ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ🍂…

নীলের বয়স তখন পাঁচ কী ছয়! ওর বাবা-মার মধ্যে প্রায়শ ই ঝগড়া হতো।এরপর একদিন ঝগড়ার তীব্রতা বেড়ে যায়। আর ওর মা ওকে আর ওর বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। মা চলে যাবার পর নীল ওর বাবার সাথেই থাকত; ওর বাবার কাছেই থাকত। ক্রমশ অবহেলা আর মায়ের অভাব ওকে বদমেজাজি করে তুলেছিল।

মেয়েদের ওপর ওর রাগটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তাই সবাই ওকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। অনেকে আবার ভয়ও পেতো। কিন্তু সবাই তো আর এক হয়না। নীলের কলেজ জীবনে এমনই একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয় নীলের- যে ওকে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা ওর রাগের দিকে তোয়াক্কাও করত না। বার কয়েক তো নীলের রেগে যাওয়া নিয়ে মজাও করেছে। নীল এতে আরও রেগে যেত। আর মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসত…

এতে নীল আরো রেগে গেলেও কিন্তু মেয়েটা ভারী অদ্ভূত ছিল; নীলকেও বার কয়েক হাসিয়ে ছেড়েছে। ধীরে ধীরে নীলের রাগ কমতে শুরু করে। ওর ভেতরে জমে থাকা অভিমানগুলো বরফের মতো গলতে শুরু করল।শেষমেষ ওরা দুজন ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে। দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ হয়ে এল। কিন্তু ওদের বন্ধুত্বটা রয়েই যায়।একবার ওরা দুজন মিলে ঘুরতে গেছিল।সেখান থেকে তাড়াতাড়িই ফেরার কথা ছিল।কিন্তু রাস্তা খারাপ থাকায় দুজনে ফিরতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে ঐখানে একটা হোটেলে স্বামী স্ত্রীর পরিচয়ে রাত কাটিয়ে পরেরদিন ভোরে ফিরে আসে। কিন্তু মেয়েটির অজ্ঞাত এক পরিচিত কোনোভাবে এই ব্যাপারটা জেনে যায় এবং তার বাবা মাকে জানিয়ে দেয়।ফলে মেয়েটিকে অনেক কথা শুনতে হয়।সবশেষে নীলের সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। ততদিনে নীল অনেকটা শান্ত। আয়েশা এতে খুব রেগে যায়; হ্যাঁ মেয়েটির নাম আয়েশা ছিল! ও নীলকে মানতেই পারছিল না।কিন্তু নীল আয়েশাকে ভালোবেসে ফেলেছে।তাই ও ঠিক করে ভালোবাসা দিয়ে ও আয়েশার মনটা জয় করবে। তাই যা যা আয়েশার পছন্দ-নীল ঠিক তাই, তাই করত। কিন্তু আয়েশা যেন কিছুতেই রাজী হতেই চায়না।

এবার, তাই নীল বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে তৈরি হয় দূরত্ব। দূরত্ব শেষে আয়েশা বুঝতে পারে ও বোধহয় নীলকে ভালোবেসে ফেলছে…

প্রাণপনে সেও সেদিন থেকে নীলের রাগ কমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নীল তো নাছোড়বান্দা! জেদি। তাই আয়েশা একদিন রীতিমত প্রচন্ড রেগে গিয়ে নীলের দিকে তেড়ে যায়। ঘরের জিনিস ছোঁড়াছুঁড়ি, ভাঙাভাঙি করতে থাকলে- এসব দেখে নীল নিজের জেদ ছেড়ে দেয়। ওর কাছে গিয়ে ওকে আটকায়, সামলায়। সত্যিই এতে নীলকে দু একটা মারও খেতে হয়েছিল সেদিন; তবু তো সেদিন দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিটা মিটে গিয়েছিল!

শেষটায়, নীল আয়েশাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়। ধীরে ধীরে আয়েশার রাগটাও কমে। এভাবেই ওদের দুজনের মত সব সম্পর্কই আবার নতুন জীবনের দিকে, অন্ধকার শেষ করে পা বাড়াক।

আসলে, রাগই তো হল প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ!

প্রজ্ঞা চক্রবর্তী। কলকাতা।

গুচ্ছকবিতা

স্বপ্ন

——-

(১)

পাড় ভাঙ‌তে ভাঙ‌তে স্বপ্নগু‌লো ঘোলা জ‌লের ম‌তো ঢু‌কে প‌ড়ে

আমার অন্ধকার ঘ‌রে।

আ‌মি নি‌জের খোসা ছাড়া‌তে ছাড়া‌তে তোমার সাম‌নে গি‌য়ে দাঁড়াই,

আঁশফ‌লের ম‌তো ধূসর আমার ক‌য়েকটা সুখ মু‌খে তু‌লে‌ নি‌য়ে

তু‌মি থু থু করে ফে‌লে দাও তেতো ব‌লে।

চ‌ব্বিশটা মৃত সাঁঝবা‌তিস্তম্ভ পে‌ড়ি‌য়ে আন‌ন্দের প্রাচীন রাজবা‌ড়ির

ধ্বংসাব‌শে‌ষের সাম‌নের জঙ্গ‌ল থে‌কে ভে‌সে আসা বাদু‌রের

অট্টহা‌সিতে থরথর ক‌রে কেঁ‌পে ও‌ঠে আমার ঘর।

তু‌মি আপেল খে‌তে খে‌তে মিলি‌য়ে যাও অন্ধকা‌রে।

চাঁ‌দের শরীর থে‌কে সাদা রঙ তু‌লে নি‌য়ে কারা যে‌নো

মা‌খি‌য়ে দেয় আমার চাদ‌রে।

একটা মুমূর্ষু জ্যোৎস্না পুড়‌তে পুড়‌তে ছাই হ‌য়ে যায় ।

ঘ‌রের ম‌ধ্যে জমা ঘোলা জ‌লে ভাসে শুক‌নো ফুল, মালা,পোড়ামাটির মালসা

ও আমার নাভী।

(২)

যে রাজবা‌ড়ির স্বপ্নটা আমি বারবার দে‌খি।

তার ঠাকুরদালানে কো‌নো প্র‌তিমা নেই,

প্রদীপ জ্বালায় না কেউ দু’‌বেলা।

শুধুই অন্ধকার । কো‌নো উৎসব হয় না ওখা‌নে।

(৩)

এলইডি বা‌ল্বটা নিভি‌য়ে দি‌য়ে এসো। এসো জ্বালাই নি‌জে‌দের আলো।

আলোর ম‌ধ্যে শরীর। শরীর ম‌ধ্যে স্বপ্নের নক্ষত্রপুঞ্জ ।

যে বিবস্ত্র জ্যোৎস্নাটা খে‌লে বেড়া‌চ্ছে গোটা বিছানা জু‌ড়ে

তা‌কে খেল‌তে দাও, বাধা দিও না।

অন্ধকা‌রের গা‌য়ে স্ব‌প্নের ঘ্রাণ লে‌গে থা‌কে।

‌তোমার শরী‌রের সুগ‌ন্ধের ম‌তো মো‌হময়।

প্র‌তি‌টি রা‌তই অপ্র‌তিম ও অদৃষ্টপূর্ব ম‌নে হয় আমার।

স্বপ্ন, শরীর, জ্যোৎস্না মাখামা‌খি হ‌য়ে গে‌লে যা‌বে।

(৪)

আলোর বাগান থে‌কে তু‌মি সুখ-ফুল তো‌লো বা‌রোমাস।

আ‌মি যে উতরাই ধরে ‌নে‌মে গে‌ছি তার শে‌ষে অন্ধকা‌রের জঙ্গল।

ফ্রেমে কাদা মাখা উলঙ্গ বাচ্ছাটার চো‌খে রু‌টির ঝলকা‌নি তোমার ‌

ডিএসএলআরের থে‌কে অনেক বে‌শি।

‌নোংরা প্লা‌স্টি‌কের ম‌তো ড্রে‌নের মু‌খে আট‌কে থাকা

জীবনটার কা‌ছে একটা নালার আনন্দ অনুপ‌মেয়।

হাত পা‌ল্টে পা‌ল্টে যারা মৃত্যু‌কে কো‌লে নি‌য়ে এগি‌য়ে যাচ্ছে অ‌বিরত।

তা‌দের লালন ক্ষমতা তু‌মি জা‌নো?

