‘উপন্যাস’

নিখিলেশ এবং

আজ আমার শ্বশুরকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। গতকাল মাঝরাতে কখন এসেছেন জানা নেই, আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি তিনি আমার মুখোমুখি বসে আছেন। আমি চোখ মুখ ধুয়ে বসে পড়লাম ওনার সামনে। গম্ভীর মুখে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কেন কে জানে! আমি বললাম,শুনলাম কাল রাতে এসেছেন?

– হুঁ, তা কলকাতার খবর কি? শুনলাম নাকি এখানে খুব ঝামেলা চলছে?

– তা তো জানি না। আপনার কাছে কোনো খবর আছে নাকি ?

– তা নেই, তবে তোমার সাথে আমার কিছু বিশেষ কথা আছে।

আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখলাম মহামায়ার মুখ ভার। বুঝতে পারলাম বিশেষ কিছু হতে চলেছে আমার সাথে। শ্বশুরমশাই বললেন,এসব কি শুরু করেছ তুমি? হঠাৎ হঠাৎ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছ। সবসময় একটা ভাবের ঘোরে থাকো। তোমার প্রবলেমটা কি?

– আজ্ঞে, আমার তো কোন প্রবলেম নেই। আর বিয়ের পর আমি একবারই বাড়ি থেকে পালিয়েছি।

– মানে? একজন বিবাহিত মানুষ, বাড়ি থেকে পালাচ্ছে , এটা কি একটা হাস্যকর বিষয় নয়? মহামায়া খুব আপসেট।

– মানুষ পালাতে পারলেই নিজেকে খুঁজে পায়। এই যেমন আপনি, আপনিও পালাতে চান তবে পারেন না। কারণ আপনার মেয়ে।

– আমি পালাতে চাইনা। আর সকাল সকাল ফিলজফি দেবে না।

– আজ্ঞে দেব না।

– আমার কিছু কথা রাখতে হবে।

– যথা?

– বাড়ি থেকে পালানো চলবে না। তোমাদের বিয়ের আগে অনেকেই আমায় বলত ছেলের মাথা খারাপ, বিয়ে দেবেন না। মহামায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বিয়েতে রাজি হলাম। এখন দেখছি….

– ছেলের মাথা খারাপ!

– অবশ্যই। মাথাটাই নেই। বাড়িতে বউ আছে অথচ বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এ কেমন ছেলে।

– অদ্ভুদ।

– আবার ফাজলামো মারছ। সকাল সকালে ফাজলামো মারবে না নিখিলেশ।

– আজ্ঞে।

– তোমার কি ইচ্ছাহয় আমায় বল। দেখি তোমায় সাহায্য করতে পারি কি না।

– আমার বই পড়তে ইচ্ছা হয়। উপন্যাস।

– বাহ্‌। তা কোন লেখকের? আমায় ব‍‌লো আমি কিনে দেব।

– আমার কোন প্রিয় লেখক নেই।

– আবার ফাজলামি শুরু করলে। প্রিয় লেখক নেই বললেই হল।

– আজ্ঞে সত্যি নেই। আমার মত প্রকৃত পাঠকের কোন প্রিয় লেখক থাকতে পারে না। কারণ প্রতিটি লেখক নিজের প্রতিভা অনুযায়ী রচনা লেখেন। তারমধ্যে বিশেষ করে কোন একজনকে প্রিয় বলা যায় না। পাঠকের উচিত রচনাকে ভালবাসা, রচনাকর্তাকে নয়।

আজ মাসের ১ তারিখ। এই দিনটায় আমার অফি‍‌‍‌সে যেতে ভাল লাগে না। কারণ এইদিনে আমাদের মাইনে হয়। আর মাইনে এলেই আমার মনে হয় আমি এজীবনে এসেছি অন্য একজনের ফাইফরমাস খাটতে। যার জন্য মাসের শেষে টাকা পাই। একটা জীবন পুরোপুরি নষ্ট। নিজের জন্য কিছু করলে মানুষ যদি টাকা পেত তাহলে ভাল হত। অলি গলিতে কত লেখক, কত বিদুষী মানুষ পাওয়া যেত।

ঠিক করলাম আজ ২টার সময় হাফ ছুটি নিয়ে চলে যাবো কলেজস্ট্রিট। কিছু বই কিনব। মানুষের কাজ যদি শুধু বই পড়া হত তাহলে হয়ত আমি ১নং’এ থাকতাম। মাঝে মাঝে ভাবি এক একটা জীবন যদি শুধু জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য হত তাহলে বেশ হত।

ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ২টো বাজে। বেরুতে যাব তখনই অফিসের বড়বাবু অলোকবাবু আমার কেবিনে ঢুকলেন। অলোকবাবু মানুষটা প্রাণখোলা মানুষ। সারাদিন শুধু কাজ নিয়ে থাকতে ভালবাসেন। জীবনটা যদি শুধু কাজ নিয়ে থাকার জন্য হত তাহলে অলোকবাবু ১নং’এ থাকতেন। আমার কেবিনে ঢুকে ধপ করে বসে বড়লেন তিনি। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমি বললাম,কি স্যার, কোনো গুরুতর ব্যাপার না‍‌ কি?

অলোকবাবু যেন আমার কথা শুনতেই পেলেন না। কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন,ভাই নিখিলেশ, বড় সমস্যায় পড়েছি। সাহায্য করতে হবে।

– বলুন।

– শুনেছি তুমি নাকি মুখ দেখে মনের ব্যথা বলতে পারো। তা বলোতো আমার মনে কি চলছে এখন।

– পরীক্ষা করছেন?

– অনেকটা সেরকমই। বলইনা দেখি একটু।

– আপনি খুবই ব্যক্তিগত সমস্যায় পড়েছেন। সমস্যাটা এমনই যে খুব বিশ্বাসি মানুষ ছাড়া আপনি বলতেও পারছেন না।

– ঠিক তাই। আর তারজন্যই তোমার কাছে ছুটে আসা।

– আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন জেনে ভাল লাগল। এই নিয়ে দু’জন মানুষ পাওয়া গেল যারা আমায় বিশ্বাস করে।

– আর একজন কে?

– মহামায়া, আমার স্ত্রী। এবার বলুন ব্যাপারটা কি?

– ব্যাপারটা খুবই পার্সোনাল, ঘটনাটা তোমায় খুলে বলি।মাসখানেক আগে আমি একটি মেয়ের সাথে আলাপ করি ফেসবুকে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। আমরা প্রায়ই কথা বলতাম ফেসবুকে। এরপর ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়। শুরু হয় ফোনে কথা বলা। হপ্তাখানেক আগে তার সাথে আমি দেখা করি, অনেক গল্প হয়। এইপর্যন্ত ঠিক ছিল। এখন মেয়েটি আমায় বলছে যে সে নাকি অপর একটি লোককে দিয়ে আমাদের পাশে বসে থাকার ছবি তুলেছে। সেই নিয়ে আমায় এখন ব্ল্যাক মেল করছে। বলছে টাকা দাও না হলে সব ফটো বাড়িতে চলে যাবে। আ‍‌মি বউ বাচ্ছা নিয়ে সংসারী লোক এসব কি ঝামেলা শুরু হল বলো দেখি।

– বুঝলাম। তা আমায় কি করতে হবে?

– তুমি মেয়েটির সাথে দেখা করে ওকে বলো যে এসব যেন বন্ধ করে।

– আমি! আমার কথা মেয়েটি শুনবে?

– আলবাত শুনবে। তুমি হলে নিখিলেশ। তোমার কথা শুনবেই। তুমি বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারো। এইটুকু হেল্প করে দাও ব্রাদার। মেয়েটির নাম মিনু। ওর ফোন নম্বর আমি তোমার দিয়ে দিচ্ছি!

বিকেল ৫টা বাজে। আমি নন্দনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ইতিমধ্যেই মিনুর সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ—

– হ্যালো, মিনু বলছেন?

– হ্যাঁ, আপনি অলোকবাবুর পরিচিত কেউ?

– সেকি! বুঝলেন কিভবে?

– আমি এরকম অনেককিছুই বুঝতে পারি। বলে যান।

– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। আজ দেখা করতে পারি?

– পারেন, তবে বেশিক্ষন না। কোথায় আসবো বলুন?

– ৫টার সময় নন্দন। কিন্দু আমি আপনাকে চিনব কিভাবে?

– আমাকে চিনতে লাগবে না। আমিই আপনাকে চিনে নেব। আপনি নন্দনের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়াবেন। আর লেট করবেন না। আমি খুবই পাঁঞ্চুয়াল মানুষ।

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

এখন ৫টা ১০মিনিট। মেয়েটির পাঁঞ্চুয়ালিটির সংজ্ঞায় কিছু ভুল আছে। এই নিয়ে তিনটে সিগারেট আর ২ কাপ চা শেষ হয়ে গেল। উদাস মনে আমি নন্দনের পোস্টার দেখছি। আর্ন্তজাতিক একটি সিনেমা চলছে। নামটা কি বিটকেল। উচ্চারনই করতে পারছিনা। হঠাৎ দেখলাম একটি লাল শাড়ী পরা সুন্দীর মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বয়স প্রায় তিরিশ। অবিবাহিত। আপাতত তাই মনে হচ্ছে কারণ হাতে শাঁখা, সিন্দুর নেই। যদিও এসব দিয়ে আজকাল বোঝা যায় না। মেয়েটি আমার সামনে এসে বলল,

– নিখিলেশবাবু!

– আজ্ঞে। আপনিই মিনু।

মেয়েটি বিরক্তির সাথে আমার দিকে তাকাল। হয়ত সবার মাঝে এভাবে নাম নেওয়াটা পছন্দ করেনি। মেয়েরা নিজের নামটাও সবার সাথে শেয়ার করতে চায় না। ঈশ্বরের অদ্ভুদ সৃষ্টি। মেয়েটি কঠিন ভাবে বলল, আগে আগে কোথাও বসি, তারপর বলছি আমি কে।

আমরা বসলাম নন্দন-এর পাশে একটি বেঞ্চে। লোকজন বেশ ভালই রয়েছে এখানে।

মিনু বসতে বসতে বলল, আপনি সিগরেট খান?

