প্রাতঃভ্রমণ

বাড়ির পুরনো দেওয়াল ঘড়ি টায় ঢং ঢং করে চারটের ঘন্টা বাজল। কৃষ্ণকান্ত বাবু অভ্যাসমতো বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। তখনো ভোরের আলো ভালো করে ফুটে উঠতে পারেনি। প্রত্যেক দিনের অভ্যাস মত কৃষ্ণকান্ত বাবু ভোরবেলা  উঠে প্রথমে  যান বাড়ির পিছনে কামিনী ফুলের বাগানে। কৃষ্ণকান্ত বাবু কামিনী ফুল বড়ই ভালোবাসেন, যার দৌলতে তিনি তার বাড়ি নামও রেখেছেন কামিনী।

কৃষ্ণকান্ত বাবু রোজ তার সাধের কামিনী ফুলের বাগান কে নিজের হাতে পরিচর্যা করে ভোর পাঁচটার সময় হাত মুখ ধুয়ে যান মর্নিং ওয়াকে। সত্তোর্ধ বয়সের বৃদ্ধের  এইটি রোজকার নিয়ম। শীত হোক কিংবা গ্রীষ্ম বা হোক বর্ষা,  কৃষ্ণকান্ত বাবুকে রোজ ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে দেখা যাবে মাঠে।কেবল মাঝে কয়েকটি দিন অসুস্থতার কারণে যাননি,না হলে তাকে আটকায় কে?

 কৃষ্ণকান্ত বাবু হলেন ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মী, সাদা চুলে ভরা মাথা, পরনে সবসময় সাদা ধুতি আর সাথে মানানসই জামা।একদম শান্ত ভদ্র সভাবের কৃষ্ণকান্ত বাবুর এক পুত্র আর একটি পুত্রী নিয়ে সংসার। পুত্র পুত্রী উভয়ই  বিবাহিত। পুত্রের একটি কন্যাও আছে। অর্থাৎ কৃষ্ণকান্ত বাবুর এখন ভরা সংসার।তবে তার স্ত্রী মারা গেছে,তারও ১০ বছর হয়ে গেছে। 

    এতদিন পর্যন্ত কৃষ্ণকান্ত বাবুর জীবন একপ্রকার ঠিকই ছিল।ভোর চারটে ওঠা, কামিনী বাগান পরিচর্যা করা,পাঁচটায় মর্নিং ওয়াকে যাওয়া,আর আটটায় বাড়ি ফেরা। এই ঘেরাটোপের মধ্যে ছিল তার জীবন বাঁধা আর নাতি-নাতনি ছেলেপুলে তো আছেই। 

   রোজকার মতো সেদিনও কৃষ্ণকান্ত বাবু গেছিলেন মর্নিং ওয়াকে।কিন্তু ফেরেননি সময়মতো। আটটা বেজে ন’টা হলো, দশটা হলো,এগারোটা বাজলো,কিন্তু তিনি এলেন না। ছেলে তখন চিন্তায় পড়েছে কি করবে ভেবে।কৃষ্ণকান্ত বাবু ফোনও ব্যবহার করেন না।তাঁর মতে,”ওসব ফোন-টোন তোমাদের ব্যাপার বাবু।আমি বুড়ো মানুষ।একাই ঠিক আছি।” তেমন  বন্ধু-বান্ধব নেই তার।কি করা যায় ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণকান্ত বাবুর ছেলে অনির্বাণ তৈরি হতে গেল ঘরে।পুলিশের কাছে যাবে বলে যেই ঠিক করেছে ওমনি বেল পড়ল দরজায়।দৌড়ে গিয়ে সদর দরজাটা খুললেন অনির্বাণের স্ত্রী জয়া। দরজা খুলতেই দেখা গেল কৃষ্ণকান্ত বাবু দাঁড়িয়ে আছে মুখে মৃদু হাসি নিয়ে,কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে অনির্বাণ শুধু এইটুকু বলল,”বাবা এবার একটা ফোন নিয়ে নিন।চিন্তা তো হয় আমাদের। ” একটু থতমত খেয়েই কৃষ্ণকান্ত বাবু উত্তর দিলেন,”আরে বাবা অত চিন্তা করতে হবে না।৭০ পেরিয়ে এসেছি।অত সহজে কিছু হবে না আমার।তোমরা ওতো দুশ্চিন্তা করোনে বাবু।”

এর আগেও শতবার এই ফোন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অনির্বাণ তার বাবাকে। এবং প্রত্যেকবারই কৃষ্ণকান্ত বাবুর একই উত্তর দিয়েছিলেন,’না’ তাই এবারে খুব একটা অনুকূল উত্তর আশা করেনি অনির্বাণ। কিন্তু তবুও অনির্বাণ বাবুর এতবার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারলেন না।অগত্যা একপ্রকার বাধ্য হয়েই কৃষ্ণকান্ত বাবুকে রাজি হতে হলো ফোন নেওয়ার জন্য। অবশেষে অনির্বাণ বাবুর ইচ্ছা পূর্ণ হল।বিকেলে একটি নতুন ফোন এল এবং তাকে ফোন করা আর ফোন ধরা সবই শিখিয়ে দিল কৃষ্ণকান্ত বাবুর বছর পাঁচেকের ছোট নাতনি শ্রুতি।

একদিন দেরি  ঠিকই ছিল। অনির্বাণ তার বাবাকে একবার জিজ্ঞাসাও করেছিল, “বাবা ছিলেন কোথায়?” কৃষ্ণকান্ত বাবু কথা এড়িয়ে গেলেন দেখে ছেলেও আর কথা বাড়ায়নি। সবারই কিছু না কিছু গোপনীয়তা তো থাকে,তারও আছে হয়তো। অনির্বাণ সম্পূর্ণ বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করে দেয়। কিন্তু এরপর থেকে প্রায়ই দেরি হতে লাগল কৃষ্ণকান্ত বাবুর। ফোন করে বৌমাকে জানিয়ে দিতেন কখন আসবেন তিনি।কিন্তু কখনো ভুলেও বলতেন না কোথায় আছেন তিনি।

 অনির্বাণের অফিসে দুদিন ছুটি এক শুক্রবার অপরটি সোমবার। তাই কৃষ্ণকান্ত বাবু কায়দা করে সপ্তাহের এই দুই দিন  ঠিক সময় বাড়ি ঢুকতেন। আর বাকি দিন ঢুকতেন দেরিতে।জয়া সব লক্ষ্য রাখতেন।অনির্বাণ তার বাবার এই কাণ্ডকারখানা জানলেও কিছু বলেন নি তাকে। কারণ বিগত কয়েক মাস ধরে এরকম চলতে থাকলেও,কৃষ্ণকান্ত বাবুর মুখের সেই প্রাণোচ্ছল হাসি এবং আনন্দ হারাতে চাইনি অনির্বাণ এবং জয়া।

অনির্বাণ বাবু ঠিক করলেন বুধবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তিনি পিছু নেবেন তার বাবার। হাজার হোক বাবা তো খেয়াল রাখাটা তার কর্তব্য। বাবার যা ইচ্ছা তাই করুক কিন্তু সুরক্ষা করা অনির্বাণ বাবু নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। অতএব যেমন চিন্তা ওমনি কাজ,  সকাল সাতটায় ওঠা মানুষটাকে সেদিন অ্যালার্মের আওয়াজে উঠতে হলো ভোর পাঁচটায়। জেগেই বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করছিলেন অনির্বাণ, উদ্দেশ্য একটাই বাবা বেরোলে তিনি পিছু নেবেন।

 প্রথমে সবকিছুই ঠিকঠাক,কৃষ্ণকান্ত বাবু মাঠে গিয়ে যথারীতি হাঁটাহাঁটি শুরু করেলেন। পিছনে যে অনির্বাণ বাবু আছেন তা তিনি খেয়াল করলেন না। অনির্বাণ বাবু লক্ষ্য করলেন হাঁটাহাঁটি করার সময় কৃষ্ণকান্ত বাবু এদিক ওদিক দেখছেন, যেন তার চোখ সর্বদা কাউকে খুঁজছে। অনির্বাণ বাবু এক মুহূর্তের জন্য ভয়ই পেয়ে গেছিলেন এই বুঝি তার বাবা তাকে দেখে ফেলবে আর অনির্বাণ বাবুর সম্পূর্ণ প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে।