ওই চোখগু‌লোর দি‌কে তা‌কা‌লে দেখ‌তে পা‌বে,

সা‌রি সা‌রি স্ব‌প্নের কঙ্কাল মার্চ পাস্ট কর‌ছে গোটা মান‌চিত্র ধ‌রে।

ও‌দের গা‌য়ে গা ঘেঁ‌ষে থে‌কো না, ‌

তোমার আলো, ফুল, সুখ, যাপ‌নের স্বপ্নগু‌লো একে একে কঙ্কাল হ‌য়ে যা‌বে।

জমাট অন্ধকা‌রে তো তোমার ভীষণ ভয়।

(৫)

‌চিতার আগুন নি‌ভে গে‌লে, আধ পোড়া কাঠগু‌লোর

রক্তক্ষরা যৌবন থে‌কে ফিন‌কি দি‌য়ে উঠে আসে নিঃস্ব অন্ধকার।

চতুর্দি‌কে ছ‌ড়ি‌য়ে প‌ড়ে চাপ চাপ দুঃস্ব‌প্নের ম‌তো।

স্ব‌প্নে বাবা আসেন একমুখ গরম তাজা রক্ত নি‌য়ে।

বাবা প‌রে পিতামহ । পিতাম‌হের প‌রে সেই পয়সাওয়ালা লোকটা।

‌যে আমায় ব‌লে‌ছি‌লো । ‘তো‌দের শালা র‌ক্তেই দোষ’।

র‌ক্তে র‌ক্তে ভে‌সে যায় ঘ‌রের মে‌ঝে, দেওয়াল।

দেওয়া‌লে টাঙা‌নো মা লক্ষ্মীর ক্যা‌লেন্ডার।

আমি দু’হা‌তে গরম রক্ত কা‌চি‌য়ে তু‌লে ভা‌তের হা‌ড়ি‌তে ভ‌রে রা‌খি।

প‌রের স্ব‌প্নে একটু চাল য‌দি পাই, গরম র‌ক্তে ফু‌টি‌য়ে নে‌বো এই ভেবে।

(৬)

অষ্টম গর্ভ টর্ভ ওসব ছিনালী রা‌খো।

স্ব‌প্নের ভ্রূণগু‌লো‌কে জঠ‌রে হত্যা কর‌তে কর‌তে

শরীরটা বাঁজা হ‌য়ে গ্যা‌ছে।

(৭)

যে ক্ষুধার্ত স্বপ্নগু‌লোকে জ‌ড়ো ক‌রে রে‌খে ছিলাম

ঘ‌রের এক কো‌ণে,

তা‌দের গা‌য়ে এখন মৃত্যুর পুতিগন্ধ।

অগণন ম্যাগট থিক‌থিক কর‌ছে ঘরময়।

‌ইষ্ট‌দেবতা স্বপ্ন দি‌য়ে বল‌লেন এই নর‌কে তি‌নি আর থাক‌বেন না।

——————————-

:অমর্ত্য দত্ত

স্রোতস্বিনীর মতো

আমাকে স্থবির প্রতিক্রিয়াহীন ভেবে
লাঞ্ছনা বঞ্চনার প্রতিযোগিতার বাণ ভেদ করতো মুহুর্মুহু,
ক্রমে সময়ের সাথে অভিযোজিত হই,
স্রোতস্বিনীর গতি লাভ করি,
ভেতর থেকে না মুচড়ে যাওয়ার কল কল আওয়াজ অনুভূত হয়।
তারপর নদীজ আদ্রতা পেতে কতজনে ছুটে আসে,
কতজনের উপচে পড়া প্রেম মিশতে চায় নদীর বুকে।
বুঝি না এটা নিশর্ত নাকি শর্তবেষ্টিত ভালবাসা যা ক্ষতের মলমের মতো আরামদায়ক।
আজ বঞ্চনার বাণ নদীর সুদূরপ্রসারী গতির কাছে হার মানে, লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়;
আর লাঞ্ছনারা লাঞ্ছিত হয়ে মুখ লুকোয়।:অমিত জানা

হৃদয়গঞ্জের হাট

সেবার কোনো নামি-দামি জায়গায় বেড়াতে যাব না ভেবেই হিমালয় পর্বতমালার দেশ নেপাল আর বিহারের ঠিক মাঝামাঝি একটা অখ্যাত গ্রামে গিয়ে উঠলাম। বিভূঁই জায়গায় ভরসা বলতে বন্ধু রবিউলের নানাসাহেবের একখানা টালি-ইঁটের তৈরি পুরানো কোঠাবাড়ি। সেটাকে আশ্রয় করেই কয়েকদিনের জন্য সস্ত্রীক ডেরা নিলাম। সঙ্গে বৃদ্ধ চাকর কাম গার্জেন রামদীন।   
    শহুরে চোখে গ্রামটাকে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই সাধারণ মনে হলেও, রবিউলের নানাসাহবের কোঠা বাড়িটা কিন্তু প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লেগে গেল। এখানে পৌঁছানো ইস্তক সমস্ত বাড়িটাই ঘুরে ঘুরে দেখে নিচ্ছিলাম। টুকরো টুকরো রঙিন কাঁচের জাফরি দিয়ে ঘেরা প্রশস্ত বারান্দাসহ অপূর্ব নক্সা-সমৃদ্ধ খিলান দিয়ে তৈরি ভেতর বাড়িটা যেন এই অজ পাড়াগাঁয়ে পৃথক একটা দ্বীপভূমির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লক্ষ্য করলাম, বাড়িটার ঠিক সদর দরজার পাশেই রয়েছে লাল ইঁটের তৈরি একখানা পাতকুয়ো। পাতকুয়োটা সম্বন্ধে রবিউল বলেছিল, এ গাঁয়ের সবাই এই পাতকুয়োর জল খেয়েই তৃষ্ণা মেটায়। রোগ-জ্বালা হলে গাঁয়ের লোকজন হাকিম- বদ্যির কাছে যায় না। মনে মনে মানত করে কুয়োর জল খেলেই নাকি তাদের সব ব্যাধি সেরে যায়। কুয়োটাকে আশপাশের সমস্ত গ্রামের মানুষজনই  পীরবাবার কুয়ো বলে মান্যি করে, পুজো-আচ্চা দেয়। প্রতি শুক্কুরবার শুক্কুরবার সিন্নি চড়ায়।
       আমি কুয়োটার ভিতর উঁকি মেরে দেখলাম , কাকচক্ষু-জল ভিতরে টলটল করছে। জোরে গাড়ি চালিয়ে আসায় একটু সকাল সকালই রবিউলদের গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হাতে প্রচুর সময় থাকায় ভাবলাম, কাছেপিঠে নিশ্চয় বাজার হাট আছে , খোঁজখবর নিয়ে যাই একবার ঘুরে আসি। যদিও, মনে মনে ঘুরে আসার কথা ভাবলাম বটে কিন্তু, যাবো কীসে! এই চিন্তা মাথায় নিয়েই বাড়িটার এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে দেখতে হটাৎই নজরে পড়লো পিছনের রসুইঘরের বারান্দায় একখানা পুরানো আমলের বাইসাইকেল ঠেসানো আছে।  
সাইকেলটা হাতের সামনে পেতেই, খিলান দিয়ে সাজানো সেই ভারি ভারি থামগুলোর আড়াল থেকে যেন একটা ছোট্ট ছেলে খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, জীবনে এই প্রথমবার একটা জিনিস অন্তত সময় মতো হাতের কাছে পাওয়া গেল ! সাইকেলটা ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখলাম। প্রায় সবই ঠিক আছে শুধু পিছনের চাকাটায় একটুও হাওয়া নেই। স্ত্রীকে রামদীনের জিম্মায় রেখে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।  নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও সাইকেল সারানোর দোকান থাকবে। প্রয়োজনে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেবো, এই ভেবে রাস্তায় বেরিয়ে একটু এগোতেই একজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। লোকটাকে আমার সমস্যার কথা বলতেই, সে তার সাইকেল থেকে নেমে এসে ভালো করে আমার সাইকেলটা দেখলো তারপর ঠিক শিশুর মতোই লোকটা তার একমুখ হলদেটে দাঁতের হাসি ছড়িয়ে বললো, ” ইকটুক দূর আছে বটে।”
    এতদূর জায়গায় এসেও যে একজন দেহাতি মানুষের মুখে নিজের মাতৃভাষা শুনতে পাব এ যেন ভাবতেই পারিনি! মনে মনে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলাম। ভাবলাম, যাইহোক, একজন দেশোয়ালি মানুষকে অন্তত প্রয়োজনে কাছেপিঠে পাওয়া যাবে! আমি কিছু বলার আগে লোকটাই যেন আমার মনের কথাগুলো বুঝে ফেললো। বললো, “এঁজ্ঞে, ইখেনে পেরায় সকলেই আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আমাদের দাদা-পরদাদারা বাঁকড়ো, ফুরুল্যা, মেদিনীফুর থিক্যা গাই-গরুর খাটাল লিয়ে ইখেনে এসে ডেরা বেঁধেছিল!”  
   লোকটার কথা বলার ধরনটি আমার বেশ ভালো লাগলো। আমি হেসে বললাম, “তাই!”   
  পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা একবার কথা বলতে শুরু করলে আর যেন থামতে পারে না, এক নাগাড়ে বকেই চলে। লক্ষ্য করলাম, এই লোকটাও সেই ধরনের বক্তিয়ারবাজ! আর, আমিও যেন লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার সমস্যার কথাটা ভুলেই গেলাম। কিন্তু, হটাৎই কোথা থেকে যেন একঝলক বরফকুচি মেশানো ঠান্ডা বাতাস জঙ্গলের পর্ণমোচী পাতায় ঝরঝর শব্দ তুলে আমার গায়ে এসে লাগতেই, এই অজানা অচেনা জায়গায় বাড়ি ফেরা আর সাইকেল সারানোর চিন্তাটা আবার আমার মাথার ভিতরে নড়েচড়ে উঠলো। আমি সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে তাকে বললাম, “….কিন্তু, এটার কী হবে?”

