুই হারিয়ে যাচ্ছিস। তোর এবার নোঙর ফেলার সময় হয়েছে। সবাইকেই কোনো কোনো সময় থামতে হয়। আমিও থেমেছিলাম। এবার তোর পালা।
– কিন্তু গুরু, তোমার মতো আমি আজও মুখ দেখে মানুষ বুঝি না। আমি তোমার মতো হতে চাই।
– যথেষ্ট বুঝিস তা না হলে একটু আগেই মেয়ে নিয়ে তোর দর্শন চিন্তা আসত না। আমি তোর ভাল চাই, তাই বলছি। থাম এবার।
প্রানেশের কথা জড়িয়ে আসছে। আমি জানি না আমি ঠিক করছি কি না। ছেলেটা কাল এত মদ খেয়েছে। আজ আবার ওকে এখানে নিয়ে এলাম! কিন্তু এখানে না নিয়ে এসে ওকে বোঝাতে পারতাম না যে ও বিপথে চলে যাচ্ছে। যাকে ও আমার সুপার পাওয়ার বলে মানে তা নিছকই এক কাকতালীয় ব্যাপার। আন্দাজে কথা লেগে যাওয়ার মতো। ওর আজ সেই সত্যিটা জানা দরকার। ওকে আমার বলা দরকার ওর এতদিন ধরে আমাকে ফলো করটাই ভুল হয়েছে।
রাত দশটা নাগাদ প্রানেশকে ছাড়লাম ওর বাড়ির সামনে। জানি না ওকে ঠিক মতো বোঝাতে পারলাম কি না। তবে আমার কথাগুলো শুনে ও কেমন থমকে গেছে। যাওয়ার সময় ও কেমন যেন নিরুদ্দেশে যাওয়ার মতো উদাশ হয়ে গেল। আমিও চাই এবার ও আমাকে অপছন্দ করুক, ঘেন্না করুক। তা না হলে ও এভাবেই খারাপের দিকে যেতে থাকবে। জানিনা এরপর ও কি করবে। আমার সাথে কথা বন্ধ করলে ও পুরোপুরি একা হয়ে যাবে। যতদুর জানি আমি ছাড়া ওর তেমন কোনো বন্ধুও নেই।
ধর্মতলা থেকে মহামায়ার জন্য একটা পুঁতির মালা নিয়ে এসেছিলাম। সেটি পেয়ে মহামায়া অবাক হয়ে গেল। বলল, হঠাৎ, এসব আনলে! ব্যাপার কি?
আমি উত্তরে কি বললাম মনে নেই। তবে রাতে যখন আমার বুকে ও হাত রাখল তখন বুঝলাম আমার এ পৃথিবীতে আসা সার্থক। এক মানুষের সর্বপরী এক নারীর ভালবাসা পেয়েছি— প্রানেশ তাও পায়নি আজ পর্যন্ত। হয়ত আমিই স্বার্থপর ছিলাম, হিংসুটে ছিলাম ছোটবেলা থেকে। তাই আমার অজান্তে আমি প্রানেশকে কাল্পনিক সব গল্প বলে গেছি। আমার মনের যা বিষ ছিল সেইসব নিঙড়ে দিয়েছি ওকে। আর ও সেসব নিয়ে আজ ভুগছে। না, ও ভুগছে না, ভোগাচ্ছে। অধীরবাবুকে। হয়ত এটাই আমি চেয়েছিলাম। হয়ত আমি প্রানেশের ভাল দেখতে পারি না। তা না হলে আজ আবার ওকে নিয়ে মদ খেতে যেতাম না।
বিনা মেঘে বজ্রপাত? বিনা মেঘে বৃষ্টিপাত? কিন্তু মেঘ তো আকাশে রয়েছে। একদম সকালে অবশ্য ছিল না। ভোরের সূর্যটা দিব্বি ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য করেছে। হয়ত চা-বিস্কুটও খেয়ে থাকবে।
কিন্তু চা-বিস্কুট খাওয়ার সময় পায় নি অনুব্রত। পায় নি তার বৌ পৃথা।এমন কী দুধ দিয়ে কর্ণ ফ্লেক্স খাওয়াও হল না ওদের ছোট্ট ছেলে বুম্বারও। বাবার জন্যে চায়ের বাটিতে গরম জলে দার্জিলিং চায়ের বড় বড় পাতা ভিজিয়ে ঢাকা দিয়ে পৃথা সবে এ ঘরে এসে বুম্বার গরম দুধের বাটিতে কর্ণ ফ্লেক্স প্যাকেট থেকে ঢেলে ভিজোতে যাচ্ছে এমন সময় ঐ আওয়াজ। ঝম ঝম ঝম শব্দে একটু হাত কেঁপে গেল পৃথার। দু চারটে ফ্লেক্স মেঝেতে পড়ল।
কান খাড়া করল বুম্বাও। তারপর দৌড়ে জানালার সামনে গিয়ে পর্দা তুলে দিয়ে আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, ওমা বিষ্টি গো বিষ্টি। দেখবে এস কত জল।
হ্যাঁ তাই তো। কৌতূহল নিবারণ করা আর সম্ভব হল না পৃথার পক্ষেও। ওঃ বাবা যা গরমটা পড়েছে। ঘাম আর ঘামাচি যেন লেপটে বসে আছে সারা শরীরে। শরীর যেন সদা আইঢাই করছে। সকাল সাতটা আর দুপুর বারটার মধ্যে কোনও ফারাক নেই। তার আবার রান্নাঘরে কাজ। ওভেনের গরম আর রান্নার পরিশ্রম মিলে ঘামের সঙ্গে যেন লড়াই করতে হয়। ওঃ বাবা একটু স্বস্তি পাওয়া গেল তবে।
যেন বয়েস হঠাৎ বেশ কমে গেছে পৃথার। কোথায় জানলার পর্দা খুলে বিছানায় জল ঢোকানোর জন্যে ছেলেকে ধমকাবে তা নয় নিজেই যেন তার সমবয়সী হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টিটা উপভোগ করছে। মুখটা ভরে গেছে তৃপ্তির হাসিতে। আঃ কী সুন্দর ঠান্ডা। মনে হচ্ছে যেন এক ঝটকায় দরজা খুলে বাইরে গিয়ে ভেজে এই বৃষ্টির মধ্যে। ভেজে আর নাচে।
-খুব হয়েছে এবার চল। ফ্লেক্স খেয়ে নেবে। স্কুল যেতে হবে তো? ছেলেকে বিধি-সম্মত মৃদু ধমক দিলেও পৃথার মনের ইচ্ছে ছিল ছেলের পাশে আর একটু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির শোভা দেখে।
মুহুর্তে বুম্বার সারা মুখে নেমে এল যেন আকাশে জমে থাকা বেশ কিছু মেঘ। স্কুল? এই সুন্দর বৃষ্টির দিনে স্কুল? আজ বাবা নিশ্চয় বাজার থেকে ইলিশ মাছ আনবে। মা নিশ্চয় বেলায় খিচুড়ি রাঁধবে। আর বাবা এই বৃষ্টিতে অফিস যাবে বলে মনে হয় না। সেদিন যেন কাকে ফোনে বলছিল, আমার অনেক ছুটি পাওনা আছে। না হয় যাবে তার থেকে কিছু। তাতে আর কী।একটা বিষ্টি ফিষ্টি না হলে আর ভাল লাগছে না।
দুপুরে এই ঝম ঝম বৃষ্টির মধ্যে মায়ের করা গরম খিচুড়ির সঙ্গে গরম ইলিশ মাছ খেতে খেতে বাবা আর মা নিশ্চয় হেসে হেসে খুব গল্প করবে। এমন দিনে বাবা নাকি মাকে খুব আদর করে। হ্যাঁ, বুম্বা দেখেছে কত দিন। অবশ্য চোখের সামনে সে এসে পড়লেই মা কেমন চোখ পিটপিট করতে করতে বুম্বাকে বলে, চোখে যে কী পড়ল। ধুলো নাকি কে জানে। তোর বাবা তো অনেক ফুঁ দিল এবার তুই একটু দেখ তো বাবু। দেখতে কিছু পাস কিনা।
স্কুলের কথায় খুব মন খারাপ হয়ে গেল বুম্বার। ভাবতে লাগল ইস কী হবে। সেই বৃষ্টির মধ্যে রেনকোটের ভেতরে জবজবে ঘাম আর বাইরে বৃষ্টির ঠান্ডা ছাঁট। এই বৃষ্টিতে কারোর ঘরের বাইরে যেতে ভাল লাগে?
ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে। মনে মনে গডকে ডেকে বলতে থাকে, ইস গড, যেন স্কুলের রিক্সো আমাদের বাড়ির গলিতে ঢুকতে না পারে গড।
তা গডের ইচ্ছে হোক বা না হোক, এমন একটা সম্ভাবনা অবশ্য থেকে যায়। যদিও মায়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়া খুব মুশকিল। নিজের রান্না ফেলে গায়ে রেনকোট চড়িয়ে মাথায় ছাতা দিয়ে বুম্বাকে নিয়ে দৌড়বে সেই মোড়ের মাথায় যেখানে এসে জলের জন্যে আটকে আছে তার স্কুলের রিক্সো। আর আজ তো বাবা যদি অফিস না যায় তো সেই এ কাজ করবে।
ছেলেকে কোনওমতে খাইয়ে রান্নাঘরে ছুটল পৃথা। বুম্বার বাবা অফিস বেরোবে ঠিক নটায়। তার গাড়ী নটা চোদ্দয়। এখনও বিস্তর রান্না বাকি কিছুটা করে ফেলতে হবে তারপর বাজার থেকে মাছ নিয়ে অনুব্রত ফিরলে সে মাছ ভেজে ঝাল করে দেবে।
খানিকটা রান্না করে দেবার কথায় বাসনের কথাটা মনে পড়ে গেল। এই রে কালকের বাসন যে ডাঁই করা রয়েছে রান্নাঘরে। সুন্দরী আসবে তবে মেজে তাকে উদ্ধার করবে। সুন্দরী তার কাজের মেয়ে। আসল নাম কেউ জানে না। বা খোঁজ নেয় নি। রঙ তেমন ফর্সা না হলেও দেখতে সে বেশ সুন্দর। তাই সবাই তাকে এই নামে ডাকে বা চেনে।
কানে এই সময় আবার নতুন করে বৃষ্টির শব্দটা এল। আর মনের আলগা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল সন্দেহটাও। সাত সকালে আচমকা বৃষ্টির এই উৎপাতে মেয়েটা যদি কাজে না আসে? ইস কী বিপদ। কিন্তু আর সময়ও তো নেই। এখন হাতে হাতে দুটো বাসন ধুয়ে নিতেই হবে। মাথা কুটে মরতে ইচ্ছে হচ্ছে পৃথার। ধুর ধুর একেবারে হাড় মাস কালি হয়ে গেল গা!
সাতটার আগে সাধারণত বিছানা ছাড়ে না অনুব্রত। আর উঠবেই বা কী করে। রাত সাড়ে বারটা একটা পর্যন্ত কম পরিশ্রম করতে হয় তাকে? পরিশ্রম অবশ্য আগেও করত। লড়াইয়ের পরিশ্রম। কখনও তো রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যেত।
তখনও বুম্বা হয় নি। তখন পৃথার সঙ্গে তাকে লড়াই চালাতে হত প্রায় সারা রাত্তির ধরে। এখন তার দিক থেকে সাড়া তেমন পাওয়া যায় না। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায় অন্য দিক থেকে। সারারাত না হলেও কাল রাত দুটো পর্যন্ত তো বটেই।ঘুমন্ত পৃথার পাশে দিব্বি চ্যাট করে গেছে।সুমতির নামটা সুমতি কী কুমতি কিংবা তার ছবিটা তার নিজের কিনা সেটা নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। অলীক জগতে কেউ নিজেকে লিক করে না বেশী। বেশীর ভাগ সুখ তো মনে।
সাতটা দশে ঝম ঝম ঝম শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুমচোখে বাইরে তাকাল জানলা দিয়ে। চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে ছাওয়া। তার মানে এখনও ভোর হয় নি। পাশবালিশ টেনে তাকে প্রাণপণে আঁকড়ে আবার শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঝম ঝম আওয়াজে আবার ঘুম ভাঙ্গল। মনে হল আচ্ছা আজ সকাল তো হয়েছিল। দিব্বি আকাশ ফুঁড়ে রোদ বেরিয়েছিল। তবে কি এখন আবার সন্ধ্যে হয়ে গেল? সারাদিন ঘুমিয়েছিল? আর তার অফিস?
ধড়মড় করে উঠতেই চোখ পড়ে গেল ঘড়ির দিকে। আরিব্বাস পৌনে আটটা। কিন্তু সকাল না রাত? এ ধন্ধ কাটাতে তড়াক করে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিশেষ ফল নেই। তুমুল বৃষ্টি আরকালো আকাশ। ইস কাল কি তবে সুমতির সঙ্গে চ্যাটটা খুব জোর হয়ে গেছে?
ডাইনিং-এ টিউব লাইট জ্বলছে। রাত কী দিন বোঝার উপায় নেই। এমন সময় সুন্দরী ঢুকল। ছাতা রেখে সে চলে গেল সোজা রান্নাঘরে। তার মানে এখন রাত নয় সকালই। কারণ রাত পৌনে আটটায় সুন্দরী কখনও আসে না।
-আসব না তো আর কী গো। কাল পর্যন্ত ভ্যাপসা গরমে রাতে চোখের পাতাটি বোজাতে পারি নি। আজ ভাবলাম একটু জলে ভিজি আরাম করে তা মনে পড়ল তোমাদের কথা। বর্ষার প্রথম বিষ্টি কী ভাল লাগে তাই না গো দিদি?
মনের কথা বটে।কিন্তু এখন মনের কথা মনে গুঁজে দিয়ে কত্তার রান্না করার কথা ভাবার সময়। পৃথা সামান্য বিরক্ত হল, রাখ তো এখন বিষ্টির কথা। আমি মরছি আমার নিজের জ্বালায়।
বাসন মেজে থালাবাটিগুলো সিঙ্কে ফেলে ধুতে ধুতে বলল, দাদাকে তো দেখছি না? দাদা কি শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে বিষ্টি দেখছে নাকি গো দিদি? সত্যি কি ভাল লাগছে না কী বলব। ঠিক যেন বরফ দেওয়া লস্যি খাচ্ছি গো দিদি।
কথাটা বলে খিলখিল করে হেসে উঠল সে। দাদার কথা ওঠায় আর তার খিলখিল হাসিতে পৃথার গা-পিত্তি জ্বলে গেল একেবারে। আবার ঠিক এই সময়ই লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে মুখে টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে অনুব্রত ঢুকল গিয়ে বাথরুমে।
–আর অত আদিখ্যেতা করতে হবে না বিষ্টিকে নিয়ে। বিষ্টি আমার রান্না করে দেবে না বা তোর বাসনও ধুয়ে দেবে না।কখন থেকে বলছি হাত চালা না শুধু মুখ চালিয়েই যাচ্ছিস।
–এই তো হয়ে গেল দিদি। মুখ করছ কেন? সুন্দরী এবার মুখ ভার করে, কাল সকালে এমন বিষ্টি এলে কিন্তু আমি আর আসব না বলে দিচ্ছি। বিষ্টিতে ভিজলে আমার বড় জ্বর হয়।
মুখ বেশ একটু কুঁচকে গেল পৃথার। কী জানি কাল আবার সত্যি সত্যি যদি মেয়েটা ডুব দেয় তো কী করবে কে জানে। এদের তো শুধু কথায় কথায় কামাই আর কামাই। আবার এদিকে ধিঙ্গিপনাও আছে বেশ। আর বলিহারি বটে অনুব্রতর। কী দরকার ছিল তোমার স্যান্ডো গেঞ্জি পরে মেয়েটার সামনে আসার? এরপর যদি বাসনে সাবান লেগে থাকে তো সেই শোনাবে কথা। বলবে, সুন্দরীকে একটু বলতে পার না ভাল করে বাসন ধুতে?
তার বেশ দেরি হয়ে গেছে। ঝটপট মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে।পৃথার কথা কানে আসছিল কিছু কিছু তবে কিছু মনে করে নি।কাল যা গরম গেছে। সুন্দরীর একটা কথা তার বেশ ভাল লেগেছে। বেরিয়ে এসে বলল, তুই ভাল বলেছিস তো সুন্দরী।
বাসন ধুয়ে আনাজ কুটতে বসেছে সুন্দরী। মুখ তুলে অনুব্রতর দিকে চেয়ে বলল, কোন কথাটা গো দাদাবাবু?