 কিন্তু না সেসব কিছু হয়নি।কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন বৃদ্ধা এলে।ষাট -সত্তোর বছরের বৃদ্ধা। অনির্বাণ তাকে আগে কখনও দেখেনি। বৃদ্ধাকে দেখে কৃষ্ণকান্ত বাবুর চোখগুলো আনন্দে ঝলমল করে উঠল,মুখে মিষ্টি হাসি আর খুব ভালোবাসার সঙ্গে আলিঙ্গন করলেন বৃদ্ধাকে। দৃশ্য দেখে অনির্বাণ বাবু তো স্থির বনে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন,”এই বয়সে বাবা প্রেমে পড়লেন!!! এত মডার্ন বাবা আমার আমি তো জানতামই না।” এই কথা ভেবে অনির্বাণ নিজেই হেসে দিলেন।

 এইভাবে তিনজন তাদের মর্নিং ওয়াক তো সারলেন।কিন্তু সেরেই বসলেন না। কৃষ্ণকান্ত বাবু এবং অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা হাঁটলেন মাঠ পেরিয়ে সোজা বড় রাস্তার দিকে।আরো মিনিট পনেরো হাঁটার পর, একটা ছোট্ট গলি দিয়ে ঢুকে তিন নাম্বার বাড়ির সদর দরজা খুলে দিলেন বৃদ্ধা। দরজা খুলে কৃষ্ণকান্ত বাবু এবং সেই মহিলা ঢুকে গেলেন বাড়ির ভেতরে। এই দৃশ‍্য দেখে অনির্বাণ বাবু হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন রাস্তার উপর।অবশেষে গাড়ির হর্নে তার জ্ঞান ফিরল। বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে অনির্বাণ দেখতে পেলেন দরজার উপর লেখা “রুক্মিণী দাশগুপ্ত”। অনির্বাণ আন্দাজ করলেন বাড়িটি রুক্মিণী দেবীর এবং অজ্ঞাত বৃদ্ধার পরিচয় হয়তো রুক্মিণী দেবী।

 অনির্বাণ বাবু বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন মিনিট পাঁচেক। তারপর তার মাথায় কিছু একটা ফন্দি এল। তিনি তৎক্ষনাতৎ তার বাবাকে ফোন করলেন। দুবার ফোনের রিং হতেই ফোন ধরলে কৃষ্ণকান্ত বাবু। ফোনে বেশ গম্ভীর গলায় অনির্বাণ তার বাবাকে বললেন,”বাবা রুক্মিণী দেবীকে আসার সময় বাড়ি নিয়ে আসবেন।জলখাবার এবং দুপুরের খাওয়াটা তিনি আমাদের সাথেই করবেন।” এই বলে তিনি ফোনটা কেটে দিলেন।

 কৃষ্ণকান্ত বাবুর এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলো।তিনি শুধু ভাবতে লাগলেন,”ছিঃ! ছিঃ! কি লজ্জার ব্যাপার।শেষ পর্যন্ত এইভাবে ধরা পড়তে হবে ছেলের হাতে।” এই সব সাত-পাঁচ চিন্তা করে,অবশেষে ছেলের কথা অমান্য করতে না পেরে কৃষ্ণকান্ত বাবু রুক্মিণী দেবী কে নিয়ে হাজির হলেন তার বাড়ি ‘কামিনী’ তে।

 কৃষ্ণকান্ত বাবু একপ্রকার লজ্জায় মাথা নিচু করে বাড়ির বেল টিপলেন।অনির্বাণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাদের। সদর দরজা খুলে অনির্বাণ সসম্মানে রুক্মিণী দেবীকে বাড়ি ঢোকালেন। তারপর রুক্মিণী দেবী কে নমস্কার করে বললেন,” আমি অনির্বাণ।বাবার বড় ছেলে।”

 তারপর জয়ার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,” উনি আমার স্ত্রী জয়া।”

 ওদিকে ততক্ষণে চা নিয়ে এসেছে জয়া।সেও ঘরে এসে রুক্মিণী দেবী কে প্রণাম করলেন।রুক্মিণী দেবী তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন,”সুখী হও মা।তোমাদের কল্যাণ হোক।”

 কৃষ্ণকান্ত বাবু চুপ করে বসে আছেন দেখে অনির্বাণ নিজেই খাওয়ার টেবিলে জলখাবার খাওয়ার জন্য সবাইকে নেমন্তন্ন করলেন। জয়া গরম গরম লুচি তরকারি পরিবেশন করলেন। এবং খাওয়া-দাওয়া শেষে সকলের প্রশংসা কুড়িয়ে জয়া আর অনির্বাণ কৃষ্ণকান্ত বাবু এবং রুক্মিণী  দেবীকে বসালেন এক জায়গায়। এবং জানতে চাইলেন তাদের অজানা গল্পটি।

 অবশেষে কোন উপায় দেখতে না পেয়ে কৃষ্ণকান্ত বাবু শুরু করলেন তার রহস্যময় গল্পটি।তখন কৃষ্ণকান্ত বাবুর বয়স হবে ওই সতেরো কী আঠারো। তখন একসাথে একই পাড়ায় থাকতেন পনেরো বছরের  ছোট্ট রুক্মিণী। ছোটবেলা থেকেই তারা বন্ধু।এই বন্ধুত্ব কখন যে ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ভালোবাসার,তা কখনোই বুঝতে পারেনি কৃষ্ণকান্ত এবং রুক্মিণী। অনেকটা লজ্জা,অনেকটা বন্ধুত্ব হারানোর ভয়ে তারা নিজেদের ভালোবাসার কথা একে অপরকে বলতে পারেনি।শুধু অনুভব করে গেছেন নিজেদের ভালোবাসাকে।চোখে চোখে সেই কথা বলা,সেই মধুর কতসব স্মৃতি গুলোকে নিয়ে, বাক্সবন্দী করে এতগুলো বছর কাটিয়ে এসেছেন তারা দুজনে।

 এতক্ষণ বলার পর অনির্বাণ বাবু কৃষ্ণকান্ত বাবুকে থামালেন। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন,” তার মানে কৃষ্ণকান্ত এবং রুক্মিণী এই দুটো নাম মিলিয়ে কি কামিনী হয়?এর জন্যই কী এই বাড়ির নাম কামিনী?আর তোমার প্রিয় ফুল কামিনী?আর রোজ সকালে কামিনী ফুলের বাগান কে নিজের হাতে পরিচর্যা করো এই কারণে?” অনির্বাণ বাবুর এরূপ শিশুসুলভ আনন্দে এবং প্রশ্নবাণে কৃষ্ণকান্ত বাবু লজ্জিত হলেন।মৃদু হেসে তার প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ বললেও মুখে কিছু বললেন না।এগিয়ে গেলেন গল্পের পরবর্তী অংশে।

 অনির্বাণ বাবু বুঝতে পেড়ে কথা বাড়ালেন না।শুনতে থাকে তার বাবার গল্প। এরপর রুক্মিণী দেবী বলতে থাকলেন,”তারপর আর যা হওয়ার তাই। এক বছরের মধ্যে আমার সম্বন্ধেও এসে গেল।আর সুপুত্রও যোগাড় হয়ে গেল। কৃষ্ণকান্ত তখনো চাকরি পায়নি। তাই বাবাকে কিছু বলতে পারিনি। দেখতে দেখতে ওর চোখের সামনে আমার বিয়ে হয়ে যায়।আর ধীরে ধীরে ওর স্মৃতি আপ্ছা হতে থাকে আমার কাছ থেকে। আমার এক মেয়েও আছে।আমার স্বামী মারা গেছে সাত বছর আগে।মেয়ে আর জামাই এখানেই থাকতো,কিন্তু হঠাৎ বদলি হয় আমার মেয়ের।আমাকে বলেছিল নিয়ে যাবে,কিন্তু আমার মন যায়নি এখান থেকে যেতে।”

 এই বলে একটু থামলেন রুক্মিণী দেবী। টেবিলের উপর রাখা জলের গ্লাস থেকে জল খেয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,”অতঃপর এখানেই থেকে গেলাম।শেষে ভাবলাম সকালে প্রাতঃভ্রমণে যাব।আর বুড়ো-বুড়িদের সাথে একটু না হয় বন্ধুত্ব করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবো।কিন্তু আমি কি জানতাম যে বুড়োটাকে আমি আবার পাব।”বলে তিনি তাকালেন কৃষ্ণকান্ত বাবুর দিকে। কৃষ্ণকান্ত বাবুর তখন লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠেছে। রুক্মিণী দেবী আবারও বলতে থাকলেন,”প্রথম দিনই চোখে পড়েছিল কিন্তু পাত্তা দেইনি।আসলে আমি ভাবতেই পারিনি যে সে সেখানে থাকবে। কিন্তু সেদিন কৃষ্ণকান্ত নিজেই এল কথা বলতে আমার সাথে।”

-” তুমি রুক্মিণী না?সেই চন্দ্রপুরে রুক্মিণী?তোমার বাবা কৃষক ছিল,তাই নয় কী?”

