আমার চোখ না চাইতেও থেমে গেলো, বাসের ভীড়ে আর ঝাঁকুনির অবহেলা কিন্তু আমার নজরের লক্ষ্যবস্তু বদলাতে পারলো না। দেড় বছর হলো একলা জীবন যাপন, শেষ বারের সম্পর্কটা আত্মসম্মানের তাগিদে মুছে দিয়েছি, ভালোবাসাটা এতটাই গভীর ভাবে গহীনে দাগ কেটেছিল যন্ত্রণার, এতোটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তার রেশ কাটে নি।
সব কিছু যেনো গুলিয়ে কোথায় মিশে গেছিলো জানো? ঠিক যখন শ্যামবাজারগামী বাসটা বালি হল্ট থেকে দক্ষিণেশ্বরে এসে দাঁড়ালো, কন্ডাক্টারের হাঁক আর বাসের হর্ন এর শব্দ কোলাহলের মাঝে সন্তর্পনে ব্যাগ টা কষে হাতে ধরে উঠলে বাসে, সচরাচর, আমি কানে হেডফোন গুজে গান অনুভব করতে ভালোবাসি, শব্দ গুলো যেনো গানের গল্প বলে যায় সুরে সুরে, জীবনের, সময়ের, তোমার-আমার, সমাজের, কান থেকে সরিয়ে রাখলাম সেই হেডফোন, আজ যেনো একাকীত্বের ফাঁকে কোথাও একটা কারণ খুঁজে পেয়েছি উৎফুল্ল হওয়ার, যদিও তোমার তখনও গোচরে আমি আসিনি, দূর থেকেই দাঁড়ানো লোকেদের দুলতে থাকা শরীর গুলোর ফাঁকে ফাঁকে দেখছিলাম তোমাকে, যেনো লুকোচুরি খেলা চলছে তোমাতে আমাতে। কন্ডাক্টার হাঁক ছাড়ল ডানলপ…
বেশ অনেক ভিড় আলগা হলে প্রথম বার চোখ পড়লো তোমার আমার, তোমার চোখে সরু করে টেনে রাখা লাইনার, পড়েছিলে সবুজের টিন্ট টপ, সরু ঠোঁট আর তোমার চাহনি কিছু না বলেও যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মত আকর্ষণ করছিল তোমার দিকে, প্রথম প্রেমে যেমন হয় , ঠিক সেই একই অনুভূতি, সত্যি পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমি সম্পর্ক থেকে?
ধাক্কা খেয়ে আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প শুনতে শুনতে কেমন যেনো একটা ভয়ংকর পরিণতি মন ভেবে নেয় নিজে থেকেই। তাই মনকে সান্তনা দিয়ে সামলে রাখি প্রায়শই কিন্তু সেদিন পারছিলাম না, পারছিলাম না কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা বিচার করতে! বাস যত ক্রমশঃ এগোতে থাকলো, তোমার চোখ দেখলাম আমার চোখে বেশ কয়েক বার এসে ফিরে গেলো। নিজেকে কেমন যেনো চাতক পাখির মত মনে হতে লাগলো।ঠোঁটের কোণে নিজের অজান্তে ক্ষীণ হাসি কখন ফুটে উঠেছিল বুঝতে পারিনি ততক্ষণ, যতক্ষন হটাৎ তোমার চোখে চোখ পড়তেই তোমার হাসি ফুটে উঠলো, সিঁথির মোড় আসতেই আমার নেমে পড়ার পালা, বুঝেছিলাম তোমার ঝোলা ব্যাগ আর চাহনিতে তুমি রবীন্দ্রভারতীতেই পড়তে কনফার্ম হলাম যখন কন্ডাক্টার টিকিট কালেক্ট করতে গেলো… আমি নেমে পড়লাম। সোজা চললাম আমাদের অফিসে, চেষ্টা করছি মুহুর্তগুলো ফেলে রেখে এগোনোর; কিন্তু কিছুতেই এগোতে পারছিনা, চেষ্টার পর চেষ্টা, ঠিক যেমন ছোটো বেলায় ভূতের সিনেমা দেখলে রাতের বেলা হতো, ঠিক তেমন। কিন্তু প্রেম তো আমি আগেও করেছি, সম্পর্ক ছিল বেশ কয়েক বছর, এমন অনুভূতি তো হয় নি , নানা রকম খেয়াল মাথাচাড়া দিতে শুরু করলো, তার রেশ কাটবার ছিলো না কে জানতো?
বেশ কিছু দিন কেটে গেল ঘড়ি ধরে বাড়ি থেকে বেরোনো আর ঠিক ওই বাস টাতেই ওঠা, নাহ তোমার দেখা নেই, তারপর ওই সময় টা বরাবর দক্ষিণেশ্বরের বাস স্টপে বেশ কিছু দিন অপেক্ষাও করা;
নাহ তোমার দেখা নেই।
দেখতে দেখতে প্রায় দুমাস কেটে গেল তোমায় আর দেখিনি, সত্যি বলতে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি, বাসে যথারীতি সামনের দিকে বসে কানে হেডফোন গুজে দিয়ে হারিয়ে যেতাম কাল্পনিক প্রেম উদ্ভাবনে, আমি চা খেতে খুব ভালোবাসি, তবে বাস থেকে নেমেই চা খাওয়াটা কোনোদিনই হতো না, অফিসের ঠিক সামনেই বেশ কড়া করে আদা দিয়ে চা বানায়, ওখানে খেয়েই ঢুকতাম অফিসে। কিন্তু সেদিন জানিনা কেনো বাস থেকে নেমে পড়ার পর ফুটপাতের ঠিক পাশের চা’র দোকানে দাঁড়ালাম? পয়সা মিটিয়ে চা আর সিগারেটে একটু আনমনা হয়ে কী যেনো একটা ভাবছিলাম, হটাৎ চোখ পড়লো ফুটপাথ বরাবর, আমি সত্যি তোমায় দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, সত্যি বলতে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম । তোমার হাতে তখন অচেনা যুবকের হাত, অজ্ঞাত কারণ বসত চোখ কিন্তু চোখ এড়ালো না, চোখের কায়দায় বেশ বুঝিয়ে দিয়েছিলে তুমি অন্য কারো সাথে বাঁধবে ঘর; মনের কোথাও যেনো একটা শান্ত ঝড় আর তৃপ্তি একসাথে বয়ে গেলো, বেশ কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলাম , সিগারেটটা কখন যেনো ফুরিয়ে গেছিলো ঠাওর করে উঠতেও পারিনি, শুধু নিস্পলক চোখে দেখেছিলাম তোমার চলে যাওয়া।
সময় টা পেরিয়ে গেলো তার পর মাস থেকে মাস , বছর থেকে বছর, সেই আকর্ষণ থেকে আমি আর বেরিয়ে আসতে পারিনি কোনোদিন । ভুলিনি তোমায় বিশ্বাস করো, তবু তোমার হাতে রাখা হাত যেনো সুখের দিগন্তে পাড়ি দেয়, যেনো তুমি ভালো থাকো কোথাও না কোথাও আমার প্রার্থনা তে তাই ঘুরে ফিরে আসতো।
তার পর ব্যবসা যখন বেশ জমে উঠলো, আমি আর দাদা বেশ জমিয়ে ব্যবসা করছি হটাৎ বাবা একদিন তোমার ছবিটা সামনে রাখলো, বললো-
পছন্দ তোর?