–ওই যে বললি না বরফ দেওয়া লস্যি খাওয়ার কথাটা? আমারও যেন—
আগুন চোখে তার দিকে তাকাল পৃথা, বলছি হচ্ছেটা কি? সময় নষ্ট করছ কেন? মাছ আবার টাটকা না হলে তো মুখে রুচবে না। এদিকে বাজার ফুরিয়েছে। যা বিষ্টি দেখছি ক’দিন বাজার বসবে না তা ঠিক নেই। কিছু বাজার বরং বেশী করে এনে দাও।বড়ি আছে মাছের বদলে চালিয়ে দেব যা হোক।
নিজের ঘরে গিয়ে কাগজ নিয়ে বসতে না বসতে গিন্নি ঢুকল। এক হাতে চায়ের কাপ অন্য হাতে বাজারের থলে।
কড় কড় করে বাজ পড়ল বাইরে। চমকে নিজের মাথাতেই হাত দিয়ে ফেলল অনুব্রত। ইস বাজটা বোধহয় তার মাথাতেই পড়েছে। ভেবেছিল চায়ের সঙ্গে জম্পেশ করে কাগজ পড়বে। মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে মুখ তুলে বৃষ্টির শোভা দেখবে। আর আকাশ না ধরলে অফিস যাওয়ার বালাই নেই।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কারবারে কেরোসিন। এই সাংঘাতিক জল মাথায় করে বাজার করতে বেরোতে হবে? বাজার বসবে তো? কে জানে গিন্নির হুকুম।
-কি হল গো বসেই থাকবে নাকি যাবে? আবার গিন্নির তাড়া। বেরোতেই হল। বৃষ্টি এখন একটু ধরেছে মনে হল। বাজার করতেই হবে নইলে গিন্নি হয়ত আজকে তাকে বড়ির ঝাল আর ভাত খায়েই রাখবে।
বাজার আর বসবে কি? এই বর্ষায় সে বসবে কি ছুটি নেবে যেন ভাবতেই পারছে না। বাজারের ভরা হাট আজ রীতিমত ভাঙা হাট। জনা কয় এসেছে গুটি গুটি। তাও কাটা মাছের জায়গায় এসেছে ল্যাটা মাছ। বাগদা চিংড়ির জায়গায় এসেছে কুঁচো চিংড়ি। কুমড়োর জায়গায় এসেছে ডুমুর কী কাঁচকলা।
একটু অপেক্ষা করলে কি হয় না? হয় বৈকি। তার ছুটির ঘন্টা বেজে যায় অফিসপৌঁছনোর আগেই। হাতঘড়ির কাঁচের জল মুছে দেখল সাড়ে নটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট বাকি আছে।
বাড়ী থেকে হেঁটে আসা যায় না। আবার সাইকেল চালাতেও জানে না। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও অটো বা টোটো কিছুই পাওয়া গেল না। বৃষ্টির জোর আবার বেড়েছে। একটা বন্ধ দোকানঘরের চালার নীচে দাঁড়িয়ে রিক্সার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আহারে! একটা লোক মজুর মত হয়ত, তার পাশেই গুঁড়ি শুঁড়ি মেরে বসে আছে। ফুটপাথেই থাকে হয়ত। এই দামাল বৃষ্টি তাকে হয়ত আশ্রয়চ্যুত করে থাকবে। মধ্যবিত্ত আর ফুটপাথবাসীকে একসঙ্গে এনে ফেলেছে।
বুকপকেটটা কেঁপে উঠল। ভুল করে সাইলেন্ট করা ছিল।
পৃথার ফোন। বলেছে আজ নাকি খিচুড়ি করে দেবে। শ আড়াই মাঝারি সাইজের খয়রা পেয়েছে অনুব্রত। ইয়াহু! তাই আজ ইলিশের বদলে দিব্বি চলে যাবে।
একটা রিক্সাকে অনেক করে দাঁড় করান গেল।
-পঁচিশ টাকা লাগবে কিন্তু। দেখছেন তো কি বিষ্টি—
লোকটা ডাহা গলা কাটছে। সাত টাকা ভাড়া বৃষ্টির চোটে গিয়ে দাঁড়াল একেবারে পঁচিশ টাকায়? পরেই ভাবল আহা এমন বর্ষায় তার যদি মজা করতে ইচ্ছে হয় তো এ লোকটা করবে না?
রিক্সোটা বঙ্কিম কাননের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের ঠিক ওপরেই ঋষি বংকিমচন্দ্রের আবক্ষ প্রতিমূর্তি।রিক্সার গতি বেশী ছিল না। প্রবল বৃষ্টির ঝাপটায় কোনওমতে টেনে টেনে চলছিল। তাই মূর্তিটা আজ অনেকক্ষণ ধরে দেখার সুযোগ পেল সে। অবাক কান্ড অন্যদিন তো এটাকে চিনতেই পারত না। নীচে মাঝে মাঝে জমে থাকে জঞ্জালের স্তূপ। মাথায় কাক-চিল বসে বসে মুখ আর মাথা সাদা করে দিয়েছিল।
কিন্তু আজ এই প্রবল বৃষ্টিতে সব সাদা ধুয়ে মুছে সাফ। এই সেই সেদিনের সাহিত্য সম্রাট। আনন্দমঠের রচয়িতা। নিজের অজান্তেই নিজের হাত উঠে গেল কপালে। বর্ষা তুমি খেল দেখালে বটে। মহাপুরুষকেও আজ নতুন করে চিনিয়ে দিলে।
তারপরেই এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।এদিক ওদিক বইছে পাগলাহাওয়া। এতদিন আসছে এই বাড়িগুলো কি কোনদিন চোখে পড়ে নি তার? বয়েস তা প্রায় আশি-নব্বই কি একশোও হতে পারে। বাড়ি তো নয় যেন বাড়ীর কঙ্কাল। ভূতের মত দাঁত বার করে হাসছে। বাড়িগুলো কি দুলছে? এত জোর দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির দাপটে ভেঙ্গে না পড়ে।
ভয়ে ভয়ে তাড়া দিল রিকশাওয়ালাকে, ভাই একটু তাড়াতাড়ি চল না।
খিল খিল হাসিতে রীতিমত চমকে যেতে হল অনুব্রতকে। এই বর্ষায় এমন প্রাণখোলা ঊচ্ছ্বল হাসি এল কোথা থেকে? আশ্চর্য এই বর্ষাতেও ছাতা না নিয়ে স্রেফ রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে চলেছে এরা দুজনে। দুজনে প্রায় জড়াজড়ি করে।এই বর্ষায় আর কে দেখছে তাদের।
ওরা চলছে ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে। রিক্সোটা প্রায় পাশ দিয়ে যাচ্ছে।অনুব্রতর খুব কৌতূহল হল। এমন রোমান্টিক দৃশ্যের নায়ক-নায়িকাদের দেখতেই হবে। হৃদয় যে তারও দুলছে।
ক্লাস ইলেভেনের শম্পা। একটা জিনস আর টাইট গেঞ্জি পরেছে। জলে ভিজে তা আরও টাইট হয়ে গেছে। দেহরেখা স্পষ্ট। শম্পা থাকে তাদের বাড়ির একটু দূরেই। কয়েক বছর আগে প্রাইভেটে তাকে ইকনমিক্স পড়াত। তাকে জড়িয়ে ধরে হাটছে প্রিয়ংকন। বি-এস-সি ফাইনাল ইয়ার। দুজনে এত প্রেম আগে জানত না অনুব্রত। এখন জেনেও খারাপ লাগল না।
-এই কোথায় চললি তোরা?
–আমি স্কুলে যাব দাদাই। শম্পা হাসতে হাসতে বলল, আর প্রিয় যাবে কলেজে।
-এই বৃষ্টিতে কলেজ হবে? ছাতা নিস নি কেন তোরা?
রিক্সো তখন বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। শম্পা খিলখিল হেসে বলল, বিষ্টিতে ভিজতে ভাল লাগছে দাদাই। কতদিন পরে বিষ্টি এল বল?
মনটা ভরে গেল অনুব্রতর। তারও তো ইচ্ছে হচ্ছিল উঠোনে দাঁড়িয়ে পৃথার সঙ্গে ভেজে। এমন ভাবে দুই শরীর লেপ্টে। আজও ইচ্ছেগুলো পালায় নি।কিন্তু হাতছাড়া হয়েছে উপায়টা।
Dr. Arun Chattopadhyay; 181/44 G.T.Road(Gantir Bagan)P.O BaidyabatiDist. Hooghly (PIN712222)
যেটুকু সময় চুপ করে বসে থাকা, সেইটুকুই সময় যেন ছুটে বেড়ানোর।
ছুটে যাই সেই পথে, যেই পথে যাওয়ার ইচ্ছে প্রবল।
আজ আর কোন বাঁধা নেই।
এইতো সময় নিজের কাছে আরো কিছুটা এগিয়ে আসার।
বসে আছি।
তবুও যেন হেঁটে যাচ্ছি সেই পথে,
যেই পথ চিনে নিতে চেয়েছিলাম জন্মের পর।
এই পথ আমার জানা নেই।
এযাবৎ যত জনের সাথে দেখা হয়েছে, নিজের পরিচয় দিয়েছি।
কেউ জানতে চায়নি। তবুও আলাপ করেছি।
যদি আবার ফিরে আসা না হয়, তারা মনে রাখবে,
কেউ এসেছিল, তবুও কোন প্রশ্ন না করেই ফিরে গেছে।
রাত বেশ গভীর। আকাশে একটাও তারা নেই। চাঁদ মুখ ঢেকেছে অমাবস্যার কোলে। বাড়ির সামনে স্ট্রিট লাইটদুটো অন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। পাশের গুহ বাবুর বাড়ির দোতলার বাতিও এইমাত্র নিভে গেল। দূরে কোথায় একটা কুকুর কেঁউকেঁউ করে ডেকে উঠলো। নাকি কেঁদে উঠলো বোঝা গেল না। আবার সব চুপচাপ। গাঢ় অন্ধকার আর গভীর নিঃস্তব্ধতায় যেন ডুবে গিয়েছে চারিপাশ! শুধু বিকাশের মাথার সামনে দেওয়ালের বড় ঘড়িটার পেন্ডুলামের টিক টিক শব্দটা ছাড়া…
পাশ ফিরে শুলো বিকাশ। টেবিলে জলের জগ থেকে এক গ্লাস জল খেল। কত রাত হয়ে গেল… অথচ ঘুম যে কেন আসছে না! চোখের পাতা বন্ধ করলেই বারবার ভেসে উঠছে হোটেলের ছবিটা।
আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল বুবলু, ব্যাকগ্রাউন্ড জুড়ে আঁকা সমুদ্র সৈকতের ডিজিটাল পেইন্টিং সহ দৈত্যাকার নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে… ‘ হুররে…পেয়ে গেছি দাদানের হোটেল!’