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

– সাথে সিগরেট থাকলে আমায় একটা দিন। তাড়াহুড়োতে কেনা হয়নি।

মিনু সিগারেট ধরালো। আমিও ধরালাম। ঠোঁটের বাঁ দিকে সিগারেট রেখে টেনে চলেছে মিনু। মনে হচ্ছে বেশ পারদর্শি একাজে সে। এসবের মধ্যে হঠাৎ‍‌ সে বলে উঠল, বলুন লিখিলেশবাবু কী কথা আছে?

– তেমন বিশেষ কিছু না। অলোকবাবুর ব্যাপারে। উনি খুব চিন্তিত, এভাবে ব্ল্যাকমেল করাটা কি উচিত হচ্ছে?

– মানে! উফফ মানুষটা দেখছি এবার আমার হাতের বাইরে চল যাচ্ছে। ও এসব বলেছে আপনাকে! আশ্চর্য! আপনি জানেন আসল ঘটনা কি?

– এরপরে‍ও কোনো ঘটনা আছে নাকি? থাকলে শুনব অবশ্যই।

– তাহলে শুনুন, আপনার অলোকবাবু একজন মানষিক রোগী। আর আমার নাম মিনু নয়। প্রতিমা। প্রতিমা চ্যাটার্জি। আমি একজন সাইক্রিয়ার্টিক ডাক্তার। মাসখানেক আগে উনি আমার চেম্বারে আসেন। ওনার মতে উনি নাকি একটি মেয়েকে দেখতে পান, তার নাম মিনু, তারসাথে গল্পও করেন। এখন আপনাকে বলেছেন যে সেই মেয়েটি নাকি তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছে। এত পাগলের পাগল।

– মানে মিনু নামে কেউ নেই?

– কেউ আছে কি না জানি না। তবে ইদানিং উনি আমার নাম দিয়েছেন মিনু। ব্যাপারটা কমপ্লিট হ্যালুসিনেশন।

– বুঝলাম। তাহলে এখন আমার কি করণীয়।

– ওনাকে গিয়ে বলুন যে মিনুকে বুঝিয়ে দিয়েছি। ও আর ব্ল্যাকমেল করবে না।

– বুঝলাম তাই করব। আপনাকে একটা কথা বলব?

– বলুন।

– আপনি কি বিবাহিত?

– হঠাৎ এই প্রশ্ন?

– ইচ্ছা হল তাই করলাম। আপনার অসুবিধা হলে প্রশ্ন ফিরিয়ে নিলাম।

– না অসুবিধা কিছু নেই। তাহলে শুনুন আমি বিবাহিত আর আমার স্বামী আমেরিকায় থাকে। সফ্‌টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।

বা‍‌ড়ি ফিরছি। মেট্রো স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে, কে ঠিক আর কে বেঠিক। তবে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। অলোকবাবুকে যতদুর বুঝেছি তিনি তিব্বতের লামাদের মতন। আজীবন একটাই মন্ত্র পড়ে যাবে। ডানে বামে কি হচ্ছে তাতে কিছুই এসে যায় না তার। এরকম একটা মানুষের মানষিক রোগ! হতেও পারে। এই শতাব্দীতে রোগের রুপ ও কারণ বড়ই অস্বাভাবিক। ইংল্যন্ডের এক বিখ্যাত সাইক্রিয়াটিক ডাক্তার বলেছিলেন, পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষই মানষিক রোগী। কেউ সেটা প্রকাশ করে কেউ করে না। কে জানে আমার আবার কোন মানষিক রোগ আছে। তবে আমার মন এখন বিভ্রান্ত। ফোনে নয়, সরাসরি কথা বলতে হবে অলোকবাবুর সাথে। সবচেয়ে অদ্ভুদ মানুষটা আমায় এখনও ফোন করল না। জানতে চাইল না মিনু মানে প্রতিমার সাথে আমার কি কথা হল। মনে হচ্ছে মিনুর কথাই ঠিক, মানে প্রতিমার কথা। উফ্‌ দেখেছ আমিও কেমন হয়ে যাচ্ছি।

দমদম স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি ট্রেন ধরব বলে। এখান থেকে মাত্র একটা স্টেশন পরেই আমাদের বাড়ি। তবে এই একটা স্টেশনে যাওয়ার যে চাপ তা সহ্য করার পর যখন ট্রেন থেকে নামি তখন মনে হয় পুনঃজন্ম পেলাম।

– নিখিলেশবাবু?

লোক‍‌টি কে বুঝতে পারলাম না। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। লোকটি আবার বলল,আপনি নিখিলেশ তো?

– আজ্ঞে হ্যাঁ।

– আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। আমি কে জানতে চাইবেন না?

– আজ্ঞে না। আপনি যেই হন আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।

– তবে আপনাকে নিয়ে আমার মাথাব্যথার যথেষ্ট কারণ আছে। শুনলাম আপনি নাকি মুখ দেখে ভ‍‌বিষ্যৎ বলতে পারেন।

– ভবিষ্যৎ নয় তবে মানুষটা কেমন তা বলতে পারি।

– তাহলে বলুন আমি কেমন মানুষ?

– ইচ্ছা নেই বলার। ট্রেন আসছে আমায় উঠতে হবে।

– প্লিজ, আমার খুব দরকার আপনাকে। আমার নাম সুকান্ত সেন। আমি প্রতিমার হাজবেন্ড।

– বাজে কথা, ওর হাজবেন্ড আমেরিকায় থাকে।

– হ্যাঁ থাকে, আর আমিই সেই মানুষ।

ট্রেনটা ছেড়ে দিতে হল। মানুষটার দিকে ভাল করে তাকালাম। এই এপ্রিলের গরমে একদম ফিটফাট হয়ে আছে। ফুলহাতা জামা, কালো প্যান্ট, চেহারায় কেমন একটা বস বস টাইপ। আমি বুঝতে পারলাম এ আমাকে ছাড়বে না। অনেকক্ষণ ধরেই পিছু করছে বোধহয়। নিতান্তই ভদ্রলোক তাই মুখফুটে কথা বলতে পারেনি। এর সাথে কথা বলা দরকার। আমরা স্টেশন থেকে বের হলাম। একটা চায়ের দোকানে বসলাম। চায়ের সাথে লোকটি আমার সিগারেট দিল। আমি টানতে থাকলাম। লোকটি বলল,আমার নাম সুকান্ত সেন।

– এই নিয়ে দু’বার বললেন।

– ও আচ্ছা। আমি আসলে খুব চিন্তিত। কি বলছি, কি করছি বুঝতে পারছি না। আমি প্রতিমার হাজবেন্ড। কিছু কথা আপনার সাথে শেয়ার করতে চাই।

আমি সিগারেট টানতে টানতে উদাস ভাবে বললাম, বলে যান শুনে যাচ্ছি।

– আমার সাথে প্রতিমার বিয়ে হয় বছর দু’য়েক আছে। সম্মন্ধ করে বিয়ে। বিয়ের মাস দুয়েক পর আমি আমেরিকায় চলে যাই। তবে প্রতিমার জন্য আমি গ্রীনকার্ড জোগাড় করতে পারিনি। এর পিছনেও একটি কারণ আছে। আমি আমেরিকা যাওয়ার পর থেকেই বাড়ি থেকে খবর আসে যে প্রতিমা মানষিক ভাবে অসুস্থ। মাঝে মাঝেই নিজেকে ডাক্তার, উকিল বা গোয়েন্দা বিভাগের লোক বলে মনে করে। মানে ব্যাপারটা পারসোনাল ডিসঅডার। আমি এখন এক বছরের বন্ডে গেছিলাম আমেরিকা। তাই এখন ভারতে আসতে পারতাম না। ঠিক এক বছর পর বন্ড শেষ হলে আমি ভারতে এসে ওর চিকিৎসা শুরু করাই। চিকিৎসা ভালই সাড়া দেয়। তবে ইদানিং আবার আগের মত শুরু করেছে, তাই আমাকে আবার আসতে হলো। এখন ভাবছি ওকে আমেরিকা নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। আপনি শুনছেন তো?

– শুনছি। আর তাই এখন বউয়ের পিছু করছেন?

– হ্যাঁ, তবে ঠিক পিছু না। ও কার সাথে কথা বলছে সেটা জানার চেষ্টা করছি। আর তারপর সেই মানুষটার সাথে দেখা করে পুরো ঘটনাটা খুলে বলে অনুরোধ করছি যাতে সে আর না মেশে প্রতিমার সাথে। আগের দিন আপনার বন্ধু অলোকবাবুকেও এভাবে সব বলেছিলাম। উনিই আপনার গল্প করেছিলেন। তবে উনি আমার কথায় বিশ্বাস করেননি। বলেছিলেন আপনাকে পাঠাবে প্রতিমার সাথে দেখা করার জন্য। আপনি জানেন আপনার বন্ধু আমার বউয়ের একটা নামও দিয়েছে— মিনু।

– প্রথমত, উনি আমার অফিসের বন্ধুনন, আমার বড়বাবু। দ্বিতীয়ত, আপনার মত একরকম, মিনু মানে প্রতিমার মত একরকম এবং অলোকবাবুর মতামত একরকম। আমাকে কি করতে হবে বলুন।

চায়ে শেষ চুমুক মেরে সুকান্তবাবু বললেন, আমি অন্যদের বলেছি আমার বউয়ের কাছ থেকে সরে যেতে তবে আপনাকে বলব আপনি একবার চেষ্টা করে দেখুন যদি কিছু করা যায়। মানে প্রতিমাকে যদি ঠিক করা যায়। কেন জানিনা আপনাকে দেখে ভরসা করতে ইচ্ছা করছে।

বাড়িতে ফিরলাম রাত ৮টা। ঢুকেই দেখি শ্বশুর লাল চোখ করে বসে আছেন। আর সাথে পেলাম হোমিওপ্যাথি ওষুধের গন্ধ। বুঝতে অসুবিধা হল না এক-দু পেগ চড়িয়ে বসে আছেন তিনি। মহামায়ার মুখ ভার। আজ সারাদিনে একবারও কথা বলেনি আমার সাথে। আমাকে দেখতে পেয়েই শ্বশুরমশাই গম্ভীর ভাবে বলে উঠলেন, নিখিলেশ হাম-মুখ ধুয়ে তোমার শোবার ঘরে এসো, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আমি গুটি গুটি পায়ে হাতমুখ ধুয়ে সোজা চলে গেলাম আমার শোবার ঘরে। শ্বশুর যখন মৃতসঞ্জীবনী খান তখন পেগের সংখ্যা অনুযায়ী ওনার মুড চেঞ্জ হয়। যেমন—

এক থেকে দুই—গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর

তিন থেকে পাঁচ-হাল্কা রসিক

পাঁচ থেকে উর্দ্ধে-অমায়িক, বন্ধুত্বপূর্ণ, দার্শনিক।

শোবার ঘরে ঢুকেই প্রথমে বোতলের দিকে চেয়ে বললাম, ক পেগ বাবা?

