সুর

কিছু কিছু সুর থাকে যা কথাকে আশ্রয় করে না। শব্দের মোড়ক ছাড়াই প্রকাশ পায় নগ্নভাবে। আর সেই নগ্নতাই সত্য, সুন্দর। আবার কোনও কোনও সময় শব্দের আতিশয্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেখিয়ে দেয় অন্দরমহল। সুরের বসতবাড়ি। স্টকয়স্কি বলেছিলেন স্তব্ধতার ক্যানভাসে ঈশ্বর সুর আঁকেন। মাঝে মাঝে এ কথাটিকে আমার সাংঘাতিক সত্য বলে মনে হয়। এও মনে হয় যে মাকড়সার জালের মতো অজস্র সুরের জাল ছড়ানো থাকে চারিদিকে, জড়িয়ে ধরলেই সুরারোপিত জীবন…বছর তিনেক আগে কার্শিয়াংয়ের রাস্তায় এক অদ্ভুত বিকেল কেটেছিল; overspread silence…একটা চায়ের দোকান, কেটলি ও কিছু বাসনপত্রের খুচরো আওয়াজ, সামনে দেবদারু জঙ্গলে কিছু পাখির কলতান, আর কিছু শব্দ নেই। হাঁটলে জুতোর মচমচ শব্দ ওঠে। একটা দুটো যাত্রীবোঝাই গাড়ি দার্জিলিঙয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে আরও ওপরে। এমন নিরবিচ্ছিন্ন স্তব্ধতায় হাঁটতে দিব্যি লাগে। আদিম শব্দহীন নৈসর্গিক দৃশ্যকল্প যেন! চায়ের দোকানটিতে সঙ্গ পেয়েছিলাম এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর। অন্তর্মুখী ত্রিকালজ্ঞ সাধকের মতো দৃষ্টি। খানিক পরে এক ব্যাপার ঘটল। সামনের উঁচু সবজে পাহাড়টা থেকে ভেসে এল একটি সুর। প্রার্থনার সুর, কাছেই কোথাও মনাস্ট্রি থেকে আসছে। সমগ্র চরাচরে বিস্তার করছে এক অনির্বচনীয় নমনীয়তা, হিমালয় ভেসে যাচ্ছে সুরস্রোতে। এ সুরের উৎস কোথায়! ঠিক কতগুলো গিরিপথ লঙ্ঘন করে ভারতবর্ষের একফালি পাহাড়ি শ্যামল উপত্যকাকে প্লাবিত করছে জানা নেই! বৌদ্ধ সাধক উঠে গেছিলেন,সূর্যও ডুবেছিল, আমি অনেকক্ষণ বসেছিলাম স্তব চাদর গায়ে জড়িয়ে।

গাড়িটা যেখানে এসে থামল সেটা শিলং আর গৌহাটির ঠিক মাঝখানের জায়গা। নাম তার নংপো। গাড়িতে বাজছিল কিশোর কুমার। গাড়ি থামতেই ভদ্রলোককেও চুপ করিয়ে দেওয়া হল। চারদিকটা নিস্তব্ধ, পাইনের ঘন জঙ্গল,রাস্তা সামনে চড়াই উঠে গেছে। কফির দোকানে কফি পেটে ঢেলে গাড়িতে ফেরার সময় চোখে পড়ল বাচ্চাটাকে। বয়স সাত কিংবা আট হবে, চোখ দুটো ক্ষুদে, পরনে ময়লা হলদেটে একটা ঢোলা জামা আর খয়েরি হাফপ্যান্ট, রাস্তার ওপর একমনে একটা বাঁশের পাইপে ফুঁ দিচ্ছে। ফুঁ গুলো বৃথা যাচ্ছে না। তৈরী হচ্ছে আওয়াজ। একটা সুর। অদ্ভুত এক মৌলিক সুর। এ সুরে কোনও কৌলিন্য নেই,এ সুর কোনও দাবি রাখে না, এ সুর কোনও দেখনদারি করে না। তৈরী হয়েই হারিয়ে যায় পাইনের জঙ্গলে। গাড়ি আবার চলল শিলংয়ের দিকে। সেই সুরটা কানে বেজে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ। ভারী অদ্ভুত লাগে ব্যাপারটা এভাবে ভাবলে, যেমন একটি জেলে পুকুরের জলে ছিপ ফেলে বসে থাকে,ঠিক তেমনি হয়ত বাচ্চা ছেলেটা ওই পাইপটা হাতে নিয়ে ফুঁ দিচ্ছিল, মাছ যেমন ধরা পড়ে যায়,তেমনভাবেই অচিনপুরের কোনও সুর হয়ত ভাসতে ভাসতে এসে সেই পাইপে আত্মসমর্পণ করেছে!! তারমানে এই দাঁড়াচ্ছে যে সুর তৈরী হচ্ছে না নতুন করে,বরং অনেক আগেই সব টিউন যেন তৈরী করাই আছে, শুধু মানুষের সৃষ্টিশীল সতর্ক চেতনার খপ্পড়ে পড়বার অপেক্ষা!পরে জেনেছিলাম বাঁশের পাইপটার নাম স্থানীয় ভাষায় “কুচপা।”