তিরিশটা বছর… কম তো নয়! টিনের ক্যানেস্তারার ওপর সেদিনের লেখা ‘ হোটেল সৈকতাবাস’…নামটা সেই একই রয়ে গেছে, পালটে গিয়েছে ফরমেশান। কে বলবে, কত শখ আর স্বপ্ন নিয়ে বিকাশের নিজের হাতে গড়া একতলা হোটেলটা আজ সময়ের হাত ধরে এভাবে বদলে ফেলবে নিজেকে! হাত বাড়ালেই সমুদ্র, হাত বাড়ালেই মেইন রাস্তা, বাজার… তার পাশে নতুন, নতুন বাড়ি, মনুষ্য বসতি,ভীড় আর যানজটে ভরা আজকের শহরের বহিরঙ্গের চেহারা বদলালেও জায়গাটা কি আর ভোলা যায়? বিকাশও ভোলে নি। শুধু মাথা উঁচু করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে.. এই সেই ‘সৈকতাবাস!’ এই কি সেই একতলার ঘর! এতগুলো বছর পরেও যার ছাঁচটা হবহু এক,কিন্তু আশ্চর্যভাবে পালটে গিয়েছে দেহ সৌষ্ঠব। কোথায় সেই পুরনো আদ্দিকালের টিনের নেমপ্লেট! তিরিশ বছর সময়টা এ হোটেলের চেহারাকে শুধু বদলায়নি, খোল নলচে পর্যন্ত বদলে দিয়েছে…। শুধু একতলার ঘরের এই ছাঁচটুকু এতদিন ধরে যেন অপেক্ষায় ছিল স্মৃতিটুকু উসকে দেবে বলে…।
‘বলো না দাদান,এটাই কি তোমার তৈরি করা সৈকতাবাস?’
কিছু বলে নি বিকাশ। শুধু মাথা নেড়েছিল। জীবনে অনেক ছবি ফ্যাকাশে হয়ে এলেও এ ছবি বোধহয় গাঁথা হয়েই থাকবে মনে… কতকাল, বিকাশ নিজেও জানে না।
‘কত্তো বড় হোটেলটা আর কি সুন্দর! এক দৌড়েই সমুদ্র.. কতো বড় বড় ঢেউ..ঐ তো কত লোক চান করছে জলে নেমে..! আমরা এটাতেই থাকবো।’
আবারো লাফিয়ে ওঠে ভাইপো বুবলু।
সকলেই একবাক্যে স্বীকার করলো, এমন হোটেল থাকতে আর খোঁজাখুঁজির কোনো দরকার নেই। বিকাশের মুখে এর আগে এই হোটেলটা সম্পর্কে যে যতটুকু গল্প শুনেছে,তাতেই যেন সমান নস্টালজিক সকলে…।
রেস্টুরেন্ট, সুইমিং পুল, বাগান, ক্যাফেটরীয়া সমেত একবিংশ শতাব্দীর একটা ঝাঁ চকচকে চার তলা হোটেলের রাস্তার ধারের একতলার ঘরখানাই তিরিশ বছর পর আসা প্রায় অচেনা শহরে যেন সবথেকে বেশি আপন হয়ে উঠেছিল বিকাশের কাছে… কিন্তু সেই সঙ্গে কি এক একটা ঘোর লাগা ভাব..! আপনত্ত্বের মাঝে মিশে থাকা সেই ঘোর লাগা অণুভূতি বাড়ি ফিরে আসার পরেও কিছুতেই কেন কাটতে চাইছে না? কেন চোখের পাতা বুজলেই ফিরে ফিরে আসছে রাস্তার পাশের ঐ একতলার ঘর, সেই প্রশস্ত করিডরটা, সমুদ্রের ঝপাং ঝপাং শব্দ আর রাত হলেই কার নীরব পদচারণা. …! নাকি কাছে আসতে চাওয়া স্মৃতিগুলোর পদচারণা? উত্তর আসে না কোনো।
হঠাৎই বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা আচমকা বেজে ওঠে..। এই গভীর নিশুতি রাত্তিরে কে?
অজানা নাম্বার।
‘ হ্যালো।’
‘ আমি অভয়।’
বুকের ভেতরটা কেন জানি না ধক করে উঠলো বিকাশের।
‘ বোবা হয়ে গেলি নাকি?’
কেমন একটা অদ্ভুত শব্দে হেঁসে উঠলো অভয়।
নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বিকাশ।
‘ নম্বর বদলে ফেলেছিস বুঝি?’
‘ বদলাতেই পারি…।’
‘ তাই ভাবলাম এত রাতে কে আবার…।’
‘ বললাম তো “অভয়”। আরো ভেঙে বলতে হবে বুঝি?’
বাঁ হাতে জগটা ধরে আরো কয়েক ঢোক জল খেয়ে নেয় বিকাশ। গলাটা শুকিয়ে এসেছিল।
‘ আরে না, হয়েছে কি, খারাপ খবর না থাকলে লেট নাইটে তো কেউ সাধারণত ফোন করে না…তোর গলাটা শুনে তাই হঠাৎ করেই…।’
‘ হঠাৎ করেই কী?’
থমকে যায় বিকাশ। ঢোক গিলে বলে,’ ও কিছু না। তা তুইও দেখছি আমারই মতো…।’
‘ নিশাচর..।’
হেসে ওঠে অভয়। আবার সেই অদ্ভুত হাসি। কানে এসে লাগছে বড় হাসিটা। ওকে তো এর আগে এইভাবে কখনো হাসতে…! কী করেই বা পড়ে ফেললো বিকাশের মনের ভাষা? অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, টেলিপ্যাথিটা কী করে রপ্ত করলি?
‘ কেমন ঘুরলি বল..।’
প্রশ্ন ভেসে আসে ওপাড় থেকে।
‘ আর বলিস না, কলকাতায় বাস করেও তিরিশ বছর বাদে দীঘায় পা রাখলাম…লোকে শুনলে হয়তো অবাক হয়ে যাবে..রবি ঠাকুরের কবিতাটা মনে পড়ছিল… “দেখা হয় নাই শুধু দুই পা ফেলিয়া..”এবারেও যাওয়া হতো কিনা সন্দেহ.. নেহাৎ বড় ভাইপোটা বায়না ধরলো বলে ওদের পাল্লায় পড়ে… ভালোই লাগলো বেশ… সেই আগের দীঘা আর নেই… অনেক কিছুই পালটে গিয়েছে… পরিবর্তন হয়েছে… স্বাভাবিক। সমুদ্র তো বরাবরই আমাকে টানে… এসে দেখলাম, তিরিশ বছর আগে যা দেখেছি.. সেই ঘন নীল জলরাশি,সুবিস্তৃত ঝাউবন, বোল্ডার বিহীন বিস্তীর্ণ বালিয়ারি…কল্পনায় ভাবছিলাম আর বীচে বসে কমপেয়ার করছিলাম দুটো সময়কে…এখনো শুয়ে শুয়ে এসব কথাই রেমিনিসেন্স করছিলাম আর কি…এছাড়া কি আর করবো বল..বাবা নেই, মা নেই…পূর্বাশাও (বিকাশের স্ত্রী) চলে গেছে কত দিন হয়ে গেল… ছেলে বোর্ডিংয়ে… একা একা কাটানো জীবনে রেমিনিসেন্স করা ছাড়া আর কিই বা থাকতে পারে…। ঘুম আসছিল না.. কাল আবার অফিস…আসছিস তো কাল?’
‘ কোথায়?’
‘ কেন অফিসে?’
উত্তর আসে না কোনো।
‘ হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো..।’
লাইনটা কেটে গেল বোধহয়। ফোনটা রেখে দেবে কিনা ভাবছিল বিকাশ। আর ঠিক তক্ষুনি আবার সেই অচেনা হাসি..’ কী ভাবলি লাইনে নেই? এত তাড়া কেন?’