 মনে মনে খুব আনন্দ হল উত্তেজনাকে মনের মধ্যে আটকে রেখে রুক্মিণী দেবী উত্তর দিলেন,” হ্যাঁ কিন্তু আপনি কে আপনি আমায় চেনেন?”

-” আলবাত চিনি আমি আপনাকে।আর তুমি আমাকে ভুলে গেলে?আমি কৃষ্ণকান্ত। চিনতে পারছ না?সত্যি ভুলে  গেলে আমায়?”

কৃষ্ণকান্ত বাবু কষ্ট পেলেন দেখে রুক্মিণী হাসতে হাসতে বলে উঠলেন,” আমি চিনব না তা কি হয় আমি তোমায় আগেই দেখেছি,তুমি আমার আজ দেখছো।”

 এইভাবে আস্তে আস্তে শুরু হল রুক্মিণী দেবী এবং কৃষ্ণকান্ত বাবুর হারিয়ে যাওয়া প্রেম। আস্তে আস্তে কথার মাধ্যমে এত বছরের সমস্ত গোপন রহস্য বেরিয়ে আসলো দুজনের সামনে। সেই দিন থেকে বদলে গেল তাদের জীবন। মাসকয়েক এই ভাবেই চলতে থাকল তাদের মর্নিংওয়াক,গল্প করা আর কৃষ্ণকান্ত বাবুর দেরিতে বাড়ি ঢোকা।

গল্প শেষে অনির্বাণ খুব উত্তেজিত হয়ে বললেন,”তা রুক্মিণী ম‍্যাম আর বাবা, তোমাদের সম্মতি থাকলে নতুন মায়ের স্বাগতমের ব্যবস্থা করতে পারি?”

 কৃষ্ণকান্ত বাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকেলেন ছেলের দিকে।এতটা তিনি একদমই আশা করেননি ছেলের কাছ থেকে।ছল ছল নয়ণে তিনি অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললেন,”তোমাদের কোনো অসুবিধা নেই?” প্রত্যুত্তরে অনির্বাণ বললেন,” তুমি আমাদের বাবা।তুমি এত কাল আমাদের সুখ-দুঃখ-আনন্দের খবর রেখেছো। আমার আর জয়ার প্রেমকে সম্মতি দিয়েছ। আর আমি তোমার ছেলে হয়ে, তোমার খুশির জন্য এইটুকু করতে পারব না?”

 অনির্বাণ এর উত্তরে মুগ্ধ হয়ে জড়িয়ে ধরলেন কৃষ্ণকান্ত বাবু  তাকে। অনির্বাণেরও চোখের কোনে জল এলো। সে বলল,”বোনকে ফোন করে দিয়েছি।বলেছি আসার কথা।আর মা তুমি ও তোমার মেয়েকে,মানে আমার নতুন বোনকে ফোন করে বল চলে আসতে। তারপর সবাই একসাথে মিলে তোমাদের পুরনো প্রেমটাকে এক করব।” অনির্বাণ বাবুর মুখ থেকে মা শব্দটা আশা করেনি রুক্মিণী দেবী আনন্দের সাথে ফোন করে সেও ডাকলো তার মেয়েকে।

 অবশেষে সবই ঠিক হলো।দুপক্ষেরই কিছু কিছু লোকের অসম্মতি থাকলেও, সবকিছুকে তোয়াক্কা না করে অনির্বাণ বাবু এবং অন্যান্য সবাই মিলে রুক্মিণী দেবী এবং কৃষ্ণকান্ত বাবুর শুভ বিবাহ সম্পন্ন করে তাদের পুরনো প্রেমকে স্বীকৃতি দিলেন।

 বিয়ের শেষে অনির্বাণ বাবু লক্ষ্য করলেন জয়ার মুখে চিন্তার রেখা। অনির্বাণ তাকে জিজ্ঞাসা করল,”কি হয়েছে জয়া?কি ভাবছো তুমি?”অনির্বাণের কানে কানে বলল,”তুমি তো এই বাবারে ছেলে।তোমার আবার কোনো পুরোনো প্রেমিকা নেই তো? পরে এনে বলবে একে আমি বিয়ে করবো। আমি মরে গেলে কিন্তু ভূত হয়ে এসে ওর ঘাড় মটকে দেবো।”হতভম্ব দৃষ্টিতে অনির্বাণ জয়ার দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারল না।শুধু হো হো হো হো করে হেসে দিলো।

: অনুসূয়া ওঝা

চুপ

প্রেম পেলে আসিস আমার কাছে,
বসিস আমার পাশে,
দেখিস আমার দিকে
বলিস না কোন কথা।
কথা বলবে রুপ, আমারা তাকিয়ে থাকবো অযথা।

পড়িস চোখে কাজল
ছোট্ট একটা কালো টিপ
আর তোর সেই, ওই শাড়িটা লালচে কালো ডিপ,
ঘুরবি যখন পিছন আমি দেখব তোর খোলা পিঠ,
তুই চুপ করে বসিস, বলিস না কোন কথা,
বলতে গেলে প্রেম হবে না, শব্দ হবে অযথা।

দেখিস আশেপাশে ফাঁকা সব কটা সিট
তুই আমি সামনাসামনি,
আমার বাঁ হাত, তার নিচে তোর কোমর
আমার ডান হাত, তার নিচে তোর পিঠ
আমার গলা, তার উপরে তোর ঠোঁটের ছেলেখেলা

তুই শান্ত হলেই আমার পালা
আমার দুহাত, তার নিচের তোর গাল
আমার জমে থাকা কথা।
তার উপরে তুই ঠোঁট চালাস
এখন না, প্রেম থেকে ভালোবাসা হলে তখন থামাস।

থামিয়ে দিস হঠাৎ, তাকিয়ে থাকে মাঠ-ঘাট,
আজ ভালোবাসা হোক, প্রেমটা বাকি থাক।

আমার পিঠ, তার নিচে সবুজ মাঠ
আমার বুক, তার উপর তোর চিবুক,
আমি বলি, “চুমু খাবি আয়”
তুই বলিস,  “চুপ, একদম চুপ।”

:তোফায়েল হোসেন

চলার পথে…

এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনের দূরত্বে চলে তাদের পরিপাটির সাম্রাজ‍্য…

দলে আছে কমবয়সী থেকে বয়স্ক সকলেই! এক-একজনের জীবনের এক-এক ধরনের বিচিত্র কাহিনি কান পাতলেই শোনা যায়! সাজগোজ? পরনে রঙচটা, ছেঁড়া শাড়ি- ব্লাউজ, আঁচল কোমড়ে গোঁজা, হাতখোঁপাতে কোনো পরিপাট‍্য নেই, কারো বা কপালে সিঁদুরের আভা; অধিকাংশই প্রচন্ড শীর্ণ, দেখলেই বোঝা যায়, অসম্ভব মনের জোরই এগিয়ে নিয়ে যায় তাঁদের! এইসব মহিলাদের সাথে প্রচুর পুরুষ সঙ্গীও দেখা যায়– হয়তো নেই কোনো বিশেষ সম্পর্ক, শুধু কাজের সূত্রেই সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুর মতো। এদেরও দেখা যায় লুঙ্গি ভাঁজ করে কোমরে বেঁধে আর একটা ছেঁড়াফাটা গেঞ্জি পড়ে মাথায় মুট বইতে! রোজকার ঝগড়ার মধ‍্যেও তাদের অদম‍্য ভালবাসা আর ভালোলাগা বেঁচে থাকে! সস্তার অভিমান বোধহয় শুধু মধ‍্যবিত্তদেরই সাজে…একদল তাকে কিনে নেয় টাকায়, আর এই একদল, যাদের মধ‍্যে অভিমান বিস্তারের অবকাশই পায়না– প্রতিদিনের জীবনে এরা এতটাই সহজলভ‍্য যে আলাদা চোখে দেখতেই শিখিনি আমরা! কেউ কেউ এদের দেখলেই নাক সিঁটকোয়, নির্দ্বিধায় দামী জুতোয় পা দলে দেয় ভীড়ের সুযোগে; আবার কেউ কেউ একটু হাসিমুখে কথা বলে জেনে নিতে চায় অভাবের কথা! 