আমার একটা দোষ আছে। মাঝেমধ্যে কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন নিজেকে করে ফেলি। তারপর নিজের ভেতর অনেকগুলো “আমি” জন্মায়,তাদের একেকরকম মতামত,একেকরকম চিন্তাধারা। সেইসব মতামত বা উত্তর কে সমষ্টিবদ্ধ করে একটা কিছু হয়ত পাওয়া যায়,কিন্তু তাতেও ফাঁক থেকে যায় অনেক। যেমন ধরুন, একটা প্রশ্ন যে শব্দ বা আওয়াজের সাথে সুরের তফাত ঠিক কোনক্ষেত্রে?আপাত অর্থে খুব সাধারণ ভাবেই মনে হবে যে শব্দ তো শব্দই,সেটা সুরের মতো ব্যপ্ত নয়। কিন্তু, মুশকিলটা হল যে প্রতিটা শব্দের মধ্যেই সুরের আত্মা লুকিয়ে থাকে বলে আমার বিশ্বাস। সহজ করে বললে একটা যেকোনো শব্দ বিস্তার লাভ করলেই সেটা নির্দিষ্ট সুরে রুপান্তরিত হয়। একমুখী বিস্তারে ছন্দলাভও একমুখী হয়, তবে এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া ভালো যে প্রতিটি শব্দই প্রতিটি সুরের সংক্ষিপ্ত রূপ। বিস্তারেই ধ্বনি জন্মায়। কিছু কিছু আওয়াজ আছে যা আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। যেমন বৃষ্টি আসার শব্দ, নিশুত রাতে নিঝুম রাস্তায় ভারী বুটের ভারী মচমচ শব্দ, মরা নিয়ে যাওয়ার সময়  উচ্চকিত হরিধ্বনি। আরেক ধরনের আওয়াজ পরিচিত ছিল ছেলেবেলায়। আপিস থেকে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করার সময় রোজ বাবার পকেট থেকে বেশ কিছু খুচরো পয়সা ছড়িয়ে পড়ত মেঝেতে। আমরা ঝাঁপ দিতাম সেই ধাতব সচ্ছলতার ওপর। সেই রিনরিনে আওয়াজটায় একটা আমোদ মিশে থাকত। খুব রাতে বৃষ্টি পড়লে টিনের চালে ঝিনঝিনে বাজনা, নিঝুম অন্ধকারে সেটা যে নিছক শব্দ হয়ে থাকত না বলাই বাহুল্য। বৃষ্টির বাড়াকমা বোঝা যেত অনায়াসে। একতারার আওয়াজ মুগ্ধ করে। একতারার ওই একটি তারে কি আছে বলুন তো? যার জন্য বিবাগী হয়ে যাওয়া যায়, যার জন্য গেয়ে ওঠা যায় “তুই আমায় পাগল করলি রে!” আপার বার্থে আমি তখন ঘুমে কাদা। ট্রেন যাত্রী বোঝাই, হঠাৎ ওই সব্বোনেশে শব্দটা কানে এল। গেরুয়া পরা ভিখারীটা গাইছে “হরি হে, দুখ দাও যে জনারে”। তাকিয়ে থাকলাম লোকটার দিকে। রুগ্ন শরীর, গলার শিরা ফুলে উঠেছে। হরি সুখ না দিক অন্তত একটা একতারা দিয়েছে ওকে। ট্রেন বোলপুর ছাড়ল।

মায়ের চুড়ির আওয়াজ আমি চিনি। ওটা থামলে বুঝি মাও থেমে গেছে। একটা চুড়িতে কোনোদিন সুর তৈরী হয় না। সুরে মিশে থাকে একটা টাটকা গন্ধ,মায়ের গন্ধ। ওই সুরে ধাতব গন্ধ থাকে না। আমার চেতনায় মায়ের যাতায়াত চিরন্তন। সুর কখন গান হয়?? সুরের অনাবৃত শরীরে কথার জামা পড়িয়ে ছন্দের প্রসাধণে গান সৃষ্টি হয়। 

পৃথিবীর সবথেকে ইন্টারেস্টিং আওয়াজ হল নাক ডাকার আওয়াজ। ট্রেনের কামরায় সন্মিলিতভাবে ওই আওয়াজ তন্দ্রাকে যখন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয় তখন বিরক্ত লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্ত কেন জানি আমার মনে হয় প্রত্যেকের নাক ডাকার মধ্যে একটা তফাত আছে। কারোরটা নরম সুরে, যেন এক অব্যক্ত আকুতি মিশে আছে,যেনও অনেকদিনের না বলা কথা ঘুমের মধ্যে সব অভিমান ঝেড়ে জেগে উঠতে চাইছে। কারোরটা গর্জন, যেন বহুদিনের রাগে প্রতিশোধের নেশা চেপেছে, কারোরটা আবার নির্বিকার, সরল স্বীকারোক্তি যেন, এইতো আছি, ভালোই আছি টাইপ। এটাও তো সুর!

পৃথিবীটা একটা সুরের পাহাড়ের ওপর অধিষ্ঠিত। কোনায় কোনায় সুরের আবাহন। সেখানে ডুংরি আছে,কুচপা আছে,একতারা আছে, হাসি কান্না হিরা পান্না সব আছে।কার্শিয়াংয়ের সেই অপূর্ব বিকেল বা ঝাড়খন্ডের ঝাঁঝালো মাদলের মধ্যরাত্তির যখন ফিরে ফিরে আসে,সমগ্র শব্দের ক্যাকাফোনি ছাপিয়ে অপূর্ব এক বাঁশি শুনতে পাই। কোথায় বাজে,কে বাজায় জানি না। মন বলে সুতীক্ষ্ণ সেই স্বরে পৃথিবীর সমস্ত সুর লুকিয়ে আছে। শুরুর সেদিন ব্রহ্মান্ডের জন্মের শুভলগ্নেও সে বাঁশি নির্ঘাত বেজেছিল,সেই অকৃত্রিম অদ্বিতীয় সংগীতের পিঠেই ব্রহ্মান্ডের ব্যাপ্তি, সভ্যতার পদচারণা। আবহমান তা বেজে চলেছে একক অখন্ড ব্রহ্মরাজ্যে….”বাজে অসীম নভোমাঝে অনাদি রব,জাগে অগন্য রবি চন্দ্র তারা….” সুরের সেই চির পরিচিত দেশটা সবার। সেখানে পিট সিগার আছে,লালন আছে,আছে সেই নংপোর বাচ্চা ছেলেটাও। 
ভালো থাকবেন…

ছবি: সংগৃহিত

: সুপ্রতীক চক্রবর্তী

একতারা…🎇

অতীতের ঋণ যেন মৃতদের ঢিপি
ধ্বংসের স্মৃতি তারা কাউকে বলে না।

বুকেতে লুকিয়ে নির্জনতার লিপি
ধ্রুপদি সে বাউলের সুর চেনা চেনা–

ক্লান্তির ছায়া মাখে, ধূসর পাঁজরে।
গোধূলির স্তনে মুখ হয়ে আসে ম্লান

জন্মের মতো কোনো ছাইরঙা ভোরে
তোমার দু’চোখে রোজ করেছিল স্নান।

তার গায়ে লেগে আছে জ্যোৎস্নার নেশা
তার বুকে ঝড় ওঠে, ছুটে যায় ঢেউ

তার তুমি সব ছিলে, জোনাকির দেশ আর–
আকাশের বুক থেকে খসে যাওয়া কেউ।

কুয়াশার স্তবে আজ উপকূল জুড়ে
স্তব্ধতা জারি। দূরে বাজে ভায়োলিন।

খ্যাতির প্রবাদে ক্ষীণ যন্ত্রণা খুঁড়ে
নিরালায়, শান্তিতে, তর্জমাহীন–

শুয়ে আছে, বিচ্যুত টান বুকে সয়ে
প্রিয় কোনো প্রেমিকের পৌরুষ ছাড়া

পৃথিবীর ঝংকারে স্বরলিপি হয়ে–
অন্ধ সে বাউলের প্রিয় একতারা।

: সৌরভ কুন্ডু

।। শ্রমিক স্পেশালটা ধরা হল না ওদের ।।

‘শ্রমিক স্পেশাল’টা ধরা হল না ওদের
লকডাউনের সোজা পথটা ধরেছিল ওরা
হেঁটে হেঁটে অবসন্ন শরীর
অলস সূর্যের সাথে কিছুটা সুখ নিতে
শরীরটা বিছিয়ে দিল গ্ৰানাইট পাথরথেরাপির
বিছানায়
রেললাইনটাকেই বানিয়ে নিল মাথার বালিশ
ওতে ঘুম ভালো হয়
বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ-জোছনায় উমারিয়া শাহদল ফেরার
‌স্বপ্ন দেখেছিল ওরা
চিড়ে মুড়ি ছিল না বাঁধা কাপড়ের ভাঁজে
ছিল কিছু রুটি
ঘুম থেকে উঠে খাবে বলে।