আমাদের বয়স বাড়ছে এবার কিছু ভাবতে হবে তোকে । আমি সেই মুহূর্তে কতটা অবাক, আবেগ আপ্লুত সেটা বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল, এদিকে মনের ভিতর যে আন্দোলন আনন্দের চলছে তা চেপে রাখাটা সত্যি অক্ল্পনীয়! তার পরের গল্প টা তুমি জানো…
তুমি শুনতে চেয়েছিলে আমার প্রেমের গল্প, আমাদের প্রেম এর গল্প এই ফুলশয্যায় তোমায় এইটুকু উপহার দিলাম, চুমু আঁকলাম তোমার কপালে।
: সৌগত গাঙ্গুলী ঠিকানা : চকপাড়া, লিলুয়া, হাওড়া , ডাক যোগ সংখ্যা : ৭১১২০৪
“এই শুভদীপ ,এদিকে আয়”, মেয়েলি কন্ঠে চমকে উঠে, পিছনে ফিরল শুভদীপ। ফিরেই চমক, তাকে ডাকা হয়নি। ‘শুভদীপ’ বলে তরুণ যে ছেলেটি, সুন্দরী মেয়েটির ডাকে সাড়া দিয়ে তার কাছে হেঁটে গেল, সে আলাদা ।নন্দন চত্বরে ‘কলিখাতা’ বলে একটা লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল আজ,তাতে শুভদীপই ছিল প্রধান অতিথি। কবি হিসেবে ওর মোটামুটি ভালই পরিচিতি আছে, লিটিল ম্যাগাজিনগুলো তো বটেই ,নামী পত্র-পত্রিকাগুলোও নিয়মিত ওর লেখা চায়,ছাপে। এদেরই আমন্ত্রণে আজ ও এসেছিল, ভাষণও দিয়েছে। কবিতা নিয়ে কিছু তো বলতেই হয়,ওর যে জীবনটাই কবিতা। অনুষ্ঠানের শেষে এবার বাড়ি ফিরে যাবার পালা। ফুডস্টলগুলোর কাছে এসে শুভদীপের মনে হল এক কাপ চা না হলে যেন চলছে না। ঠিক তখনই এই কাণ্ড।চায়ে চুমুক দিতে দিতে, একটু থমকে দাঁড়াল ও। এই তরুণ শুভদীপ কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম, ওরই মতো উচ্চতা, রোগা, ফর্সা, গালে হাল্কা দাড়ি, চোখে সানগ্লাস, আকর্ষণীয় চেহারা। একটু দাঁড়িয়ে,শুভদীপের আরো একটু দেখতে ইচ্ছে হল নিজের সমনামীকে। যদিও ফেসবুক বা গুগল খুলে অনেক ‘শুভদীপ’ ও পেয়েছে, নামটাও খুব একটা বিরল নয়। এই ছেলেটা সেরকমই একজন হবে।ওর নিজের কম বয়সের কথা মনে পড়ে গেল, বেশ লাগছিল।
হঠাৎ ছেলেটা বন্ধু বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সানগ্লাসটা খুলে বুকপকেটে রাখল। তখনই চমকে উঠল শুভদীপ, ছেলেটার সঙ্গে ওর চেহারায় ভীষণরকম মিল, ঠিক যেন কম বয়সের শুভদীপ। নিজেকে যেন আয়নায় দেখছিল ও। চা শেষ করে, একটু সরে এসে ,একটা বেঞ্চিতে বসে, ছেলেটাকে ভাল করে নিরীক্ষণ করতে লাগল। ছেলেটা জিন্সের প্যান্টের ওপর একটা কালো আর কমলা রঙের প্রিন্টেড পাঞ্জাবী পরে আছে,কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, চোখ ফেরাতে পারছিল না শুভদীপ।বসে বসে ,বন্ধু- বান্ধবীদের সঙ্গে ছেলেটার কথা অল্পস্বল্প কানে আসতে লাগল।
“কিরে বাড়ি যাবি কেন এখনই?”
“না রে, মার শরীরটা খারাপ। একা আছে।“
“সত্যি,তোর মতো মাতৃভক্ত দেখা যায় না রে।“
“কি করব বল, ছোটবেলা থেকেই তো শুধু আমি আর মা। আর কে দেখবে মাকে?”
“যা বলেছিস, তোর কপালটাই খারাপ”, আরেক বান্ধবী এসে বলে।
“হ্যাঁরে শুভদীপ, তোর বাবা এখনও তোদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না?”
“নাঃ, ডিভোর্সের পর থেকে আর কোন খোঁজই নেই।“
“কখনও আসে না? ফোনও করে না?”
“নারে,ছাড় ওনার কথা।কোনদিন তো মাকে দেখেননি। ওনার থাকা না থাকা সমান।“
“আরে,ওকে আর সেন্টু খাওয়াস না তো, বেচারা এমনিতেই চাপে আছে।“ একজন বলে ।
ছেলেটা এবার একটা সিগারেট ধরায় ।ওর বন্ধু বান্ধবীরাও ধরায়।দু’টান দিয়ে আর এক বান্ধবীকে কাউন্টার দেয়, হাসি-ঠাট্টা চলতে থাকে। ছেলেটা একটু যেন উদাস হয়ে যায়,ওর মুখে কি কোন ব্যাথা ফুটে ওঠে? অন্য সবাই চুপ করে যায় ।
তখনই শুভদীপের চোখের সামনে ভেসে উঠল বিশ বছর আগেকার কথা, তখন ওর যৌবন। নন্দিনীর সঙ্গে সম্পর্কটা হঠাৎ আসা দমকা হাওয়ার মত ছিল। শুভদীপ তখন নিত্যনতুন সম্পর্কের নেশায় ছুটে চলেছে এক সম্পর্ক থেকে আর এক সম্পর্কে। ঠিক তখনই এক সময়ের কলেজবন্ধু নন্দিনীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে। নন্দিনীর মধ্যে শুভদীপ কিছু একটা দামালপানা দেখেছিল, পেয়েছিল সেই সমস্ত, যা ও চায়,যা ওর নিজের অস্থির মনের গোপন কামনা বাসনার সঙ্গে মেলে।শুনেছিল নন্দিনীর অসুখী বিবাহিত জীবনের কথা,ওর স্বামীর অত্যাচারের কথা, শারীরিক মিলনে অনীহার কথা। দেরি করেনি শুভদীপ,তখন ও নিজেও ওর যৌবনের অদম্য চাহিদার জন্য নতুন পুতুল খুঁজছে। নন্দিনীরও সেই দুরন্ত হাতছানিকে এড়ানোর কোন উপায় ছিল না, চাহিদা ছিল দুজনেরই। নন্দিনীদের ফ্ল্যাটেই সুযোগমতো মিলিত হত ওরা,ওর স্বামী যখন অফিসে থাকত। ওর প্রেমে খুব একটা হৃদয় থাকত না, থাকত শুধু শরীর, শুধুই শরীর। নন্দিনী কিন্তু শুভদীপের থেকে আরও বেশি কিছু চাইত,শুধু শরীর নয়,একটা সঙ্গী চাইত,একটা বন্ধু চাইত।বলত,ওর কষ্টের কথা, স্বামীর উপেক্ষার কথা, ভালবাসা চাইত একটু, কাঙালীর মত।
“শুভদীপ, তুমি আমাকে ভালোবাস? সত্যি বাস?”
“কেন ভালবাসব না? এরকম কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“কি জানি! তুমি আমার সঙ্গে চিরকাল থাকবে তো ?চলে যাবে না তো, আমাকে আবার একা করে দিয়ে?”
“ধুর, কি বোকার মতো বলছ?”
“বোকা তো আমি বটেই,ভালবেসেছি যে।কিন্তু আমি জানি, তুমি শুধু তোমার বউকে ভালবাসবে। আমাকে ভুলে যাবে।“
“না গো, জীবনে ভালোবাসা ছাড়া কি শরীর আসে?”
“কিন্তু আমি যে শুধু শরীর চাইনা শুভ, তোমার মনটাও চাই। তোমাকে পুরোপুরি চাই।“
“তা কি করে হবে? তোমার স্বামী আছে না ?”