 আজ বহুদিন বাদে ভোরের ট্রেনে– ৫:৪০ এর কৃষ্ণনগর লোকাল। চারপাশে এত গিজগিজে ভীড় দেখে মনে হবে যেন বিকেল ৫টার কোনো ট্রেনে উঠেছি বাড়ি ফেরার জন‍্য! ভ‍্যান্ডারের ভাড়া বাঁচাতে গেটের দু’দিকে সার দেওয়া জিনিসের ঢল– কেউ ঘুমে ঢুলছে, আবার কেউ কেউ ব‍্যস্ত ফুলের মালা গাঁথতে, কেউ ঘরে ভাজা মুড়ি আর ছোলা এনেছে বিক্রি করতে, কোথাও ঝুলছে বড়ো পাপড়ের ঝাঁঝড়ি, পাশের কামরা থেকে ভেসে আসছে ছানার জলের বিদঘুটে গন্ধ; এরমধ‍্যেই শোনা যাবে কোনো এক মালতী পিসি গান ধরেছে দরাজ গলায়..  আর, ঐ যে লোকগুলো, তাদের মধ‍্যেও কেউ কেউ এইসব মহিলাদের সরঞ্জাম গুছিয়ে দিয়েই ছুটে চলে অন‍্য কামরায় জায়গা করে নিতে! অদ্ভুত পরিবেশ, কিন্তু প্রচলিত! তবু আজ যেন সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার ইচ্ছে জেগেছিল প্রবলভাবে! 

    ট্রেন তখন মদনপুর…

প্রতি স্টেশনের মতো এবারও গেটে চলছে প্রচন্ড ব‍্যস্ততা, ভ‍্যান্ডারির জিনিসপত্র ওঠানামা করছে.. হঠাৎই এক মহিলা এক বৃদ্ধার মাথা ঠুকে দিল দরজায় নিজের ‘মাল’ তোলার জন‍্য, তারপরই প্রায় হাতাহাতি; ব‍্যস…

ট্রেন চলতে শুরু করেছে , রড ধরে দৌড়চ্ছে ঐ মহিলা; ঝুলে পড়েছে– টানটান উত্তেজনা আমাদের চোখেমুখে – পড়ে গেল? না! রোজকার মতোই অভ‍্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে পড়েছে ট্রেনে; আর, তারপরই আবার ঝগড়া, গালাগালি! তবে, সাথের সঙ্গীটি আর উঠতে পেরেছে কিনা অন‍্য কামরায় তা জানতে পারিনি!

    না, আজ আর এদের ঝগড়ায় অস্বস্তি লাগলো না, বরং মনে হল এটাই তাদের বেঁচে থাকার রসদ…আর, ঐ যে মেলবন্ধন একেও অনেকে নোংরা চোখে দেখবে, কটু মন্তব‍্য করবে! আবার কিছুক্ষন পর থেকেই একসাথে বসে শুরু করবে প্রতিদিনের যাত্রা, আবার গল্প করবে সব ভুলে, বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে খোঁজ নেবে একে অপরের… দিনশেষে এরা কী পায়, আমরা জানি না, খোঁজও রাখি না…তবে বিশ্বাস, কিছু ভরসার হাত আছে এদের, একটা দল আছে…এরা দরকারে মারবেও, আবার হাত টেনে ধরে বাঁচিয়েও নেবে প্রত‍্যেকে প্রত‍্যেককে। শুধু ব‍্যস্ততার ভান করার মাঝে আমরাই এই ভালোলাগাকে খুঁজতে শিখিনি!

    হঠাৎ ভাবনার দমকে বাঁধা পড়ল, নৈহাটি ঢুকছে ! ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসলাম গেটের সামনে, ঠান্ডা হাওয়ার স্নিগ্ধতা জড়িয়ে নিল – নেমে পড়লাম আমি, এগিয়ে গেল তারা দিগন্তবিহীন গন্তব‍্যে! আবার দেখা হবে ফেরার পথে…

: মধুরিমা রায়

পৃথিবীর ও একটা মন রয়েছে…

পৃথিবীর ও একটা মন রয়েছে
আর মানুষ গর্ববোধে শূন্য হয়ে য়ায়

রক্তশূন্য সূর্যের আলোয় আমরা বই পড়ছি
ধর্মগ্রন্থ নয়
সাদা কাগজ
চোখের কুয়াশার জন্য ঝাপসা দেখছি দিগন্ত
আর এ পর্যন্ত আমাদের সব বর্ণনা জলের মতো
জলেও প্রাণ আছে
যেভাবে আমরা বেঁচেছিলাম অনেক বছর

ফাঁকা মাঠের গোড়ালি থেকে ভেসে আসছে গরুর গাড়ির গান
আর মাটির চাকার ঘর্ষণে জেগে উঠছে আকাশ
নক্ষত্রের পাল তাড়া করছে
এমন বিপদসংকুল ছিলো সৃষ্টির উল্লাস

বেশিরভাগ সময় মানুষ শূন্যে ভাসে
আর সঙ্কটে পড়লে পৃথিবীতে নেমে আসে
পৃথিবীর তো একটা মন রয়েছে

ছবি: গুগুল

: গোলাম রসুল

”টপিক; শ্রমিক”

পরিযায়ী শ্রমিক।
এরা এখন মিডিয়া বাজারে হট টপিক;
লকডাউনে কিভাবে কষ্ট করে বাড়ি ফিরছে, খেতে পাচ্ছেনা আরো কত কি!সোস্যাল মিডিয়াতেও এদের নিয়ে দুঃখের স্রোতে ভাসমান। আমিও দুঃখ পাচ্ছি। নানা কবিতা আর্টিকেল আরো কত কি সব কিছুর প্রধান আকর্ষণ বা কেন্দ্রবিন্দু এখন এনারা।
বাহ! সত্যি, মানুষ এদের নিয়ে ভাবচ্ছে, কিন্তু একটা প্রশ্ন ??
ভীষণ ভাবাচ্ছে আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে- এই শ্রমিকরা কি আজ প্রথম যে এভাবে কষ্ট করছে? আজই কি প্রথম যে তাদের সন্তানদের নিয়ে অনাহারে মড়ছে ?
নাহ আজ প্রথম নয়-
সময় মানুষকে ভাবায়, সেই নিরীহ শ্রমিকদের কষ্টটা আজ প্রথম নয় যে অনাহারে আত্মহত্যা করছে, আজ প্রথম নয় যে বিপর্যস্ত হয়ে মাইলকে মাইল হঁটেছে, তাদের দুধের শিশুটাকে নিয়ে ,
তখন কিন্তু কোনো মিডিয়া তাদের খবর কভার করতে আসেনি , ভাবায়নি তখন কোনো সোস্যাল মিডিয়ার পোস্ট ওয়াল!
ভাবায়নি?
তখনো অনেক অসহায় মায়েরা তাদের শিশুকে মাইল কে মাইল পথ ধরে হাঁটিয়েছে বলেছে –
“এই তো সোনা চলে এসেছি।”
তখনো অনেক অসহায় মানুষের খিদেতে মৃত্যু হয়েছে সেই রেল লাইনে।
কিন্তু তখন কেউ ভাবায়নি- কেউ ভাবেনি…
আসলে আমরা বড্ড হুজুগে মানুষ, টপিক সন্ধানী মানুষ নিজেদের সোস্যালে বেশি চর্চা করাতে ভালোবাসি।
তাই আজ সুযোগ এসেছে- সুযোগ করে দিয়েছে
লকডাউন নামক বিশ্বত্রাস নায়ক । তাই তার সান্নিধ্যে এসে কিছু মানুষের হঠাৎ দয়া জাগরিত হয়েছে এই শ্রমিক শ্রেণির প্রতি!
কিন্তু কোনো একসময় এই মানুষরাই শ্রমিক শ্রেনিদের ক্রীতদাসের উপমায় অপমানিত করতে হয়তো বাঁধেনি।
আমরা সাম্যবাদের ভাবনায় যতই জ্ঞান কবচাই,
দিনের শেষে মানতেই হয় আর বলতেই হয়-

মালিক শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণি।


দেখতেই হয়- কেউ আসে উড়োজাহাজে
আর কেউ আসে মৃত্যুমিছিলের পথ ধরে।
আসে কিন্তু সবাই ।
আর সমাজের সেই বুদ্ধির ঠিকাদাররা- সেই বুদ্ধিজীবিরা তারাও আসে ঠিকই…
তবে, শ্রমিকের মৃত্যুমিছিলে যোগ দিতে নয় ,
শ্রমিকের মৃত্যু যাত্রায় মেকি সমবেদনার মোমবাতি আর নিজস্বীর অবয়বে।
আসে ঠিকই!