‘শ্রমিক স্পেশাল’টা ধরা হল না ওদের
কেবল একটা মালগাড়ি উপহার নিয়ে এল
সূর্যোদয়ের আগে
টাকা! এত টাকা ওরা জীবনে দেখেনি কখনও
পাঁচ লাখ!
একে একে ষোলটি চেক লেখা হল
লাশকাটা ঘরে।
পরিযায়ী শ্রমিকের জামা-চটি-রুটি আর রক্ত মাংসে
ভারি হয়ে উঠল গ্ৰানাইট পাথরের বুক
তবুও হাঁটবে ওরা
হেঁটে যাবে পুঁজি তৈরির ধড়
যেখানে চেক নিয়ে বসে আছে
লাশকাটা ঘর।

: অরুণ কুমার সরকার
শিবমন্দির, বিধানপল্লী
শিলিগুড়ি

❤ভালবাসার গন্ধ❤

‘মনা, ও মনা, মনালী কোথায় গেলি মা?’

মনালীকে সারা বাড়ির লোক খুঁজে হয়রান। অবশেষে মনালীর বাবা অরূপবাবুই মেয়েকে ছাদের চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটাতে আবিষ্কার করলেন। মেয়ের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,

‘‘কি রে মনা তুই একলাটি কি করছিস? নীচে কত লোকজন, আমি তোর জন্যে মা নিয়ে এসেছি; চল্ মনা, তোর নতুন মায়ের সঙ্গে আলাপ করবি চল।’’
– না, আমি কিছুতেই যাব না, ও আমার মা নয়।’’ মনালী জেদ ধরে।
– ‘‘আচ্ছা, আলাপ পরে করবি না হয়, এখন নতুন মাকে দেখবি চল।’’- মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অরূপবাবু মেয়েকে বোঝাতে লাগলেন।
– ‘‘দেখেছি, কালো, বিচ্ছিরি- ওটা আমার মা কিছুতেই হতে পারে না, আমার মা কত সুন্দর ছিল।’’ বলে মনা অঝোরে কাঁদতে লাগল।
অরূপবাবু অনেক ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েকে নিচে নামিয়ে আনলেন, কাজের মাসি মোক্ষদাদিকে স্নান করিয়ে, খাইয়ে দিতে বললেন। মনালী তো কিছুতেই খাবে না, স্নানটা যা হোক করে নতুন জামার লোভ দেখিয়ে করানো গেল।
মোক্ষদাদিই এখন মনালীকে দেখাশোনা করে। অভাবী হলেও তার মনের কোনে মনালীর জন্যে কোথায় যেন একটা ভালবাসার বাসা আছে, এটা বোধহয় মেয়েদের জন্মগত প্রবৃত্তি। মোক্ষদা মনালীকে নিয়ে রান্নাঘরের আড়ালে গিয়ে বলল, ‘‘তুমি কিছু খাচ্ছ না কেন? কত্ত ভাল ভাল সব খাবার। তোমার আগের মা তো আকাশের তারা হয়ে গেছে- তুমি না খেলে ভারি কষ্ট পাবে।’’
– কষ্ট না হাতি, কষ্ট পেলে আমার কাছে আর আসত না?
– আসবে, ঠিক আসবে, দেখবে তুমি ঠিক আগের মাকে খুঁজে পাবে, হয়ত তো কোন নতুন রূপে।
গল্প করতে করতে মোক্ষদাদি মনালীকে খাইয়ে দিতে লাগল। মাকে ফিরে পাবার আশায় মনালীও খেয়ে নিল।
মনালীর বিষণ্ণ মুখ অরূপবাবুর মনে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে আনল। কিন্তু এছাড়া আর উপায়ই বা কি ছিল! তাঁর প্রথমা স্ত্রী ছিলেন বেশ সুন্দরী, কিন্তু অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে হওয়ায় তেমন বিশেষ কাজকর্মও জানতেন না, ইদানিং যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তো একদম শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন, মাস তিনেক হল গত হয়েছেন। মনালীর দিদিমা মেয়ের অসুখের সময় অনেকদিন এসে থেকে ছিলেন। মেয়ের মৃত্যুর পর কাজকর্ম মিটিয়ে তিনিও ভারাক্রান্ত মনে একবুক কান্না নিয়ে নিজের সংসারে ফিরে গেলেন, স্বামী ও ছেলেকে ছেড়ে বেশিদিন থাকার তাঁর খুবই অসুবিধে। মনালীকে নিয়ে খুব সমস্যায় পড়লেন অরূপবাবু। তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরী করানো, টিফিন গোছানো, ব্যাগ-বই গোছানো, সে বিরাট কাজ। খুব জেদী মেয়ে, মা চলে যাবার পর থেকে আরও জেদী হয়ে পড়েছে সে। কত আর অফিস কামাই করে বাড়িতে বসে থাকবেন অরূপবাবু। মোক্ষদাকে সব দিকটা ঠিকঠাক হচ্ছে না। এদিকে স্ত্রীর অসুখের চিকিৎসায় অনেক টাকা-পয়সা খরচ হয়ে গেছে- নানান সমস্যা আর চিন্তায় অরূপবাবু জর্জরিত হয়ে পড়লেন। মনালীর জ্যেঠু-জ্যেঠিমা চেন্নাইতে থাকেন। মনালীর জ্যেঠিমাই মাঝে একবার এসে এসব অব্যবস্থা দেখে তাঁর দূরসম্পর্কের এক বোনঝি রীণার সঙ্গে অরূপবাবুর বিয়ের সম্বন্ধ একেবারে পাকা করে ফেললেন। দেখতে রীণা হয় তো ভাল নয়, কিন্তু খুব কাজের। গরীবের মেয়ে তার ওপর রং ময়লা, চওড়া কপাল-রূপও নেই, রূপিয়াও নেই, অতএব মেয়েদের যা হয়, সম্বন্ধ করতে করতেই কপাল আরও চওড়া হয়ে যায়। যাক্ রীণার কপাল ভালই বলতে হবে, অরূপবাবুর মত সুপুরুষ তাঁকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছেন। রাজী না হয়ে উপায়ও ছিল না। সংসার একেবারে অচল। অফিসও অনেক কামাই হয়ে গেছে। তাছাড়া সবকাজেই পারদর্শী শুনে মনটা একটু খুঁতখুঁত করলেও শেষ পর্যন্ত অরূপবাবু সম্মতি দিয়েই ফেললেন। কিন্তু এমন বিপত্তি হবে কে জানত। তাঁর পছন্দ হলে কি হবে, মেয়ের মাকে পছন্দ হল না, এ কি জ্বালা রে বাবা।