“আমি যদি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিই। আর পারছি না।“
শুভদীপের পুরোনো সব কথা আজ মনে পড়তে লাগল,ও আজও একা । তনুশ্রীর সঙ্গে বিয়েটা টেঁকেনি বেশিদিন, ছেলেপুলেও হয়নি ।ও জানে দোষ ওরই।ওর এই বহুগামীতার নেশা, কোন একক নারীতে সন্তুষ্ট না হতে পারা, স্বীকার করতে দেয় না সম্পর্কের চিরস্থায়ী মধুরতাকে। কিন্তু সেসব অস্থির দিনগুলো চলে গেছে, আজ পড়ে আছে শুধু প্রৌঢ়ত্বে দাঁড়ানো শুভদীপ। চুলে পাক ধরেছে, শরীরেও ভাঙন , মনটা তো দুর্বল হয়েছেই। এখন ও একটু থিতু হতে চায়। কিন্তু আজ আর উপায় নেই। যৌবনের নেশায় সম্পর্ক গুলো ভাঙতে ভাঙতে, জোর করে অগভীর ক্ষণস্থায়ী একটা মোড়কে ঢেকে রেখে আর প্রকৃত ভালবাসাকে ইচ্ছে করে অসংখ্যবার ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে, তারা সব ধুয়ে মুছে আজ সাফ হয়ে গেছে, বড় দেরি হয়ে গেছে।যদি একটা সাথী থাকত, যদি একটা সন্তান থাকত, যদি নতুন ক’রে আবার সব ঠিকঠাক শুরু করতে পারত! আজকাল প্রায়ই আফসোস হয় শুভদীপের।
ততক্ষণে ছেলেটাও রওনা দিয়েছে, বন্ধু-বান্ধবীদের বিদায় দিয়ে। ওকে দেখে আর কথাবার্তা শুনে এক অদম্য আকর্ষণে পিছনে পিছনে চলল শুভদীপও। ছেলেটা কে, দেখতে হবে। আধুনিক ছেলে, হয়তো শুভদীপেরই মত কবিতা লেখে। না হলে এই পত্রিকার অনুষ্ঠানে আসবে কেন ! একটু এগিয়েই ময়দান মেট্রো, শুভদীপকেও বাড়ি ফিরতে হবে মেট্রো করেই। যাবার কথা দমদম, স্মার্টকার্ড তো কাটাই আছে। ছেলেটার পাশের লাইনেই টিকিট কাটতে মিছিমিছি দাঁড়িয়ে শুনল,ছেলেটা যাবে শোভাবাজার। বুকটা ধ্বক্ করে উঠল। তবে কি? তবে কি? নন্দিনীর বাড়ি তো ওখানে নেমেই যেতে হয়। আর মায়ার বাঁধন এড়াতে পারেনা শুভদীপ। ওকে দেখতেই হবে শেষ পর্যন্ত। ছেলেটার পিছনে একটু দূরত্ব রেখে চলতে শুরু করে। প্লাটফর্মে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওকে লক্ষ্য করে যায়। ছেলেটা কাকে যেন ফোন করে। ওর মাকে নয়তো? ছেলেটা বলতে থাকে “এইতো, এসে গেছি।মেট্রোয় উঠছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি শুয়ে থাকো। ঠিক আছে,রাখছি।“ ফোনের কথাকটা কান খাড়া করে শোনে শুভদীপ। ফোনের ওপারে কি নন্দিনী?কি হয়েছে নন্দিনীর,অসুস্থ বলল। মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। তবে কি ও যা ভাবছে, তাই? এই নন্দিনীর সেই সন্তান ? এইজন্যই একদম যৌবনের শুভদীপের সঙ্গে এত মিল। এ কি সেই?তাই কি নন্দিনী শুভদীপের নামটাকে জোর করে ধরে রেখেছে ছেলের মধ্যে? শুভদীপের বুকে হাতুড়ির ঘা পড়তে থাকে।ওর আবারও মনে পড়ে যায় পুরোনো সব কথা।
“তুমি আমার হও শুভদীপ, আর কারও না।“
“সে তো ঠিক আছে। কিন্তু আমার বাড়িতে জানাতে হবে তো! বাবা-মাকে বোঝাতে হবে। দেখি ,সময় লাগবে ।“
“আমার জন্য এইটুকু করতে পারবে না? আমি কি শুধু তোমার সেক্সপার্টনার ?একটুও ভালবাস না আমাকে ?”
“তোমার কি তাই মনে হয়? একথা বলতে পারলে?”
“সত্যি! সত্যি ভালোবাস আমাকে?”
“হ্যাঁ ,সত্যি।“
“তাহলে আমি যা চাইব, তা দিতে পারবে তো?”
“কি চাও, বল। তুমি যা চাইবে,চলো এখনই ।“
“না গো ,আমি যা চাই তা কোন বাজারে পাওয়া যায় না।“
“মানে?”
“আমাকে একটা বাচ্চা দেবে,শুভদীপ? আমার একটা বাচ্চা চাই।আমি মা হতে চাই।দেবে শুভ?“
কি উত্তর দেবে বুঝতে পারেনি শুভদীপ।শেষে ফেঁসে যাবে না তো ! জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না , ওর পরিবারের একটা সুনাম আছে। চাকরিটা তখন সবে পেয়েছে, বিয়ের কথাবার্তাও চলছে। কিন্তু কামনার আগুনে পুড়তে পুড়তে আগুপিছু কিছুই ভাবে নি ওরা।শুধু দুজনে, দুজনের শরীরের নেশায় ভেসে গিয়েছে। মিথ্যে প্রেমের সম্পর্কটা টিঁকে ছিল আরও কয়েক মাস। হঠাৎ একদিন নন্দিনী বলেছিল, ও মা হতে চলেছে। ততদিনে দুজনেই ছক কষে ফেলেছে এবং ওর স্বামীকে ভুলিয়ে এনে,নন্দিনীর চিত্রনাট্য রচনা করা হয়ে গেছে, যাতে ওর স্বামী কোন সন্দেহ করতে না পারে। ঠিক তখনই শুভদীপ বুঝে গেল, এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়ে গেছে। সুতরাং সম্পর্কের শেষ করতে আর বিন্দুমাত্র দেরি করে নি ও। একটুও কষ্ট হয়নি,আসলে কোন আবেগ ভালবাসা ছিল না তো,তাই নন্দিনীকে ভুলে যেতেও ওর কোন অসুবিধা হয়নি। তারপর থেকে আর ওর কোন খবর, কোনদিনও নেয়নি শুভদীপ।মাঝেমাঝে অবশ্য একান্তে ওর কথা মনে পড়েছে ঠিকই,মনকেমনও হয়ত করেছে,কিন্তু ঐ পর্যন্তই।
হঠাৎ ওর চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল। ট্রেন ঢুকছে। জুনিয়ার শুভদীপের কামরাতেই উঠতে হবে, নজর রাখতে হবে। কামরায় উঠে একটু দূরে থেকে ছেলেটাকে দেখে চলে শুভদীপ ।একটা অপত্য স্নেহ উঠে আসছে যেন অকারণে। হতে পারে,এ কেউ নয়। হতে পারে সেরকম কেউ নেই ।নন্দিনী বা তার কোন সন্তান, কেউ নেই। তবু ভাবতে ভাল লাগে। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে আজ শুভদীপের আর আগের মত রোমাঞ্চ লাগেনা,বরং আফসোস হয়। সে ভুল করেছে, সম্পর্কগুলো নিয়ে, ভালোবাসাবাসি নিয়ে, যৌনতা নিয়ে খেলা করে সে নিজেকেই সস্তা করে তুলেছে,নিজেকেই বঞ্চিত করেছে।সন্তানের মুখ দেখেনি আজও, স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে বছর দশেক হল। কি পেয়েছে জীবনে? একটু থিতু হয়ে বসতে পর্যন্ত পারেনি,খালি দৌড়ে বেড়িয়েছে মিথ্যে মরীচিকার পেছনে।চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে শুভদীপের,চশমাটা খুলে চোখদুটো একটু রগড়ে নেয়। তারপর ভালো করে দেখে জুনিয়র শুভদীপকে।কামরায়, চারপাশে সবাই মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত, কিন্তু এই ছেলেটা আর পাঁচজনের মতো নয়। এক কোণে দাঁড়িয়ে আজকের প্রকাশিত পত্রিকাটায় ডুবে আছে। কবিতাই এখন শুভদীপের সবকিছু, ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে শেষ হয়ে যাওয়া একটা ব্যর্থ জীবনের হতাশার মধ্যেই হয়ত ওখানে ও কবিতার খোলা রাস্তায়, একটু মুক্তি খোঁজে। সব ব্যর্থতা,সব কষ্ট থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতে চায়। শুভদীপ আজ একা, বড় একা। এই একাকীত্ব থেকে কবিতাই ওকে মুক্তি দেয়, শান্তি দেয়। আর কিছু নেই ওর এ পৃথিবীতে ।মনে হয় সুস্থ জীবনের প্রকৃত স্বাদ ও কোনদিনই পেল না,একটা সুন্দর সংসার ,সুখী জীবন, একটা সন্তান- সব ওর কাছে চিরকাল অধরাই থেকে গেল । আজ যৌবন ফুরিয়েছে, যা ছিল আজ সব নেগেটিভ,আলোর পথে এলনা।
“আর একটু বোসো না শুভ,তুমি চলে গেলে আমি আবার একা হয়ে যাব।“
“না নন্দিনী,আজ যেতেই হবে।কাল সকালেই অফিসের কাজে টাটা যেতে হবে।“
“আবার আসবে তো!তুমি কিরকম যেন পাল্টে গেছ।“
“না,না,তা নয়।“
“আমায় কষ্ট দিও না ,শুভ। আমার জন্য তোমার একবারও খারাপ লাগে না?আমি কোন কিছু নই তোমার কাছে,না?”