‘ না ঠিক তা নয়…।’
মনের মধ্যে খটকাটা ক্রমশই যেন বাড়ছিল বিকাশের। আদৌ কি এটা অভয়? তার অনেক দিনের চেনা সবচাইতে কাছের অফিস কলিগ..। এতক্ষণ হাসিটা অচেনা লাগছিল, এবার যেন গলাটাও কিরকম..! তাই বা কি করে হয়? এই মূহুর্তে অভয় নামে বন্ধু বলতে তার ঐ একজনই। আর তো কেউ নেই…। অভয় ছাড়া এত রাতে কে তার ফোন নম্বর জোগাড় করে জ্বালাতন করবে? তবু….।
‘ জীবনে কতকিছুই তো আমাদের অবাক করে দেয়…তাই না রে? এই যেমন ধর একটা হোটেল…আদ্যন্ত আধুনিকতায় মোড়া… পালটায় নি শুধু একতলার ঘরের কাঠামোটাই…সেই পুরনো করিডর… তিরিশ বছর আগে যা ছিল..’
আবার সেই শিহরণ জাগানো হাসি। সেই অদ্ভুত,অচেনা গলার আওয়াজ…।
‘আমাকেও সমুদ্রটা বড় টানে বুঝলি…বিশেষ করে যে জায়গাটায় তুই আমাকে খুন করেছিলি….সৈকতাবাস ছাড়িয়ে সেই নির্জন জায়গাটা…ঘন ঝাউবনে ঢাকা… আমার চেয়ে একটু বেশি ড্রিংক করে ফেলেছিলি… জোর করে ধরে আমাকে টেনে নিয়ে চললি গভীর জলের দিকে… পায়ের মাটি পাচ্ছিলাম না…তোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম… একটুকরো খড়কুটো…তখনো বুঝিনি তোর অভিষ্যন্ধি… আমার নাক,মুখ জলের ভেতরে ঠেসে ধরেছিলি তুই… যতবার ঢেউগুলো আসছে… আমি প্রাণপণ মাথা তোলার চেষ্টা করছি, ততই তুই আমায় অগাধ জলে..কি যে কষ্ট হচ্ছিল! উঃ! সে কষ্ট এখনো আমার গলায় বিঁধে…কেন করলি এসব? হোটেল ব্যাবসায় নিজেই পুরো ভাগ বসাবি বলে?’
‘ আমি অভয়। অভয় সাঁধুখা। কাঁথি থেকে রামনগরে এসে উঠি কারখানায় কাজের সূত্রে তোর দেশের বাড়িতে পেইং গেস্ট হয়ে… তুই তখন বেকার অবস্থায় হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছিস…কারখানা একদিন লক্ আউট হয়ে গেল আমার…বাপ, ঠাকুর্দার যা জমিজমা, সম্পত্তি ছিল, বেচেবুচে দুজনে মিলে দীঘায় এসে হোটেল ব্যাবসা শুরু করলাম… আমাদের স্বপ্নের হোটেল..” সৈকতাবাস..” তারপর লোভের বশে আমায় খুন করে নিজেই পালিয়ে গেলি… হোটেল বিক্রি করে, দীঘা ছেড়ে, দেশের বাড়ি ছেড়ে, আমার গচ্ছিত টাকা পয়সাগুলো সব হাতিয়ে…এমনকি ব্যাগ থেকে আমার ব্যাঙ্কের পাস বইটা পর্যন্ত নিয়ে গেলি ওর ভেতরে রাখা আমার নিজের সই করা চেকের পাতাগুলো সমেত…এক এক করে টাকাগুলো সব আত্নস্যাৎ করার পর একদিন অবাক কারণে নিজেই ভুলে গেলি পাস বইয়ের ব্যাপারটা…লোভ আর পাপ কাউকে ছাড়ে না জানিস তো? নিজেও টিকতে পারলি না ব্যাবসায়,আমাকেও থাকতে দিলি না দুনিয়ায়…বুড়ো বাপ,মা আমার শোকে শোকে মরে গেল…একজন নয়, তুই তিন- তিনজনকে খুন করেছিস..!’
জলদগম্ভীর আওয়াজ! বিকাশের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘাম ঝরতে শুরু করেছে ততক্ষণে! শরীরময় এক অদ্ভুত কাঁপুনি…!
‘ কী… কী….কী প্রমাণ আছে আমি খুন করেছি? কবে আমি এসব করলাম..! মিথ্যা..সব মিথ্যা!’
আবার সেই হাসি।
‘এত ভুলে যাওয়া মন তোর! জীবনের চরম সত্যিটাকেও অস্বীকার করছিস! অবশ্য করবি নাই বা কেন…প্রমাণ যে তুই কিছুই রাখিস নি সেদিন.. আমার গলাও টিপে ধরিস নি.. শুধু চুলের মুঠি ধরে ঠেসে ধরেছিলি, যাতে লোকে ভাবে অ্যালকোহল গিলে জলে নেমে পায়ের মাটি না পেয়ে ঘটি বাটির মতো কেউ একজন ডুবে গেছে…!’
‘ না.. না…না আমি এ কাজ করতে পারি না.! পারি না! আমায় মিথ্যে ফাঁসানো হচ্ছে ফোনে…কে? কে তুমি? উত্তর দাও!’
‘শোন, আমার মুক্তি নেই রে…আমি হোটেলের ঐ একতলার ঘরেই রয়ে গেছি আজও… ঘুরে ঘুরে বেড়াই…ঘরের আনাচে-কানাচে.. করিডর… এর বাইরে চাইলেও আমার মুক্তি নেই… কখনো যদি এ হোটেলে আসিস, দেখতে পাবি ঘোরাফেরা করতে..না আমাকে নয়..আমার ছায়াকে…। তোর নিজের পরিবারে তোর বাবা,মা ছাড়া আর কেই বা জানতো সে আসল কাহিনী…। পাছে সবকিছু বেফাঁস হয়ে যায়, এই ভয়ে দেশের বাড়িতে চিরকালের জন্য তালা মেরে… তোর ছোট ভাই এ নিয়ে প্রশ্ন করলে গোটা ঘটনাটা হাজির করেছিলি আর একভাবে…আজ তোর নিশ্চিন্ত জীবনে আমি কোনো ব্যাঘাত ঘটাবো না রে… একটা অনুরোধ, পাস বইটা পুড়িয়ে ফেল…যেভাবে আমাকে নিশ্চিহ্ন করেছিস, ঠিক তেমন করে…। ভেবে দ্যাখ শেষবারের মতো কোথায় রেখেছিলিস বইটা…।’
‘ কি.. কিসের পাস বই..আমার কাছে কোনো বই..!’
ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো বিকাশ।
‘ আজকাল অনেক কিছুই দেখছি ভুলতে বসেছিস তুই, শারীরিক সমস্যার কারণে..মনে করে দেখ ।’
‘ মিথ্যা! সর্বৈব মিথ্যা! আমার এ ধরণের কোনো সমস্যা নেই। আগেও ছিল না…।’
‘আবার ভুলতে বসেছিস!এরপর কোনদিন হয়তো নিজেকেই ভুলে যাবি দেখছি..! আমি কিন্তু কিচ্ছু ভুলি নি…ওটা যত তাড়াতাড়ি নিশ্চিহ্ন করবি,ততই মঙ্গল…হাজার জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ সেদিন তোর দিক থেকে কোনো প্রমাণ পায় নি…আর কোনোদিন হয়তো পাবেও না…যদি পাসবইটা…দরকার কি একটা প্রমাণ রেখে দেওয়ার… নইলে আমায় দিয়ে দে..সে আসছে নিমেষের মধ্যে….তোর কাছেই আসছে…দিয়ে দে…দিয়ে দে.. তাড়াতাড়ি খোঁজা শুরু কর…মনটাকে একজায়গায় নিয়ে আয়..!’
‘ কে..! কে আসছে..!’
উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকে বিকাশ…।
‘ আমার তো মুক্তি নেই… বৃদ্ধ বাবাকে পাঠাচ্ছি… তিনি আসছেন, তোর মঙ্গলের জন্য… ঐ শোন..।’
সিঁড়িতে কার যেন পায়ের আওয়াজ। ক্রমশ এগিয়ে আসছে শব্দটা…স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে…একটা করে পা ফেলার আওয়াজ, তার কিছুক্ষনের বিরতিতে পরেরটা..দোতলায় বিকাশের ঘরের সামনে এসে হঠাৎই থেমে যায় শব্দটা…। নাকি গোটাটাই মানসিক বিভ্রান্তি..!
‘ খট..খট..খট..খট…। ‘
কড়া নাড়ছে কে যেন!
‘কে….কে ওখানে…! বুবলু.! সুরেশ…!’