– মাত্র দুটি, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বসো।

আমি বসলাম একটি চেয়ারে। শ্বশুরমশাই তিন নম্বর পেগ শুরু করলেন।

– নিখিলেশ ?

– আজ্ঞে।

– আমি সকালে তোমায় অনেককিছু বলে ফেলেছি। I am sorry।

– আরে নানা sorry বলছেন কেন?

– sorry বললাম কেন? এক‍‌শো বার বলব, হাজারবার বলব। তু‌মি কে আমাকে থামাবার।

– ওকে Sorry।

– নিখিলেশ ?

– আজ্ঞে।

– আসলে তোমায় আমি খুব ভালবাসি। You are a good boy, a good Person । মাঝে মাঝে একটু মাথার পোকা জেগে ওঠে। সে উঠুক। ক্ষতি নেই। তবে তোমার নিয়ে চিন্তায় থাকি। যাইহোক, তা শুনলাম কলকাতায় নাকি কিসব ঝামেলা চলছে।

– ঠিকই শুনেছেন। গড়ের মাঠে বোম পড়েছে।

– সে কি! কখন?

– বিকেলে।

– ও, সে পড়ুক। আসলে আমি এমন একটা কাজ করি কাউকে বলতেও পারি না। সারাদিন চোর পুলিশের খেলা। এমন ডিপার্টমেন্ট যে কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতে হয় পুলিশে কেরানির কাজ করি। ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট বলে যে একটু বুক ফোলাবো তার উপায় নেই।

শ্বশুরের পাঁচ নম্বর পেগ শেষ। এবার তিনি দার্শনিক হতে চলেছেন। আমিও প্রস্তুত। মাঝে দু’কাপ চা শেষ করলাম।

– বুঝলে নিখিলেশ, জীবনের শুরুটা শুন্য থেকে আর শেষটাও সেই শূন্যে গিয়ে। মাঝের এই সময়টায় মানুষ তার মনের মতন সংখ্যা বসিয়ে যায়। তাতে লাভ কি হয়। শেষটাতো সেই শূন্যেই।

– আমি অঙ্কে খুব কাঁচা। কি বলছেন বুঝতে পারছি না।

– কি বলছি বুঝতে পারছ না! তুমি দর্শন বোঝ না?

– আজ্ঞে হ্যাঁ, তবে আপনি যা বলছেন তা অনেকেই বলে গেছে। নতুন কিছ শুনবেন?

– নতুন কিছু? নতুন কিছু কি আবার?

– আছে, আমি আপনাকে একটি গল্প বলব তবে আপনাকে গল্পের শেষে বলতে হবে কে অভিনয় করছে আর কে আসল দোষী।

– ওকে, Done, বলব, আমার পুলিশি কেরিয়ারের দিব্যি। বলো।

আমি শুরু করলাম অলোকবাবু, মিনু আর সুকান্তবাবুর ঘটনা পুরো বললাম। সব শুনে শ্বশুরমশাই হেসে উঠে বললেন,হে‍‌ হে, এত খুব সহজ নিখিলেশ। আসল কালপিটই হল ঐ সুকান্ত। ওই ব্যাটা বউটাকে পাগল বা‍‌নিয়ে রেখেছে।

– তাহলে আপনি বলছেন মিনুর মানসিক প্রবলেম আছে?

– হ্যাঁ, আছে, আর ভাল মতই আছে।

পরেরদিন একটু সকাল সকাল অফিসে পৌঁছলাম। অলোকবাবু অফিসে ঢুকে সোজা আমার চেম্বারে ঢুকেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আর বললেন,ভাই নিখিলেশ বাঁচিয়ে দিয়েছো, একটা ভিজিটেই প্রবলেম Solved।

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,বুঝতে পারছি না কি বলছেন।

– আরে মিনুর মাথা থে‍‌কে ব্ল্যাকমেলের ভুত নেমে গেছে ভাই। ও কালকেই আমায় ফোন করেছিল।

– যাক ভালই হল।

বলতে বলতেই আমার ফোন বেজে উঠল। আমি ফোন তুললাম, ওপাশে থেকে এক মহিলা বললেন, তোমার সাথে আমার পাশে বসার ছবি আমি তুলে নিয়েছি। আমার একটা লোক তোমার কাছে চলে যাবে। তার হাতে ১লক্ষ টাকা ক্যাশ দিয়ে দিও। না হলে সব ছবি তোমার বাড়িতে চলে যাবে। লোকটির নাম সুকান্ত।

(চলবে)

:কৌশিক দে

জ্যোতিষী

টিভিতে পালা করে আজ তপন শাস্ত্রী তো কাল রতন শাস্ত্রী। আজ আর কালের ব্যবধানে তো চব্বিশ ঘন্টা লাগে। আজকাল একই সঙ্গে একই দিনে দু- তিনটে চ্যানেলে একই সঙ্গে বারো চোদ্দ জন জ্যোতিষীদের ভিড় লেগে থাকে। এ বলে আমাকে দেখ তো ও বলে আমাকে। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব রে বাবা!

ভেরি কনফিউসড্।

প্রতিকার একটা চাইই…

মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে, সঠিক পাত্র জুটছে না! ছেলের চাকরীর যোগ কবে থেকে শুরু? গিন্নীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না একদম, উপায় বলুন বাবা!-এমন হাজারো প্রশ্ন দর্শকদের লেগেই থাকে।

দাদা বাবারাও তাদের সামনে রাখা ল্যাপটপে জন্ম তারিখ, সময় পুট করছে আর পুট পুট করে উপায় বাতলে দিচ্ছে। ফল হাতে হাতে পাবেন সামনের অগ্রহায়ণ মাস থেকে কিম্বা সামনের জুলাই মাসের পনেরো তারিখের পর থেকে। পারলে আমার চেম্বারে একবার চলে আসতে পারেন। বারাসাত, চাকদা, মালদা, শেওরাফুলি, চুঁচুড়া, বর্ধমান, কৃষ্ণনগর, এগরা, মগরা সব জায়গায় আমার চেম্বার আছে। একনাগাড়ে বলতে গেলে গলা শুকিয়ে যাবে। টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখুন কবে কোথায় বসেন আমাদের শাস্ত্রীজি সবটা দেখতে পাবেন। প্রতিকার না পেলে মূল্য ফেরতের গ্যারান্টি দিতেও বাবারা কার্পণ্য করেন না। বাবার পাশে বসা মেয়েটা একটার পর একটা ফোন রিসিভ করছে। বাবার কথার ওজন কুইন্টালের থেকেও ভারি এভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে পাশে বসা তন্বী।

বাপরে বাপ্!

বাবা দাদাদের হাতে আংটির ছড়া ছড়ি, গলায় মাদুলি কিম্বা বাবাদুলি। মাথায় কারোর জটা, কারোর আবার মুখ ভর্তি দাড়ি। মর্ডান জ্যোতিষ দাদারাও আছেন টাই স্যুট পরা।

কাউকে বলছেন, ‘শনির দশা চলবে আগামী আড়াই বছর’, কাউকে আবার বলছে, ভৌম যোগের কারণে আপনার বিবাহিত জীবন সুখের হচ্ছে না।’ আবার কাউকে ভয় দেখিয়ে বলছেন, ‘আপনার মেয়ের যে এখন মাঙ্গলিক যোগ রয়েছে, বিয়ের প্রধান অন্তরায় এটি।’ যোগ গুলোকে বিয়োগ করতে গেলে আমার কাছেই আসতে হবে একথা একদম বলছি না, যেকোনো ভালো জ্যোতিষীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন’- এভাবে নিজের পদমর্যাদা বাড়িয়ে তোলেন ভগবানের অবতারেরা।

কাজ না থাকলে, শুনতে মন্দ লাগে না। গোটা দেশজুড়ে করোনার জন্য লকডাউন চলছে। এখন একদম হাতে কাজ নেই।‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কনসেপ্ট পশ্চিমবঙ্গেও চালু হয়েছে। কিন্তু আমাদের কাজ সেরকম নয়। তাই ছুটি পুরোপুরি।

ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম আজকে কোনো একটা নামজাদা বাবাকে জিজ্ঞাসা করবই, ‘করোনার এই করালগ্রাস থেকে বিশ্ব কবে মুক্তি পাবে? কবে স্বাভাবিক হবে আমাদের জীবন?’

ফোন করলাম।

বাবার শো গুলোতে অ্যাঙ্কারিং করা মেয়েটা সুমধুর কন্ঠে জানিয়ে দিল, ‘এখন যে শোগুলো টিভিতে দেখছেন। ও গুলো লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে না। বাবা এখন হোম কোয়ারিন্টেনে রয়েছেন। বাবা কিছু বলতে পারবেন না!’

প্রশ্নটার উত্তর বাবার কাছ থেকে আশাও করিনি।

তবে জ্যোতিষীর ক্ষমতা আছে। আমার মনের প্রশ্নটা আগে থেকে বুঝতে পারল কি করে!