“তুমি তো মা হতে চেয়েছিলে,আমিও আমার কথা রেখেছি।আর কি চাও আমার থেকে?”
“আর কিচ্ছু চাই না।তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ,আমি সারাজীবনেও তোমার ঋণ শোধ করতে পারব না। শুধু আমাকে একা করে দিয়ে যেও না,আমি কোথায় মুখ লুকোবো বলো! তুমি ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই।”
“আমার কিছু করার নেই,নন্দিনী। একটু বোঝার চেষ্টা কর প্লিজ।“
“আমার কি হবে ,শুভ?আমার বন্ধু হয়ে অন্ততঃ থেকে যাও।তোমার কোন ভয় নেই,তোমার কোন ক্ষতি আমি জীবন থাকতে হতে দেব না।“
“সবকিছু শুধু তোমার কথা মত হবে ,তাই না শুভ?আমার জন্য তোমার কোন সময় নেই,কথা বলারও না।শুধু যাবার তাড়া।“
বিশ বছর আগের এক দুপুরের এসব কথা ভেসে ওঠে শুভদীপের মনে। নন্দিনীকে ছেড়ে চলে আসার দিন ।নন্দিনী মনে হয় কিছু বুঝতে পেরেছিল ,ওকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছিল না। শুভদীপের তখন ফেঁসে যাবার ভয় বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, সবে পাওয়া চাকরি ,ওদিকে নন্দিনী প্রেগনেন্ট ।ওর স্বামী ইম্পোটেন্ট, তক্ষুনি বেরিয়ে আসতে হবে এই সর্বনাশা সম্পর্ক থেকে। নন্দিনীকে স্বার্থপরের মত ছেড়ে এসে, কোনরকমে সেদিন শেষবারের মতো বাড়িটা থেকে পালিয়ে, বেরিয়ে এসেছিল শুভদীপ।কারণ, ততক্ষণে ও মনস্থির করে ফেলেছে, আর ফিরে তাকায়নি কোনদিনও।
হঠাৎ ছেলেটা দরজার দিকে এগোতে, চিন্তায় ছেদ পড়ে শুভদীপের। শোভাবাজার এসে গেছে। আর মাত্র একটু সময়, তারপরেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ও অনুসরণ করতে থাকে ছেলেটাকে। স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে গ্রে স্ট্রিট ধরে সবে একটু গেছে, হঠাৎ ছেলেটা দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে শুভদীপের মুখোমুখি হয়, ওর দিকে এগিয়ে এসে ওকে চার্জ করে। “কি ব্যাপার বলুন তো, আপনি কে? কেন আমার পিছনে পিছনে আসছেন?” শুভদীপ বুঝে উঠতে পারে না, কি বলবে। আমতা আমতা করে বলে “না, মানে আমি তো এখানেই থাকি।“ ছেলেটা শুভদীপের চোখের দিকে তাকায়, একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে ওকে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর একটু নরম হয়। মৃদু হেসে বলে,”ও”। বলেই আবার হাঁটা দেয়।গলাটা শুকিয়ে আসে শুভদীপের। ছেলেটা কি বুঝতে পেরেছে? শুভদীপ দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
শেষে হাঁটতে হাঁটতে ,শুভদীপ তাল রাখতে পারে না, পিছিয়ে পড়ে।ছেলেটা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।আর একটু জোরে হাঁটলে,হয়ত এখনও ওকে ধরা যাবে।কিন্তু শুভদীপ সে চেষ্টা করে না,বরং দাঁড়িয়ে পড়ে।সব চলায় যেমন একদিন থামতে হয়,সেরকমই।
সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,’তুমি কে?কোথা থেকে আসছ?’
আমি বললুম ‘আমি অতীত থেকে আসছি,অন্য আলোয় যাকে দেখেছিলুম,তাকেই খুঁজছি।’
সে বলল ‘আলো তো নিভে গেছে এখানে,অনেক আগে।’
আমি বললুম ‘তাহলে অন্ধকারেই খুঁজি,এই তো! বেশ দেখা যায়।’
গৃহকর্তা সাহস রায় পিসিমার ভয়ে ঘাবড়ে থাকেন আর সবকিছু গুলিয়ে ফেলেন । বিনস’র সাথে বরবটির যে কী তফাৎ আজও বুঝতে পারলেন না। উচ্ছে করলাও তো একইরকম । বেগুণের মধ্যে যে পোকা আছে, সেটা যে কীকরে মানুষ বাইরে থেকে বোঝে, কে জানে!
আজকে যেমন সস্তায় পেয়েছেন ভেবে পেঁয়াজের বদলে টোপাকুল কিনে এনেছেন । পিসিমা ফতোয়া দিয়েছে সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া যাবে না । গায়ে জ্বালা ধরিয়ে বউ শুনিয়েছে – অসময়ে কুল খেয়েই তোমার যতো ভুল।
পিসিমার সাথে সর্বদা বউ সানাইয়ের পোঁ ধরে । কেউ কোনও সাশ্রয় করে না, কিন্তু সেকথা বলবার উপায় নেই সাহসবাবুর । অফিসে নারীদিবসের বক্তৃতায় শুনেছেন – গৃহশ্রমে মজুরি হয় না বলে…। তবে উনি খেয়াল করে দেখেছেন, সব বাড়ির নারীই শায়েস্তা হয় কাজের লোক কামাই করলে ।
বাজার করা তার কাছে ছোটবেলা থেকেই বড় ঝক্কির কাজ। ফর্দ দেখে, সস্তা খুঁজে বাজার দোকান করো, গলদঘর্ম হয়ে বয়ে নিয়ে এসো তারপর হাজার গঞ্জনাও সহ্য করো। যথেষ্ট সস্তায় জিনিস কিনতে পারে না বলে বাবা তাকে বাজার না যেতে দিয়ে নিজে খুঁজে যতরাজ্যের হাবিজাবি কিনে এনে লোককে কৃতিত্বের গল্প শোনাতো। বাজারওলারা সম্পর্কে যেন সাহসবাবুর মামা ।
বাহান্ন বছরের সাহসকে সুযোগ পেলেই এখনও বুড়ি পিসিমা অবহেলার হাসি হেসে বাচ্চা ছেলের মতো উপদেশ দিতে শুরু করেন। সম্পত্তিগুলো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে ঘ্যানঘ্যান। একটা কথা ওনার মনে থাকে না, ঠাকুরদার আমলের যাবতীয় কাগজপত্র কোন এক সিন্দুকে লুকিয়ে তিনি মারা গেছিলেন।
বিয়ের পর থেকে গত বাইশ বছর ধরে সবেতেই ভয় পান সাহসবাবু । বসের ভয়, মাস শেষের ভয়, মুরগির ফ্লু হলে খাসি কেনার ভয়, নেমন্তন্ন এলে ভয়, ইএমআইয়ের ভয়, কোলেস্টেরলের ভয়, পাড়ার দাদাদের ভয়, চাহিদার ভয়, সম্বৎসর পুজোর সময় দেবীও দশহাতে মহাভয় দেন। তাই আজকাল শরীরটা সবসময়েই যেন দুর্বল ঠেকে।
আজ ভুল হতো না বড় একটা, চায়ের দোকানে বসে গল্পগাছা করতে গিয়েই হয়েছে মুশকিল। তারপরে মুদির দোকানে না গিয়ে তিনি সেলুনে গিয়ে আয়েস করে দাড়ি কেটে বাড়ি ফিরেছেন ।