হাতের মোবাইলটা খটাস করে মাটিতে আছড়ে পড়লো বিকাশের।
ভাই, ভাইপো.. ওরা কি শুনতে পাচ্ছে না কিছু? শুনতে পাচ্ছে না দোতলার এক কোণের ঘরে বিধ্বস্তপ্রায় বিকাশের আর্তনাদ?
সজোরে দরজাটা বন্ধ করতে গেল বিকাশ…আর ঠিক তখুনি ঘন অন্ধকারে কিসের একটা পায়ায় বাঁ পাটা আটকে গিয়ে ‘ আঃ’ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে।
সারা বাড়ি আজ শোকে মুহ্যমাণ। কাজের লোক গণেশই প্রথম ভোরবেলায় চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকে দেহটা দরজার কাছে পড়ে থাকতে দ্যাখে। বারবার ডাকার পরেও সাড়া না পেয়ে চিৎকার করে বাড়ির লোকজনকে জড়ো করে। একটু আগেই ডাক্তারবাবু এসে পাল্স পরীক্ষা করে জবাব দিয়ে চলে গেছেন…’ কোনো একটা সাডেন শক্ আর আর তা থেকেই এই ম্যাসিভ অ্যাটাক…।’
খাটে শোয়ানো বরফের মতো ঠান্ডা, নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকে বুবলু।দীঘায় যাবার আগে দাদান বলেছিল, ‘ ওখানে একটা হোটেল আছে। আমি নিজে তৈরি করেছিলাম হোটেলটা। দেখাবো তোদের…। ‘
‘তোমার হোটেল দাদান? কি মজা, কি মজা..ওখানেই আমরা থাকবো..?’
বাবা বলেছিল, ‘হ্যাঁ রে, আমি তখন কতো ছোট। ইস্কুলে পড়ি। তখন দাদান আর দাদানের বন্ধু মিলে হোটেলটা তৈরি করেছিল। ‘
‘ তারপরে কী হলো দাদান?’
‘ তারপর একদিন বন্ধুর সঙ্গে আড়ি হয়ে গেল। আমি আর কি করবো.. মনের দুঃখে হোটেল বন্ধ করে আবার চলে আবার চলে এলাম নিজের বাড়ি। কতো লোক, কতো মানুষজন আসতো সেই হোটেলে…কতো মজার মজার গল্প আছে… সব বলবো তোকে একদিন..। ‘
বাবা বলেছিলেন, ‘ আমিও শুনবো দাদা। ‘
বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মাও শুনছিল সেসব গল্প।
কান্নাভেজা গলায় বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বুবলু।
‘ দাদান আর কোনোদিন গল্প করবে না, তাই না বাবা? আর কথা বলবে না? ‘
বুবলুর মা রমা দেবী স্বামী সুরেশের দিকে তাকিয়ে ভীষণ রকম কৌতুহলী চিত্তে জিজ্ঞেস করে, ‘ সাডেন শক্ টা ঠিক কী হতে পারে বলোতো? দীঘায় ঐ হোটেলটাতে ঢোকার পর থেকেই দাদাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল…এমন কি ফিরে আসার পরেও…কালকে তুমি যখন কথাটা বলছিলে আমায়,ভাবছিলাম দাদা বোধহয় একটু বেশিই নস্টালজিক হয়ে পড়েছে, তাই…। তুমি তো এ নিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলে দাদাকে? ‘
ভেঙে পড়া কন্ঠে মৃদু স্বরে উত্তর দেয় সুরেশ,’ হ্যাঁ করেছিলাম। “নস্টালজিয়া…বয়স হলে বাড়ে।” আমাকেও তাই বলেছিলেন। ‘
‘ কাল অবধি আমিও তাই ভেবেছি জানো..। এখন যেন মনে হচ্ছে গতরাতের ঘটনার সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর কোথাও কোনো যোগ…সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে..! দ্যাখো, দাদার চোখ দুটো কিরকম বিস্ফারিত! ‘
সকলকে চমকে দিয়ে মোবাইলের আওয়াজ ভেসে আসে। কথা থেমে যায় রমার। দাদার ফোনটা মেঝের এককোনে পড়ে আছে কারো নজরেই পড়ে নি! এগিয়ে গিয়ে মোবাইলটা তুলে নেয় সুরেশ। লাইন টা কেটে গেল। ফোন স্ক্রিনে কি একটা দেখে ভুরু কুঁচকে তাকায় সুরেশ। নিজেই নম্বর টা ডায়াল করতে শুরু করে।
‘ হ্যালো।’
‘আমি অভয়। একটু আগেই কল করলাম। কেটে গেল। ‘
‘ ও অভয় কাকু.. তুমি কি গতরাত্রে দাদাকে ফোন করেছিলে?’
‘ কেন বল তো?’
‘ এই নম্বরটাই শো করছে স্ক্রিনে। দুটো আটের কল…। দাদা তখন জেগে ছিল? ‘
‘ আরে তোর দাদা যে এতটা ভীতু তা তো জানতাম না! কী হয়েছে শুনবি? একদিন অফিস ক্যান্টিনে বসে কি একটা কথার সূত্রে আমার সঙ্গে বাজি ধরলো..রাত বিরেতে ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে। ও বলে ভূত টুত ওসব কিছু নেই। আমি বললাম, আছে তোকে দেখাবো। বাজি অ্যাকসেপ্ট করে নিলাম। গতকাল বাড়ি রং করানোর সময় চিলেকোঠায় রাখা একটা ভাঙা টিনের বাক্স থেকে কি খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম তিরিশ বছর আগেকার একটা খবরের কাগজের ফ্যাকাশে বিবর্ণ পাতা। এক ঝলক নজর পড়ে যাওয়ায় দেখি অনেক খবরের মাঝে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং রিপোর্ট.. “দীঘা সৈকতের কাছে ব্লু মুন নামক একটি হোটেল তৈরি করে নতুন ব্যাবসা করতে আসা দুই বন্ধুর মধ্যে অভয় সাঁধুখা নামে এক যুবকের সমুদ্রে রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য। হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ঘন ঝাউবনে ঢাকা সমুদ্রতীরের এক নির্জন স্থানে মৃতদেহটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। রামনগর থানার আই সি র নেতৃত্বে পুলিশ গোটা ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুসারে মৃতের পাকস্থলীতে পাওয়া অ্যালকোহলের অস্তিত্ব এবং মৃত্যুকালে অস্বাভাবিকরকম বিস্ফারিত দু চোখের মণি রহস্যকে ঘনীভূত করেছে। সদ্য ব্যাবসা শুরু করা মৃত যুবকের ব্যাঙ্ক পাসবই, নিজের সই করা চেকের বেশ কিছু পাতা, এবং সঙ্গে রাখা নগদ টাকা পয়সা… সেগুলি সবই খোয়া গেছে বলে মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগের যাবতীয় তীর মৃতের বন্ধুর বিরুদ্ধেই…। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে নিজের বাসভূমি কাঁথি থেকে এসে কারখানায় চাকরি সূত্রে রামনগরে ঐ বন্ধুর বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থাকতে শুরু করে মৃত যুবক অভয় সাঁধুখা। কারখানা লক আউট হয়ে যাওয়ায় পৈতৃক সম্পত্তি, জমি জমা বিক্রি করে হোটেল ব্যাবসা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় দুই যুবক। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে রয়েছে কিনা পুলিশ সব দিক খতিয়ে দেখছে। আপাতত জেরার মুখে মৃত যুবকের বন্ধু…।”
পৃষ্ঠার বাকী অংশ একেবারেই ছেঁড়া। যাই হোক, খবরটা পড়ার পর মাথায় একটা ভূতুড়ে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। বছর কয়েক আগে ফ্যামিলি নিয়ে দীঘায় বেড়াতে এসে এক আদ্যন্ত ঝাঁ চকচকে হোটেলে গিয়ে উঠি। যে হোটেলের একতলার ঘর আর সামনের প্রশস্ত করিডরের মূল কাঠামোটা কোনো এক অজানা কারণে অদ্ভুত ভাবে সেকেলে মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গিয়েছে। তফাত শুধু এই..ওটা ছিল ব্লু মুন আর যে হোটেলে ছিলাম সেটা তার থেকে মাত্র কিছুটা দূরে, সৈকতাবাস। সর্বোপরি আরো একটা ঘটনা… মনে আছে তোরা বেড়াতে যাবার ঠিক আগের দিন বিকেলে তোদের বাড়ি গেলাম? গল্প করতে করতে তোর মুখেই প্রথম উঠে এলো, বিকাশও নাকি এক বন্ধু পার্টনারকে নিয়ে অনেক বছর আগে দীঘায় হোটেল ব্যাবসা করতে শুরু করেছিল। তারপর পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে লোকসানে চলা ব্যাবসা শেষমেশ গুটিয়ে ওকে ফিরে আসতে হয়… তুই শুরু করলি তারপর বিকাশ গল্পটা ধরলো…আগে কোনোদিন ওর মুখে শুনিনি। বেশ ইন্টারেস্টিং। যাই হোক, তাড়া থাকায় আর সবটা শুনতে পেলাম না। পরে বাড়ি যেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো, এ তো মেঘ না চাইতেই জল! তিনটে ছবিকে একটা ফ্রেমে নিয়ে এসে, নিজেকে অভয় সাঁধুখার জায়গায় বসিয়ে, গলা পালটে, ফোন নম্বর চেঞ্জ করে রায় বাড়ির দোতলার কোণের দক্ষিণমুখী ঘরটাতে একটা ভুতুড়ে নাটকের উপস্থাপন করলে কেমন হয়? একসময় ইস্কুল,কলেজ প্রোগ্রামে অভিনয় করতুম, কল্পনা করে গল্পও লিখেছি কতো..। তারই কিছুটা খরচ করে ওর স্মৃতিশক্তিটা লোপ পাইয়ে দিয়ে বাজিটা যদি জিতে নিয়ে আসতে পারি…হা..হা…হা…হা..শেষমেশ ভয়ে ময়ে তোর দাদা কি করলো জানিস? হঠাৎ আসা ঝোড়ো হাওয়ায় দরজার কড়াগুলো বোধহয় নড়ে উঠেছিল.. আর ও ভাবলো ভূত বুঝি ওর ঘরের দোরগোড়ায়.. ..! বাছাধনের মুখেই যত বারফাট্টাই..ভেতরে আসলে ফানুস…নইলে এই আজগুবি গপ্পে কেউ সাড়া দেয়? বাজি লড়তে গিয়ে শেষকালে নিজেই কিনা সত্যিকার ভূত হয়ে গেলাম…হো..হো..হো…! আজ আসছে তো অফিসে? আসুক একবার দেখি…হ্যালো হ্যালো হ্যালো…!’