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হবার পর অরূপবাবুর দাদা-বৌদিরা চেন্নাই ফিরে গেলেন। আত্মীয়-স্বজনরাও চলে গেল। মনালীর নতুন মা রীণা বেশ গুছিয়ে সংসার করতে লাগল, কিন্তু মনালী কিছুতেই তার নতুন মায়ের ত্রিসীমানায় আসবে না। রীণা কিন্তু হাল ছাড়ে না, খুবই চেষ্টা করে মনালীর মন পেতে। রোজ নতুন নতুন মুখরোচক টিফিন বানিয়ে দেয়, নানারকম রান্না করে খাওয়ায়। মনালীর বাবা তো খুব খুশি, তিনি তো আগে এত যত্ন-আত্তি পাননি। কিন্তু মনালীর মন তার নতুন মা কিছুতেই পায় না। মনালীর জন্যে অরূপবাবুরও বেশ দুশ্চিন্তা। তিনি কত ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েকে মায়ের কাছে নিয়ে আসতে চান- কিন্তু মনালীর মুখে সেই এক বুলি, ‘ও আমার মা নয়, আমি ওর কাছে যাব না।’ একদিন তো অরূপবাবু খুব রেগে গেলেন, বললেন, ‘‘মনা, এমন ব্যবহার করলে আমি তোকে নিয়ে হোস্টেলে ভর্তি করে দিয়ে আসব, অসভ্য মেয়ে কোথাকার।’’ মনালীকে অন্য জায়গায় ভর্তি করবে শুনে রীণা তো কেঁদেই ফেলল, বলল, ‘‘তুমি একটু ধৈর্য ধর, আমাকে একটু সময় দাও, আমি ঠিক মনার মা হয়ে যাব একদিন, তুমি দেখে নিও। তুমি ওকে এই নিয়ে আর বকাঝকা করো না প্লিজ, ওতে ওর মন আরও খিঁচড়ে যাবে।’’ রীণা দুপয়সা আয়ের জন্য বাপের বাড়িতে নানারকম খেলনা, হার, দুল তৈরী করে দোকানে সাপ্লাই দিত। মনালী পুতুল খেলতে খুব ভালবাসে তাই রীণা অরূপবাবুকে দিয়ে নানারকম পুতুল তৈরী করার সাজসরঞ্জাম আনাল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা ধরণের সুন্দর সুন্দর পুতুল তৈরী করে মনালীকে উপহার দিতে লাগল। মনালী পুতুলের লোভ সামলাতে পারে না। পুতুল নেবার সময় মায়ের কাছে একবারটি যায় আবার পুতুল নিয়ে থ্যাঙ্ক য়ু বলেই ছুটে চলে আসে। মনালীর পুতুল নেবার আনন্দে উজ্জ্বল মুখটা আর একটা পুতুল তৈরীর প্রেরণা যোগায় রীণার। বেশ কয়েকটা পুতুল হল মনালীর। এখন মনালী নতুন পুতুলগুলো নিয়েই খেলে, পুরনোগুলোকে বাতিল করেছে। মনালী মনে ভাবে, ‘‘নতুন মা দেখতে খারাপ হলে কি হবে, পুতুলগুলো কিন্তু দারুণ তৈরী করে।’’ কিন্তু যতই নতুন পুতুল নিয়ে মেতে উঠুক না কেন মনালী, নতুন মাকে এখনও সে মন থেকে কিছুতেই গ্রহণ করতে পারছেনা।
বসন্ত বিদায় নিল। সব জীর্ণ পুরাতনের অবসান। এল নতুন বছর। নতুন আশায় বুক বাঁধে রীণা। মনার সেই ম্রিয়মান ভাবটা কিছুটা কেটেছে। নতুন নতুন খাবার খাওয়ানোর সময় কাছে বসে থাকলে এখন আর বিরক্ত হয় না, কিন্তু নতুন মায়ের সঙ্গে ভাব সে কিছুতেই করবে না। হঠাৎ খবর এল অফিসের কাজে অরূপবাবুকে দিন কয়েকের জন্য কলকাতার বাইরে যেতে হবে। শুনে মনা তো ভীষণ কান্নাকাটি করতে লাগল। কিছুতেই সে তার বাবাকে ছাড়বে না। অনেক জিনিস আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, অনেক বুঝিয়ে অরূপবাবু ছাড়া পেলেন। মুম্বাইতে দিন কয়েক তাঁকে থাকতে হবে। মনা একা একাই শুয়েছে ওর ঘরে, সে তো বাবার কাছে শোয়। নতুন মায়ের সঙ্গে তো আর শোবে না। রীণার মনে বড় কষ্ট হয়- এত মায়া পড়ে গেছে মেয়েটার ওপর- মনার মনের কষ্ট রীণা উপলব্ধি করতে পারে, তাই তো সে জোর খাটায় না- শুধুই ভালবাসা দিয়ে যায়।
এরই মধ্যে একদিন রাত্রে উঠল প্রচণ্ড ঝড়। রীণা মনার ঘরে এল জানলাগুলো বন্ধ করতে। ঝড়ের আওয়াজে মনার আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, বড় ভয় করছিল তার। নতুন মাকে দেখে এই প্রথম মনালীর খুব ভাল লাগল। মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মনার মনেও যেন আলোর ঝলক লাগতে লাগল, তবে কি মনার মনে মেঘ কাটছে! মনা ভাবতে থাকে, ‘‘না এই মা’কে তো দেখতে খুব খারাপ লাগছে না- বেশ তো হাসছে, আমার গায়ে চাদরটা চাপা দিয়ে দিচ্ছে, ঠিক আমার আগের মায়ের মতই।” হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে আওয়াজ হল, কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। দারুণ আতঙ্কে মনালী ছুট্টে গিয়ে তার নতুন মাকে জড়িয়ে ধরল। একি কাণ্ড, নতুন মায়ের গায়েও মনা পায় সেই চির পরিচিত ‘মা’– মা’ গন্ধ, যা ছিল তার নিজের মায়ের গায়ে। এই সুগন্ধ প্রকৃত মাতৃস্নেহের গন্ধ যা সব মায়ের গায়েই মাখানো থাকে সহজাত ভাবেই। রীণার বুভুক্ষ নারী হৃদয় এতদিনে কানায় কানায় ভরে উঠল। মুম্বাই থেকে ফিরে এসে অরূপবাবু দেখেন তার মনা সোনা তো মায়ের কাছ-ছাড়াই হচ্ছে না। তাঁরও মনে আনন্দের প্লাবন বয়ে যেতে লাগল।