আর আজ, কত দয়া, কত দুঃখ,
এদের এই দুঃখ দেখে দুঃখও বেজায় বিদ্রুপ মনে করছে নিজেকে।
দয়া করে এবারে এই প্রহসন গুলো বন্ধ করুন ,
ওরা শ্রমিক- জোকার নয়;

ওদের জীবন জীবিকা নিয়ে আপার রঙ্গ করার দরকার নেই…
হয়তো লকডাউন একদিন উঠে যাবেই ,
এই বিশ্বত্রাস ভাইরাস ও একদিন ইতিহাসের পাতায়  থেকে যাবে ভাঙ্গা চিড়ের দাগের মত ।
কিন্তু,
   সেই শ্রমিক শ্রেণি সেদিন ও হেঁটে যাবে তার অসহয়তার ভাগ্যের রেখা ধরে, সেদিন কোনো মা তার সন্তানকে নিয়ে মাইলকে মাইল পথ হেঁটে যাবে নিজের আত্মমরিচীকার পথ ধরে।
কিন্তু, সেই দিন মিডিয়ারা আর থাকবেনা তাদের hot cake Breakingnews করার জন্য ।
কারণ, তারা শ্রমিক-
                                নতুন নাম; পরিযায়ী শ্রমিক

ছবি; গুগুল

: প্রিয়াঙ্কা পিহু কর্মকার, খড়দহ, কল্যাণনগর
ভায়া- পানশিলা
কোল-৭০০১১২

।। আশ্বস্ত হও ।।

ঝিলমিল রোদ গাছে
দূর হতে পাখিদের ডাক আসে
পাখিটাও বুঝি আজ রয়েছে উপোস মৌমাছিটাও যেন এসে আঙ্গিনায় চাইছে খোরপোষ

তোমরা যে বলছো- পৃথিবীটার সব শেষ হয়ে গেছে
তা আসলে ঠিক নয়;
এই বিশ্বযুদ্ধ একদিন থামবে নিশ্চয়,
হতাশার বাতাস দিয়ে আশার আলোটা ফেলোনা নিভিয়ে
হে বিশ্ববাসী, লেগেছে যে গ্রহণ এ বিশ্বের গায়ে
ছুটে চলেছে আগুনের দুরন্ত গতি মানুষের পায়ে পায়ে

দড়ি দিয়ে সংক্রমণকে যাবেনা বাঁধা
সতর্কতাই একমাত্র পথ
নিতে হবে শপথ
এই গলা সাধা, এই অনুরোধই;একমাত্র পথ

ছোটার কাছে আজ নেই কোনো বাহুলতা
নেই কোনো পরিচয়ের হিম্মত
থেমে যাও, থেমে যাও।
থেমে যাওয়াতেই বরং আছে এখন জীবনের সম্মত

বাস্তবের হাড়িতে স্বপ্নের দানাগুলো গচ্ছিত রেখে দাও
রেখে দাও ব্যস্ততা,সুস্থ্য হোক সভ্যতা
সুন্দর পৃথিবীর মাঝে এই বিকলাঙ্গ জীবন আমারও যে আপন
তবু রাখি সাহস,
তবু খুঁজি সরস,
বিধ্বস্ত জীবনের কাছে শান্তির আশ্বাসের প্রশ্বাস

ধ্বংসের অন্তিম সীমার কিনারে আসার পূর্বেই
ফিরে যাবো আমরা সৃষ্টির দরবারে
দুর্গম মেরু শেষে যাবো ফিরে যাবোই

এই মহামারী সংক্রমণকে গলাটিপে মারবোই ।

ছবি: গুগুল

সুব্রত মিত্র; গড়িয়া- নতুন দিয়াড়া, কোলকাতা ৭০০১৫০,দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।

অপেক্ষা

বৃষ্টি আর মেঘের প্রেম শুরু হয় ফিজিক্স ব্যাচের এক সন্ধ্যায়। দু-জনেই বাড়িতে জানায় নিজেদের সম্পর্ক আর ভালবাসার কথা। কিন্তু, দু-জনের মায়েরাই বলেন, “আগে নিজের পায়ে দাঁড়াও তারপর এক অপরের দায়িত্ব নিও।”

একদিন দুদিন করে দশ-বছর কেটে গেল। আজ মেঘ একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার আর বৃষ্টি একটি নাম করা মাল্টি ন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকরীরতা।

এক সন্ধ্যেবেলায় মেঘ, বৃষ্টির সাথে দেখা করতে চায় কফিশপে। সেখানে ও বৃষ্টিকে জানায়, ও জার্মানি যাচ্ছে হায়ার স্টাডিজ়ের জন্যে।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও দশটা বছর। আজ বিদেশে স্ত্রী-সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে সুখে পরিবার কাটাচ্ছে মেঘ।

আর বৃষ্টি?

আজও আকাশের দিকে চেয়ে দিন কাটাচ্ছে। কখন মেঘ আসবে আর মেঘের কোলে টুপ করে বৃষ্টি ঝড়ে পড়বে…

: সাগ্নিক রায়; খাগড়াবাড়ি, নাট্যসংঘ, কোচবিহার

ভিতর বাড়ীর দু’চার কথা

আগলে রাখার দায়িত্বটা তোমার হোক
রাগলে আমার আগুন মাথার ঠিক থাকে না
জানোই তো শব্দ চাষা ফালতু লোক
মেঘের বুকে জলের রঙে ফুল আঁকে না

যদিও প্রেম বিগড়ে যাবে তেমন নয়
কষ্ট এবং প্রেমটা মেখে ঘর করি
মুসাফিরের রাস্তা চলা যেমন হয়
সিঁদুরে মেঘ দেখলে তাকে গড় করি

কাঁধের ঝোলায় উপচে পড়ে স্বপ্ন দোষ
লজ্জাশীলের ফাঁদের ভিতর গভীর গিঁট
কেউ ভাবে না চৌকাঠেই থাক পাপোশ
চাদর ভরা অনাহুত শুক্রকীট

তাই ভেবেছি পথের কাঁদন থাক পথে
কপাল থেকে ফেলছি মুছে ফালতু শোক
সুখে ওরা দুই পা দোলাক সুখ রথে
আগলে রাখার দায়িত্বটা তোমার

: কিশলয় গুপ্ত

রক্তকরবী…🌺

মূল নর্মদা মন্দির থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় চার কিমি দূরত্বে আছে ধূনিপানি। গাড়ি করে আমরা এগোলাম। নখটির জঙ্গলে এসে নামলাম। আসলে ধূনিপানি আর ভৃগুকমন্ডলু যেতে নখটির জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়। আমরা কোন রকমের গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগলাম, জঙ্গলের রাস্তা তাই গাইড জরুরি, নাহলে পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রবল। জঙ্গলের রাস্তা অতি মনোরম, এডভাঞ্চারাস তো বটেই। বিশ্বাস করুন, এই যে এখন গভীর গর্তের পাশ দিয়ে যাবার সময় আপনার গা টা অল্পস্বল্প ছমছম করছিলো,  আমি আর তিন বন্ধু বেরিয়েছি ভারত ভ্রমণে তাও আবার বাইকে করে, আমার সাথে ছিল পৃথ্বীশ আর রাঘব, বেরোবার সময় অনেকে টোকা দিয়েছিল তিন জোনা যাস না হয় চারজন না হলে দুজনে যা, কিন্তু আমাদের তখন তাজা রক্ত, সবে কলেজ পাস করেছি  বাইক টাও নতুন, কে কার কথা শোনে,  পেন্ড্রা রোডের ধারে একটা পেট্রোল পাম্পে আমরা থামলাম, যে ছেলেটা তেল দিচ্ছিল সে বলল-

“স্যার দুপুর ১’ টা বাজে ওই দিকটাতে গাইড  ছাড়া যাবেন  না অনেক বড় জঙ্গল তো!”