এই কারণেই অফিসে লোকে কাজ না করে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে । সবার আগে সব কাজ করে দেয় – সেটা নাকি তার গুণ নয়, বসের ভয় । আর কী করেন সাহসবাবু… ক্ষমা করে দেন । লোকগুলো যে গণ্ডমুর্খ সে ভালই জানা আছে। কালীপুজোয় লোকের ঘরে রকেট ঢুকিয়ে, চন্দ্রযান কেন ঠিকমতো ল্যাণ্ড করলো না সেই নিয়ে আলোচনা করে । তাকেও যে এরা পুঁছবে না, তাতে আশ্চর্য কি ! অবশ্য সুযোগ পেলে তিনিও গালগল্পও যে ঝাড়েন না, তা নয় । তবে অতি বড় নিন্দুকও তার গল্প বলার আর্টের তারিফ করে থাকেন ।
তার ছোটবেলায় শান্তিনিবাসে পিসিমার সাথে ইন্দিরা গান্ধী দেখা করতে এসেছিল কিংবা দাদুর নেতৃত্বে ভারতের সেনা গিয়ে বাংলাদেশটাকে উদ্ধার করেছিল অথবা বাবা কাউকে তেমন বুদ্ধি দিয়েছিলেন বলেই জিও এই অফার এনেছে… এসব শুনে সবাই আমোদ পায় খুব । সাহসবাবুও চা সিঙারা খাইয়ে থাকেন । সবাই বাহবা দিয়ে বলে, জমিদারের বংশ তো বটে ।
ফেব্রুয়ারির শেষে অফিসে জোর খবর । অডিট করতে লোক আসছে হেড অফিস থেকে । কয়েকদিন বসের হম্বিতম্বি বন্ধ ।
কয়েকদিন ধরে চলা গুজব সত্যি হতে দেখল অফিসের সবাই । বস ব্যাটা জব্বর ফাঁদে পড়েছে । কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ মিলছে না । ফাইল সব লোপাট । অনেকদিন আগেকার দলিল… কারোর মনেও নেই ।
সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছে তখন খেল দেখালেন সাহসবাবু । স্টক খুঁজে হাজির করলেন ভুলে যাওয়া সব ফাইলগুলো ।
তারপর থেকে ভুলো লোকটাকে সবাই সাহস হিসেবেই মনে রাখলো ।
ক্ষমা করো, আমরা মানতে পারিনি তোমাকে, ভুলে গেছি তোমার বর্ণপরিচয়, তাই আজ ভুল বানানে নাম্বার মিলে।
তুমি দিয়েছিলে যে নৈতিক শিক্ষা, আজ, কে বা মানে সেই কথা, সদা সত্য কথা বলা আজ ঠাট্টার বিষয়, ভাই – বোনদের ভালোবাসা আজ বিরল।
ভুলে গেছি এই তুমি আর আমির সংসারে, পিতা – মাতাকে শ্রদ্ধা ভক্তির কথা, তৈরি করেছি বৃদ্ধাশ্রম।
যে বিধবা বিবাহ, বাল্য বিবাহের জন্য তুমি লড়েছিলে, সেই নারীজাতি আজ বেড়াতে পারেনা একা একা, মানুষরূপী রাক্ষসরা থাবা বসানোর জন্য প্রস্তুত তাদের শরীরে।
শিক্ষা সংস্কারে তোমার অবদানের কথা মনে রেখে, আজ আমরা বিদ্যালয় স্থাপন করেছি আনাচে কানাচে, তাতে সুশীল, বিদ্বান ছাত্র – ছাত্রী তৈরি হয় না, তৈরি হয় গুরুমহাশয়দের বিপদে ফেলা ছাত্র – ছাত্রী।
তোমার মাতৃ ভক্তির কথা মনে রেখে, আজ আমরা বৃদ্ধ পিতা – মাতাকে কাঁদায়, একটু খাদ্যের জন্য।
মৃত্যুর সাথে লড়াই করা মানুষটা স্তব্ধ হয়ে যেত। যদি না শ্রাবণী থাকতো। যদি না মাথায় হাত রাখতো, আর বলতো, “বাবা আমি আছি”, তোমার কাছাকাছি।
গরীব মেধাবী স্নেহের ছোট ভাইটার বন্ধ হয়ে যেত লেখাপড়া। যদি না শ্রাবণী দুবেলা টিউশনি করে যদি না ভাড়া বাঁচিয়ে সাইকেল করে, পড়াতে যেত পাশের গ্রামে ডাক্তার হতো না ভাই অল্প দামে।
সারাদিন সংসার সামলে ক্লান্ত মায়ের মুখে হাসি ফুটত না। যদি না শ্রাবণী হাতে হাত দিয়ে যদি না কাজের মাসির টাকা বাঁচিয়ে, অনটনের মেটাতো সংসারে জরাজীর্ণ পরিবার ভেসে যেত ক্ষুধাভারে।
সুন্দরী ষোড়শী নাবালিকা বোনটা অ্যাসিড আক্রান্ত হতো। যদি না শ্রাবণী অমানুষগুলোর সাথে লড়াই করে যদি না স্নেহের বোনকে বাহুডোরে। আগলে রাখত ভালোবেসে টুকরো হয়ে যেত পরিবার অবশেষে।
কিন্তু শ্রাবণী জন্মায়নি কোনদিন। এভাবে আরো কত শ্রাবণীরা হয় আঁধারে বিলীন। মা-বাবার কাঙ্খিত শ্রাবণ যে শ্রাবণী হয়েছিল অপরাধ এইটুকু ছিল তার- ওরা জন্ম নেয় না, ওরা গল্প হয় কন্যাভ্রূণ হত্যার যন্ত্রণা পায় বারবার।
এই কথা গুলো এখনও একই রকম ভাবে প্রাসঙ্গিক।অন্তত আমার তো সেটাই মনে হয়। কেমন আছে আজ বাংলা ভাষা? এই যে আপনি আমি ও আরো বাঙালিরা নিঃশাস-প্রশ্বাস এর মতো যে ভাষা কে ব্যবহার করি। কেমন আছে সে? এতটা পড়ার পর আপনি নিশ্চই টুক করে ভেবে নিলেন সেই আবার একঘেয়ে কচকচি এবং এটাও ভেবে নিলেন আজ কি ভাষা দিবস টিবস নাকি।
না একদম ই ঠিক জানেন।আজ ভাষা দিবস নয়। আজ ভাষা দিবস নয় বলেই সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে কিছু দেখাবো। কিছু সহজ সত্যি কথা তুলে ধরতে আজ এই বিষয়ের অবতারণা। ভাষা কে কিসের সাথে তুলনা করা হয় জানেন? বলা হয় ভাষা হলো বহতা নদীর মতো।সে শুধু বয়ে যায় থেমে থাকে না।থেমে থাকলেই তার আয়ুষ্কাল কমে আসে। এই বিষয়ে কয়েকটা দারুন মজাদার ব্যাপার বলা যাক।
আজকাল ইংরেজি ভাষার প্রসার ও ব্যাপ্তি বিশাল।কোনোরকম ভাবেই এই ভাষার সর্বজনগ্রাহ্যতা কে দূরে সরানো যাবে না।যে জোর করে সেই চেষ্টা করবেন সময়ের স্রোতে তিনি মুছে যেতে বাধ্য। এবার দেখুন ভালো কর্মজীবন ও বাহ্যিক দেখনদারিতার জন্য আজকাল বেশিরভাগ পরিবারের মানুষজন তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা শেখান।। কিন্তু বেশিরভাগ ইংরেজি মাধ্যমে বাংলা কে বড়ো হেয় করা হয়। একজন বাঙালির সন্তান অ,আ,ক,খ এর আগে শেখে A,B,C,D।সে মা কে মা বলে না শেখে মাম্মি বলতে। বাবা কে বলে পাপ্পা।আমার বক্তব্য হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেও বাচ্চা তো বাংলা ভাষাটাও শিখতে পারে।তাতে দোষ কোথায়। তারা বেশিরভাগ “সহজ পাঠের” মতো চমৎকার বই দিয়ে তাদের শিক্ষালাভ শুরু করে না। যখন তার হাতে সেই বইটার রঙচঙে সংস্করণ পৌঁছায় ততদিনে সেই ভাষাটা যে তার “সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ” বা “থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ” এই ধারণা টা তার মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