: ডঃ রমলা মুখার্জী, বৈঁচি, বিবেকানন্দ পল্লী, হুগলী,৭১২১৩৪

জীবন যে আনন্দময়🌿

বাঁধা পরিত্যাগ রাজপত্নী

মাঠে উড়ে যাওয়া ফুটবল তরী

উড়ে যায় গোলের দিকে,

পা দিয়ে ছুটে নিয়ে যায়

হাজার শ্রমিক , বিবেক হীন।

কত মানুষ হাততালি দেয়

মানুষের মৃত্যু দেখে ;

যে মানুষকে বলি দিতে

নিয়ে আসে – তাকে বোঝানো হয়েছে

তোমার মৃত্যু পুন্য দেশের কল্যাণের জন্যে।

ছিন্ন মাথা রক্তে ডুবে চিৎকার করে

বেঁচে থাকার জন্যে

তখন পুণ্যবান সাধু আনন্দে হাসে,

সত্যি কি ! শান্তি এসেছে – ঘরে ঘরে

দেবতা কি এসেছে নেমে ;

যে মানুষ দিনরাত জীবন বাঁচাবার

ব্রত নিয়েছে জীবনে,

সেই যন্ত্রণার মৃত্যুর দরজা থেকে টেনে নিয়ে

আলো দেখার জীবন্ত জীবনের

মানে বোঝায় –

সেই মানুষটা হাসপাতালে ।

মন বেঁচে থাকার মানুষের মন্দির গড়ে

তুলেছে—সেই বুঝেছে

জীবন কত যে আনন্দময় ।

কত যে আলো ভরে গিয়েছে

মায়ের কোলে – শিশুর হাসি ভরা

মুখ খানি ।

সংলগ্ন আশ্রয় –সারাদিন ঘরের মধ্যে

আকাশটা একবার দেখতে ইচ্ছে করে ,

নুন ঝাল মেশানো ছোলা চিনেবাদাম ও

চাল ভাজা খেতেও ভাল লাগে

কেন জেলখানার জমাদার

ভিতরে এলো তবু সে বোঝেনি।

———————————————————————-

: নিত্যরঞ্জন মন্ডল- হাওড়া , চুনাভাটী , সরকার পাড়া

উচ্চারিত হলে…

তীব্রতম যন্ত্রনায় যে কথা
বহুবার বলতে গিয়েও বলা হয়নি তাকে,
আদতে তা কখনোই বলা যায় না সেভাবে।

সে শব্দেরা উচ্চারিত হলে বর্ষব্যাপী বিপর্যয় নেমে আসে সাজানো পৃথিবীর বুকে,

সে শব্দেরা উচ্চারিত হলে নীরব গভীর চিৎকারে
ব্যাহত হয় এই শান্তি অরণ্যে সমস্ত সুখ পাখিদের রাত্রিকালীন ঘুম,

সে শব্দেরা উচ্চারিত হলে ক্রসিং পয়েন্টে সারাটাদিন জুড়ে একটিও গোলাপ গোলাপ বিক্রি হয় না ভুখা ছেলেটির হাতে,

সে শব্দেরা উচ্চারিত হলে সদর দরজার পাশে মিথ্যে হয়ে যায় পৃথিবীর সমস্ত মায়ের অনন্ত অপেক্ষা,

সে শব্দেরা উচ্চারিত হলে রঙিন আলোক চাদরে ঢাকা দীপাবলি রাত দৈনতা ঢাকতে পারে না ফুটপাত জুড়ে ,

আসলে তীব্রতম যন্ত্রনায় যে কথা
বহুবার বলতে গিয়েও বলা হয়নি তাকে ,
আদতে তা কখনোই বলা যায় না সেভাবে।