ড. প্রদীপ ঘোষ

নাড়ুয়া, সত্যপীরতলা

পোষ্টঃ চন্দননগর, জেলা- হুগলী

(বি.দ্র. সব চরিত্র কাল্পনিক। কারোর কোনো বিশ্বাসে আঘাত করার জন্য লেখা নয়। এটা শুধুই গল্প)

“বাউল”

– ” বাপ, আজ ঈদের তারাবি নামাজ পড়বিনি ? জুম্বাবারের নামাজও পড়লিনি দুপুরে? ”

– ” কেন নামাজ পড়লুম তো ইফতারের পর। তুই শুনিস নি –
‘ নূতন প্রাণ দাও প্রাণসখা ,
আজি সুপ্রভাতে ।।
বিষাদ সব …….
প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে।। ‘

আজ পঁচিশে বোশেখ। আজ রবি ঠাকুরের কবিতা পাঠ করলুম। ওটাই আমার সারাদিনের নামাজ।”

– ” শোন শ্যামলীর মা, এই নিয়ে তিনদিন কামাই করলে, কাল ফের কামাই করলে মাইনে কেটে নেব।”

– ” কাল আমি আসছি না। কাল আমার ছোট্ট পাপান, কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করবে। অনেক কষ্টে ও সিলেক্ট হয়েছে। শুনতে পাচ্ছেন খোলা ছাদে ও কি সুন্দর আবৃত্তি করছে ঐ দেখুন-

‘ চিত্ত যেথা ভয় শূন্য/ উচ্চ যেথা শির….
…….. ……..প্রাচীর…… ‘

– ” গুরুপ্রীত, তোমার পাঞ্জাবী হোটেলের তন্দুরিটা কিন্তু অসাধারণ বানাও । সন্ধ্যেতে গেস্ট আসছে। তন্দুরি আর কাবাবটা বানিয়ে রেখ। আমি এসেই … ”

– ” সাব, আজ তন্দুরি নেহি বানায়েঙ্গে। আজ রবীন্দ্রনাথকা জনম্ দিন হে। ইসলিয়ে হাম বাঙ্গালী খানা বানায়েঙ্গে। ”

– ” রোজলিন, তোর ঐ ফরাসী বয়ফ্রেণ্ডকে ধুতি পরে কেমন ” পুরুত ঠাকুর ” এর মতন লাগছে। সবাই হাসছে। ”

– ” আমিই বলেছি পরতে। আজ জানিস তো কি দিন ? আজ ও রবি ঠাকুরের গান করবে পাড়ার অনুষ্ঠানে। ”

-” তোমাদের আদিবাসীদের দম আছে। এগারো মাইল রোদে হেঁটে থ্যালাসেমিয়া দিবসে রক্ত দিতে এসেছ শহরে। ”

-” বাবু তু মুকে যা বুলিস বুল ক্যানে , মু আইছি রবি ঠাকুরের গান শুনবার লিগা। আজ তো উহার “হ্যাপী বার্থ ডে” টো আছেক। আহা! পরাণ জুড়াইন যায় উ গানে-

” যদি তোর ডাক শুনে কেউ ….

চল রে……”

আটত্রিশ বছর কেটে গেছে। হুগলীর বলাগড় একটু একটু করে সাবালকত্বের তুলসীতলা পেরিয়েছে। সেদিনের বাসির চাচা, শ্যামলীর মা, গুরুপ্রীত, রোজলিন, চুমরি কেউই নেই। তবু এলাকার মানুষদের বৈশাখের একটি বিশেষ দিনকে নিয়ে আবেগ , মাতলামির যেন শেষ নেই। শব্দগুলো ঘটনাগুলো ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজও ছোট ছোট “ভিসুভিয়াস” তৈরী করে।

অগোছালো গ্রামের গন্ধ মেশা গঙ্গাপাড়ের ঐ অঞ্চলটার পঁচিশে বৈশাখ আসলেই ছটফটানি শুরু হয়ে যায়।

**********

ঝরণা তখন সেনবাড়িতে সবে পা রেখেছে। জমিদার শ্বশুড়ের চাবুকের শব্দ কলকতা অবধি শোনা যায়। শ্বাশুড়ির হুঙ্কারে বাঘে গরুতে…।

গায়ের রং শ্যামলা, খুব সুশ্রীও নয়। গরীব বাবার মেয়ে তাই জমিদারবাড়িতে আদর কম। একটু কোণঠাসাও বটে। শুরুতেই সবার অপচ্ছন্দের তালিকাতে।

পঁচিশে বৈশাখের দিন অঘটনটা ঘটল।

থ্যালাসেমিয়া রোগটা তখন মানুষ অতটা জানত না। ছোট মসজিদ পাড়ার নিজামুদ্দিনের ছেলেটা রক্তের অভাবে মারা গেল। এক সপ্তাহ পড়ে পাঞ্জাবী পাড়া , আদিবাসী কলোনীর দুটো তাজা প্রাণ ঝরে গেল থ্যালাসেমিয়ার কবলে।

ঝরণা চুপ থাকেনি। পঁচিশে বৈশাখের দিন বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে আয়োজন করেছিল ব্লাড ডোনেশান ক্যাম্প। সেবার পঁচিশে বৈশাখ থ্যালাসেমিয়া দিবস একই দিনে পড়েছিল। সন্ধ্যেতে হাইস্কুলের মাঠে ঝরণার উদ্যোগে শুরু হল “রবি প্রণাম”। ঝরণা নাচও করল।

” মায়া বন বিহারিণী/
থাক থাক নিজ মনে……. ”

জমিদার রুদ্রপ্রতাপ সেনের সন্মান সেদিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। সেনবাড়ির মেজবৌ স্টেজে নাচছে বলে। দুবছর পরেই ঐ একই দিনে রুদ্রপ্রতাপের সৌখিন ঝাড়বাতি আবার ঝলমল করে ওঠে ঝরণার প্রতিভার ছটায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে উনি দেখলেন তাঁর আদরের বৌমা কি সুন্দর কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করছে সাহেবি ঢংয়ে-

” Where the mind is without fear
My head…….. ”

ঝরণার প্রচেষ্টায় বলাগড় হসপিটালেই তৈরী হল ছোট ব্লাড ব্যাঙ্ক।শ্বাশুড়ির দামী জামদানি সেদিন চোখের জল শুষে নিয়েছিল।

” বৌমা , তুমি ইংরাজীতে কবিতা বলতে পার ? ” শ্বাশুড়ির মুখের জ্যামিতিতে তৃপ্তির হাসি।

ঝরণা বেশীদিন বাঁচেনি। ব্লাড ক্যানসারে মারা যায়।
প্রায় চার দশক পরে বৈশাখের এই দাবদাহে মনে হল আবার যেন ঝেঁপে বসন্ত এসেছে বলাগড়ের অলি গলিতে। গান, কবিতার বসন্ত।

রমজান মাস। সেনবাড়ির মাঠেই চলছে ইফতার আর নাটকের মহড়া। কখনো ভেসে আসছে “শ্যামা” , “চিত্রাঙ্গদার” সংলাপ কখনো বা “চণ্ডালিকা” , “বীরপুরূষ”।

“কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…. ”

“রিমি ঐ মেয়েটি চুমরির মেয়ে ঝুমরি না ?”

কি সুন্দর নাচছে ! ঠিক তোর মেজকামণির মত। আজ আবার কবিগুরুর জন্মদিন। আজ বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসও।

বাসিরচাচার মেয়ে শহরবাণু “বাউল” কবিতাটি পাঠ করল।
“দূরে অশথতলায়….
বাউল দাঁড়িয়ে আছ তুমি
…… …… একতারাটি হাতে…..”

শ্বাশুড়ির মন হল মেজবৌমাও যেন এক বাউল। নিরাভরণ অহংকারহীন। বাউলের মতন পথে ঘাটে মাঠে সর্বত্র চলাফেরা।
শ্বাশুড়ি ধীর পদক্ষেপে ঘরে এসে ছল ছল চোখে ঝরণার প্রিয় গানটা বাজাল।

“…… না পেয়ে তোমার দেখা একা ……. ”

গানের ছোট ছোট ঢেউ বাউলের সুরের ছন্দে দুলে দুলে মাঠ ঘাট রেললাইন পেরিয়ে প্রবাহিত হল দূরে বহু দূরে।

ছবি: গুগল

কবিরুল; Dum Dum , Kolkata – 28

মিথ্যে বিশ্বাস

সপ্তদশী পদ্মের কুঁড়ি থেকে প্রস্ফুটিত হয়ে প্রথম আলো দেখা
নতুনকে চেনার অমোঘ আকর্ষণ
শিশির ভেজা ঘাসে হেঁটে গিয়েছিল বকুল তলে
নতুনভাবে পেয়েছিল সেদিন বকুলের গন্ধ
স্বর্ণলতার মতো জড়িয়ে ধরেছিল দেহ মন
চমকে উঠেছিল শিহরণে!
স্বয়ংবরার ইঙ্গিত ছিল তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে
জেনে গিয়েছিল অনেক কিছু
হটাৎ করে হয়ে উঠেছিল যুবতী

ধীরে ধীরে চেনা বকুলের গন্ধটা হারিয়ে গেল বাতাসে
পদ্মের পাপড়ি সব গেছে ঝরে
লিপ্সা মনও গেছে হারিয়ে
গোধূলির বাদামী ছায়া পড়েছে মুখে
শুধু মন আজও স্মৃতির প্রান্ত আছে ছুঁয়ে।

————————————-

: অর্পিতা ঘোষ
বিধুবাবু লেন,চৌরাস্তা,
পোস্ট- কৃষ্ণনগর
জেলা- নদীয়া
ভারত
পিন- ৭৪১১০১

।। বাঁচিয়ে রাখ, যদি বেঁচে যেতে পারি ।।

আমার বেঁচে থাকার স্বভাব
বাঁচিয়ে রাখার মানুষের অভাব,

আমি বাঁচবো কার সাথে! কি করে কোন পথে?
থাকলে বলো উপায়,
চলো হাঁটি একসাথে, বেঁচে থাকি পথেঘাটে।

সময় নেই হাতে,
চলো যাই এক্ষুনি যাই,
মরুভূমি থেকে সমুদ্রসৈকতে।

চলো যাই এক্ষুনি যাই,
প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে।

চলো যাই এক্ষুনি যাই,
শরীর ভোলে না ভালোবাসা- চাই হাত পেতে।

চলো যাই এক্ষুনি যাই,
প্রাচীন প্রেমকে ইতিহাস বানাই।

চলো যাই, তাহলেই বেঁচে যাই।

:তোফায়েল হোসেন
ঠিকানা- বারুইপুর

” নটরাজের ছেলে “

একমাত্র ভাইয়ের এমন দুর্দিনে দিদি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। ভেবেছিলেন সমস্যাটা হয়ত মিটে যাবে। কিন্তু ভাইয়ের ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া দুশ্চিন্তায়, তিনি নিজেও চিন্তিত হয়ে, জলন্ধর থেকে কাল বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতায় উড়ে এসেছেন চিত্রা দেবী।
পঞ্চাশোর্ধ চিত্রা দেবীর শরীর ও মনে এতটুকু পাক ধরেনি। আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি নারীর তুলনায় বেশ শক্তপোক্ত। আজ প্রায় বছর তিরিশেক হল উনি কলকাতা ছেড়েছেন। স্বামী জলন্ধর পুলিশের পদস্থ আধিকারিক। জলন্ধরের আবহাওয়ায় নিজেকে বেশ ভালভাবেই মানিয়ে নিয়েছেন চিত্রা দেবী।
মালিপাড়া থানার এসআই বারিদ বাবুর বাড়ির সামনে কাল বিকেলে উবের থেকে চিত্রা দেবীকে নামতে দেখে, এলাকার অনেকেই বিশেষত মহিলারা তাকে জরিপ করছিলেন। এত লম্বা চওড়া মেয়েমানুষ এর আগে তাদের কারো চোখে পড়েনি।
“- এসআই এর দিদি তো, তাই অমন বড়সড়ো চেহারা। ভাইবোনে তো মিল থাকবেই।”