আমরা যখন সাধারণ কথা বলি আজকাল একে ওপরের সাথে কটা বাংলা শব্দ ব্যবহার করি? যতগুলো করি, তার দ্বিগুণ বেশি শব্দ আমরা ইংরেজির ব্যবহার করি। এর ফলে কি হচ্ছে? যেমন ধরুন “জন্মদিন” এই শব্দটা কিন্তু শুনতে একদমই খারাপ শোনায় না। এবং এইটা ব্যবহার করলে আপনার গায়ে ফোসকা পড়বে বা আপনার সমাজে প্রভাব কমবে তা কিন্তু নয়।
তবুও “জন্মদিন” শব্দটার ব্যবহার কত কমে এসেছে দেখেছেন। আজকাল ছোট ছোট বাচ্চারাও কেউ খুব একটা বলে না যে আজ আমার জন্মদিন। এখন সবাই বলে আজ আমার বার্থ ডে আছে । এবার আরো কিছুকাল পরে শব্দটাই আর থাকবে না। তার জায়গা অধিকার করে নেবে বার্থডে। এরকম আরো কয়েকশো শব্দের সাথে হচ্ছে। তারা হারিয়ে যাচ্ছে। এর পরে এমন একটি প্রজন্ম আসবে যারা এই শব্দগুলো চিনবেই না কখনো।
এবার আপনি যদি সেইরকম ভাবে মানে ওই বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে কথা না বলেন বা আপনার লেখাকে সমৃদ্ধ না করেন তাহলে আসতে আসতে লেখার ক্ষেত্রে আপনার পাঠক সংখ্যা ও আপনার কথা শোনার মানুষ কমবে। অর্থাৎ চলতি ভাষায় “আপনার বাজার থাকবে না”।
যারা ধৈর্য্য ধরে এতটা পড়লেন তারা ভাবছেন এতে আবার কি রে বাবা। এ তো কোন আধুনিক লেখা লিখছে না বা সেই একঘেয়ে কথাই বলে চলেছে।ঠিক আমি পুরোনো কথাই বলছি কারণ এগুলোর প্রয়োজন এখনো শেষ হয় নি।
আমরা এখনও যুগের হাওয়ায় গা মিশিয়ে চলছি,কিন্তু আমাদের হাতেই খুন হয়ে যাচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা।পারলে চেষ্টা করুন একে বাঁচানোর ।ইংরেজি বর্জন করতে বলছি না তবে বাংলার ব্যবহার বাড়াতে বলছি। কে না জানে, ভাষার আত্মা হলো সেই ভাষার মানুষজন।আপনিও পারবেন এই লড়াইতে বাংলার পাশে থাকতে। অনুরোধ করলাম।
আরো দূরে- সেখান থেকে আরও কিছুটা দূরে- যেখানে অসীম সবুজ আধুনিকতার ধূসরতাকে, তার শান্তির চাদরে ঢেকে গেছে, যেখানে একলা দুপুরে মাঠ পেরিয়ে ঘোলা ডোবার ধারে-ধারে সাদা বক,ডাহুক এসে অবাধে ভীড় জমায়- সেখান থেকে আর মাত্র পঞ্চাশ-ষাট পা এগিয়েই রামধনু আঁকা প্রেম জাগানো আকাশ, তার কোলে বেল,জুঁই,মাধবীলতা আরও কত বনফুল শান্ত-শীতল বাতাসে গা দোলায়- ঠিক সেখান থেকেই পাঁচ কিংবা ছয় পা পেরোলেই অসংখ্য রাঙা প্রজাপতি পাখিদের পালকে অবিরত রং ছড়িয়ে চলেছে, মাঝে মাঝেই বৌ-কথা-কও, হলদেমনি এসে জটলা পাকায়- সেখান থেকে আর এক পা এগিয়ে দেখো, অপূর্ণ একটা ক্যানভাস ইজেলে দোল খাচ্ছে, কিছু ডায়েরীর পাতা ছন্দহীন অসংখ্য স্তবকে ভরা- আর অর্ধেক পা বাড়াও দেখবে,ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শুকনো সাদা ছাই ! হয়তো মুঠো-দুয়েক হবে, হ্যাঁ,ওখানেই তোমার সেই গোপন উষ্ণ প্রেম-পত্রটি রেখে যেও।
বাইরে বৃষ্টি তবু প্রত্যেক সন্ধ্যের মত আজও আড্ডা বসেছে নরহরি মিত্তিরের বাড়ি। উত্তর কলকাতার সব রক আর বৈঠকখানা সন্ধ্যাবেলা করে এক একটা আড্ডাখানা থুড়ি আলোচনাসভায় পরিনত হয়। কত কী যে আলোচনা হয় তার হিসাব নেই, আজ হয়তো সাহিত্য কাল ফুটবল তো পরশু রাজনীতি আবার কোনোদিন সিনেমা। একবার কেউ এই আড্ডায় যোগ দিলে সে আর আসা ছাড়তে পাড়বে না, যেন নেশার মতো। নরহরি মিত্তিরের বৈঠকখানাও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এ আড্ডায় উপড়ি পাওনা রমেনবাবুর গল্প।কোনো একটা বিষয় উঠলেই হলো রমেন বাবুর তার নিয়ে কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা আছেই! নিন্দুকে বলে গুল তাপ্পি , কিন্ত শুনতে সবাই খুব ভালোবাসে। বিশেষ করে এমন অদ্ভূতূড়ে গল্প বলেন তাতে সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা হলেও লাঘব হয়…
এক এক করে বৈঠকখানায় এসে উপস্থিত পুরোহিত গিরিধারী, ব্যবসায়ী কিষন সাউ, কথায় কথায় মার্কস আওড়ানো বিপ্লব আর শিক্ষক ভোলানাথ বাবু। তবে এখনও দেখা নেই রমেনবাবুর ।এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় তাকেই তো দরকার। দু’বছর আগে এই উত্তর কলকাতায় বাড়ি কেনেন রমেনবাবু, কিন্ত কোথায় তার আদি বাড়ি তা কেউ জানে না। গল্পের খাতিরে নিজের বাড়ি কখনও বলেন বর্ধমান আবার কখনও বলেন মেদিনীপুর আবার কখনও হুগলি; কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে বলেন যে তাঁর বাবার নাকি বদলির চাকরি ছিলো। তবে কিসে চাকরি করতেন আর এত বদলিই বা কি করে হলেন আড্ডার সভ্যরা তা জানতে পারেননি। ছাতা টা দরজার বাইরে রেখে ভেতরে প্রবেশ করলেন রমেন দস্তিদার; ঢলঢলা পাজামা আর গায়ে পাঞ্জাবি, না ঠিক পাঞ্জাবি নয় ,ঐ পাঞ্জাবি ছিটের জামা, গলা থেকে নীচ পর্যন্ত বোতাম আর নীচেই বোতাম এর দুপাশে দুটো বড় বড় পকেট।
হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঢুকলেন নরহরি মিত্তিরের বৈঠকখানায়। তাকে দেখে বেশ গুছিয়ে বসলেন নরহরি বাবু, চাকর কে ডেকে সবার জন্য আসাম থেকে আনানো চা করতে বললেন। একথা সেকথার পর নরহরি বাবু রমেন বাবুকে বললেন “আজ এই আবহাওয়ায় একটা জমিয়ে গল্প হয়ে যাক” সবাই সায় দিলো তাতে। গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে! তবে সেটা সত্যি হোক আর মিথ্যে বানানো , গল্প গল্পই।চায়ের কাপে সশব্দে শেষ চুমুকটা দিয়ে রমেন বাবু একটা বিশ্রী গলা হাঁকরানী দিলেন। আত্ম অহংকারী একটা ভাব এনে গিরিধারির কাছ থেকে দেশলাই চেয়ে বিড়ি ধরিয়ে বললেন ,”তা বলতে কোনো আপত্তি নেই তবে এই বৃষ্টি বাদলের দিনে একটু তেলেভাজা হলে মন্দ হতো না। তাতে গল্পটা আরো জমতো।” তখনি ডাক পড়ল নরহরি বাবুর চাকরের ,”সবার জন্য মুচমুচে বেগুনী করে আনো” অর্ডার হয়ে গেল…