আমরা আগেই অনেকটা খাবার তুলে নিয়েছি,  ছোট মাটি কাটার যন্ত্র- তাছাড়াও ধারালো ছুরি, সবকিছুই আমাদের সঙ্গে আছে, রাঘব হেসে বলল, আমরা তিনজনে তিনজনের গাইড, আমরা গাড়ি স্টার্ট করলাম, তারপরের ঘটনা আপনাদের বলেছি-

আমরা কোন একটা গভীর খাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, একদল ছেলে হয়তো মধু নিয়ে ফিরছিল,তাদের জিজ্ঞাসা করলাম- “আশেপাশে কোন বাজার আছে নাকি, খাবারের দোকান?”

তারা বলল, “আজ্ঞে সাত কিলোমিটার আগেই আছে, কিন্তু আপনারা তো ভিনদেশী মনে হচ্ছে, পৌষ মাস একটু পরে সন্ধে নামবে এ রাস্তা ধরে একদম সোজা চলে যান কোন দিকে দেখবেন না ডাকলেও তাকাবেন না।”

ওরা চলে গেল, আমরা গাড়ি স্টার্ট করে সোজা চললাম, সতেরো কিলোমিটার কেন কুড়ি কিলোমিটার হয়ে গেল না কোন বাজার না লোকজন জঙ্গলের জঙ্গল, এদিকে পশ্চিমের আকাশে সূর্য একদম ম্লান হয়ে আলো দিতে শুরু করেছে, চুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেল, কি বলল ভাই জঙ্গলের রাস্তা হিংস্র পশু থাকতে পারে, আমার একটু ভয় ভয় করছিল, বললাম, একটু এগিয়ে চল দেখি, যদি কোন বাজার দোকানপাট না পাই, একটা খালি জায়গা দেখে তাবু খাটাবো তারপর কাল সকালে দেখা যাবে, কিন্তু চাঁদ তো দেখতে পাচ্ছিনা আজ বোধ হয় অমাবস্যা, আমরা জঙ্গলের রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চললাম, দেড় থেকে দু কিলোমিটার গিয়ে দেখলাম একটা সাদা রঙের বাড়ি, আমাদের মনে একটা ক্ষীণ আশার সঞ্চার হলো, আমি বললাম বাড়িতে কেউ যদি নাও থাকে কোন জায়গা পরিষ্কার করে রাত্রে থেকে যাব, একদম কাছে গিয়ে দেখলাম একটা ঘরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে, আমরা তো কোন পথ হারাবার ভয়ে পরিশ্রান্ত, গাড়ি থেকে নেমে সজোরে দরজা ধাক্কা দিলাম, চার-পাঁচবার ধাক্কা দেবার পরেও কোন উত্তর দিল না, তারপর দরজাটা একটু সজোরে ঠিলতেই ক্যাচ।..  করে দরজাটা খুলে গেল।

খুব ধীরে ধীরে ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “কেউ আছেন?”

কিছুক্ষণ পর এক মাঝবয়সী মহিলা বাইরে এল, অবাক দৃষ্টিতে তাকালো  আমাদের দিকে, চাউনি  এক ভয়ঙ্কর হায়নার মত,

“আমি বললাম ম্যাডাম আমরা জঙ্গলে হয়তো রাস্তা ভুল করেছি, অমরকন্টক রাস্তাটা বলে দিতে পারবেন?”

একটু থেমে উত্তর এল, এতরাত্রে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে হবে না, রাতটা  এখানে কাটিয়ে নেন, জায়গা টা  সম্পুর্ণ অন্ধকার, শুধু একটা গলা শুনতে পেলাম, এত মিষ্টি গলা আগে কোনদিন শুনিনি আমরা, মেয়েটি বললো ভিতরে আসুন, গায়ে মোটা জ্যাকেট আমি টুপি থাকা সত্ত্বেও, উত্তরের বাতাস আমাদের শরীরে তীরের মত ফুট ছিল, প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের শরীর যেন নড়তেই চাইছিলো না, আমরা আমাদের গাড়ি গুলো একটু ঠিক জায়গা তে রাখার জন্য গেলাম, গাড়ি গুলো ঠিক করে স্ট্যান্ড করতেই পিছন দিকে একদল হায়না কেঁদে উঠলো, যদিও এটাকে আমরা হায়নার হাসি বলি, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে এত ভয়ংকরতা ছিল আমরা সকলে  আঁতকে  উঠলাম, আশপাশের হাড় হিম করা আর বাতাসে জঙ্গলে পাতার ঠোকাঠুকির আওয়াজ, আর হায়নার হাসিতে আশেপাশের পরিবেশ আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠল, এখানটা নিকষ অন্ধকার, প্রকৃতি যেন পৃথিবীর সব কালি এলাকাতে লেপন করেছে, অন্ধকারে কালো কাপড়ে চোখ ঢেকে দিলে যেমন হয় তার থেকেও বেশি গাঢ় এই অন্ধকার, মেয়েটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, আমাদের দিকে তাকালো, আমরা ইতস্তত করছি দেখে বলল; “কি হয়েছে ভেতরে আসুন এখানে কারেন্ট নেই, তবে কেরোসিনের আলো আছে।”

রাঘব জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে আর কেউ থাকে না? মেয়েটি উত্তর দিল আগে ভেতরে আসুন তারপর কথা হবে, আমরা মনমোহিতের মতো ভেতরে গেলাম, মেয়েটি বলল আমার কাছে বেশি ঘর নেই, এই ঘরটাতে দুজনকে মানিয়ে নিতে হবে, আর একজন পাশের ঘরটাতে থাকবেন, আপনারা বিশ্রাম  করুন আমি চা করে আনি, আমাদের মধ্যে রাঘাব একটু ভীতু ছিল, তাই দুজনাতে ঠিক করল এক ঘরে থাকবে আর আমি অন্য ঘরে, এই ঘর টা  বেশ গুছানো, বেশি জিনিস নেই একটা খাট, একটা কাঠের স্ট্যান্ডের উপরে একটা ফুলদানি, একটা আয়না, আর কিছু নিত্যনৈমিত্তিক সরঞ্জাম, এই ঘরটায় একটা মোমবাতি জ্বলছিলো, আরেকটা স্ট্যান্ডে একটা নিভানো মোমবাতি ছিল, এই ঘরটাতে মোমবাতির আলো পড়ে যেন আরো  মৃদুমন্দ হয়ে গেছিল, আমি সিগারেট খাই তাই আমার কাছে লাইটার  ছিল, সেটা দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে পাশের ঘরটাই গেলাম যেটা সেই মেয়েটা দেখিয়ে  গেছিল, তিনটে মাত্র ঘর আর কাউকে কিন্তু দেখতে পেলাম না, হঠাৎ একটা আওয়াজে স্তম্ভনতা  ফিরল, দেখলাম মেয়েটি তিন কাপ চা আর বাটার টোস্ট নিয়ে ঘরের দিকে আসছে, আমায় দেখে বলল চাটা খেয়ে নিন তারপর সব দেখাচ্ছি, প্রচন্ড খিদে পেয়েছিল ক্ষুধার্থ হায়নার মত খাবারে হাত লাগালাম, মেয়েটি  অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে দেখল, আমরা কিছু বলার আগেই আমাদের বলল, আমি করবী..  বহু বছর এখানে আছি, রাত্রে রুটি খান তো? কিছু উত্তর দেওয়ার আগে একদল খেকশিয়াল একসঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে ডেকে উঠল, কি বিশ্রী তাদের ডাক, মেয়েটি হেসে বলল এটা নতুন শিকার পেয়েছে বোধহয়, জঙ্গলে এখন খাবার অনেক কমে গেছে, তাই শিকার পেলে আনন্দেতে  এভাবে ডেকে ওঠে.. আমি বললাম এই জঙ্গলে এই বাড়িতে আপনি একাই থাকেন? মেয়েটি হেসে বলল না, আরো তিনজন থাকে, তারা খাবার আনতে গেছে রাত্রেই ফিরে আসবে, আমাদের কেমন অদ্ভুত লাগছিল কিন্তু আমরা নিরুপায়, রাঘব হেসে বলল করবি খুব সুন্দর নাম তো, মোমবাতির আলোয় আলোয় মেয়েটির  অপরূপ সৌন্দর্য,  তার সৌন্দর্য যেন জোসনা রাতে নদীর স্বচ্ছ জলে প্রতিফলন প্রতিফলিত হওয়া জোসনার আলোর মত সুন্দর, আমি বললাম- “আমরা তিনজন পুরুষ, অচেনা আপনি একা ভয় লাগছে না আপনার?”