একজন রোগাপটকা মানুষ তার তিন গুণ ওজনেরও বেশি স্ত্রীকে বললেন;

“-কি ব্যাপার গো,বারিদ বাবুর বাড়িতে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে? কিগো,শুনতে পাচ্ছো না আমি কি বলছি?”
“-আমি কি আর জানি?মিউ মিউ করে জবাব দিলেন স্বামী।”
“- চোখ কান খোলা রাখতে পারো না।”
“- চোখ কান খোলা রেখেই তো জানতে পেরেছি,বারিদ বাবুর নাকি রাতের ঘুম চলে গেছে।”
“- সে কি! কী আবার ঘটলো যে উনি রাতে ঘুমাতে পারছেন না। খোঁজ নিয়ে দ্যাখো তো ব্যাপারটা কি?”
“- হ্যাঁ,জানতে আমাকে হবেই। বাথরুমের মগ চুরির
জিডি করতে গিয়ে সেদিন ওনার ওই তাচ্ছিল্য আর রঙ্গতামাশায় আমি তিন রাত ঘুমোতে পারিনি। এখন বোঝ্ ঠ্যালা। ঈশ্বর আছে গিন্নি, ঈশ্বর আছে।”

দিদির আগমনে বারিদ পাট্টাদার যেন কিছুটা অক্সিজেন পেলেন। সেই অক্সিজেনটুকু নিয়েই সকাল সকাল বাজার ছুটলেন তিনি।
দু ঝোলা ভর্তি সবজির পাহাড় স্ত্রীর সামনে ফেলতেই,তার চোখ কপালে-
“-এত সবজি কি হবে? সবজির পাহাড়ের তলায় হাত ঢুকিয়ে চারটে মাত্র পোনা মাছ অতি কষ্টে বার করতে করতে বললেন, বারিদ বাবুর স্ত্রী, বিদিশা।”
“- ওমা এত সবজি, খুব ভাল করেছিস। বিদিশা, আমাকে একটা মুলো ধুয়ে দাও তো এখনই খাবো। ভাইয়ের বউকে নিজের ইচ্ছের কথা জানালেন, ননদ চিত্রা দেবী।”
“- দিদিকে মুলোটা ধুয়ে কেটে দাও।”
“- না, কাটতে হবে না। আমি গোটাই খাই। হ্যাঁরে,আজ তো তো্র ছুটি? চল্ দেখি আজ আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে কোনো মীমাংসা সূত্র বের করতে পারি কিনা।”- ভাইকে আশ্বস্ত করলেন চিত্রা দেবী।
“-হ্যাঁ তাই চল্।”

মুলোয় কামড় দিতে দিতেই ভাইয়ের পিছু নিলেন তিনি।

– ‘বড়ী বহেন’ (জলন্ধরে চিত্রা দেবীকে সবাই ওই নামেই ডাকে, তাই বিদিশাকেও ওই নামে ডাকতে বলেছেন তিনি) তোমার ভাইকে একটু ভালো করে বোঝাও, যেন অযথা টেনশন না করে। ছেলেকে নিয়ে কিসের যে এত চিন্তা ভেবে পাই না। ঘুম তো আগেই গেছে, এখন খাওয়া দাওয়াও প্রায় যেতে বসেছে।

“- ঠিক আছে, তুমি কিচ্ছু ভেবো না, আমি দেখছি। শুভ তো আমার ভতীজা, ওর ভালো মন্দটা আমাকেও দেখতে হবে।” এই বলে মুলো চিবানোর শব্দ ছড়িয়ে বারিদ বাবুর ঘরে প্রবেশ করলেন।

পেল্লাই সাইজের সাদা মুলো,বীট,গাজর, পালং শাক, টমেটো,শিম,বরবটি, বেগুন,এত সবজি রান্না করা দূরের কথা, অনেক দিন চোখেই দেখেননি বিদিশা। তিন জনের সংসারে ডাল,ভাজা আর মাছের ঝোল হলেই যথেষ্ট। কর্তার যা ডিউটির বহর, কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজে বেরোতে হয় তাঁকে। ছেলে তো সবজি দেখলেই নাক সিটকোয়। কিন্তু এখন তো উপায় নেই। জলন্ধরের ননদটি আবার ভেজিটেরিয়ান। বাকি বাটি সবজি তার চাই। এইসময় কিচেনে থাকলেও বিদিশার মনটা দিদি আর ভাইয়ের শলা পরামর্শেই ঝুঁকে আছে।
“- এই ঘটনা আমাদের বংশে এই প্রথম। একজন এসআইয়ের আঠেরো বছরের ছেলে সারাদিন নেচে বেড়াচ্ছে।” বারিদ বাবু তার দিদির কাছে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন।

“- শোন্ বীরু,এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই বয়সে শুভ একটু হিল্লি দিল্লি করবেই। কেন তুই ভুলে গেছিস, তোকে নিয়ে বাবা কি অশান্তিতেই না ছিল! এক মুহুর্তও তোকে ঘরে পাওয়া যেত না।” চিত্রা দেবী ভাইকে বোঝান।
“- আরে বাবা,হিল্লি দিল্লি করলে নয় কথা ছিল।শুভ সত্যি সত্যিই নেচে বেড়াচ্ছে। মণিপুরী, কত্থক আর ভারত নাট্যম। আমার তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। আড়ালে আবডালে সবাই হাসাহাসি করছে। কলিগরা তো মজা করছে। এই তো সেদিন এক সিনিয়র উপদেশের সুরে বললেন, মিঃ ভৌমিক ছেলেকে গোবিন্দার মত নাচতে বলুন,নাম আর পয়সা দুটোই আছে। এরপরে কি মাথার ঠিক থাকে, তুই ই বল্?”
“- আমি বলি কী,শুভকে আমার সঙ্গে জলন্ধরে নিয়ে যাই। সেখানে ওর বয়সী ছেলেরা সব হকি, বাস্কেটবল খেলে কিংবা আখড়ায় কুস্তি লড়ে। তারপর কুড়ি বাইশ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে ঢুকে পড়ে। সেখানকার ছেলেরা একমাত্র ভাঙরা ছাড়া আর কোনো নাচ জানে বলে আমার জানা নেই। তারপর তোর জামাইবাবু আছেন, তিনি শুভকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ম্যানেজ করে নেবেন। তুই কিছু ভাবিস নারে বীরু। চিত্রা দেবী ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।”
“- তা কি করে সম্ভব। এখানে ওর কলেজ আছে যে!” লেখাপড়ায় মোটামুটি মন আছে। কিভাবে যে ওকে নাচের নেশায় ধরলো আমি তো ভেবেই পাই না। আমি যে কি টেনশনে আছি,তোকে বোঝাতেই পারব না। বারিদ বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“- আহা অত ভেঙে পড়িস না।”
কে আবার ভেঙে পড়ল বড়ী বহেন। ট্রে’তে তিন কাপ কফি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন বিদিশা।

আর বোলো না বিদিশা,ছেলের চিন্তায় চিন্তায় বীরুর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শুভ যে মেয়েদের মত নেচে বেড়াচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেই ভাল না। ওর ভবিষ্যত কি আমিও তো ভেবে পাচ্ছি না। ননদের গলায় উদ্বেগের সুর।
“- ছেলেরা নাচলেই মেয়েলি হয়ে যায়,কোন্ বইয়ে লেখা আছে। উদয় শঙ্কর, বিরজু মহারাজ, থাঙ্কুমণি কুট্টি,গোপী কিষেণ এনারা তো সব এক একজন দিকপাল। ভারতীয় নৃত্যকলার এক একটি স্তম্ভ। সারা পৃথিবীতে এনাদের কীর্তি ছড়িয়ে আছে। এমনকি বলিউডের ছবিতেও সরোজ খান,ফারহা খানের পাশাপাশি,পি এল রাজ,রেমো ফার্নান্দেজ আর গনেশ আচারিয়ার মত নামকরা পুরুষ ডান্স ডিরেক্টরও আছেন যাঁরা খ্যাতি প্রতিপত্তিতে মেয়েদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।আর দক্ষিণ ভারতের প্রভুদেবার নাম তো সবাই জানে। তোমরা কি জানো, গনেশ আচারিয়ার ডান্স এ্যাকাডেমিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ছেলে মেয়েরা নাচ শিখে কেরিয়ার তৈরি করছে। বর্তমানে কোরিওগ্রাফিতে গনেশ আচারিয়া দেশের সেরা নাম। কোটির কাছাকাছি তাঁর মান্থলি ইনকাম।
বিপাশার বিস্তারিত তথ্য পরিবেশনে,দিদি আর ভাই একেবারে স্তব্ধ। দুজনের অপলক দৃষ্টি বিপাশার চোখেই কেন্দ্রীভূত। কারো মুখে কোন কথা নেই।
— তাছাড়া যার যেদিকে ঝোঁক,তাকে সেদিকেই এগিয়ে দিতে হয়। তার ইচ্ছে কিংবা স্বপ্নের লালন-পালন করা ভীষন জরুরী। কোন পেশাই উপেক্ষা বা অবহেলার নয়। আজ আমরা বিভিন্ন পেশায় যে খ্যাতিমান মানুষদের দেখি,নেপথ্যে কিন্তু তাদের প্রিয়জনদের একটা ভূমিকা থাকে।”- বিপাশা যুক্তি দিয়ে বোঝালেন।
বিপাশার বুদ্ধিদীপ্ত কথার মাঝখানে হঠাৎই শুভর আবির্ভাব।
“- আয়, আমার কাছে একটু বোস দেখি।” শুভর ঘাড় বেয়ে নেমে আসা বাবরি চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন বারিদ বাবু।
“- এই শুভ, আমি পরশুর যাওয়াটা ক্যানসেল করলাম। ওই দিন তোর ডান্স প্রোগ্রামটা দেখে তারপরে যাবো।” পিসির কথায় শুভ একেবারে উচ্ছসিত।
তাহলে তো কোন কথাই নেই। কালই তোমার আর মা’র দুটো কার্ড নিয়ে আসবো।
“- না,তিনটে কার্ড আনবি। আমিও যাবো।”