আবার কেটে গেল লাইনটা।
রায় বাড়ির দক্ষিন কোণের দোতলার ঘরে গতকাল গভীর রাতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা শেষমেশ চোখের জলে শেষ হবে, ভাবতে পারে নি বিকাশ চন্দ্র রায়ের দীর্ঘ দিনের কলিগ বন্ধু অভয় চট্টরাজ।ঐ ঘরেরই বাঙ্কে রাখা এটা সেটা জিনিসপত্রের পেছনে একটা মরচে ধরা ট্রাঙ্কের ভেতর হাবিজাবি, অদরকারী কাগজপত্রের ফাঁকে দিন কয়েক আগেও রাখা ছিল তিরিশ বছর আগে সদ্য হোটেল ব্যাবসা শুরু করা অভয় সাঁধুখা নামে কোনো এক ব্যক্তির বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া একটা ধূলিধূসরিত ব্যাঙ্ক পাসবই। অতীত বোধহয় কোনো না কোনো ছাপ ঠিক রেখে যায় কোথাও একটা, যার হদিশ জানে শুধু এ বাড়ির একজনই।
শোকস্তব্ধ বাড়িটা আজ যেন ভেঙে নুয়ে পড়া একটা বটগাছের মতো… যার ছায়া এতকাল বেঁধে রেখে এসেছিল একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষকে। শান্তির আশ্রয়ে। এক লহমায় স্মৃতি হয়ে গেল গাছটা।
ফুল,মালা,চন্দনে সাজানো দেহটার সামনে স্থানুর মতো দাঁড়িয়েছিল গণেশ। চলে যাচ্ছে সেও। ছায়ার আশ্রয় ছেড়ে। দেশের বাড়ি। ছেলের কাছে। ছেলে সেখানে বাঁধা মাসমাইনের চাকরি করে। বাবাকে আর কাজের লোকের পরিচয়ে থাকতে দিতে রাজী নয়।
যাবার আগে শুধু একটাই জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে গণেশ।
দাদাবাবুরা সব দীঘায় গিয়েছিল বেড়াতে। একা বাড়িতে ঘর দোরগুলো সাফসুতরো করছিল গণেশ। দাদাবাবুর ঘরের বাঙ্কে এটা ওটা জিনিসের পেছনে এক কোণায় পড়ে থাকা টিনের ট্রাঙ্কটা কি মনে করে ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে ভেতরকার পুরনো কাগজগুলো সরাতেই চমকে ওঠে সে! কাগজের গায়ে লেখা, মনে থেকে যাওয়া নামটা পড়ে ফেলতে অসুবিধা হয়নি নাইন পাশ করা গণেশের। আজ পর্যন্ত বাবুকে না বলে ওনার কোনো জিনিসপত্রে হাত দেয় নি গণেশ। সেদিনই প্রথম কি যে হলো হঠাৎ!
….মনে পরলে এখনো বুকের ভেতরটা কিরকম করে ওঠে গণেশের। দুপুরবেলা। মা ঠাকরুন আর বিকাশ দাদাবাবু ঘরের ভেতরে খাওয়া দাওয়া করছে।মেশোমশাই অফিসে। এমন সময় পুলিশ এসে হাজির। সোজা ঘরে। বিকাশ দাদাবাবুকে জেরার পর জেরা। সুরেশ দাদাবাবু তখন কতো ছোটো। হাফপ্যান্ট পরতো।ইস্কুলে গিয়েছিল। ঐ ঘটনার বিন্দুবিসর্গ কিছুই সে জানতো না। আড়ালে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটাই সেদিন আর অজানা রইলো না গণেশের কাছে। কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারে নি কিছুতেই , ঐ মানুষটা এরকম একটা অপরাধের সঙ্গে..! জয় হলো সেই দাদাবাবুরই।
আজ যখন সে সব কিছু ভুলে গিয়েছে মানুষ, তখন নিজের একটা ভুল বশত কেন সে এ কাজটা করে ফেললো! কেন বাঁচিয়ে রাখতে পারলো না তার মনে, এতদিনকার মানুষটাকে!
ঝোলা ব্যাগের ভেতর সন্তর্পণে রাখা সবুজ রংয়ের পাসবইটার দিকে একঝলক নজর চলে যায় গণেশের…।
তিরিশ বছর আগে ফেলে আসা খবরের কাগজের একটা রিপোর্ট…’ দীঘা সৈকতের কাছে ব্লু মুন নামে একটি হোটেল তৈরি করে ব্যাবসা করতে আসা দুই যুবকের মধ্যে এক যুবক.. হোটেলটা যে ব্লু মুন ছিল না। ছিল সৈকতাবাস… ভুলবশত ঘটে যাওয়া অর্ধসত্য শিরোনামটিকে চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেবার মতো কেউ হয়তো নেই আজ আর। রয়ে গেছে একজনই… নির্ণিমেশ চোখে দাদাবাবুর বিদায়ী যাত্রার দিকে তাকিয়ে। ঝোলা ব্যাগে সন্তর্পণে লুকোনো সে অতীতের কলংক…আর কেউ কোনোদিন হদিশ পাবে না শেষ সম্ভাবনাটুকুরও।
চল্লিশ বছরের চেনা বাড়িটা যে নিজের চেয়েও প্রিয় তার কাছে…
হাজার বছর আগেও আমরা বলেছিলাম
‘একদিন ঠিক আসবে।’
একশো বছর আগেও আমরা বলতাম
‘দেখে নিও একদিন ঠিক আসবে।’
শতবর্ষ পরেও আজও আমরা বলি
‘আসবে আসবে, একদিন ঠিক আসবে।
‘
আমরা হাজার বছর অপেক্ষা করেছি
আমরা একশো বছর অপেক্ষায় ছিলাম
আমরা আজও অপেক্ষায় আছি
একদিন কি এসেছে? একদিন কি আসেনি? একদিন কি আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায়নি ?
আমরা কি একদিনকে চিনতে পেরেছি?
নাকি একটা অনাগত একদিনের জন্য
আগত একদিনকে অবজ্ঞা করেছি মাত্র?
আমরা কি দেখেও না দেখার ভান করেছি
ছুঁড়ে ফেলে, চাপা দিয়ে, মুখ বন্ধ করে রেখেছি
যেই একদিন আমাদের সম্মুখে এসেছিল একদিন।আমরা কি সত্যিই চিনতে পারিনি একদিনকে?
আমরা এখনো বহুদিন থেকে অপেক্ষায় আছি
‘একদিন আসবে’ বলে।
যে একদিন হবে আমাদের একটা
সত্যি কারের একদিন।
যে একদিন হবে আমাদের ইচ্ছে পূরণের একদিন
যে একদিন হবে আমাদের স্বপ্ন পূরণের একদিন
কিন্তু, একদিনে কি সব ইচ্ছে, সব স্বপ্ন পূরণ হয়?