মেয়েটি কোন উত্তর দিল না, শুধু নিষ্ঠুরভাবে একবার তাকাল যেন পৃথিবীর সব রকম ক্রূর তা তাঁর চোখে আমরা দেখলাম, আমরা আর কথা বাড়ালাম না, মেয়েটি বলল,

“আপনারা ক্লান্ত, ওদের ফিরতে রাত হবে, মাংস আছে, মাংস রুটি চলবে তো?”

রাঘব হেসে বলল “দৌড়াবে।”

মেয়েটি চলে গেল, আমরা এই বিষয়ে আর গল্প করার সাহস পেলাম না, এটা যদি চোর ডাকাত হয় সে ভয়  আমাদের ছিল না, কারণ মোবাইল ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের কাছে, কিছু টাকা খুব গুনলে  হাজার দেড়েক হবে, আরে জঙ্গলের আশেপাশে এটিএম আছে বলে মনে হয় না যে তুলে নিয়ে গিয়ে টাকা বার করাবে, আমরা কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে ঘন্টা দুই কেটে গেল, হঠাৎ একটা আওয়াজে আমরা চুপ হয়ে গেলাম, করবী বলল, খাবার তৈরি হয়ে গেছে খেয়ে  নিন, আমরা কেউ অমত করলাম না, খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম যে যার ঘরে, ঘুমটা একটু  এসেছিল, কোন একটা গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, দরজা খুলে দেখলাম পাশের ঘর থেকে শব্দটা আসছে, কৌতূহলবশত একটু এগিয়ে গেলাম, কারোর জ্বর টর এলো না তো? দরজাটা খুলতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, দেখলাম করবী আর করবী নেই ওর সঙ্গে আরো তিনটে বাদুড়, চোখ ঠিকরে যেন আগুন বেরোচ্ছে, একটা অনুমানিক তিন মাসের বাচ্চা ছেলের  মাথাটা ছিবিয়ে খাচ্ছে সে, তার থুতনি বেয়ে কাঁচা রক্তের স্রোত, আশেপাশের হয়না আর শিয়াল গুলো ভয়ঙ্কর ভাবে কাঁদছে, বাদুর গুলো আমার দুই বন্ধুর আশেপাশে পাকে পাকে ঘুরছে, আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, আমার চলছে না পা, কোন রকমের দরজা খোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাত উঠছে না, আমি উন্মাদের  মত চেষ্টা করতে লাগলাম, অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবুও দৌঁড়াতে লাগলাম, চোখের সামনে একটা আলো পড়লো, তারপর কিছুতে যেন সজোরে ধাক্কা খেয়ে আমি উলটে পড়লাম, তারপর চোখ খুলতেই দেখি আমার সামনে আপনি বসে আছেন, রাঘবরা কোথায়? ইস্পেক্টর অফ পুলিশ হেসে বলল, দুই বন্ধুকে খুন করে গল্প শোনাচ্ছেন, ওরা খুন হয়েছে? দেখুন দুই বন্ধুকে আপনি খুন করে পালাবার সময় জঙ্গলে আমাদের ফরেস্টের গাড়ি আপনাকে উদ্ধার করে, দয়া করে, সত্যিটা বলুন না হলে কিন্তু কপালে কষ্ট আছে আপনার।

হঠাৎ পিছন থেকে একজন বলে উঠলো উনি সত্যি বলছেন, পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একজন গেরুয়া বসন পড়া দেখে সন্ন্যাসী মতো লোক লাগলো, অফিসার জিজ্ঞেস করল আপনি, উত্তর দিলেন আমি- সচ্চিদানন্দ কৃপাগিরি, উনাকে যেখান থেকে উদ্ধার করেছেন তার পাঁচ কিলোমিটার দূরে যে গ্রাম টা আছে সেখানেই আমার আশ্রম, কালকে রাত্রে চিৎকার শুনে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা হচ্ছে কেউ বিপদে পড়েছে, রাত্রে একা বের হবার সাহস হয়নি, তাই ভোরের আলো ফুট তেই  খুঁজতে বের হলাম খবর নিয়ে দেখলাম এনাকে  উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন আপনারা, ওরা যেখানে খুন হয়েছে সেই ভাঙ্গা বাড়িতে করবী নামে এক পিশাচিনী থাকে, আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে এক শয়তান তান্ত্রিক ওকে বশ করেছিলেন, তারপর সুযোগ বুঝে সেই পিশাচিনী ওই তান্ত্রিক  হত্যা করে ওখানে থেকে গেছে, পিশাচ বশে রাখা খুব কঠিন কাজ, একটু অসাবধান হলেই মৃত্যু অনিবার্য, কাল ছিল অমাবস্যা তার সঙ্গে দগ্ধাযোগ এই যোগ শয়তানদেরকে সবথেকে শুভ সময়, ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তুমি বেঁচে গেছো, তোমার গলায় যে কালভৈরব কবচ আছে, তার জন্য ওই পিশাচিনী তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি, এ কবজ অতি উত্তম তান্ত্রিক ছাড়া তৈরি করতে পারেন না, রক্তকরবী মূল ভেজানো জল দিয়ে এই কবজ শোধন করতে হয়, জ্যোতিষ শাস্ত্রে অধম, ত্র্যস্পর্শ ও মল-মাস বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। একদিনে অর্থাৎ এক দিবা-রাত্রে দুই তিথির অমত্ম হলে ঐ দিনকে অবম বলে। একদিনে তিন তিথি অবস্থান করলে ঐ দিনকে ত্র্যস্পর্শ বলে। যে মাসে দুইটি অমাবস্যা হয় ঐ মাসকে মল-মাস বলে। কালকে সব গুলো ছিল, সন্ন্যাসী বলল তুমি বেঁচে আছো এটাই অনেক, এই কবজ তুমি কোনদিন খুলবে না, পুলিশ অফিসার কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,  দৌড়ানোর সময় গাছে ধাক্কা লেগে তোমার ডান কাঁধে একটু চোট লেগেছে তাছাড়া আর কিছু হয়নি, কিন্তু দুটো খুন হয়েছে তদন্তে অবশ্যই আপনাকে  সাহায্য করতে হবে, কাল চোরাকারবারীদের পিছু নিতে নিতে ফরেস্টের অফিসার ওইদিকে যাবার সময় তোমাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে, তার সঙ্গে দুজন ছেলে মৃত অবস্থায় পায় ওদের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন কেউ চুষে  নিয়েছে।