বারিদ বাবুর অপ্রত্যাশিত ঘোষনায় ঘর জুড়ে খুশির ঢেউ খেলে গেল।

আজ চিত্রা দেবীর জলন্ধরে ফেরার দিন। গোছগাছ সব সাড়া। মোবাইলের স্ক্রিনে রুট ম্যাপ অনুযায়ী আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উবের চলে আসবে বাড়ির দরজায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই চিত্রা দেবী বোমটা ফাটালেন-
” -বিপাশা তুমি হয়ত জানো না,বাবা ছোটবেলায় বীরুর নাম রেখেছিলেন নটরাজ। তারপর একটু বড় হয়ে ও নিজেই কোর্টে গিয়ে নামটা এফিডেভিট করে ফেলে। কিন্তু বাবার নাম কি অত সহজেই বিফলে যায়? বলি নটরাজের ছেলে নাচবে নাতো কি চোর, গুন্ডা, বদমাইশ ধরে ধরে লকআপে পুরবে?”
উবেরের হলুদ প্লেটের কালো নম্বরটা ততক্ষণে একেবারে দরজার সামনে চলে এসেছে-WB 5621

ছবি দেবার্পন দত্ত

:সমাজ বসু
৫৬এ, মিলন পার্ক। ডাক-গড়িয়া।
কলকাতা: ৭০০০৮৪

গুচ্ছকবিতা প্রেমের চার-প্রহর ****************

(১)

ভালোবাসা
***********

ভালবাসা,নতজানু হতে শেখ
প্রেমিকার কাছে নয়
প্রেমিকের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনের কাছে নয়
নীলচে পাহাড় আর গালচে ঘাসের ওপর
নতজানু হও! ক্ষমার কাছে!
বুক পেতে স্পর্শ কর শান্তির ওম্,
ভালবাসা, নতজানু হতে শেখ!
ভালবাসা, মুক্তি দিতে শেখ!

(২)

চুম্বন
******

বিষাদবৃক্ষ জড়িয়ে বুকে
আজন্মকাল পথ খুঁজেছি

হাত ছাড়িয়ে ঠোঁটে নাগাল
পাওয়ার আগেই হই বেসামাল
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে দেখি!

আজন্মকাল ঠোঁটের ডানায়
ভর করেছি বলার সময়

আজন্মকাল ঠোঁটের মায়ায়
জড়িয়ে আছি মাতাল হাওয়ায়

এইতো থাকা, এইতো খুঁজে যাওয়া
চাএর দোকান, পাড়ার মোড়ে

নিরজন পথ, দেমাক ছুঁড়ে
বিনোদবেণীর রাইকিশোরী চলে..

আজন্মকাল সময় জলে,
ঠোঁটের ডগায় আগুন জ্বেলে

বির্সজনই বৃক্ষতলে!
বিষাদঘোরের প্রণয়কালে।

(৩)

ভ্যালেন্টাইন্স ডে
****************

যে বারান্দাটুকুই ছুঁয়ে গেছে
ফেরারী আলোর রেখা শুধু,
তাদের প্রতিটি কণাই
ফিসফিস করে বলে ‘ভালোবাসি’

যে চোখে দৃষ্টি নেই ! অতল আঁধার
তার কাঁধ ছুঁয়ে উদাসী বাতাস এসে
ফিসফিস করে বলে ‘আলিঙ্গন’

যে মনে মনে পাথর হয়েছে কবেই
তার রক্তধারায় তবু আঙুল বুলিয়ে
ফিসফিস করে বলে ‘চুম্বন’

যে প্রবল শৈত্যের কাছে জড়োসড়ো
স্পর্শে জাগেনা কোন পরকীয়া প্রবৃত্তি,
তার কাছে নতজানু প্রতিটি অক্ষর
ফিসফিস করে বলে ‘ক্ষমা’ !

(৪)

ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়
***********************

আমিও চাইনি তুমিও না
অনর্থক এ দেওয়া নেওয়া
তাই তো আজকে পয়লা ফাগুন
নিজের হাতে আগল খুলে দেওয়া।

গোলাপ যত বাজার জুড়ে
করলে জড়ো খামখেয়ালে
কাটল ঘুড়ি পাল্লাছুটে,
লাগল হাওয়া তোমার পালে।

লগনচাঁদা সন্ধেবেলা
রঙিন আলো জলতরঙ্গ
ফুলের ভেলায় সপ্তপদী
অসূয়া ভরা অন্তরঙ্গ।

খুললে মুঠি, মিলল ছুটি
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়
চোখের মধ্যে শিশিরবিন্দু
সর্বনাশের আশায়।

: শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

অওয়ধপুরী, ভোপাল।

সাম্যবাদ ও আমি

কৃষানী সূর্যের আলো ভালোবাসি
ভালোবাসি সূর্যের এক দেহ আগুন
তার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিই দুহাতে ।
লক্ষ লক্ষ তারা অঞ্জলি ভরে আগুন পান করে
নক্ষত্র হয়ে ওঠে,উত্তাপ ছড়ায়।
মাটি পোড়ে,পুড়ে পুড়ে খাঁটি হয় মাটির হৃদয়।

যত মেঘ ডানা মেলে ,খুজে আনে তুষারের ধোঁয়া
ঝলসানো মাছেদের বিবর্ণ পাতা
সূর্যের পরিধি মাপে মেপে দ্যাখে বিকিরিত পথ।

উত্তীর্ণ কাল বেয়ে রক্ত ঝরে ফোঁটায় ফোঁটায়
নিশ্চল সময়ের হাঁড়িকাঠে বাঁধা থাকে বন্ধ্যা পৃথিবী,
চেতনার হাজারো হাত তখনো আগুন ছড়ায়
কেঁপে ওঠে বারুদ পাহাড়।
সমুদ্রাগ্নির হলুদ স্রোতে অন্ধত্বের অন্ধকার ছিঁড়ে
খুঁজে আনে ফুটন্ত সকাল ।

পোড়ামাটির খাটি হৃদয়ের বর্ণহীন সারগাছি
সাম্যবাদের ইতিহাস লেখে,রাষ্ট্রের ঠিকানায়
লাল বাতির আলো নেভে ,নিভে যায় সূর্যাস্তের মতো।

দিগন্তের নীল রেখার ওপারে কৃষাণ-,কৃষানী
কৃষানীর হাতের কাস্তের মরচে পড়েনি
লংম্যান হেঁটে যাওয়া নিরন্ন জনতার পায়ের অস্পষ্ট
ছাপ,জমাট রক্ত মাড়িয়ে এসো খোঁজে দেখি
আগুন পাথর।।

ছবি গুগুল

: তামস চক্রবর্তী, দ্বৈপায়ন সাহিত্য পত্রিকা

রংপেন্সিল

।। এক ।।

সন্ধ্যে ছ’টার মধ্যে অফিস থেকে বেরোতেই হবে আজ। সকাল থেকে তাই যথাসম্ভব কম সময় নষ্ট করে নিজের কাজটুকু শেষ করার চেষ্টা করে চলেছি, সময় পাইনি টিফিনটুকু খাওয়ারও। ঋক বলেছিল, অফিস ফেরৎ বাইরে কোথাও দেখা করার কথা। বলে দিয়েছি, হবে না আজ, ওকে বরং আমার সঙ্গে নিয়ে যাবো আমাদের বাড়ি।

আজ ছেলেটার জন্মদিন। ন’বছরে পা দিল। আসার সময় বারবার করে বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা। বড়ো কোনো অনুষ্ঠান হয় না তেমন, শুধু ওর কয়েকজন কাছের বন্ধু আর আমার বাবা – মা মানে নীলের দাদু – দিদা আসে এই দিনটায়।

অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই দেখলাম ঋক আসছে। ঋক এর অফিস আর আমার অফিসের দূরত্ব খুব বেশি হলে এক কিলোমিটার। একই বাসে যাতায়াতের সূত্রেই কখন যেন সহযাত্রী থেকে বন্ধু হয়ে উঠেছিল ঋক। পরিচয় বেশিদিনের নয়, ছয় -সাত মাস হবে হয়তো। কিন্তু সময়ের মানদন্ডে কি আর সম্পর্কের গভীরতা মাপা যায়? স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই আমার খারাপ লাগা, ভালোলাগা, একাকিত্ব, হতাশা, আনন্দ, বিষাদের কত স্মৃতি আর মুহূর্তের ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিল ও। আমাদের নিখাদ বন্ধুত্বের প্রাচীরে প্ৰতিফলিত হয়ে গিয়েছে কত শত অশ্লীল শব্দের তীর, কারণ একটি ছেলে আর একটি মেয়ে যে শুধুমাত্রই খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে, তা এখনো সহজদৃষ্টিতে মেনে নিতে পারে না আজকের “কেতাদুরস্ত “, “আধুনিকমনস্ক “, “যুক্তিবাদী” সমাজ। আচ্ছা, বন্ধুত্বের কোনো জেন্ডার হয় নাকি?

ঋক আসতেই একটা রিক্সা ধরে আমরা রওনা দিলাম সামনের বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্য। মাঝখানে একটা কেকের দোকান চোখে পড়ায় রিক্সাচালক ভাইটিকে একটু দাঁড় করিয়ে একটা কেক কিনে এনে রিক্সায় উঠতে গিয়ে দেখি, ঋক নেই। রিক্সাচালক ভাইটিকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, “দাদা বললেন, একটু অপেক্ষা করতে, উনি সামনের দোকান থেকে কিছুক্ষনের মধ্যেই আসছেন।” এদিকে দেরি হয়ে গেলেও অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। প্রায় ১৫ মিনিট পর ফিরে এলো ঋক, হাতে রঙিন গিফ্টপ্যাক এ মোড়া উপহার। মনেই হচ্ছিলো আমার, ও এমন কিছু একটা কিনতেই গেছে। বাকি পথ যেতে যেতে বললাম ঋককে, “জন্মদিনে উপহার না নিয়ে যাওয়া যাবে না এমন নিয়ম কিন্তু কোথাও বলা নেই, তুমি নিজে যাচ্ছ, আমার ছেলেটার আনন্দের একজন অংশীদার হয়ে উঠছো, এর থেকে বড়ো উপহার আর কি হতে পারে? “ঋকের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে আমি পেরে উঠিনি কোনোদিনই, জানতাম আজও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটবে না, তাই প্রত্যাশামতোই উত্তর, “জীবনের প্রতিক্ষেত্রেই কি কোনো না কোনো বাঁধাধরা নিয়মের খুব প্রয়োজন? আমাদের ভালোলাগা,খারাপলাগা -এগুলোর কি দাম নেই কোনো? সবকিছুকেই কি জড়িয়ে ফেলতে হবে নিয়মের বেড়াজালে? নীল বাচ্চা ছেলে, আমরা যখন ছোটো ছিলাম আমাদের জন্মদিনে আমরাও অপেক্ষা করে থাকতাম নতুন উপহারের জন্য, আজকের দিনে নীলও হয়তো সেই একই প্রত্যাশাই করে। তোমার কথা মতো আমি নিজে গিয়ে না হয় ওর আনন্দের ভাগীদার হলাম, কিন্তু সেই আনন্দে যদি একটুও নতুন মাত্রা যোগ করতে না পারি তাহলে একটা অতৃপ্তির রেশ যে রয়েই যায় মনের মধ্যে !”