আমার কথা শুনে লোকটা এবার একটু থামলো তারপর আগের মতোই তার সেই হলদেটে দাঁতগুলো বের করে হাসিহাসি মুখে বললো, “সাইকিল সারানোর দুকানট ইকটুক দূর আছে বটে। তা আপুনি অই পুব পানে তাকিয়ে দাঁড়ান কেনে, উই পথই সজা আপনেকে সাইকিল সারানোর দুকানটতে পৌঁছি দিবেক!                              

তারপর, নিজের মনেই সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো, “….তব্যা, সিখেনে যাবার সময় পুটুলিতে করে ইকটুক লবণ লিয়ে যাবেন। দু-চারটা কড়ি অদবা, কয়েকটা জালখাটি যদি পেতেন….”

     লোকটার এই অদ্ভুতধরনের কথাবার্তা শুনে আমার ওকে কেমন যেন ছিটেল বলে মনে হলো । আমি হতভম্ব হয়ে রাস্তার এদিকও -দিক তাকাতে লাগলাম। আশেপাশে যদি আর কাউকে পেয়ে যাই এই আশায় ! কিন্তু , এদিক ওদিক  তাকাতে গিয়েই আমার নজরে পড়লো একটু তফাতে রাস্তার ধারেই একটা মাছধরা জাল শুকোতে দেওয়া আছে। মনের ভিতরে সামান্য দ্বিধা নিয়েই আমি বললাম, ” ওই তো জাল, কিন্তু….”  আমার কথা শুনে লোকটাও পিছন ফিরে জালটা দেখল তারপর, বললো, ” আসেন, আমার সাথে আসেন! ” কথাগুলো বলেই, সে এগিয়ে গেল তারপর, একটা চালাঘরের উঠোনের সামনে দাঁড়িয়ে কার উদ্দেশ্যে যেন হাঁক পেড়ে বললো,

” কাকি, লোতন বাবুর লেগে চারটা জালখাটি লিচ্চি গ!” ভিতর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর আসার আগেই সে উবু হয়ে বসে কপালে হাত ঠেকিয়ে জালটাকে প্রণাম করলো তারপর, গুনে গুনে চারটে জালকাঠি নিয়ে একটা নেকড়ার পুঁটলিতে বেঁধে দু-চার বার আমার গায়ে মাথায় বুলিয়ে কোনোরকম ইতস্তত বোধ না করেই লোকটা নিজের হাতে সেগুলো আমার পকেটে পুরে দিয়ে বললো, ” যান, সজা উই পথ ধরে এগালেই ভুলভুলুনির হাট। সিখেনে জরা শিমুলগাছের তলায় আপনের সাইকিল সারানর মানুষট বুসে আছেন বট্যা !”
ভুলভুলুনির হাট!  ভাবলাম, বেশ নাম তো হাটটার!                                                                        লোকটাকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে একরাশ কৌতুহল নিয়ে আমি হাঁটা দিলাম ভুলভুলুনির হাটের দিকে। বাদামিরঙের পাথর বিছানো রাস্তার দুপাশে যতদুর চোখ যায় শুধুই কার্পেটের মতো ঢেউ খেলানো সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ আর সেই বিশালাকৃতির তৃণভূমি জুড়ে প্রায় দশ- পনেরো হাত ছাড়াছাড়াই তমাল পাইন পিয়াশাল জুনিপার হেমলক বির্চ গাছগুলি যেন পথিকের শ্রান্তি নিরাময়ের আকুতিতে একেকটা ছত্রালয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকালের প্রারম্ভিক আলোয় রাস্তার থেকেই বিস্তীর্ণ সেই সবুজ ভূমির একেবারে শেষপ্রান্তে ঘন জঙ্গলের কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তরেখার সামনে দাঁড়িয়ে হটাৎই নিজেকে যেন বড়োই ক্ষুদ্র মনে হলো আমার। আমি সেই বিশাল দিগন্তরেখাটির দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আবারও সাইকেলটা নিয়ে  হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশে বনসাইয়ের মতো গজিয়ে ওঠা বির্চ-ঝোপগুলোর আশেপাশে লক্ষ্য করলাম, লাল হলুদ রঙের নরম পালকে মোড়া একপাল গোল গুবগুবে মুরগী ছড়িয়েছিটিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। দেখামাত্রই ওদেরকে যেন ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে হলো ! আমি সেই গাঢ় সবুজ রঙের ছোটোছোটো বির্চ ঝোপগুলোর আশেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অদ্ভুত আকৃতির মুরগীগুলোর দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই লক্ষ্য করলাম, আমার চারদিক ঘিরে যেন অপূর্ব এক রঙের খেলা শুরু হয়ে গেছে! নরম রৌদ্রতে ভেসে যাওয়া আদিগন্ত সবুজ মাঠ, গাছগাছালি সব যেন সেই রঙের খেলায় মেতে ধীরেধীরে আসন্ন গোধুলি বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি সেই রঙ বেরঙের খেলা দেখতে দেখতে হটাৎই একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলাম।আমি লক্ষ্য করলাম , পাম্পহীন সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে এতখানি পাহাড়ি-পথ বেয়ে নিয়ে আসা সত্ত্বেও আমার যেন সামান্য ক্লান্তিটুকুও অনুভব হচ্ছে না! আমি যেন সম্পূর্ণ অতীতহীন হয়ে হিলিয়ামগ্যাস ভর্তি একটা বেলুনের মতো হাওয়ার স্রোতে ভাসতে ভাসতে বাধাহীন এগিয়ে চলেছি !  আমার জীবনে যেন পুরানো কোনো যন্ত্রণা নেই, কোনো আঘাত নেই, তার বদলে একটা পক্ষীরাজ ঘোড়া যেন আমার বুকের ভিতরে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেরাচ্ছে ! 
      কিছুটা পথ এগোনোর পর অনেকগুলো মানুষের কলরোল একসঙ্গে শুনতে পেলাম। আরেকটু এগোতেই দেখলাম, একদল নারী পুরুষ নিজেদের মধ্যে রঙ্গ-রসিকতা, গান-গল্প করতে করতে হাট ফিরতি পথ ধরে যে যার বাড়ি ফিরে যাচ্ছে । ভীড়টা আরও কাছাকাছি আসতেই খেয়াল করলাম, দলের পুরুষগুলি যেন খেলার ছলে কখনো মাঠে, গাছের নীচে, কখনো বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আসঙ্গলিপ্সায় নিজের নিজের নারীদেরকে ইশারায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে আর মেয়েগুলিও এক অদ্ভুত নাচের ভঙ্গিমায় নিজের পুরুষসঙ্গীটিকে ছোঁয়ার খেলায় মেতে কখনো রাস্তার থেকে মাঠে, মাঠের থেকে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে আর অদ্ভুত মজার সুরে গান গাইতে গাইতে, হাসতে হাসতে নিজেদের শরীরময় এক অপূর্ব হিল্লোল তুলে একজন আরেকজনের গায়ের উপর ঢলে ঢলে পড়ছে! এরমধ্যেই লক্ষ্য করলাম, অনেকে আবার আমার মতোই ভুলভুলুনির হাটের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে। সেই ভীড়ের ভিতর হটাৎ একটা কম বয়েসী ছেলে আমার পাশে এসে ঝুপ করে তার সাইকেল থেকে নেমে পড়লো। তারপর, আমার দিকে তাকিয়ে হাসিহাসি মুখে বললো , ” নতুন বাবু বুঝি ভুলভুলুনির হাটে যাবেন? ”                                         
      