এবার শুরু করলেন রমেন বাবু,
কিছুক্ষন চুপ থেকে গল্প টাকে খানিক গুছিয়ে নিলেন।বাকিরা একটু অধৈর্য্য হয়ে পড়ছিলো বটে। এমন সময় বলে উঠলেন রমেন বাবু-“আপনারা হয়তো জানেন না , আমার মা ছিলেন জমিদার বংশের মেয়ে ,বাবা ভালো চাকরি করতেন দেখে দাদু বিয়ে দেন, নাহলে হয়তো কোনো জমিদার দেখেই বিয়ে দিতেন আর আমিও হয়তো জমিদার হয়ে এইরকম এক সন্ধ্যেয় গড়গড়া টানতাম বালিশে হেলান দিয়ে ।সে যাইহোক, আমার মায়ের খুড়তুতো পিসিমার নিজের নন্দাই ছিলেন চন্দননগরের জমিদার। তার বিশাল সম্পত্তি আর গঙ্গার ধারে বাগান সহ এক বিশাল প্রাসাদ তবে এখন আর তার কোনো চিহ্ন মাত্র নেই, মা গঙ্গা অনেক কাল আগেই তাকে দিয়ে তার ভোজন সেরেছেন। যে সময়’র কথা বলছি সেটা হলো পলাশীর যুদ্ধের ও আগের, সিরাজ তখনও মুর্শিদাবাদের আম্রকাননে খেলা করতো। ইংরেজ ব্যবসায় তখনও ফরাসিদের সাথে এঁটে উঠতে পারেনি।ফরাসীরা চন্দননগরে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। দুএকটা কল-কারখানা করেছে ঐ গঙ্গার ধারে। আমার মা এর খুড়তুতো পিসিমার নন্দাইয়ের কাছে অনুমতি ছাড়া এসব তখন সম্ভব ছিলো না। তিনি ছিলেন এক দুর্দন্ড প্রতাপ মানুষ, তার এক হাঁকে বাঘ-গরুতে এক ঘাটে জল খেতো। শিকারেও তেমনি পারদর্শী, এক গুলিতে বাঘ সিংহ মারতেন। ফরাসী সাহেবদের সাথে তার খুব দহরম মহরম ছিলো; আর তারা খুব মান্যি করতেন তাঁকে। যে বন্দুক দিয়ে বাঘ মারতেন সেটা নাকি ঐ ফরাসীরাই তাকে দিয়েছিল । এভাবেই চলছিলো বেশ। ফরাসীরা ব্যবসা করে, উপঢৌকন, রাজস্ব জমিদারীর কোষাগারে জমা পড়ে , আর কী চাই? এভাবে চললো কয়েক বছর আর তার পরেই ঘটলো বিপত্তি। বাংলার অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে ,সিরাজ নবাব হয়ে বসার পর ইংরেজ দের সাথে যুদ্ধ করে প্রান খুইয়েছেন। কলকাতা এখন ইংরেজদের। ফরাসীরা একটু কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে সপ্ত বর্ষের যুদ্ধ।এমন সময় একদিন এক ইংরেজ ছোকরা হাজির ঐ জমিদার এর দরবারে। তার ইচ্ছা যে সে চন্দননগরে ব্যবসা করবে। সে ছোঁড়ার সাহস আছে বলতে হবে, একেবারে ফরাসিদের ঘাঁটিতে এসে ব্যবসা করতে চায়। ওদিকে জমিদার ফরাসী বনিক ঘেঁসা, তার বিপদ আপদে ফরাসীরায় পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সাথে তো আর বেইমানি করা চলে না! তা সে কথা তিনি বললেন সেই ইংরেজ ছোকরা কে, সে কাকুতি মিনতি করলে। জমিদার নিমরাজি হয়েছেন দেখে ফরাসীরা তাকে ডেকে বেশ ধমক দেন, তাকে মনে করিয়ে দেন নিজেদের উপকারের কথা।ফরাসীদের এই ব্যবহারে জমিদার খুব অপমানিত হন।আর সেই রাগ গিয়ে পড়ে ঐ ছোকরার ওপর। পরে যেদিন ব্যাটা ব্যবসার অনুমতিনামা নিতে আসে সেদিন জমিদার তাকে কিছু কুকথা শুনে হাঁকিয়ে দেন। এমনকি তার দেশ নিয়েও দুকথা শুনিয়ে দেন জমিদার।রাগে,অপমানে সে ছোকরার লাল মুখ আরো লাল হয়ে যায়। যেনো ইঁট পুড়ে সবে মাত্র বাইরে এনেছে; ছোকরা চলে যায় বটে তবে মনে মনে এর বদলা নেবে ঠিক করে যায়। তখন কিছু বোঝা না গেলেও পরে তার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। কিছুদিন যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন মারা গেলেন ঐ জমিদার, তাঁর নাকি হার্টফেল হয়েছিলো। ডাক্তার মৃতদেহ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন নাকের গোড়ায় কালো কালো ছোপ। যারা নস্যি নেয় তাদের ওরকম থাকে বটে, তবে ডাক্তারের কেমন যেন সন্দেহ হলো। রাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, তাই বিষ খাবারে থাকতে পারে ভেবে রাতের খাবারের উচ্ছিষ্ট পরীক্ষা করা হয়, কিছুই পাওয়া গেল না। তখন এ মৃত্যু স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া হবে মনে হতে লাগলো ঠিক তখনই কোনো এক ফরাসী পুলিশের মনে হয় যে নস্যির কৌটো টা একবার পরীক্ষা করে দেখলে হয় না! যেমন ভাবা তেমন কাজ। পরীক্ষা হলো আর ঐ নস্যিতে পাওয়া গেল একরকমের বিষ, যা ইউরোপেই ব্যবহার হতো। কিন্তু এদেশে কিভাবে আর কে এগুলো আনলো ,আর জমিদার এর নস্যিতে মেলালোই বা কি করে তাই নিয়ে বসল তদন্ত কমিটি। ক’দিন এর মধ্যেই খবর পাওয়া গেল ঐ ইংরেজ ছোকরারই কাজ এটা ,জমিদার এর খাস চাকর হরিপদর বউকে টাকার লোভ দেখিয়ে সে একাজ করে,যদিও হরিপদ কিছু জানতো না ,সে নস্যি এনে দিতো জমিদারকে। আর হরিপদর বউও জমিদার বাড়িতেই কাজ করতো রান্নার, কোনো এক সুযোগে বর এর আনা নস্যির মধ্যে মিশিয়ে দেয় ঐ ধূসর রঙ এর বিষ। তারপর রাতে যখন জমিদার নস্যি নিয়েছেন আর গেছেন। আরে বাংলায় ইংরেজ আর ফরাসীদের রফা হয়ে যাচ্ছিলো আর এই সময় ঘটলো এমন ঘটনা। স্বভাবতই ফরাসীরা ইংরেজ দের ওপর আরো খাপ্পা হয়ে উঠল- তাদের বন্ধুর মৃত্যুর বদলা নিতে উঠে পড়ে লাগলো। আর তাতেই বেড়ে গেল ইঙ্গ ফরাসী যুদ্ধ।”