কথা বলতে বলতে কখন যে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেছি, তা খেয়ালই করিনি। ওখানে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি বেশিক্ষন। বাড়িতে যখন পা রাখলাম আমরা ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। আমার বাবা – মা আজ সকাল থেকেই এখানে, আমন্ত্রিতরাও আসতে শুরু করেছে দু একজন করে। নীল স্কুল যায়নি আজ, সারাটা সকাল ওর কেটেছে দাদু-দিদার সঙ্গে দুষ্টুমি করে আর এখন বন্ধু -বান্ধবের সঙ্গে হুল্লোড়ে মত্ত। আমাকে দেখামাত্রই সবকিছু ফেলে দূর থেকে দৌড়ে এসে জাপটে ধরলো ভীষণজোরে। হাত থেকে কেকের প্যাকেটটা পাশের টেবিল এ নামিয়ে রেখে কোলে তুলে নিয়ে খুব আদর করলাম ওকে আর কপালে গালে এঁকে দিলাম শতসহস্র স্নেহচুম্বন। নীলের সারাগায়ে ছড়িয়ে থাকে কি সুন্দর নরম একটা আদুরে গন্ধ, মনে হয় সেই গন্ধের ঘ্রাণ যেন নিতে পারি আজীবন, আমার দেহমনের সমস্ত ক্লান্তি, মনখারাপ ধুয়ে যায় সেই গন্ধের সমুদ্রে।

এরপর সন্ধ্যের বাকি সময়টা কেটে গেছে হাসি -ঠাট্টা -আনন্দ -খুশির মিলিত কোরাসে। নীল -হলুদ -গোলাপি আলোর টুনিতে কি মায়াবী লাগছিল আমাদের ঘরটা। একে একে জন্মদিনের হাওয়ায় এসে মিশেছে কেক কাটার মুহূর্তে সকলের মিলিত শুভেচ্ছাধ্বনি, ঋকের মিষ্টি গলার গান, বাচ্চাদের আনন্দোল্লাসের শব্দ।

।। দুই ।।

এখন রাত এগারোটা। অতিথিরা ফিরে গেছে সবাই। নীলও ঘুমিয়ে পড়েছে ওর দাদু -দিদার সঙ্গে। কাল আবার স্কুল আছে ওর। বাড়ির সব কাজ সেরে উঠে স্নান সেরে আমি এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি আমাদের ভাড়া বাড়ির ছোট্ট ছাদটায়। সারাদিনে নিজেকে দেওয়ার মতো সময় বলতে এটুকুই। দূরে বৃষ্টি হয়েছে কোথাও। ঠান্ডা হওয়ার ঝাপ্টা এসে লাগছে চোখে মুখে। চাঁদটা মেঘের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে বারবার। হাতেগোনা চার -পাঁচটা তারা ফুটে রয়েছে আকাশের একেবারে ঈশাণ কোনটায়। অদূরে কোনো বাড়ির টিভি থেকে ভেসে আসছে খবরপাঠের আওয়াজ। সামনের পুকুরটার শান্তজল বারবার কেঁপে উঠছে দু -একটা বটফল পড়ার মৃদু শব্দে। আর অতীতের কবর খুঁড়ে আমার মাথার ভিতরে একে একে জেগে উঠতে শুরু করেছে দশবছর আগের ব্যথিত স্মৃতির শব। টাইমমেশিনে চেপে আমি ফিরে চলেছি আমার কলেজজীবনের রোমাঞ্চপূর্ণ দিনগুলিতে।

তখন কলেজ শুরু হয়েছে চার -পাঁচদিন হবে। কত নতুন বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে শুরু করেছে সবে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের চৌহদ্দিতে পা রাখা আমাদের সবার চোখে তখন কত আশ্চর্য রঙিন স্বপ্নের অবাধ আনাগোনা। আমার ছিল ইংলিশ অনার্স। দিব্যেন্দু ভৌমিক আমাদের কলেজেরই ইংলিশের প্রফেসর। তাঁর কাছেই পড়া থাকতো সপ্তাহে দুদিন। শুধু আমাদের কলেজই নয়, অন্যান্য অনেক কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও পড়তে আসতো ওঁনার কাছে। সেখানেই প্রথম দেখা বিয়াসের সঙ্গে। বিয়াস সেনগুপ্ত, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইংলিশ অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার। যেদিন প্রথম দেখা সেদিন ওর পরনে ছিল নীল রঙের পাঞ্জাবী আর জিন্স। শান্ত, গভীর চোখদুটোয় বৃষ্টিস্নাত বিকেলের হিমেল বাতাস। সদাহাস্যময় মুখটিতে সদ্য ওঠা দাড়ির আভাস। ওর পড়া থাকতো আমাদের আগের ব্যাচটায়। আসা -যাওয়ার মাঝে দেখা হয়ে যেত মাঝে মধ্যেই, বুকভরা চাপা উত্তেজনা নিয়ে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতাম ওই মায়াময় চোখদুটির দিকে, ডুবে যেতে ইচ্ছে করতো ওই স্বপ্নালু চাহনির অতল গহীনে। নিজে থেকে কথা বলার সাহস বা সুযোগ করে উঠতে পারিনি কোনোদিনই। স্যারের বাড়িতে সরস্বতী পূজার দিন সন্ধ্যেবেলা একটা ছোটো সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন হতো। সেই অনুষ্ঠানে কেউ গান গাইত, কেউ আবৃত্তি করতো, কেউ বা নৃত্য পরিবেশনা করতো। সেখানে আমার গাওয়া একটা গানের সূত্র ধরেই খুলে গিয়েছিলো আমাদের পারস্পরিক ভাবপ্রকাশের প্রাথমিক দরজাটা। গান শোনার পর বিয়াস নিজেই এসে পরিচয় করেছিল আমার সাথে। আমার হৃদস্পন্দনকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথা বলছিলো আমার অপ্রকাশিত ভালোলাগা, ভালোবাসার প্রেমিক পুরুষটি, বলেছিলো, “ভারী সুন্দর গান তো আপনি, গান শেখেন নিশ্চই? ”

অপ্রত্যাশিত প্রশংসা আর আবেগে কাঁপতে থাকা গলা নিয়ে আমি কোনোক্রমে বলে উঠতে পেরেছিলাম, “অসংখ্য ধন্যবাদ, আমার বেসুরো গলার গানের প্রশংসা করার জন্য। আর হ্যাঁ, আমি গান শিখিনি কোনোদিন, আমার বাবা খুব ভালো গান করেন, ওঁনার থেকেই শুনে শুনে যেটুকু শেখা।”

প্রত্যুত্তরে ও বলেছিল, “আপনার গান শুনে কিন্তু এতটুকু বোঝার উপায় নেই যে, আপনি গান শেখেন না। এরপর একদিন আপনার বাবার সাথেও পরিচয় করার ইচ্ছে রইল। বাই দ্য ওয়ে, কথা বলতে বলতে নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি একেবারে, আমি বিয়াস সেনগুপ্ত, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইংলিশ অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার। আপনি?”

“আমি সাঁঝবাতি রায়, স্কটিশ চার্চে ইংলিশ অনার্সের ফার্স্ট ইয়ার এর ছাত্রী। ”

সেদিনের অনুষ্ঠানে ওর নিজের লেখা একটা কবিতা আবৃত্তি শুনে রীতিমতো ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম ওর। যেমন মন ছুঁয়ে যাওয়া তার ভাষা তেমনই তার স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। মনে হচ্ছিল, এ কবিতার জন্মই যেন শুধুমাত্র ওর ঠোঁট দিয়েই উচ্চারিত হওয়ার জন্য।

এরপর কত অনুষ্ঠানে ওর আবৃত্তি শুনতে গেছি লুকিয়ে লুকিয়ে –একবার তো ধরাও পড়ে গেছিলাম হাতেনাতে। ও নিজেও আমাদের বাড়িতে এসেছে বহুবার। বাবার সাথে তো খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গেছিলো ওর । ক্রমশ আরও বাড়তে থেকেছে যোগাযোগ। তারপর কখন যে গান আর কবিতার মাঝে ভালোবাসা সুর হয়ে দেখা দিলো -তা বুঝে ওঠার সময়ই পাইনি।

এখনো মনে পড়ে, গঙ্গার ঘাটে বসে তোমার কাঁধে মাথা রেখে কাটিয়ে দেওয়া সেই সন্ধ্যেগুলোর কথা, কলেজ পালিয়ে সারা শহরের এগলি – ওগলি ঘুরে হাতে হাত রেখে ট্রামলাইন ধরে একসাথে হেঁটে যাওয়া দুপুর, বাজের শব্দে তোমার বুকে মুখ লুকানো ঘন বর্ষার বিকেল, বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে সিঁড়ির তলার অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা প্রথম চুমুর উত্তাপ।