ছেলেটি এমনভাবে তার সাইকেল থেকে নেমে এলো মনে হলো যেন ডানায় ভর করে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে সে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তার দিকে কিছুক্ষণ বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নাড়লাম। বললাম, ” হ্যাঁ! ” তারপর সাইকেলটা দেখিয়ে বললাম, ” এই যে এটা সারাতে হবে। ”                                                
ছেলেটি আমার সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বললো, “ওঃ, তাহলে তো আপনাকে নন্দাই মিস্তিরির কাছে যেতে হবে। হাটের পশ্চিমে জোরা শিমুলগাছের তলায় ওর মন্ডি ।

…. তবে, আপনাকে কিন্তু  ধৈর্য ধরে বসতে হবে। আজ ওর অনেক কাজ ।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ” সবাই বুঝি ওর কাছেই সাইকেল সারায়? ”  ছেলেটি বললো, ” হ্যাঁ, তা তো সারায়! তাছাড়া, নন্দাই মিস্তিরির কী শুধু একটা কাজ! ও নতুন জুতো তৈরি করে, ছেড়া জুতোয় তাপ্পি মারে, ছেলেদের খেলার বল, ছাতা, সাইকেলের টায়ার সেলাই করে। হাঁড়ি কড়াই বালতি জলের গামলা ফুটো হয়ে গেলে সারিয়ে দেয়, বাটনা গাছের কাঠ দিয়ে দাঁ, করাত খুকরির হাতল বানিয়ে দেয়                                                                                         আমি বললাম, ” ও বাবা, তাহলে তো ওর অনেক কাজ!”                                                                      ছেলেটি বললো, ” আরও আছে! ঢেকি-ছাটা চাল, নতুন ধানের খৈ, চিড়া,জ্বালানিকাঠ, মাটিরতেল, খড়, কচি বাঁশ সব পাওয়া যায় নন্দাই মিস্তিরির মন্ডিতে!”                                                                                     তারপর, একটু থেমে ছেলেটি বললো, ” চলুন, আমিই আপনাকে ওর কাছে পৌঁছে দিই।” বলেই  সে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলো। আরও কিছুটা পথ এগোবার পর ছেলেটি আঙুল তুলে দূরে দেখিয়ে বললো, ” নতুন বাবু , ওই দেখুন ভুলভুলুনির হাট !”     
                 আমি দূর থেকে ভুলভুলুনিরহাট দেখলাম! হাট তো নয়, যেন একটা মেলা বসেছে ! দূরবর্তী সেই রাস্তার থেকেই আমার মনে হলো, সেই মেলার ভিড়ে কেউই হাঁটছে না, সকলেই যেন নাচের ভঙ্গিতে এক জায়গার থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করছে! ছেলেটির সাথে পায়ে পায়ে আমি ভুলভুলুনির হাটে গিয়ে ঢুকলাম। হাটের ভিতরে পা রাখতেই মনে হলো, আমি যেন একটা সবপেয়েছির দেশে এসে ঢুকে পড়লাম! কী নেই সেখানে! দেখলাম, হাটের প্রায় মধ্যিখানে বসেছে মনোহারি দোকান! মেয়েদের বেলোয়ারি চুড়ি, রেশমি ফিতে, মাথার ঝুমকো কাটা, গিরিমাটি , আলতা পাতা,ছোট ছোট শিশিতে মোম আর , ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি মেয়েদের ঠোঁট রাঙানোর মলম , পুঁতির মালা, কাজললতা, রুজ, পমপমের দোকান ঘিরে খুব ভিড় জমে উঠেছে । একটু দূরেই একটা মহুল গাছের নীচে বসেছে নাগরদোলা। সেখানে ছেলেমেয়েরা সব রঙ্গরসিকতায় মেতেছে। আমি সেই ছেলেটির সঙ্গে সামনের পথ ধরে এগোলাম। লক্ষ্য করলাম, সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে আমার যেন কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না। সকলের জন্যেই যেন ভিন্ন ভিন্ন পথ আগের থেকেই নির্দিষ্ট করা আছে। বুঝতে পারলাম, প্রত্যেকেই যে যার নির্দিষ্ট পথ ধরে যাতায়াত করছে বলেই, সকলের হাঁটার মধ্যে যেন নাচের মতোই একটা ছন্দ তৈরি হচ্ছে। ছেলেটি এবার আঙুল তুলে বললো, ” নতুন বাবু, ওই যে জোড়া শিমুলগাছ। ওইখানেই নন্দাই মিস্তিরির মন্ডি। আমাকে জোড়া শিমুলগাছ দেখিয়ে দিয়ে ছেলেটি বললো, ” এবার আমি যাই, মায়ের জন্য কাপড়ে ফুল তোলার রঙিন সুতো কিনতে হবে।”                                                                                      আমি তাকে ধন্যবাদ জানাবার আগেই সে হাঁটা দিল। আমি জোড়া শিমুলগাছ লক্ষ্য করে এগোলাম… দেখলাম, হরেক কিসিমের পসরা সাজিয়ে হাটুরেরা সব হাটের বিভিন্ন জায়গায় দলবেঁধে বসেছে। বড় বড় তাঁবু খাটিয়ে নেপালি ব্যপারিরা রঙবেরঙের পাথর, তাবিজ, মাদুলি, পাহাড়-প্রমাণ রুদ্রাক্ষ ঢেলে বিক্রি করছে । কেউ কেউ আবার তাদের কাঁধের ঝোলাতে করে হিং, কেশর, জাফরান, পাহাড়ি গাছের শেকড়-বাকড় ঘুরে ঘুরে দেদার বিক্রি করছে। হাটের একধার জুড়ে বসেছে সারি সারি ফলের দোকান। সেখানে থরে থরে সাজানো আছে কাঁদি ভর্তি ডাব, কলা, খোসা ছাড়ানো নারকেল, আখরোট, কিসমিস, পেল্লায় পেল্লায় আখ, রাঙাআলু, আম, পেয়ারা, ঝুড়িভর্তি দারিম্ব । লক্ষ্য করলাম, হাট ফিরতি মানুষজন কেউ কেউ সেইসব ফলপাকড় কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরছে । কেউ কেউ আবার, ঘাড়ে-গদ্দানে মালপত্র নিয়েই খালায় করে কাটা ফলপাকড় দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই খুব মজা করে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে। আর, দোকানিরা তাদের মাছের আঁশের মতো পাতলা রূপালি ছুরি দিয়ে ফলপাকড় কেটে শালপাতার খালায় করে খদ্দেরদের হাতে হাসিমুখে সেসব ধরিয়ে দিচ্ছে।                                              
হাটের প্রায় মাঝখান দিয়ে ঠিক ছবির মতোই বয়ে গেছে সরু একচিলতে একটা পাথুরে খাল । ছোট ছোট কঠের পুল দিয়ে খালটার এপার ওপার করা যায়। এরকমই একটা পুল দিয়ে সেই খালটা পেরিয়ে আমি ভুলভুলুনির হাটের আরেক প্রান্তে এসে পৌঁছালাম। পুলের উপর দিয়ে আসবার সময় মনে হলো কেউ যেন সেই খালের জলে বরফের টুকরো মিশিয়ে দিয়েছে।একটু ক্ষণের জন্য খালের সেই ঠাণ্ডা হাওয়াতে আমার শরীরে যেন কাঁপুনি ধরে গেল।  আমি খালের ওপারে পৌঁছে দেখলাম, কয়েকটা চালাঘরের উঠোনে মাটির ভাঁড়ে করে বিক্রি হচ্ছে মহুল থেকে তৈরি টাটকা মদ। সেখানে নারী পুরুষের ভীড় যেন একেবারে  উপচে পড়ছে। আমি সেই চিৎকার , হৈ-হুল্লোড় পেরিয়ে খানিকটা এগোতেই লক্ষ্য করলাম,একটু দূরে হাটের একটা বেশ বড় জায়গা জুড়ে মাছধরা জাল, পাথরের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি, গৃহসজ্জা , রান্নার নক্সাকরা তৈজসপত্র, ঝলমলে রঙিন শাড়ি, ড্রাগনের পেল্লায় পেল্লায় ছবি আঁকা স্কার্ফ , রুমাল, ছাতা, রাঙাপেড়ে ধুতি, ময়ূরকণ্ঠী চাদরের পসরা ঘিরে বেশ ভীড় জমে উঠেছে ।  
         