এই বলে থামলেন রমেন বাবু, যেন এক যুদ্ধ জয়ের হাসি। প্রতিদিন এর মতই গিরিধারী বলে উঠলো-“বাবা! নস্যি দিয়ে খুন ,বাপের জন্মেও শুনিনি।” “সে তো কত কিছুই শোনোনি” একটু তিরিক্ষে ভাবে বললেন রমেন বাবু। আসলে তার গল্প শেষ হলেই পুরোহিত গিরিধারির কিছু না কিছু একটা বলা চায়। গিরিধারীর মুখের দিকে তাকালেন রমেনবাবু, বুঝতেই পারলেন যে সে এ গল্প বিশ্বাস করেনি। আর সেই বুঝেই একবার সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে রমেনবাবু বললেন “জানতাম, অনেকে এ কথা বিশ্বাস করবে না, তাই সেই নস্যির কৌটো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।” এই কথা শুনে সকলে তো হাঁ, বলে কি ! সেই সিরাজ এর সময়কার নস্যির কৌটো মানে প্রায় আড়াইশো বছর আগেকার। এবার সকলের মুখের অবস্থা দেখে রমেনবাবু মনে মনে হাসলেন। গিরিধারীর ভ্রু যুগল এখনো কুঁচকে আছে। আস্তে আস্তে পকেটে হাত দিলেন রমেনবাবু, বেরিয়ে আসতে চলেছে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন নস্যির কৌটো ,তার জন্য কত বড় যুদ্ধ হয়ে গেল।যদি না জমিদার নস্যি নিতেন তাহলে হয়তো ইংরেজ আর ফরাসীদের মধ্যে রফা হয়ে যেত। ঘরের হালকা আলোয় রমেনবাবু যে জিনিসটা বের করলেন তা দেখে ঘরের সভ্য বৃন্দ হতাশই হলেন। গিরিধারী তো একটা ছুক্ করে শব্দ ও করলো ।আসলে সবাই ভেবেছিলো একটা চকচকে কৌটো বেরোবে তার গায়ে মনি মুক্ত বসানো, অন্তত রমেনবাবু র বিবরণ অনুযায়ী তো তাই হওয়া উচিত। কিন্তু যেটা বেরোলো তা তামার একটা রঙচটা আঙুল তিন লম্বা ক্ষয়িষ্ণু কৌটো ,যার গায়ে কটা পাথর বসানো আছে বটে তবে তার কোনো দীপ্তি নেই, নেই কোনো ঠিকরে পড়া আলো! এযেন পর্বতের মুষিক প্রসব। রমেনবাবুর ঠোঁটের কোনে একটা হাসি ,যেন গিরিধারীকে জব্দ করেছেন। হাতে নিয়ে সবাই একবার দেখলেন।নরহরি বাবু জিজ্ঞাসা করলেন-” এ জিনিস তোমার কাছে এলো কিভাবে রমেন?” রমেন বাবু উত্তর দিতে যাবেন এমন সময় বেগুনী এসে হাজির তবে তার হাজিরা আজ সিনেমায় পুলিশের মতো হয়ে গেল ,সব শেষ হওয়ার পর তার প্রবেশ।যাইহোক তার দর্শন পাওয়া গেছে এ বৃষ্টির সন্ধ্যায় ,আর তার ওপর মাগনায় তখন সদগতি করায় শ্রেয়। টেবিলের ওপর রাখা নস্যির কৌটো থেকে এক চিমটে নস্যি নিয়ে নাকে ঢললেন রমেনবাবু, তারপর তিনি যে প্রকান্ড হাঁ টা করলেন তাতে করে তার আলজিভটা পর্যন্ত দেখা গেল । ভ্রু দুটো কুঁচকে এসেছে ,নাকের ফুটো একবার ছোটো হয়ে বড় হচ্ছে, কান দুটো যেন আরো দুহাত প্রসারিত করে দিলো। যে ঝড় আসতে চলেছে তার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সেফটি উপায় অবলম্বন করলেন। নরহরি বাবু হেলান ছেড়ে টানটান হয়ে বসেছেন।যেন এক সিনেমার ক্লাইম্যাক্স আস্তে চলেছে। শিক্ষক ভোলানাথ ধুতির খুঁট তুলে নিজের চোখ মুখ ঢাকছে , বিপ্লব মুখটা সরিয়ে নিলেও আলতো করে ঘার বেঁকিয়ে তাকিয়ে থাকলো , বিহারী কিষন সাউ “আরে রাম রাম বলে উঠতে উদ্যত হলো আর গিরিধারী নিজের জীবন বিপন্ন করে আসন্ন জলোচ্ছ্বাস এর কবল থেকে গরম বেগুনী দের বাঁচাতে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে তেলেভাজার থালাটা; আর এমন সময় বহু প্রতীক্ষিত হাঁচি সশব্দে নির্গত হলো রমেনবাবু র মুখ থেকে“…হ্যাঁচ্চো…”
এ শব্দ আশাকরি লালবাজার থেকেও শোনা যাবে, তারা না পরমানু বোম ফাটলো কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত করতে বেরিয়ে পড়ে ! গিরিধারী, বৃষ্টির মধ্যেই ডেকে নিয়ে এলো পাড়ার বিধু ডাক্তারকে। রমেনবাবুর নাড়ি পরীক্ষা করে বললেন,”বুঝলেন নরহরি বাবু ,ইনি হার্টফেল করে মারা গেছেন।” শুনেই সবাই চমকে উঠলো ।নস্যি নিয়ে ঐ যে হাঁচি দিলেন রমেনবাবু তাতে তাঁরই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে গেল। তক্তোপোশের ওপর পড়ে রয়েছে রমেনবাবুর দেহ। ডাক্তার দু একটা কথা জিজ্ঞাসা করে উঠে পড়লেন, বললেন-“এক ঘন্টা পর গিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট টা কেউ নিয়ে আসবেন।” নরহরি বাবু মাথা টা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন,”কি যে হয়ে গেল!” এমন সময় গিরিধারী টেবিলে রাখা নস্যির কৌটো টা দেখিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ইতিমধ্যে কারেন্ট চলে যাওয়ায় ঘরে শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছিলো,আর তার আলোতেই সবাই দেখলো সেই নস্যির কৌটো টা যেন বেশ জ্বলজ্বল করছে ,তার গায়ে বসানো নীল,সবুজ ,হলুদ পাথর থেকে একটা ছটা যেন হালকা হয়ে বেরোচ্ছে। বৃষ্টি থেমে চাঁদ এর আলো জানালা দিয়ে এসে পড়েছে টেবিলটায় ,আর তাতে যেন একটা মায়াবী উজ্জ্বলতা পেয়েছে নস্যির কৌটোটা।
গিরিধারী ,নরহরি বাবুর কানের কাছে মুখ টা এনে বললো-“ঐ যে মার্ডার ওয়েপন!”
অনাড়ম্বর জীবন হতে পারতো ফড়িংয়ের মতো, অথবা কাঠবেড়ালির। তবুও! শিকড়ের বলিষ্ঠতায় ছড়াতে চেয়েছি দুই হাত। হাতের মুঠোয় ধরেছি ধরণীর মাটি। যে মাটিতে জন্মেছিল ঘাসপোকা, খুঁটে খুঁটে খেয়েছি আর ছুটে গেছি। চঞ্চলতায় পাখনা মেলেছি আকাশে, ডানা ভারী হবার পর জিরিয়ে নিয়েছি কোন রমণীর শরীরে। সে আমাকে ভেবেছিল অন্যগ্রহের। কারণ পৃথিবীর পোশাক খুলে রেখে গোটা চরাচর ঘুরেছি ছদ্মবেশে। চিনতে পেরেছিল কিছু শামুকের দল, যারা পিছিয়ে পড়েছে বলে ফিরে দেখেনি আর। সবাই এসেছে আজ , দেখা হয়ে যাবে শ্যাওলা ধরা ছাদের পাঁচিলে! ঘুঘুর ঘর ভাঙা গোধূলি আলোয়, বাসা ভুলে যে পাখি বসে আছে তারে। অপেক্ষা ? অথবা অভিমানে, জিরিয়ে নিচ্ছে নরম পালক। আর রাজপথ পেরিয়ে ঘরমুখী সেই খরগোশ ও কচ্ছপ! গতিবেগের তফাৎ আজ সমানুপাতিক , দেখা হয়ে গেল নিজের সাথে অনেক দিনের পরে!