: সৌভিক ঘোষ, রজিপুর, হাসনাবাদ

লকডাউনের জেরে…🌼

সেদিন সকালে ফোন এসেছিল একটা – কাঁদতে কাঁদতে মামা বলেছিল, “তোর বাবা আর নেই রে বাবু! পারলাম না আর কিছুদিন জাগিয়ে রাখতে!” –বিশ্বাস করতে পারেনি সে। এই তো, লকডাউন উঠলেই তো তার বাবার কাছে পৌঁছোনোর কথা ছিল!
আজও প্রতীক্ষায় জীমূত, হয়তো সারাজীবনই থাকবে; তার জীবনের এই লকডাউন আর কোনোদিনই স্বাভাবিক হবেনা। হাতে গ্লোব নিয়ে খেলা করার ছলে দূরত্ব মাপাও বোধহয় ছেড়ে দেবে সে, বাবার সাথে তার দূরত্বটা যে আর সেই মাপকাঠিতে মাপা যাবেনা!
না, তার বাবা করোনা আক্রান্ত নয়; নয় কোনো সৈনিক বা ডাক্তার – একজন সাধারণ ব‍্যবসায়ী মানুষ। চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু দেশব‍্যাপী হঠাৎ লকডাউনে আর ফিরতে পারেনি ঘরে, চাইলেও আর ফিরতে পারবেনা; চাইলেও ছুঁয়ে দেখতে পারবেনা তার বাবুকে, বুকে টেনে নিতে পারবেনা অভিমানী স্ত্রীকে। কিছু সম্পর্ক বোধহয় এভাবেও শেষ হয়! কিছু জীবনের সমাপ্তি বোধহয় এভাবেও ঘটে।
সারা বিশ্বের মানুষ যখন নোভেল করোনার খবর মাপতে ব‍্যস্ত, প্রশাসন ব‍্যস্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, তখনই নামকরা সরকারী হাসপাতালের বেডে শুয়েই শেষ নিশ্বাস ত‍্যাগ করেন অপেক্ষারত এক মানুষ – পরিবার- প্রিয়জনের অপেক্ষা।
এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখী পরিবার। ব‍্যবসার সুবাদে থাকতেন দেশেরই আর এক প্রান্তে। বাবা-মা-ভাই থাকেন কলকাতায় – পারিবারিক জটিলতায় সেইসব সম্পর্কতেও ভাঙন ধরেছিল ৬ বছর আগেই, কিন্তু , ধসে যাওয়ার খবর পাননি দূরে বসে; তাই, এখন যখন আবার কলকাতায় ফিরেছেন একাই, ঠাঁই মেলেনি সেই বাড়িতে – একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে শ্বশুরবাড়ি ও কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু-পরিজন। শারিরীক জটিলতা বাড়ছিল, তাই হঠাৎই আসেন কলকাতায় এবং এসে ধরা পড়ে দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসা চলতে থাকে, কিন্তু সুযোগ হয়নি kidney replacement এর – পরিবারের সই ছাড়া সেই অপারেশন যে সম্ভব ছিলনা– এগিয়ে আসেনি বাবা-মা। ইতিমধ‍্যেই লকডাউন শুরু হয়েছে, তাই স্ত্রী-ছেলেও আসতে পারেনি – চলতে থাকে অপেক্ষা। কিন্তু, ক্রমাগত বাড়তেই থাকে লকডাউনের পরিসর; আর একদিকে বাড়তে থাকে শারিরীক অবক্ষয়। একমাত্র আশা video call…বারবার চেয়েও পায়নি প্রশাসনিক কোনো সাহায‍্য। এভাবেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে মৃত‍্যুতে এসে। দেখা হয়নি কারো সাথেই – সুদূরে বসে শুধু থমকে গেছে একরাশ আশা, বয়ে গেছে চোখের জলের ধারা।
ছেলের মৃত‍্যুর খবরেও একফোঁটাও বিচলিত হয়নি বাবা-মা। পারিবারিক বিবাদের মূল কারণ যখন টাকাপয়সা-গয়না-সম্পত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোধহয় এমন পৈশাচিক মনোবৃত্তিই তৈরী হয়, আর লোপ পায় সম্পর্কের মূল‍্য; তাই ডুকরে ডুকরে শেষ হয়ে যেতেও দেখা পায়নি সেই আশৈশব-প্রিয় মুখগুলো। শুধু থমকে গেছে জীমূতের পথ চলা; হয়তো,মেরুদন্ডহীনভাবে চলবে কিছুদিন তারপর আবার ফিরবে মূল স্রোতে; আবার হয়তো নাও ফিরতে পারে, মিলিয়ে যাবে চোরাবালিতে। তবে, দূর্গাদের মৃত‍্যু যেভাবে অপুদের বড়ো করে দেয় এক ধাক্কায়, সেভাবে জীমূতরাও একধাপ বেড়ে উঠবে। শুধু ভুলতে পারবেনা এয়ারপোর্টে শেষ ছুঁতে পাওয়া বাবাকে, video call-এ শেষ দেখা বাবাকে আর পূর্বস্মৃতির আঁচর! লকডাউন এখনো চলছে….

: মধুরিমা রায়, রাণাঘাট, নদীয়া- ৭৪১২৪৭.

ইনকা 🍁

যেখানে খুশি জমুক কালো মেঘ
তবু বৃষ্টি তোমাকে ভেজাতে চাই না।
পৃথিবীর গভীরতম ঘড়ির যে পেন্ডুলাম
ভালোবাসা, চিরদিনই বকের মতো সাদা।

ঠিক এখান থেকে কতদূরে তুমি ইরা?
পৃথ্বী মাঝেও কি তুমি বিকশিত তারা?
এবড়ো খেবড়ো জীবন কনসার্টে
মাটি হাওয়া রং ডেসার্টে
আততায়ী উৎসব।

আচ্ছা, ভালোবাসি এ কথা; না বললে কি
ভালোবাসা যায় না, নাকি ভালোবাসা হয় না?

ভালোবাসলেই তাকে পেতে হবে
এমন সংবিধান অবশ্য কোন দেশে নেই
আর নেই বলেই আমি সফলভাবে ব্যর্থ, এটা বুঝতে-
কেন এক আনালায় আমাদের জামা কাপড় থাকে না!

এতো বৃষ্টি হয় পৃথিবীতে তবু আজো আমি চাই না
তোমার চোখের বৃষ্টি তোমাকে ছুঁয়ে যাক কখনো…

©® : প্রনব রুদ্র
বিবেকানন্দপল্লী, গাজোল, মালদা।

জয় গোস্বামীর কবিতায় প্রেমচেতনা…

“জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোস্নার ধারণা দেব ব’লে

এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।”

“হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”…

“একজন কবি যে কবিতা রচনা করেন, তা নেহাত লেখালেখা খেলা নয়। কবিতা তার মাথা তোলবার, বেঁচে ওঠবার ভালবাসার অনন্য অবলম্বন। তিনি মানেন, স্বপ্নের মতো কবিতাতেও সমস্তই সম্ভব। তবু কবিতার জগৎ শুধু স্বপ্নেরই জগৎ নয়। কবিতা কবির ব্যাপ্ত, বিশাল আত্ম জীবনী। এক একটি কবিতা আত্মজীবনীর এক একটি পৃষ্ঠা।”

(ব্লার্ব, কবিতাসংগ্রহ৪: আনন্দ )

ঠিক তাই। কবি যে জীবন যাপন করেন, যে সমাজ বা রাষ্ট্রিক পরিমণ্ডলে বাস করেন, যে জীবন ফেলে আসেন, যা তাঁর স্বপ্ন-স্মৃতি, অধরা মায়া…

তার সবকিছুই কবিকে আঁকড়ে ধরে, সাপটে-জাপটে নেয় অক্ষর-শব্দের মায়াজালে। কবি তাই ক্রমাগত নির্মাণ করেন নিজেকে। খনন করেন আপনাকে। তাঁর বোধে প্রকৃতি প্রেম অসূয়া প্রতিহিংসা উত্থান-পতন সামাজিক অবয়ব সবই রেখাপাত করে গভীর ভাবে। অর্থাৎ গোটা জীবনটাই উঠে আসে কবিতায়। কবি জয় গোস্বামী সেই কবি, যিনি কবিতায় তাঁর আত্মজীবনী রেখে গেছেন। শব্দের হাত ধরে আত্মউন্মোচিত সেই জীবনে প্রেম যেন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে। আমাদের আলোচনা কবির প্রেমচেতনা।