      আমি ধীরে ধীরে জোরা শিমুলগাছের নীচে নন্দাই মিস্তিরির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।মাথা নীচু করে নন্দাই মিস্তিরি একমনে কাজ করে যাচ্ছে। শরীরের গড়ন দেখে তার বয়স আন্দাজ করা মুসকিল  । লক্ষ্য করলাম, হাতের কাজ সারা হলেই, নন্দাই মিস্তিরি সেগুলোকে পরপর সাজিয়ে রাখছে আর খদ্দের এলেই সেই সমস্ত জিনিসপত্রগুলো যথাযথভাবে খদ্দেরদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে তারপর পাশের নক্সাকরা বাক্সের ঢাকনাটা খুটুস করে খুলে পাওনাগণ্ডাগুলো গুনেগেঁথে ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখছে । খানিক দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলাম, বেশ কয়েকটা সাইকেল একটা বাঁশের খুঁটিতে পর পর ঠেসানো আছে।  আমিও আমার সাইকেলটা সেখানে রাখতে যেতেই নন্দাই মিস্তিরি বলে উঠলো , ” উঁহু , উখেনে লয়, হাতে লিয়ে রাখুন, আমি ডেকে লিব! ” দেখলাম , আশেপাশে বেশ কয়েকজন লোক আমার মতোই সাইকেল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে বকবক করে একনাগাড়ে গালগল্প করছে। একটি লোককে দেখলাম, সেই ভীড়ের থেকে একটু দূরে সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঠেস দিয়ে বসে নিজের মনেই বাঁশিতে এক অদ্ভুত সুর তুলে চলেছে !                             
নন্দাই মিস্তিরির হাতের কাজটা সারা হতেই , ” ও লোটন! ” বলে কাকে যেন হাঁক পারলো ।                       
দেখলাম, শাড়িমন্ডির ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে একটা লোক  ” যাইগো নন্দাই দাদা ! ” বলে যথারীতি এগিয়ে এলো। লোকটা এগিয়ে আসতেই, নন্দাই মিস্তিরি উঠে গিয়ে কুরির পরিস্কার জলে হাত ধুয়ে এসে শুকনো গামছায় ভালো করে মুছে নিল তারপর , পাশের দাওয়ায় গিয়ে পেতলের পাইয়ে করে মেপে মেপে লোকটাকে চাল দিয়ে এসে আবার আগের জায়গায় বসে পড়লো। মাঝখানে শুধু একটা শব্দ কানে ভেসে এলো , খুটুস !                     
দেখলাম, লোকটা চালের পুঁটলিটা ভালো করে বেঁধে নিয়ে কাঁধে ফেলে হনহন করে গাছের সারির ভিতর দিয়ে হাঁটা দিল।
       কতক্ষন হবে কে জানে , আমি বোধহয় ,শিমুল গাছের তলায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হটাৎ নন্দাই মিস্তিরির গলার আওয়াজ আমার কানে এল , ” আসুন গো লোতোন বাবু । ”                                                  
আমি একটা হাই তুলে উঠে দাঁড়ালাম। সাইকেলটা নন্দাই মিস্তিরির হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফিরে এসে আবার শিমুলগাছের তলায় বসলাম। দেখলাম , নন্দাই মিস্তিরি ততক্ষণে তার দোকানে একটা কুপি লণ্ঠন জ্বালিয়ে নিয়েছে।  কখন যে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে আমার খেয়ালই হয়নি । ঘোর লাগা চোখে আমি সেই বিশাল হাটটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম , ঘন কুয়াশার পর্দা ভেদ করে চারদিকে যেন হাজার হাজার জোনাকি একসাথে জ্বলে উঠেছে ! হাট তখন প্রায় ফাঁকা । নন্দাই মিস্তিরি হাতের কাজ সারতে সারতেই বললো , ” লোতোন বাবু, দুকানের ভিতরে এসে বইস্যান । বাইরে হিম পড়ছে , ঠান্ডা লেগে যাব্যাক । ”                                               আমি দোকানের চালার তলায় ঢুকতে ঢুকতে বললাম , ” এই আলোয় পাংচার সারাতে পারবেন , দেখতে পাচ্ছেন তো ?”                                                                                                                                                   নন্দাই মিস্তিরি বললো, ” ইতো দেখার জিনিস লয় বাবু , ই হলো অনুভব্যার কাজ । ” তারপর মৃদু হেসে বললো , ” শত আঁধারেও ব্যাতের গরাস কী কখনো নাকের খোঁদলে ঢুকে যায় ! ”                
এ কথা-র কোনো উত্তর হয় না। আমি চুপচাপ বসে নন্দাই মিস্তিরির কাজ দেখতে লাগলাম। কুপি লণ্ঠনের দোঁয়াসা আলোয় নন্দাই মিস্তিরি আর  সেই প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে আসা বিশাল হাটটাকে যেন কোনও এক মায়ার জগৎ বলে মনে হলো আমার! আমি ভুলভুলুনির অপার্থিব সেই রূপ দেখতে দেখতে বোধহয়  আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। নন্দাই মিস্তিরির গলার আওয়াজে আমার চটকা ভাঙল। কখন যে তার হাতের কাজ সারা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।                                                                                     নন্দাই মিস্তিরি বললো , ” লেনগো লোতন বাবু, আপনের সাইকিলঠাকুর সুস্থ হইয়ে গিছেন।”

নন্দাই মিস্তিরির মুখে সাইকিলঠাকুর কথাটা শুনে আমি মনে মনে হাসলাম। বললাম, ” কত দিতে হবে? ”  
নন্দাইমিস্তিরি তার হাত-পা ধুয়ে এসে গামছায় মুছতে মুছতে বললো , ” এক পুটুলি লবণ। ”                           
আমি আমতাআমতা করে বললাম , ” আমার কাছে নুন মানে  লবণ তো নেই তবে , জালকাঠি আছে ! ” নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” তবে , তাই দেন।”                                                                                   আমি পকেটের থেকে পুটলিটা বের করে সেখান থেকে একটা জালকাঠি তার হাতে দিলাম । নন্দাই মিস্তিরি জালকাঠিটা আমার হাত থেকে নিয়ে তার সেই নক্সা করা বাক্সের মধ্যে রেখে ” আসছি , ইকটুক দাঁড়ান ! ” বলে সে তার দোকান ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা চোঙামুখো কাঁচ-লণ্ঠন হাতে করে নিয়ে এসে তাতে কেরোসিন তেল ভরে আমার সাইকেলের সামনে বেঁধে দিতে দিতে নন্দাই মিস্তিরি বললো , ” আপনি লোতোন মানুষ, এই চাঁদনে-আলোয় পথ চিনে যেতে আপনার ভুল হয়ে যাবেক। তাই , ….”                                          