তোমার কবিতা লেখার ডায়েরি তুমি দেখতে দিতে না কাউকে -কোনোদিন। একদিন অনেক রাগ, অভিমানের পর সেই পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, পাতাভর্তি অজস্র কাটাকুটির মধ্যে দিয়ে কেমন করে জন্ম হয়েছে এক একটা নতুন কবিতার !জিজ্ঞাসা করেছিলাম তোমাকে, “সমস্ত ডায়েরি ভর্তি এত কাটাকুটি কিসের?” তুমি বলেছিলে, “সদ্যসমাপ্ত কোনো লেখা আমার মাথার ভেতর খেলা করে সারাদিন। তার প্রতিটা লাইন, প্রতিটা শব্দ নিজেদের মতো করে খুঁজে চলে সেই নিখুঁত বিকল্পহীন উপযুক্ত ভাষা যা দিয়ে আমার অনুভূতির খুব কাছের কোনো বিন্দুতে পৌঁছনো যাবে অতি সহজেই। হয়তো বাথরুম এ স্নান করছি বা দুপুরে টিফিন খাচ্ছি বা ভিড় বাসে ঝুলতে ঝুলতে কলেজ যাচ্ছি, যে কোনো সময়ে এসে পড়তে পারে সেই প্রতীক্ষিত শব্দ,ভাষা—কবিতার শরীরে তাকে স্থান না দেওয়া পর্যন্ত তার হাত থেকে আমার নিস্তার নেই। তাই তো আমার লেখায় এত কাটাকুটি, সংশোধন -সেই সত্যকে ছোঁয়ার নিরলস প্রচেষ্টা।”

আমার জীবনটাকেও তুমি মনে করেছিলে তোমার কবিতার খাতা। নিজের লেখার মতো তাকেও “সংশোধন” করতে চেয়েছো বারবার। প্রথমবার যখন সন্তান এলো আমার গর্ভে তখন আমি এম.এ ফার্স্ট ইয়ার। গত বইমেলায় তোমার দু’খানা কবিতার বই বেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই তুমি ব্যস্ত থাকতে কবিতা সম্মেলন, সাহিত্যপাঠের আসর, নতুন বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান -এসব নিয়ে। প্রচারের চড়া আলোয় চোখ ঝকমকিয়ে উঠেছিল তোমার। খ্যাতি যতই কাছে এসেছে তোমার, ততই একটু একটু করে দূরে সরে গেছি আমি। আমার মন, আমার শরীরের কথা একবারও না ভেবে তাই কি অবলীলায় বলতে পেরেছিলে এবোর্ট করানোর কথা। অনেক শারীরিক যন্ত্রনা, মানসিক কষ্ট সহ্য করে করিয়েও নিয়েছিলাম এবোর্ট, শুধু তোমার অসুবিধার কথা ভেবে, তোমার মুখের কথায়। মনে হয়েছিল, যে অনাকাঙ্খিত দূরত্ব এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সম্পর্কের মাঝে, সে হয়তো নিজে সরে গিয়ে জায়গা করে দেবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে। না, ভুল ভেবেছিলাম আমি। তোমার তখন শুধুই শরীরের নেশা, নতুন নতুন নারী শরীর ভোগের বাসনা -শারীরিক কামনা চরিতার্থ না হলে তোমার কবিতারা নাকি থেকে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ, অতৃপ্ত। আমিও তোমার কাছে হয়ে উঠেছিলাম শুধুমাত্রই একটুকরো মাংসপিন্ড -যার কোনো অনুভূতি নেই, আবেগ নেই, দুঃখ -যন্ত্রনা কিচ্ছু নেই।

দ্বিতীয়বার প্রেগনেন্সির খবর পাওয়ার পর আমার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে তুমি। আমি ফোন করলে রিসিভ করতে না। বাবা ফোন করে দেখা করার কথা বলেছিলো একটিবার। ফোন করা তো দূরের কথা, কোনোরকম সম্পর্কই তুমি আর রাখতে চাওনি আমার সাথে। এদিকে দীর্ঘ সাত বছরের বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট, গ্লানি, হতাশা আমাকে একটু একটু করে ঠেলে দিচ্ছিলো মানসিক অবসাদের অন্ধকূপের দিকে।

ঘুমোতে পারতাম না কত রাত। মৃত্যুর ছায়ার নিচে দিন কাটাচ্ছিলাম আমি।একদৃষ্টে পাখার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হতো গলায় ফাঁস জড়ানো আমি ঝুলে আছি সিলিং থেকে, ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই, যন্ত্রণার কোনো লেশ নেই, চোখের নিচের কালিটাও অদৃশ্য–পুরো মুখ জুড়ে শুধু ছড়িয়ে রয়েছে কি অপার শান্তি! নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম চিরমুক্তির আশায়। পারিনি। ফিরে এসেছি বারবার। চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠতো তিন বছর ধরে প্যারালাইসড প্রতিবেশী রথীন দাদুর অসহায় মুখ, একসিডেন্টে ডান হাত হারিয়ে চাকরি খোয়ানো সুজন কাকুর শূন্য দৃষ্টি, মৃত স্বামী -সন্তানের স্মৃতি বুকে নিয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে বসে থাকা পাগলীটার কান্নাভেজা হাসি। এদের মতোই আরও অনেক মানুষ ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে, জীবন যাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বারবার। তবুও তো তারা হেরে না গিয়ে, প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে নিজের মনের সাথে, স্বপ্ন দেখছে দুঃখ যন্ত্রণাহীন আলোঝলমলে সুদিনের। কি করে হেরে যেতাম আমি ? একটা ব্যর্থ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে কি করে ভুলে যেতাম সেই সব মানুষগুলোর কথা যাদের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব আমার কাঁধে, যারা বেঁচে থাকতে চেয়েছে আমাকে সম্বল করে, আগলে রেখেছে, ভালোবেসেছে, সবসময় পাশে থেকেছে, প্রেরণা জুগিয়ে গেছে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে। আমার গর্ভে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিলো যে নির্দোষ ভ্রূণ, প্রতিমুহূর্তে অনুভব করছিলাম যে নতুন প্রাণের স্পন্দন–শুধু জন্ম দেবার অধিকারবোধ থেকেই কি খুন করে ফেলা যায় তাকে ?!

না, আমার কোনো সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্ট এর প্রয়োজন পড়েনি। নিজের মনের জোরেই আমি সরে আসতে পেরেছিলাম খাদের কিনারা থেকে। আমার শখ, আমার শিল্পসত্তা দিয়ে মুছে ফেলতে পেরেছিলাম এই অন্ধকার সময়কে। নতুন করে গান গাইতে শুরু করেছিলাম আবার, লেখালেখির কাজও নিয়েছিলাম নানান পত্র – পত্রিকায়। পাশাপাশি সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম পুরোদমে। সবমিলিয়ে বাঁচার আনন্দে আবার বাঁচতে শুরু করেছিলাম আমি -নিজেকে ভালোবেসে, নিজের কাজকে ভালোবেসে, কাছের মানুষদেরকে ভালোবেসে। আর বাঁচতে তো হতোই আমাকে, কারণ, আমি যে সাঁঝবাতি, সাঁঝবাতিরা কখনো এমন দপ করে নিভে যেতে পারে নাকি !

।। তিন ।।

আজ, জন্মদিনে অনেক উপহার পেয়েছে নীল। কেউ দিয়েছে স্কুলব্যাগ, কেউ গল্পের বই তো কেউ দিয়েছে রিস্ট ওয়াচ। খুব সুন্দর একটা ড্রয়িং সেট উপহার দিয়েছে ঋক। ওই ড্রয়িং সেটের মধ্যে যে প্যাস্টেল বক্সটা-ওটা দেখেই আমার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিলো ছোটবেলায় আঁকার স্কুলে প্রথমদিনের কথা। প্রতিটা রংপেন্সিলকে আলাদা আলাদা করে নিজের হাতের দু আঙুলে ধরে কি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের আঁকার স্যার -“এই দ্যাখো, এই যে এটা নীল–এটা কিসের রং বলোতো? এটা হল ব্যথার রং, মনখারাপের রং। তারপর এই যে লাল -এটা ভালোবাসার, ওই হলুদটা ঔজ্জ্বল্যের, সবুজটা ঐক্যের, নিশ্চয়তার।” স্যারের বলা কথাগুলো ঠিকমতো ধরতে না পেরে সেদিনের ছোট্টো আমি কেবলই মাথা নেড়ে চলেছিলাম অবুঝের মতো। এখন বুঝতে পারি, বৈপরীত্যময় এই রংগুলোই আসলে আমাদের মনের এক একটা অবস্থা, অনুভূতি –আর ওই চৌকো প্যাস্টেল বক্সটা, যার মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশাপাশি, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে –ওটাই আমাদের জীবন, ছোটো কিন্তু ভীষণ রঙিন।

: Dipanjan Poddar

Address:-12, Nawab Abdul Latif Street, Belghoria, Kolkata-700056

শরতের পদধ্বনি

আবীর মেখে লালে লালে
সূর্য ওঠে সাত সকালে
আকাশ নীলে নীল,
সাদা মেঘের ভেলা ভাসে
হাওয়ার দোলা কাশে কাশে
পদ্ম ফোটা বিল ।
শিশির ভেজা সকালবেলা
সোনা রঙের রোদের খেলা
সবুজ ঘাসে ঘাসে,
দিগন্তটা পটে আঁকা
মাঠের মাঝে পথটা বাঁকা
শেফালিকা হাসে।
স্থলপদ্ম ফুটে ওঠে
মধু খেতে ভোমরা জোটে
শাপলা শালুক দোলে,
গাঁয়ের পথে উদাস রাখাল
বাঁশি বাজায় সকাল বিকাল
মনটা হঠাৎ ভোলে।
টইটম্বুর খালে বিলে
আকাশের নীলে নীলে
শারদীয়ার বেলা,
রোদের আঁচল লুটিয়ে পড়ে
শান্ত গাঁয়ের ঘরে ঘরে
বাতাস করে খেলা।
আশ্বিনের এই ভরা মাসে
দুগ্গা ঠাকুর আবার আসে
একটি বছর পরে,
মঙ্গল-শাঁখ বেজে ওঠে
সবার মনে হাসি ফোটে
খুশি ঘরে ঘরে।
মা দুগ্গা আসেন বলে
দুঃখ দৈন্য সবাই ভোলে
পুজোর চারটি দিন,
ঢ্যাম্ কুরা কুর বাদ্যি বাজে
খুশির সাজে সবাই সাজে
মনে সুখের বীণ ।।

___________________________
: গোবিন্দ মোদক

সম্পাদক: কথা কোলাজ সাহিত্য পত্রিকা
রাধা নগর, কৃষ্ণনগর, নদিয়া

Design a site like this with WordPress.com
Get started