: রাহুল মন্ডল চাঁদনী পাড়া, সিউড়ি, বীরভূম 

পাজি ট্যাক্সিওয়ালা

ধর্মতলা যাব বলে ট্যাক্সিতে চেপেছিলুম সিঁথির মোড় থেকে। কি কুক্ষণেই না সেদিন, সেই ট্যাক্সিওয়ালাটা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিল, কে জানে ! ট্যাক্সিতে ওঠার পরেই শুরু হল সেই অবাঙালী ট্যাক্সিওয়ালার উৎপাত। প্রথমেই আমাকে দু’তিনটে ওষুধের স্ট্রিপ ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখিয়ে তো, ইসব কিসকা দাওয়াই হে ? দর্দ কম হোবে?’ আমি দেখেটেখে কিছুই বুঝতে পারলুম না ।বললুম ‘কোথায় ব্যথা?’ সে বলল ‘পুরা বডিমে ।বহত চোট লগা হে দো দিন পহলে।‘ আমি বললুম ‘কি করে লাগল?পড়ে গেছলেন বুঝি?’সে নির্বিকার ভাবে বলল ‘নেহি নেহি, হেভি মারপিট হুয়াথা এক আদমিকা সাথ ।‘ শুনে দমে গেলুম,বাপরে কি ডানপিটে ছেলে। না ঘাবড়ে বললুম ‘ওষুধগুলো কে দিয়েছে?’ সে বলল ‘একঠো দাওয়াইকা দুকান।ঠিক দিয়া হে,না?’ আমি আর বেশি কথা বাড়াতে চাইছিলুম না। বললুম ‘হ্যাঁ,ঠিকই দিয়েছে নিশ্চয়ই।আমার ঠিক জানা নেই।‘ একটু পরে বুঝেছিলুম, মারপিট করাটা ঐ ট্যাক্সিওয়ালাটার একটা সহজাত প্রবৃত্তি ছিল। যাইহোক ওষুধগুলো ফেরত দিয়ে, আর বেশি সহমর্মীতা না দেখিয়ে, নিজের কাজে মন দিলুম। সেও স্ট্রিপ থেকে একটা ওষুধ ছিঁড়ে মুখে দিয়ে,জলের বোতল থেকে জল খেতে লাগল ট্যাক্সি চালাতে চালাতেই, বেশ কায়দা টায়দা করে।নিজেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল ‘ইসসে আচ্ছা হোতা,দো বোতল দারু পি লেনেসে। শালা, দর্দ ওর্দ সব গায়েব হো যাতা।‘ আমি তার কথায় বিশেষ কান দিলুম না,বেশ টেনশন হচ্ছিল,কার পাল্লায় পড়লুম রে বাবা।ট্যাক্সিটা স্বাভাবিকের থেকে বেশ জোরেই চলছিল।আমি একটু ভয়ও পাচ্ছিলুম,সত্যি সত্যি ব্যাটা দারু খেয়েই ট্যাক্সি চালাচ্ছে না তো! বোতল থেকে কি খেল,কে জানে? যা হোক, টালা ব্রিজের ওপর জ্যামে দাঁড়াতে, পাশের আর এক দেশোয়ালী ট্যাক্সিওয়ালা তাকে সাবধান করে বলল ‘ক্যা ভাইয়া, ইতনা হড়বড়ি কিউ? জলদি হে ক্যা ?’ কথাটা সে ঠিকই বলেছিল । কিন্তু আমার ট্যাক্সিওয়ালা সেসব বুঝলে তো! সে উল্টে তাকেই ধমক দিয়ে বলল ‘আপনা কামধান্দা দেখো,হাম ঠিকহি চলা রেহে হে।‘ এরপর আসল খেলা শুরু হল। সেন্ট্রাল এভিনিউতে উঠে আমার ট্যাক্সিটা আর একটা প্রাইভেট গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে তার সঙ্গে একটু ঘষা লাগিয়ে ফেলল। আর পালাবে কোথায়, ওই গাড়িটাও একে তাড়া করে আসতে লাগল,সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ।ভয়ের চোটে এও ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে শুরু করল, হলিউড সিনেমার কার চেসিং কোথায় লাগে।আমি ওদিকে ইষ্টনাম জপ করছি। কিন্তু এটা কলকাতা শহর, পালাবার পথ নেই! একটু পরেই একটা ক্রসিংয়ে দাঁড়াতেই হল। ব্যাস, আর যায় কোথায়।ওই প্রাইভেট গাড়িতে যারা ছিল, তারাও বেশ হাট্টা কাট্টা টাইপের ,ছোড়নেবালা নয়,এরই মত অবাঙালী।দু’জন সঙ্গে সঙ্গে সেই গাড়িটা থেকে নেমে ছুটে এসে,ট্যাক্সির দরজা খুলে একে বের করার জন্য টানাহেঁচড়া শুরু করল।বলছিল ‘চল,দেখেগা শালা,তু কেয়া কিয়া হ্যায়।কিতনা লোকসান হো গয়ি।‘ সঙ্গে উভয়ের গালিগালাজ,কেউ কাউকে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। শেষে দরজা খুলে টেনে হিঁচড়ে ট্যাক্সিওয়ালাকে নামাতে যেতেই,এও পায়ের কাছে আগে থাকতে লুকোনো একটা রেঞ্চ বের করে, ওদের সঙ্গে লড়তে লাগল।আমি নীরব দর্শক। কিন্তু ওরা দু’জন, আর এ একা ,পারবে কেন?’মার শালেকো’ বলে ওরা টানতে টানতে একে রাস্তার ডিভাইডারের কাছে নিয়ে গিয়ে পেটাতে শুরু করল। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য, আমার ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি ছেড়ে রাস্তায় পড়ে মার খাচ্ছে আর আমি ট্যাক্সির পিছনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বসে আছি। রাস্তায় জ্যাম, সব গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে।দেখতে দেখতে লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। শুনতে পেলুম কে যেন ‘পুলিশ পুলিশ’ বলে ডাকছে। জানিনা পুলিশ এসে সেই ঝামেলা মিটমাট হবে কিনা ,কিম্বা হলেও কখন হবে।সেসব জানবার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না।আমি শুধু এই ঝামেলা থেকে যেভাবে হোক পরিত্রাণ পেতে চাইছিলুম। এই অবস্থায় বোকার মত ট্যাক্সিতে বসে থাকার কোন মানে হয় না। একে তো এই ট্যাক্সিতে ধর্মতলা পৌছোনোর বারোটা বাজল, এই ঝামেলা সহজে মেটার নয়। ওদিকে ধর্মতলা থেকে দুর্গাপুরের বাস ধরার দেরী হয়ে যাচ্ছে। সত্তর টাকা মতো ভাড়া উঠেছিল। সে যাকগে,ঠিক করলুম কেটে পড়ি।যদিও ভাড়ার টাকাটা মেরে দেবার মোটেও ইচ্ছে ছিল না,কিন্তু আর কিছু করারও ছিল না,বিশেষত যাকে ভাড়া দেবার কথা, সে তখন রাস্তায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে মার খেতে ব্যাস্ত। অযথা ঝামেলায় কে ফাঁসতে চায়? দেখলুম, এই সুযোগ, সোজা রাস্তার দিকের দরজাটা খুলে ,হাতের ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়লুম।ধাঁ করে দু’তিনটে গাড়ির ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে, সোজা ফুটপাতে উঠে ভিড়ে মিশে গেলুম। হাঁটতে-হাঁটতে পেছন ফিরে বারবার দেখছিলুম, ঝামেলাটা কতদূর গড়াচ্ছে বা আদৌ থামার দিকে যাচ্ছে কিনা। ততক্ষণে রাস্তায় ভিড় জমে গেছে,কিছু বোঝা গেল না। অন্য একটা যা হোক বাস ধরে তড়িঘড়ি এলাকা ছাড়লুম। সেই ট্যাক্সিওয়ালাটার কি হল আর জানা হলনা ।মনে মনে বললুম,বেশ হয়েছে,যেমন কর্ম তেমনি ফল।মার খাওয়া ছাড়াও ওর সত্তর টাকা লোকসানটাকে ধরেই বললুম।
এই ঘটনার বছর খানেক পরের কথা। ততদিনে সেই ট্যাক্সিওয়ালাটার মুখটা ভুলেই মেরে দিয়েছি, মনে রাখা সম্ভবও নয়।খালি ভয় ছিল,কলকাতার রাস্তাঘাটে কোনদিন ট্যাক্সি ধরতে গিয়ে আবার যদি সে বা সেরকম কোন ব্যাটার উদয় হয়। যাহোক সেদিন কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে একটা ট্যাক্সি ধরতে যাব,ড্রাইভারের উল্টোদিকের জানলায় মুখ বাড়িয়ে ‘দাদা ,যাবেন?’ জিজ্ঞেস করতেই সে বলল ,’কোথায় যাবেন?’ আমি ‘টবিন রোড’ বলতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল তার সিটের পাশে ক’টা ওষুধের স্ট্রিপ রাখা। চট করে পুরোনো ঘটনাটা বিদ্যুৎচমকের মত মনে পড়ে গেল। তার মুখটা অবশ্য মেলাতে পারলুম না, না পারারই কথা। হতে পারে সে নয়।তবু ভুত দেখার মত ঘাবড়ে গিয়ে,ছিটকে তিনহাত পিছিয়ে গেলুম। ‘যাবেন না?’ সে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করল। কিন্তু তখন সেসব বিশ্বাস বা ভরসা করার মত মনের অবস্থা আর নেই। ‘নাঃ, বাসেই যাব’ বলে অ্যাবাউট টার্ন নিয়ে মানে মানে কেটে পড়লুম।ট্যাক্সিটা চলে গেল।গদাইলস্করী চালে একটা ভিড় বাসকে আসতে দেখে আমার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

শুভায়ন বসু, দুর্গাপুর।

Design a site like this with WordPress.com
Get started