তারপর ,লণ্ঠনটায় আলো জ্বেলে দেবার মুহূর্তে  হটাৎই কি যেন মনে পড়ে যাওয়াতে সে আফসোসের সুরে বলে উঠলো , ” বাবু , আপনি তো অনেক্ষণ এয়েচেন , আপনার খিদা পায়নাই ?” নন্দাই মিস্তিরি খিদের কথা জিজ্ঞাসা করতেই , আমার পেটের ভিতরে যেন পৃথিবীর সমস্ত খিদে একসাথে নড়েচড়ে উঠলো। আমি বললাম , ” হ্যাঁ , মানে, তা পেয়েছে !”                                                      নন্দাইমিস্তিরি বললো , ” তালে , ইকটুক বস্যান!”                                                                                 কিছুক্ষণ পর নন্দাই মিস্তিরি একটা শালপাতার বড়ো খালায় করে চিড়ে, বাতাসা, পাকা আম আর, অন্য একটা খালায় করে বট-আঠার মতো ঘন দুধ এনে আমার সামনে নামিয়ে রাখলো । বললো, ” পেট ভরে খেইয়ে ল্যান , এই রাত্তিরে আপনেকে ইখন অনেকট পথ যেতে হব্যাক।”                                                                        

আমি তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে এসে খেতে বসলাম। সেই অপূর্ব ফলাহার মুখে দিতেই মনে হলো , এমন খাবারের স্বাদ ইতিপূর্বে আমি যেন কোনও দিন পাইনি। ভাবলাম , অমৃত বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে তাহলে, সেও বোধহয় এর কাছে হার মানবে ! আমি খেতেখেতেই লক্ষ্য করলাম , নন্দাই মিস্তিরি তার দোকানের জিনিসপত্র গোছগাছ করছে। হাট প্রায় নিস্তব্ধ। দু-দশজন যারা ভাঙা হাটে সস্তায় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার জন্য একটু আগেও এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করছিল তারাও এখন যে যার বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছে। নন্দাই মিস্তিরির দোকানের দাওয়ায় বসেই দেখলাম , ভরা কোটালের বাধভাঙ্গা আলোয় ভুলভুলুনির হাট, রাস্তা -ঘাট, জঙ্গল সবকিছুই যেন হো হো শব্দে ভেসে যাচ্ছে । বহুদূর থেকে শুনতে পেলাম , হাট-ফিরতি মানুষেরা চাঁদের সেই মায়াময় জ্যোৎস্নায় গান গাইতে গাইতে, বাঁশিতে সুর তুলতে তুলতে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে যে-যার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে !                                                                              ওদের দলবেঁধে বাড়ি ফেরার দৃশ্য নিজের কল্পনার আয়নায় দেখতে দেখতে হটাৎ যেন আমারও বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে গেল। ফুল্লরার কথা মনে পড়লো। বৃদ্ধ রামদীনের ভরসায় তাকে একা রেখে এই বিভূঁই জায়গায় সেই কখন রবিউলদের বাড়িটার থেকে বেরিয়েছি ! কথাগুলো ভাবতেই, মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠলো। এতক্ষণে নিশ্চয় ওরা আমার চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফুল্লরার স্বভাব আমি জানি। সে নিশ্চয়ই বৃদ্ধ রামদীনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির সামনের মাঠটায় এসে দাঁড়িয়ে আছে । আমি তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে হাতমুখ ধুয়ে এসে নন্দাই মিস্তিরির সামনে দাঁড়ালাম । বললাম, ” এবার তাহলে আসি ! ”                                                                     নন্দাই মিস্তিরি আমাকে আবারও , ” ইকটুক দাঁড়ান! ” বলেই কুপি লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে তার দোকানঘরের ভিতরে ঢুকে গেল । খানিক বাদেই দুটো বাজার-ভর্তি থলি নিয়ে এসে আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলে যত্ন করে বেঁধে দিল। থলিগুলোর ভেতরে যে চিড়া, খৈ,মুড়ি, মুড়কি, ঢেকিছাটা চাল আনাজপাতিতে ভর্তি  আছে সেটা আমি না দেখেও বেশ বুঝতে পারলাম ।  এরপর, নন্দাইমিস্তিরির একটা অদ্ভুত আচরণে আমি যারপরনাই ঘাবড়ে গেলাম । হটাৎই  সে আমার সাইকেলেটার হ্যান্ডেলের উপর প্রণাম করার ভঙ্গিতে মাথাটা ছুঁইয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে বলে উঠলো , ” সাইকিল- ঠাকুর , সওয়ারীকে লিয়ে যে পথে এইচেন সেই পথেই ফিরে যান। জোছনার পীরিতি-আলোয় পথ হারায়েননি বাবা । ভুলভুলুনির ই পথ বড় ভয়ঙ্কর পথ! ই পথে কেউ অ্যাকবার হারায়ে গেলে সারা জেবন ধরে তাকে নিষ্কান্তের পথ খুঁজে মরতে হব্যাক ! ” তারপর , অদ্ভুতভাবে তার ঝাকড়া চুলভর্তি মাথাটা দুপাশে ঘনঘন নাড়াতে নাড়াতে এক মায়াবী সুরে আবারও সে বিড়বিড় করে উঠলো । বললো,  ” যাও বাবা , যাও, নন্দাই মিস্তিরির হাতযশের অবমান করনি। যে পথে এইচো সেই পথেই ফিরে যাও । লোতোন বাবুর পরিবার তার লেগে পথ চেয়ে বসে আছেন! “
নন্দাইমিস্তিরির অদ্ভুতধরনের কথাবার্তা আর তার সেই রহস্যময় বিভঙ্গ আমার শরীরের ভিতরে কেমন যেন একটা শিরশিরেনি অনুভূতির সৃষ্টি করলো । আমি আর কোনো কথা না বলেই সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে সিটে চেপে বসলাম।                                 

সাইকেলটা চাঁদের অভিসারী আলোয় এক রহস্যময় লহর তুলে মাঠঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে ঝড়ের গতিতে আমাকে নিয়ে যেন ছুটতে শুরু করলো! 

ছবি: গুগল


  :দেবব্রত রয়, বাঁকুড়া

ইলোরার আত্মকথা ১

যেন ক্ষনিকের আমন্ত্রন আর আগুন মেঘে ফেটে যাওয়া ফুলের স্তবক ,
ভীষণ কঠিন নিয়মে বাঁধা কোনো সময় মানব ছুঁয়ে কোয়ারেন্টাইন ইলোরা কাঁদে আমলকী বনে…

বৃষ্টিকে ঘুমপাড়ানি গানের মতো৷

সহস্রকোটি অপেক্ষা শেষে ভীষণ নিয়মের টেলিফোনে রাত জাগে জলপট্টি রাতের ইলোরা,
কন্টকাবৃত্ত দিন যাপনে অসুখ সময় অস্ত যায় না আর…
ক্রমে এইভাবে বয়ে চলে কোয়ারেন্টাইন ইলোরার বেঁচে থাকা ৷
বদ্ধ সংসার চুম্বন ছুঁড়তেও সংকোচ করে বাতাসে ,
যেন অপ্সরার বন্ধনে আবদ্ধ নায়ক নিজেকে নিজেই বেঁধেছে এইভাবে…
তাই আকন্ঠ গরলে বাকরুদ্ধ ইলোরা ছন্দ খুঁজছে মৃত্যু-ঠিকানার ৷
মুক্ত বিহঙ্গের ডাক কখনো কি পাবে শুনতে ?
স্বাধীন ফিনিক্সের মতো কেউ কি বলবে —ইলোরা সর্বস্ব ছেড়ে আমি শুধু বাঁচব তোমার জন্য ?
হাজার আলোকবর্ষ আমি হাঁটব তোমার জন্য ?
বলবে কি সে কথা !!
নাকি,
বার বার যন্ত্রের বুকে বেজে উঠবে পিছুটান,আকন্ঠ সন্দেহ জড়ানো শব্দে ৷
আর তখনই কি সংসারে আবদ্ধ হবে পুনরায় কেউ ?
মিলিয়ে যাবে সন্দেহমাখা খামের গভীরে ?
অজানা , সবটুকু অজানা ৷
অচেনা স্তবকের মতো সেই ক্ষনে ইলোরা তখন ঠিক বেছে নেবে একাকী আলোর সরলরেখা —
কেননা বিমূর্ত নূপুরঝরানো রক্তের আলিঙ্গনে সে চিরকালই একা ৷