শুধু ঘটে আর নিরাকারে মন গলে না আর কৃষ্ণানন্দ চাইলো তখন তোমার চমৎকার নবদ্বীপে ভরা তখন কৃষ্ণ কৃষ্ণ ডাক মাতৃনাম শুনলে বলে,”ম্লেচ্ছ, নিপাত যা” প্রত্যেক দিন মহেশের পো, দাওয়ায় বসে কাঁদে বলে, “মাগো,গালি গালাজে প্রাণ টা নাহি বাঁচে” একদিন যায় দুইদিন যায়, তিন দিন হয় পার কবে আমার মায়ের সে রূপ পাবে মাটির আকার? কৃষ্ণানন্দ বিভোর হয়ে,কাতর ভাবে বলে, এবার দয়া করো তারিণী, মাতৃ শক্তি বলে-এমন সময় বিষম গরজে আকাশবানী হলো “একটি মেয়ে কে দেখতে পাবে এখুনি এগিয়ে চলো” কোথায় যাবো?কোথায় পাবো?মেয়ে দেখে কি হবে? কৃষ্ণানন্দ বড় অশান্ত প্রশ্ন করলো যবে আবার গরজে আকাশবানী গম্ভীর অতি ঘোর, “ওর মুর্খ এত কথায় কাজ কি আছে তোর? মা যে আছেন সবার মাঝে ভুলে গেলি কি ভাবে?””ভুল হয়ে গেছে” কৃষ্ণানন্দ বলে সলজ্জ ভাবে।আকাশবানী ইষৎ হাসিয়ে আবার কহিল,” ওরে,মায়ের যে রূপ বাঁধা পড়ে আছে তোর মনের ওই ঘরে। সেই রূপ যে আজ প্রতি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থ তোকেই লিখতে হবে”আকাশবানীর আদেশ শুনে ভোরের আলোর আগেই কৃষ্ণানন্দ নবদ্বীপের অলিতে গলিতে ছোটে। কোথায় কালী? কোথায় সে মেয়ে?? কোথায় সে রূপ হেরি আমি কেবলই পথে পথে ঘুরেঘুরেই মরি আক্ষেপ করে কৃষ্ণানন্দ এমন সময় দেখে দূরে ওই কুটিরের পাশে মেয়ে মানুষই বটে!!!!ছুটে আসে কাছে দেখে কালো মেয়ে খোলা চুল অতি ঘোর সিঁদুরে লেপা কপাল আর হাতে এক তাল গোবর ঘুটের জন্য করে তোড় জোড় তাকে দেখে সে হাসে মুখ টিপে বলে, ” তুই ছুটেছিলি দেখা পাওয়ার আশে?” কৃষ্ণানন্দ কাতরে বলে, “মা গো অন্তর্জামী” মা হেসে বলে, ” বড্ড রে তোর বেড়েছে ফাজলামি” ” আমি যে জগৎ বিশ্বব্যাপী,সবই আমার রূপ,তবুও তুই কেন গড়বি রে ব্যাটা আমার মাটির রূপ” কৃষ্ণানন্দ নিবিড় চিত্তে বসলে পায়ের কাছে, বলে সবিনয়ে তার নিবেদন মায়ের কাছে এসে, “জগতে তোমার এত ব্যাটা বেটি সবাই তোমাকে চায় চিন্ময়ী বা মৃণ্ময়ী তারা কোনো রূপেই না পায় তব শ্রী চরণ ভরসার তরী ঘটে তো চরণ নাই, কি করে তবে বিনা চরণে বৈতরণি বাই?? তাদের জন্য, সবার জন্য মৃন্ময়ী রূপ ধরো, দক্ষিণাকালী রূপে মাগো তুমি আত্মপ্রকাশ করো”ছেলের কাতর প্রার্থনা শুনে মন গলল, মা’র কৃষ্ণানন্দ হাতেই মাতৃমূর্তি পেলো আকার দক্ষিণাকালী পূজা সেই থেকে চালু হলো এই ভাবে কৃষ্ণানন্দ “আগমবাগীশ” প্রসিদ্ধ হলো ভবে।।: অনির্বাণ আচার্য ঠিকানা : তীর্থনীড় এপার্টমেণ্ট, কৃষ্ণকালীতলা,মালদহ, পিন -৭৩২১০১
অনেকদিন ধরে ভাবছি তোমাকে একটা চিঠি লিখবো। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠে না। চাকরি করতে রাজ্যের বাইরে চলে এসেছি। বেশিরভাগ সময়ই মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তোমার সঙ্গে তেমন কথা হয় না। মুঠোফোনের ব্যবহারটা তুমি সেভাবে পারো না। আবার ফোন ধরিয়ে দিলে ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলতেও তুমি অভ্যস্ত নও। শৈশব থেকে তোমার সঙ্গে কথা খুব কম হয়েছে। বরাবরই তুমি গুরুগম্ভীর মানুষ। ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে। কলেজ স্ট্রিটে একটু বর্ষাতে জল দাঁড়িয়ে যায়। আর তুমি সেই বর্ষার মধ্যে, আমার স্কুল ইউনিফর্ম টা ঠিকঠাক রাখার জন্য আমাকে নিজের কাঁধে চাপিয়ে স্কুলের গেটে নামাতে। নিজের চামড়ার জুতো আর প্যান্ট হাঁটু অব্দি ভিজে যেত। সেগুলোর তোয়াক্কা করতে না। আমি সেইদিন তোমার স্নেহ বুঝতে পারতাম না। স্কুলের স্যার এদের কাছে আমার পড়াশোনার খবর নিতে। আমার বুক ধড়ফড় করত। আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতে। আমাকে বড় করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছ। দুই দিদি, আমি, মা আর তোমাকে নিয়ে ভাঙাচোরা টালির বাড়িতে থেকে আমাদের দিনযাপন হতো। সরকারি চাকরির মাইনেতে সংসারের সব চাহিদা পূরণ হতো না। তার জন্য তুমি চাকরির পাশে শাড়ির ব্যবসাও করতে। যদিও সেই ব্যবসা ডুবে গেছে। স্কুল ছুটির পর আমি সূর্য সেন স্ট্রিটে ইংরেজি পড়তে যেতাম। অফিস ছুটির পর আমাকে আনতে যেতে। ইংরেজি স্যার, আমি আর তুমি শিয়ালদা অব্দি হেটে আসতাম। রাত ৮.৩৫’এ ট্রেন ধরবো বলে বেশ জোরেই হাটা হত। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমার হাঁটু ব্যথা হয়ে যেত। ট্রেনে ওঠার পর তুমি কোন কোন দিন হাঁটু থেকে গোড়ালি অব্দি টিপে দিতে। অনেক স্বপ্ন দেখতে আমাকে নিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য। জানিনা আমি মানুষ হতে পেরেছি কিনা। তবে এটুকু বুঝতে পারি তোমার সুপুত্র হয়তো হতে পারিনি। তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। অনেক দায়িত্ব আমি পালন করতে পারিনি। তবে আজও চেষ্টায় আছি ভালো ছেলে বা দায়িত্ববান ছেলে যাতে হয়ে উঠতে পারি। আমার জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আজ তুমি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছো। তবুও আমি বাড়ির দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারিনি। বাবা মনে পড়ে তুমি, আমি আর মা পুরী ঘুরতে গিয়েছিলাম তোমার অবসর নেওয়ার কিছুদিন আগে। জগন্নাথ মন্দিরে ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলে। তোমার চোখে জল ছল ছল করছিল। তুমি হয়তো আমাকে নিয়ে সেদিনও চিন্তায় ছিলে আর আজও চিন্তায় আছো। শারীরিক সমস্যা আমার একটা আছে। সেটা নিয়ে তোমার আর মায়ের অনেক চিন্তা। ডাক্তার বলেছে আমাকে সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। সেটা নিয়েও চিন্তা করো তোমরা। তবে বেশি চিন্তা করো না বাবা। আমি আমার অসুস্থতা সম্বন্ধে সচেতন। তাই প্রতিদিন নিয়মিত ওষুধ খাই। তবে তোমরা যেদিন থাকবে না , সেদিন হয়তো মনে করিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না যে “বাবু ওষুধ খেয়েছিস তো “? হ্যাঁ, বাবা। সেদিনও নিয়মিত ওষুধ খাবো নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য। কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি চেষ্টায় আছি যদি একটু ভালো ছেলে হতে পারি। আর দুই থেকে তিন বছর আমাকে সময় দাও। তারপর সব দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নেব। তোমাদের কোন অভিযোগ থাকবে না। কথা দিচ্ছি। তোমাদের বাবু স্বাবলম্বী হতে শিখেছে। আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক উন্নতির পথ দেখতে পাচ্ছি। তুমি শুধু ভালো থেকো। সুস্থ থেকো। নিজের কাজের জায়গায় একটা সম্মান তৈরি করেই বাড়ি ফিরব। তোমরাও মন প্রাণ খুলে হাসতে পারবে। তোমরা লোকজনের কাছে আমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবে। তোমাদের বাবু দাঁড়িয়েছে এই ভেবে।