রবীন্দ্র-জীবনানন্দ পরবর্তীতে শক্তি-সুনীল-শঙ্খ ঘোষ পেরিয়ে কবিতার এক নিজস্ব ভুবন তৈরি করেছেন কবি জয় গোস্বামী। তাঁর পরিধিতে তিনিই সম্রাট। এক কথায় বলা যায় তাঁর কবিতা চিত্ররূপময় । ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন কবি। ছন্দের ভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রেমে- অপ্রেমে তিনি কবিতার যে নিটোল গৃহ বানিয়েছেন, সেখানে ছায়াকামিতায় অনায়াসে ক্লান্ত তপ্ত পাঠক-পথিক চিরকালীন বসবাস করতে পারেন;

“পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন

এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা

পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।”

– (পাঁচালী : দম্পতি কথা)

জয় গোস্বামীর প্রেমের জগৎ বিচিত্র বিভায় আলোকিত। সেখানে যেমন আর্তি আকুলতা আছে, বিরহ অভিসার সমর্পণ মিলন প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি আছে। আলো আছে, ভালো আছে, আবার কালো অন্ধকারও আছে । ক্ষমার সঙ্গে সহ্য যেমন, তেমনই অগ্রাহ্যের সঙ্গে আছে প্রতিবাদ । কিশোরকাল থেকে কবি প্রেমকে দেখেছেন কখনও দূর থেকে, কখনও বা কাছ থেকে। বৈধ অবৈধ প্রকাশ্য বা আড়াল সব ধরনের প্রেম তাঁর কবিচেতনাকে ঋদ্ধ করেছে। কবির প্রেমচেতনা বহুরৈখিক। সেখানে বিশ্বাস অবিশ্বাস সমান ভাবে দোলে। তবে, প্রেমের ব্যর্থতা, আশাভঙ্গ তাঁকে বেশি ব্যথাতুর করেছে।

প্রাকৃতিক নিয়মে প্রেম আসে মানবজীবনে। সে নগর গ্রাম মানে না। স্বীকৃতি অস্বীকৃতি ভাবে না। আপন ভাবেই বিভোর। কবি জয়ের কবিতায়ও সেই অনুরাগের ছোঁয়া-

“বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে

বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে

ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর

বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর

আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি

আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি।”

– (মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়)

এই প্রেম কখন স্তিমিত, কখনও বা গুটি গুটি ভীরু পায়ে সংকোচের সঙ্গে হাঁটে। “স্বপ্নে” কবিতায়-

“ক’টা বাজলো? উঠে পড়লি তুই

সব ঘড়িকে বন্ধ করল কে?

রাগ করবি? হাতটা একটু ছুঁই?

বাড়ির দিকে এগিয়ে দিচ্ছি তোকে…

স্বপ্নে তোকে এগিয়ে দিই যদি

তোর বরের তাতে কি যায় আসে?

সত্যি বলছি, বিশ্বাস করবি না

স্বপ্নে আমার চোখেও জল আসে!”

ভীরু আর অচরিতার্থ প্রেম এক সময় কেঁপে ওঠে। অভিশাপ ছুঁড়ে দেয় তথাকথিত সভ্য সমাজের দিকে। তার প্রতিবাদী কণ্ঠে কবি এভাবেই সোচ্চারে প্রশ্ন জুগিয়েছেন,

“রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে

মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে

আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে

মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে

আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি

আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি

তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই?

কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?”

-(মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়)

আবার জয়ের প্রেম বৈধতা অবৈধতা গ্রাহ্য করে না। সে জানে বন্ধুর বিশ্বাস। আর নিজের মত হাঁটা;

“কলঙ্ক, আমি কাজলের ঘরে থাকি

কাজল আমাকে বলে সমস্ত কথা

কলঙ্ক, আমি চোট লেগে যাওয়া পাখি—

বুঝি না অবৈধতা।

— —

কলঙ্ক, তুমি প্রদীপ দেখেছো? আর প্রদীপের বাটি?

জানো টলটল করে সে আমার বন্ধুর দুই চোখে?

আমি ও কাজল সন্তান তার, বন্ধুরা জল মাটি

ফিরেও দেখি না পথে পড়ে থাকা

বৈধ-অবৈধকে—

যে যার মতন রোদবৃষ্টিতে হাঁটি…”

-( কলঙ্ক কাজল )

“স্নান” কবিতায় তিনি দুরন্ত বেপরোয়া প্রেম চিনিয়েছেন আমাদের। দাবি করেছেন পুরুষের অধিকার-

“আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি

ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি

আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল

অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?”

নারী-পুরুষের সম্পর্কের সার্থকতা তাদের প্রেমে। সে প্রেম জাগরণের মন্ত্র শেখায়। আর কবি জন্মান্ধ মেয়েকেও জ্যোৎস্নার ধারনা দিতে চান। প্রেমের স্বরূপ বোঝাতে চান;

“শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে

এখনো গোপন ক’রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;

সমস্ত যৌবন ধ’রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি

একা দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,

জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোস্নার ধারণা দেব ব’লে

এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।”

(স্নান: ঘুমিয়েছ ঝাউ পাতা)

মর্মে মর্মে রোমান্টিক কবি জয় গোস্বামী যেমন রাত্রির মরুভূমিতে জ্যোৎস্না ফোটান, তেমনই প্রেমের আবহমান যাত্রায় যে অতৃপ্তি তাকেও স্পর্শ করেন গভীর ভাবে। তাই মন খারাপের এই সন্ধ্যাফেরি আমাদের অন্য প্রেমের স্বাদ দেয়।

“সে যে কী সম্পর্ক সব। কাউকে জানিয়ে না।

সে সবই লবণ স্বাদ। অশ্রুবিষে লোনা।

অশ্রু লবণাক্ত শুধু? রক্ত বুঝি নয়?

সে-প্রেমে রক্তের স্বাদ। খেলে নেশা হয়।”

– (সন্ধ্যাফেরি)

হ্যাঁ, তাঁর প্রেম সব সময় সমাজবৈধ না। সে মাঝেমধ্যে অবৈধ পরকীয়ার পথ ধরে। নিষিদ্ধ ছায়ান্ধকারে তার চলন। আর এই চলন যখন গমনের পথ পায় না, তখন সে আত্মবিনাশের সিদ্ধান্ত নেয়।

“ওই যে প্রেমিক আর ওই যে প্রেমিকা-

প্রচুর ঘুমের পিল ব্যাগে, নিয়ে ঘুপচি-মতো হোটেলে উঠেছে

ওই যে যুবক আর ওই যে যুবতী

ফলিডল শিশি নিয়ে চুপচাপ দরজা দিচ্ছে ঘরে

ওই যে ছেলেটি আর ওই যে মেয়েটি

রেললাইনের ধারে, ঝোপঝাড়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে সন্ধ্যেবেলা