ছবি: গুগল

সায়নী সরকার
ঠিকানা-ভাতছালা, স্টাইলো মোড়,পূর্ব বর্ধমান
713101

গুচ্ছকবিতা

অপেক্ষার অবসানে

শরৎ এর শুভ্র মেঘের
ভেলায় ভেসে আসবে তুমি,
কোন এক অজানা ক্ষনে
যখন তোমার অপেক্ষায়
প্রহর নিমিষেই হবে শেষ
সেদিন দেখা হবে,
শত অপেক্ষার অবসানে।
যেদিন প্রকৃতি তার রূপের ,
ছটায় মুগ্ধ করবে তোমায়
ভুলিয়ে দিয়ে যত মান,
অভিমান রেখেছিলে জমিয়ে
পাখির গানে করবে মুগ্ধ
শুনবে অবাক হয়ে।
আর ভাবতে ভাবতে হারিয়ে ,
যাবে অচিন পাখির দেশে।
ইচ্ছে হলেই মেলতে পারো,
পাখির মতো ডানা
করবে না কেউ নিষেধ বারন।
দেখতে দেখতে সময়
কখন হারিয়ে যাবে শেষে।।

অদেখা চিঠি

বলেছিলাম আসবো ফিরে,
যে ভাবে হোক তোর কাছে।
আছি এখন খুব কষ্টে,
মরণ যন্ত্রনা শয্য করে।
দেশের তরে যাই যদি,
প্রাণ দেব হাসি মুখে।
ছায়ার মতো থাকবো পাশে,
করিস নে ভয় আছি সাথে।
স্বাধীন করে আসবো ফিরে,
বীরের বেশে তোদের কাছে।
দেখবি তখন করবো মজা,
বাপ ছেলে দুজন মিলে।
মাতিয়ে রাখবো দেখিস তুই,
করবো কতো খেলা তখন।
স্যালুট দিবি তখন আমার,
ভরবে বুক গর্বে আমার।
ইচ্ছে আছে তোদের নিয়ে,
ঘুরব কতো মজার দেশে।
হবে কি না আসা ফিরে,
মৃত্যু মিছিল হচ্ছে দীর্ঘ।।

শুভ জিত দত্ত
ঠিকানা: বণিক পাড়া, মহেশপুর
থানা: মহেশপুর জেলা: ঝিনাইদহ

মেঘ জমে ওঠে

মেঘ জমে ওঠে
আমাদের দুপুরগুলোয়,
নিশ্চল জলের উপর,
মেঘ জমে ওঠে।
আমাদের স্মৃতির মধ্যে,
শুকনো পাতার গায়ে,
মেঘ জমে ওঠে।

মেঘ জমে।
মেঘ উড়ে আসে ।
মেঘেরা একজোট।
মেঘ জমে ওঠে।

মেঘ জমে ওঠে
প্রথম প্রেমের চিঠিতে,
মায়ের শাড়ির ভাঁজে,
মেঘ জমে ওঠে
ভুলেদের মৃতদেহে,
শকুনের ময়নাতদন্তে
মেঘ জমে ওঠে।

মেঘ জমে ।
মেঘ উড়ে আসে।
মেঘেরা একজোট।
মেঘ জমে ওঠে ।

:শ্রেয়া রায় চৌধুরী
ঠিকানা: 256, গোপাল লাল ঠাকুর রোড,
কলকাতা- 36

দ্বিতীয় ঈশ্বর

হাতির পায়ের মতো ভারী ভারী নক্সা করা থাম দিয়ে সাজানো অধ্যাপক সুরঞ্জন মিত্রের বিশাল বাড়িটা দিনেদিনে যেন একটা দূর্গে পরিণত হয়ে উঠেছে। আর, ঠিক এই কারণেই বোধহয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে ওর অনতিক্রমণীয় একটা দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছে। সুরঞ্জন নিজেও অবশ্য আজ পর্যন্ত আগ বাড়িয়ে পাড়ার কারোর সঙ্গেই খেজুরে-আলাপটুকুও করতে যায়নি এমনকি, পথে ঘাটে পাড়া-প্রতিবেশিদের মুখোমুখি হলেও সামান্য সৌজন্য প্রকাশ করে কাউকেই সে ওর ঐ প্রাসাদ-বাড়িতে আমন্ত্রণও জানায়নি। চন্দননগরের একেবারে পস এলাকায় বিঘাখানেক জায়গার উপরে প্রায় দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওর বাড়িটার বিস্তীর্ণ ঘাসের সবুজ লনে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশী গাছ-গাছালি, জলের ফোয়ারা, শ্বেতপাথরের মূর্তি, বসার জন্য পাথরের সু-দৃশ টেবিল,চেয়ার- সব মিলিয়ে সুরঞ্জনের প্রাসাদ-বাড়িটা ঠিক যেন ছবির মতোই দেখতে লাগে। বাড়িটার অতিরিক্ত সিকিউরিটির কথা মাথায় রেখেই বোধহয়, সুরঞ্জন তার বাগানের বড়ো বড়ো গাছগুলোতে ওর নিজের ভাষায় "তৃতীয় নয়ন" অর্থাৎ, সি সি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। যাতে করে বাগানের আশেপাশে কেউ উঁকি-ঝুঁকি মারলেও সে ঘরের ভিতরে বসেই সবকিছু দেখতে পায়।

বছর পাঁচেক হলো সুরঞ্জন মিত্র এই শহরের-ই সবচেয়ে নামী কলেজের বাংলা বিভাগে এসে জয়েন করেছে অথচ, সেখানেও সে নিজের ডিপার্টমেন্টের কলিগদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করে না। নিজের মনপসন্দ অনুযায়ী বিশেষ কয়েকজন ছাড়া অন্যদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার জন্য সুরঞ্জন কলেজেও প্রায় এক-ই নিয়ম মেইনটেইন করে চলে অর্থাৎ, কারোর সঙ্গেই সে আগবাড়িয়ে খুব-একটা কথা-বার্তা বলে না।এমনকি, ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ ভুল করেও যদি ওর সঙ্গে ক্লাসে কিম্বা, ক্লাসের বাইরে একটু ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে তাহলেই যেন একেবারে কুরুক্ষেত্র ঘটে যায়! ওর নোংরা-অপমানজনক কথা-বার্তায় ছেলে মেয়েগুলো লজ্জায় চোখ-মুখ কালো করে পালিয়ে আসার আর পথ খুঁজে পায়না। সাহিত্যের একজন অধ্যাপক হয়েও সুরঞ্জন যে এতটা শুকনো খটখটে হতে পারে কেউ যেন সেটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনা।
বছর পাঁচেক হলো সুরঞ্জন মিত্র এই এলাকাতেই বিশাল জায়গা কিনে প্রাসাদোপম বাড়িখানা হাঁকিয়েছে। অবশ্য, প্রফেসর-হস্টেল থাকা সত্ত্বেও সুরঞ্জন আগে শহরের একেবারে একপ্রান্তে বাড়ি ভাড়া নিয়েই থাকতো। সেই ভাড়া বাড়িতে তো নয়ই এমনকি, নিজের এই প্রাসাদ-বাড়িতেও সুরঞ্জন আজ পর্যন্ত বন্ধুবান্ধব এমনকি, পাড়া- প্রতিবেশিদের কাউকেই অ্যালাও করেনি।
এই কয়েক বছরের মধ্যে শুধুমাত্র একজন-ই ওর ওই প্রাসাদ বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিল।আর,সে হলো কলেজের অন্যতম ডাকসাইটে সুন্দরী রতিপ্রিয়া, রতিপ্রিয়া মল্লিক। তাও বোধহয়, প্রতিবেশী এবং এম,পি-র মেয়ে বলেই। আসলে, সেবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে সুরঞ্জন মিত্রের মাথা ফেটে একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে গেছিলো!
রতিপ্রিয়ার কাছে একটা অজানা রহস্যের গন্ধ নিতে এসে ওর বন্ধুরাতো সব শুনে একেবারে ‘থ। রতিপ্রিয়া বলেছিল,সুরঞ্জন মিত্রের ড্রইংরুমের বিশাল দেওয়াল জুড়ে একটা এল ই ডি স্ক্রীন আর, ঘরটার ঝা-চকচকে ফ্লোরে রাজ-রাজরাদের সিংহাসনের মতো নক্সা করা ভীষন দামি একখানা সোফা ছাড়া আর কোনো আসবাবপত্র-ই নাকি, নেই! এমনকি,সুবিশাল হল-ঘরটার ভিতরে বই রাখার একখানা সেল্ফও রতিপ্রিয়ার কৌতুহলী নজরে পড়েনি ।
সুরঞ্জন পারৎপক্ষে টিভি দেখেনা। দেখলেও,তার প্রথম পছন্দ শেয়ার মার্কেটের খবরাখবর পাওয়া যায় এমন সব চ্যানেল আর,বুগি বুগি। এটা তারএকটা প্রিয় গেম।গভীর রাত পর্যন্ত জেগে সুরঞ্জন বুগি-বুগি দেখে। কখনো কখনো আবার সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে সদ্য কেনা পিস্তল্টা হাতে নিয়ে ও ঘরময় পায়চারি করে আর,মাঝে-মাঝেই সি সি টিভি-র দিকে তাকিয়ে কী-যেন দেখে তারপর, একসময় আরাম করে সোফায় বসে জায়ান্ট-স্ক্রিনে বুগি বুগি দেখতে দেখতে ওর ইনকাম-ট্যাক্সের দু-নম্বরি খাতা-পত্রগুলো যে ছোকরা দেখভাল করে মাঝরাত্রে তাকে ফোন করে। বলে, ” কি হে, সুইস ব্যাংকের কোনো এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে পারলে? “
ওপাশের উত্তর শুনে সুরঞ্জন কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে তারপর, ফোনে কেউ আড়ি পাততে পারে ভেবে সাংকেতিক ভাষায় বলে, “শোনো, বেড়ালের বাচ্চাগুলো রাখার জন্য তাহলে, আরেকটা রুম বের করতে হবে।

ছবি: গুগল

: দেবব্রত রায়

প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয়!

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে বোঝায় স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রমী ঘটনা যার ফলে প্রভূত আর্থ-সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি হয়, প্রাণহানি ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নানা প্রকারের হয়-বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, সুনামি, ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত প্রভৃতি। আজকাল মানুষের নানান অবিবেচনা মূলক কাজকর্মের জন্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রাদুর্ভাব ক্রমবর্ধমান। প্রকৃতির মমতাহীন খামখেয়ালীপনা দুর্যোগের প্রধান কারণ। এছাড়াও নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন, মাটির নীচের কৈশিক জলের অপব্যবহার, অপরিমিত জৈব ও অজৈব বস্তুর দহন, জল নিকাশি ব্যবস্থার অভাব এবং সর্বোপরি অসেচতনতা প্রাকৃতিক দুর্যোগের উল্লেখযোগ্য কারণ। আমাদের দেশের মানুষেরা প্রতিবছর প্রধানত যে দুটি বিপর্যয়ের কবলে পড়ে তা হলো বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়।
ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার পূর্বে যা করণীয় তা হলো: 
১) বাড়ির নিকটবর্তী নারিকেল এবং তালজাতীয় গাছ লাগাতে হবে,কেননা এরা অনেকখানি ঝড় প্রতিরোধ করে।২) নদী তীরবর্তী অঞ্চলের লোকেদের উচিত বাড়ির কাছে প্রশস্ত এবং উঁচু বাঁধ দেওয়া।৩)বসতি বাড়িগুলো যথাসম্ভব উঁচু স্থানে বানাতে হবে।৪) টিউবওয়েলের অবস্থান হবে উঁচু স্থানে যাতে না বন্যার জল ওতে প্রবেশ করতে পারে। প্রয়োজনে টিউবওয়েলের মুখ শক্ত পলিথিন দিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে।৫)প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ রাখতে হবে।৬)বিভিন্ন এন.জি.ও সংস্থার সঙ্গে দুর্যোগ পূর্ব যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতে হবে।৭)বাড়িতে মুড়ি,বিস্কুট, চিড়া,বাদাম প্রভৃতি শুকনো জাতীয় খাবার রাখতে হবে।৮) পানীয় জল বিশুদ্ধকরণের জন্য ফিলটার, ফটকিরি, ব্লিচিং ইত্যাদি মজুত রাখা প্রয়োজন।৯) বাড়ির মাঝে পাকা গর্ত করে রাখা দরকার যাতে জলোচ্ছ্বাস আসার পূর্বে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুরক্ষিত রাখা যায়।১০) সমুদ্র উপকূল এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষদের ভীষণ সচেতন থাকতে হবে যাতে বিপদকালে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারে।১১) সর্বোপরি অহেতুক গুজব বা রটনায় কর্ণপাত করে ভীত হওয়া চলবে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে করণীয়:
১) দুর্যোগের পরে সর্বাগ্ৰে কাজ হলো হারিয়ে যাওয়া মানুষজনের খোঁজ নেওয়া এবং উদ্ধার করা। প্রয়োজনে অবশ্যই উদ্ধারকারীদের সাহায্য নেওয়া।২) জল পান করার পূর্বে অতি অবশ্যই তা ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে এবং ফিল্টার করে নিতে হবে।৩)  খাদ্যাভাব হলে সরকারের ত্রাণ তহবিলের সাহায্য নিতে হবে নির্দ্বিধায়।৪) রাস্তাঘাটের উপর পড়ে থাকা গাছপালা সরাতে হবে।৫) এইসময় ডায়রিয়া, আমাশয়, বমি প্রভৃতি রোগ হয়,তাই প্রয়োজনীয় ঔষধ গ্ৰহণ আবশ্যক।৬)  ঝড় থেমে গেলেই ইচ্ছামতো বাইরে বেরিয়ে পড়া ঠিক না, লক্ষ্য রাখতে হবে পুনরায় ঝড় আসছে কিনা।৭) প্রতিবন্ধী, অসুস্থ এবং বয়স্ক মানুষের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে এবং এদের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।৮) বসতিস্থানের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে, কেননা এইসময় সাপের উপদ্রব বেশী হয়।৯)  দ্রুত চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য।১০)  টিভি এবং রেডিওতে প্রচারিত বিভিন্ন সতর্কীকরণ বাণী মেনে চলতে হবে।
যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করা বেশ কঠিন, তবুও উপরিউক্ত করণীয় কাজগুলো করলে অনেকখানি নিরাপদ এব সুস্থ থাকা যায় ।                        ———

: অমিত কুমার জানা

একাকীত্ব

তারারা যখন ঝুঁকে পড়ে মুখের উপর
মাথা তুলি
রাত্রির ভয়কে দূরে রাখতে ওই ছোট ছোট দ্বীপে
ভেসে যাই হাওয়ার পিঠে হাত রেখে

আমাদের একাকীত্ব মিশে যায় আলোয়

কখনও কি ভেবেছো তারাদেরও একাকীত্ব আছে
একবার চেয়ে দেখো দুটি তারার মাঝের সমুদ্রে।

: সাত্যকি

ঋষি অরবিন্দ সরণি
জেলা -উত্তর 24 পরগনা
কলকাতা -700125।

Design a site like this with WordPress.com
Get started