দূরে লোকালের আলো

আজ, কাল, পরশু, তরুণ ওদের সবাইকেই

অপঘাতে মৃত রূপে খুঁজে পাওয়া যাবে…

ওরা তো মাস্টার ছাত্রী, দেওর বৌদি তো ওরা

ওরা তো সুদূর সম্পর্কে ভাইবোন

লোকচক্ষু থেকে ওরা এই পথে বাইরে চলে এল।”

– (পরিশিষ্ট : পাতার পোশাক)

আবার এই প্রেমে আছে আস্থাহীন অবিশ্বাস। আধুনিক মানব-মানবীর অন্তঃসারশূন্য সুড়ঙ্গ-জীবন। প্রেম এখানে খুঁজে নিচ্ছে অন্য অবলম্বন ।

“সে রেখেছে বুকে মাথা। বন্ধ চোখ। সিঁথির উপরে

আমার চিবুক রাখা। কাঁচাপাকা দাড়ি ভর্তি গালে

ওর হাতটি থেমে গেল। আমার গলায় পড়ছে ঘন, দীর্ঘশ্বাস।

শরীরে আসেনি কাম। শুধু চোখ ভ’রে এল জলে।

সে ফুঁসে উঠেছে: ‘তুমি আর কাউকে সব দিয়ে এসেছে আগেই!’ “

(বিশ্বাস : বিকেলবেলায় কবিতা ও ঘাসফুলের কবি)

না, অত সহজ না জীবন। ফল্গুধারার মত, তুষের আগুনের মত ধিকি ধিকি জ্বলে প্রেম অবিনশ্বর।

“মেয়েকে দেখাই সব। ও এখন বড় হয়েছে। ও হয়তো বুঝল-ও

কী ছিল সম্পর্ক আমাদের ।

মেয়ে একটা হাত ধরল, তুমি ধরে রাখলে অন্য হাত—

ভিড়ের ভিতর দিয়ে পথ ক’রে দিয়েছে অন্ধের।”

( সুচরিতার : বিকেলবেলার কবিতা ও ঘাসফুলের কবি )

আগেই বলেছি জয় গোস্বামী জীবন অন্বেষক কবি। জীবনকে তিনি সাপটে জাপটে ধরেন। তাই তাঁর প্রেম-অনুভূতি এত বর্ণিল, এত স্তরবিশিষ্ট। পরতে পরতে জমে পেলবতার পলি। আর সেই পলি খনন করলে উঠে আসে জীবনদায়ী স্বচ্ছ জলে।

“পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন।”

—- —-

“পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।”

– (পাগলি, তোমার সঙ্গে)

তবুও অনন্ত ধরে মেঘবালিকারা উঠে আসে। এক পৃথিবী লিখতে
পারেন কথক কবি তাদের জন্য। সংবেদী হৃদয় আর অনুচ্চার ভালোলাগা নিয়ে কবি হেঁটে যান সময়ের পথে। প্রেমের আলপনা মাড়িয়ে স্নিগ্ধ সবুজ ঘাসে ঢাকা তাঁর শাশ্বত শ্যামশ্রী ইচ্ছার কাছে।

:রবীন বসু

——-

।। গুচ্ছকবিতা ।।

(১)

প্রিমিটিভ

******************************************

কিছুই সাজিয়ে রাখিনি
মেধাও ঢাকিনি মাথার চুলে
দিনকে করিনি আড়াল জীবনের বিকেলে
নুন আনতে পান্তা ফুরাইনি

দহন এসেছে বলে কুয়োও খুঁড়িনি
তোমার বিছানা থেকে পা রেখেছি দূরে
নিজের গান গাইনি কারও সুরে
অযথা সমুদ্রে গিয়ে ডুবেও মরিনি

নিভে গেছে একলা প্রদীপ বলে
কেরোসিন চাইনি তোমাকে
অন্ধকারে ডুবে থেকে থেকে
আজ আমি হয়ে গেছি আঁধারের ছেলে

(২)

পাথর হয়ে আছে

******************************************

এত মৃত্যুর পরও সকাল হাসছে
প্রজাপতি উড়ছে
বিবাহ বাসর বসেছে
নতুন শাড়ি পরে বেরিয়ে আসছে সূর্যমুখী

এইসব হাসির উপর কান্না ঝরে পড়ছে আমার
চিকমিক করছে মনখারাপের দেহ
ভাঙা নদীর উপর কে ছবি আঁকছে ?কে?

নীল রঙের শার্ট পরে হাঁটছি শবের উপর দিয়ে
কোন দিকে যাব?

পাথর হয়ে আছে সমস্ত দেশ, পাথরেই ফুল ফুটছে

বিস্ময়সূচক

(৩)

ঘোরের ভেতর থেকে

******************************************

একটা অন্ত্যজ পর্যটন সেরে ফিরে আসি
লেখার বদলে আঁকিবুকি
অজস্র মনখারাপ করা
অথবা রক্তে ছয়লাপ পাড়া
বিষাদ সকাল, বিস্বাদ চায়ের কাপ
উঠোনে সংবাদ আনে কাক….
সভ্যতা ভেঙে যায়
মনুষ্যত্ব ধুলো হয়ে ওড়ে
ছন্দ নেই, কবিতাও নেই
বিষ-অক্ষরে শব্দ ছন্নছাড়া
ঘোরের ভেতর থেকে
নিজেকে খুঁজতে থাকি, নিজের হারানো আত্মাকে

(৪)

নৌকা

******************************************

খালি নৌকা কোথায় যাবে?
নৌকায় ভাটিয়ালি চেপে বসুক
আমি ঢেউ তুলছি, ঢেউ

নৌকা ভেসে-ভেসে পেরিয়ে যাক যুগের সংকট

(৫)

নীলভাস্কর

******************************************

দুর্বলতা মরচে পড়া ঘুম
না এলেও আসে, এলেও আসে না
আলোকে পরাহত, বস্তুত নিঃঝুম

অশোক বনের কোনো নারী
নিবেদিত জলে, গোপন আকাঙ্ক্ষার ঢেউ ফেলে গেছে
স্পন্দনে কেঁপে ওঠে হাত,নীলজল
আবার কদম ফুটে ওঠে

ছায়া পড়ে মুগ্ধ মনোরম

স্নেহের আস্তরণ খুলে দেখি
সমীহ পবন যায় আসে
অথবা দুরন্ত জটিল কোনো সর্বনাম

লিখতে থাকে যা কিছু লেখার স্বয়ংক্রিয়
অথবা লেখে না
রোদ্দুর ও জলে মেলে দেয় দেহ
দেহে দেহে পর্যাপ্ত কাম

: তৈমুর খান 🌸

Design a site like this with WordPress.com
Get started